Logo

মতামত

শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট বর্জনের ঘোষণা : রাজনীতিতে ‘ভালোর প্রতিযোগিতা’ ও আগামীর বার্তা

জাহিদ ইকবাল

জাহিদ ইকবাল

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৪:০৪

শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট বর্জনের ঘোষণা : রাজনীতিতে ‘ভালোর প্রতিযোগিতা’ ও আগামীর বার্তা

বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ‘জনপ্রতিনিধি’ শব্দটির সমার্থক হয়ে দাঁড়িয়েছিল রাজকীয় সুযোগ-সুবিধা। সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়া মানেই যেন শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি (ডিউটি-ফ্রি কার) এবং রাজউকের মূল্যবান প্লট প্রাপ্তির এক অলিখিত অধিকার। দশকের পর দশক ধরে চলে আসা এই প্রথাটি আইনি বৈধতা পেলেও নৈতিকতার প্রশ্নে বারবার সাধারণ মানুষের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে জাতীয় রাজনীতিতে এক অভূতপূর্ব পরিবর্তনের হাওয়া বইতে শুরু করেছে। বিশেষ করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-এর নবনির্বাচিত সংসদ সদস্যদের পক্ষ থেকে সরকারি বিশেষ সুবিধা তথা শুল্কমুক্ত গাড়ি এবং প্লট গ্রহণ না করার ঘোষণা একটি নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) বিএনপির সংসদীয় দলের প্রথম বৈঠকে এই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তটি সর্বসম্মতভাবে গৃহীত হয়।

এই সিদ্ধান্তের গভীরতা কেবল একটি আর্থিক ত্যাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং এটি দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতার সাথে সংগতিপূর্ণ একটি দূরদর্শী পদক্ষেপ। বাংলাদেশ বর্তমানে যে ধরনের সামষ্টিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং মুদ্রাস্ফীতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, সেখানে জনগণের ট্যাক্সের টাকায় জনপ্রতিনিধিদের ব্যক্তিগত বিলাসিতা পরিহার করা সময়ের দাবি।

বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে দলটির সংসদীয় দল যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা মূলত জনআকাঙ্ক্ষারই প্রতিফলন। এর আগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীও তাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জন্য অনুরূপ সুযোগ-সুবিধা বর্জনের ঘোষণা দিয়েছিল। ফলে দেশের প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে এখন এক ধরনের ‘ভালোর প্রতিযোগিতা’ শুরু হয়েছে, যা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে বিরল এবং ইতিবাচক।

বিশ্বের উন্নত ও স্থিতিশীল গণতন্ত্রের দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে জনপ্রতিনিধি হওয়া মানেই অতিরিক্ত ব্যক্তিগত সুবিধা ভোগ করা নয়। উদাহরণস্বরূপ, যুক্তরাজ্যের ‘হাউস অব কমন্স’-এর সদস্যদের কথা বলা যেতে পারে। সেখানে সদস্যরা ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য কোনো শুল্কমুক্ত গাড়ি সুবিধা পান না। তারা নির্দিষ্ট বেতন এবং কেবল অফিস পরিচালনা বাবদ ভাতা পান, যা একটি স্বাধীন নিয়ন্ত্রক সংস্থার মাধ্যমে কঠোরভাবে নিরীক্ষিত হয় এবং সেই হিসাব জনগণের জন্য উন্মুক্ত থাকে। একইভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেস সদস্যদের জন্যও কোনো করমুক্ত গাড়ি কেনার সুবিধা রাখা হয়নি।

ন্যদিকে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো— যেমন সুইডেন ও নরওয়েতে— সংসদ সদস্যরা সাধারণ মানুষের মতোই গণপরিবহন বা সাইকেল ব্যবহার করে অফিসে যাতায়াত করেন। সেখানে রাজনৈতিক সংযম কেবল একটি নিয়ম নয়, বরং এটি তাদের সংস্কৃতির একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। বাংলাদেশেও এখন সেই ধরনের একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলার আভাস পাওয়া যাচ্ছে।

সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা নাগরিক সংগঠনগুলো দীর্ঘদিন ধরেই বলে আসছে যে, জনপ্রতিনিধিদের জন্য সুযোগ-সুবিধাগুলো সীমিত, স্বচ্ছ এবং কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত। বিএনপি ও জামায়াতের মতো বড় দলগুলোর পক্ষ থেকে আসা এই স্বপ্রণোদিত ঘোষণাটি মূলত সেই দাবিকেই স্বীকৃতি দেয়। জনগণের সেবক হিসেবে যখন একজন সংসদ সদস্য রাষ্ট্রীয় বিলাসিতা বর্জন করেন, তখন সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনীতি নিয়ে হারানো আস্থা পুনরায় ফিরে আসতে শুরু করে। এটি কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ সাশ্রয় করবে না, বরং সমাজের সর্বস্তরে মিতব্যয়িতা এবং নৈতিক নেতৃত্বের এক শক্তিশালী বার্তা পৌঁছে দেবে।

পরিশেষে বলা যায়, এই ঐতিহাসিক ঘোষণাটি কেবল একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, বরং এটি বাংলাদেশের ক্ষয়ে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নৈতিকতার এক নতুন সূর্যোদয়। দশকের পর দশক ধরে আমরা যে ‘সুবিধাভোগী’ রাজনীতির বলয় দেখে এসেছি, সেখান থেকে বেরিয়ে আসার এই সাহসী পদক্ষেপ জনআকাঙ্ক্ষারই এক বলিষ্ঠ প্রতিফলন। তবে মুদ্রার উল্টো পিঠ হলো— ঘোষণা দেওয়া যতটা সহজ, তার বাস্তবায়ন এবং সেই অবস্থানে অটল থাকা ততটাই কঠিন। রাজনৈতিক বিশ্লেষক থেকে শুরু করে সাধারণ ভোটার, সবার দৃষ্টি এখন কেবল এই প্রতিশ্রুতির ওপর নিবদ্ধ। এই ত্যাগ যেন কোনো সাময়িক চমক বা সস্তা জনপ্রিয়তার সোপান না হয়; বরং এটি যেন হয় একটি জবাবদিহিমূলক, বৈষম্যহীন এবং জনবান্ধব রাষ্ট্র গঠনের স্থায়ী ভিত্তিপ্রস্তর। যদি জনপ্রতিনিধিরা সত্যিই বিলাসিতার মোহ ত্যাগ করে জনগণের কাতারে এসে দাঁড়াতে পারেন, তবে তা দেশের গণতান্ত্রিক ইতিহাসে এক বৈপ্লবিক মোড় পরিবর্তনকারী অধ্যায় হিসেবে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে। সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা এখন একটাই— রাজনীতিতে কথার চাতুর্য নয়, বরং কর্মের বিশুদ্ধতা। জনপ্রতিনিধিরা যখন নিজেদের ব্যক্তিগত প্রাপ্তির ঊর্ধ্বে উঠে রাষ্ট্রীয় দায়িত্বকে পরম ব্রত হিসেবে গ্রহণ করবেন, তখনই এ দেশের মানচিত্রে ফুটে উঠবে প্রকৃত গণতন্ত্রের অমলিন হাসি।

রাজনীতিতে সূচিত এই ‘ভালোর প্রতিযোগিতা’ কেবল একটি সাময়িক চমক হিসেবে নয়, বরং আগামীর এক সুসংহত ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গঠনের স্থায়ী ইশতেহার হিসেবে গণ্য হোক। ক্ষমতার মোহ আর ব্যক্তিগত প্রাপ্তির চিরাচরিত বৃত্ত ভেঙে জনপ্রতিনিধিরা যখন ত্যাগের এই নতুন সংস্কৃতিকে আলিঙ্গন করবেন, তখনই দেশের রাজনীতির রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত হবে সত্যিকারের দেশপ্রেমের সুবাতাস। বিলাসিতার মোহমুক্ত এই রাজনীতি কেবল রাষ্ট্রীয় কোষাগারই সমৃদ্ধ করবে না, বরং সাধারণ মানুষের হৃদয়ে রাজনীতি ও রাজনীতিকদের হারানো মর্যাদা পুনরুদ্ধার করবে।

আমাদের প্রত্যাশা— ত্যাগের এই মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক মানচিত্রে একটি নতুন অধ্যায় রচিত হোক, যেখানে ব্যক্তিগত সুবিধা নয়, বরং জনকল্যাণই হবে রাজনীতির একমাত্র ধ্রুবতারা। এই শুভযাত্রার মধ্য দিয়ে বাংলাদেশ একটি সমৃদ্ধ, ন্যায়ভিত্তিক ও নৈতিক শক্তিতে বলীয়ান রাষ্ট্র হিসেবে বিশ্বের দরবারে মাথা উঁচু করে দাঁড়াবে—এটাই হোক আমাদের আগামীর অঙ্গীকার।

লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর