তারেক রহমানের প্রটোকল ভাঙার রাজনীতি : নতুন ইতিহাসের পথে বাংলাদেশ
প্রকাশ: ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ১৬:৫০
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতা মানেই বিশেষ প্রটোকল, আলাদা সুবিধা এবং জনজীবন থেকে দৃশ্যমান দূরত্ব— এমন একটি সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠিত ছিল। সাধারণ মানুষ ধরে নিয়েছিল, রাষ্ট্রক্ষমতার শীর্ষে পৌঁছানো মানেই আলাদা রাস্তা, আলাদা অধিকার। সেই প্রেক্ষাপটে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তারেক রহমান যে কয়েকটি পদক্ষেপ ও বার্তা দিয়েছেন, তা নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের চেয়ে বড়— এটি রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
সিগন্যালে দাঁড়িয়ে থাকা, অপ্রয়োজনে রাস্তা বন্ধ না রাখা, শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা না নেওয়ার ঘোষণা, সরকারি গাড়ি ও জ্বালানি ব্যবহারে সংযম— এসব প্রতীকী পদক্ষেপ ক্ষমতাকে জনতার কাতারে নামিয়ে আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশে ভিআইপি চলাচলের সময় দীর্ঘ যানজট, জনদুর্ভোগ ও নিরাপত্তার নামে কঠোর প্রটোকল বহুদিনের বাস্তবতা। অথচ বিশ্বের অনেক গণতান্ত্রিক দেশে নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও সরকারপ্রধানেরা স্বাভাবিক চলাচল বজায় রাখেন। নিউজিল্যান্ড, সুইডেন কিংবা কানাডার রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে সরলতা ও জবাবদিহি গণতন্ত্রের শক্ত ভিত্তি হিসেবে বিবেচিত। সেখানে মন্ত্রীদের গণপরিবহন ব্যবহার করা বা অতি সীমিত নিরাপত্তা প্রটোকল অস্বাভাবিক নয়। সরলতা সেখানে দুর্বলতা নয়; বরং রাজনৈতিক আত্মবিশ্বাসের বহিঃপ্রকাশ। বাংলাদেশেও যদি এই সরলতা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়, তবে তা রাজনৈতিক আচরণে স্থায়ী সংস্কারের সূচনা হতে পারে।
ইতিহাসের দিকে তাকালে দেখা যায়, প্রত্যেক রাষ্ট্রনায়কের সময় ও চ্যালেঞ্জ আলাদা।
মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী অস্থির সময়ে জিয়াউর রহমান প্রশাসনিক পুনর্গঠন ও গ্রামীণ উন্নয়ন কর্মসূচির মাধ্যমে ভিন্নধর্মী নেতৃত্বের ছাপ রাখেন। অন্যদিকে খালেদা জিয়া দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রাম ও একাধিকবার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হয়ে জনপ্রিয়তার অনন্য নজির স্থাপন করেন। বর্তমান সময়ের চ্যালেঞ্জ আরও জটিল— এখন জনগণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তাৎক্ষণিক ফলাফল চায়, প্রতিশ্রুতির সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে।
শুল্কমুক্ত গাড়ি ও প্লট সুবিধা বর্জনের ঘোষণা রাজনৈতিক নৈতিকতার প্রশ্নে গুরুত্বপূর্ণ। জনপ্রতিনিধিদের বিশেষ সুবিধা নিয়ে দীর্ঘদিন বিতর্ক রয়েছে। জনগণের করের অর্থে পরিচালিত রাষ্ট্রে ক্ষমতাসীনদের সংযম জনগণের আস্থা বাড়ায়। তবে এই সিদ্ধান্তগুলো যদি কেবল ব্যক্তিনির্ভর থাকে, তাহলে তা সাময়িক বার্তায় সীমাবদ্ধ থাকবে। প্রয়োজন আইনি কাঠামো ও প্রশাসনিক বিধিমালার মাধ্যমে নীতিকে স্থায়ী রূপ দেওয়া।
নারীর অংশগ্রহণ প্রসঙ্গেও বর্তমান নেতৃত্বের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ। দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠী নারী—এ বাস্তবতা নীতিনির্ধারণে প্রতিফলিত হওয়া জরুরি। নির্বাচনী প্রচারণায় পরিবারে নারী সদস্যদের স্বাধীন অংশগ্রহণ প্রতীকী বার্তা দিলেও কাঠামোগত পরিবর্তন আরও বড় চ্যালেঞ্জ। সংসদ, স্থানীয় সরকার, প্রশাসন— সবখানে নারীর কার্যকর প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে না পারলে সামাজিক ভারসাম্য পূর্ণতা পাবে না।
অর্থনৈতিক বাস্তবতা সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা হয়ে থাকবে। মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ— এসব সমস্যার সমাধান কেবল প্রতীকী সরলতায় সম্ভব নয়। প্রয়োজন দুর্নীতি দমন, রাজস্ব কাঠামোর সংস্কার, বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ ও প্রশাসনিক দক্ষতা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান ধরে রাখতে হলে সুশাসন ও নীতিগত স্থিতিশীলতা অপরিহার্য।
গণমাধ্যম ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখানে কেন্দ্রীয় বিষয়। একটি সরকার কতটা আত্মবিশ্বাসী, তা বোঝা যায় সমালোচনা গ্রহণের সক্ষমতায়। যদি গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারে এবং সরকার স্বচ্ছতা বজায় রাখে, তবে জনআস্থা দৃঢ় হবে। নতুন নেতৃত্বের জন্য এটি যেমন চ্যালেঞ্জ, তেমনি সুযোগও।
ইতিহাস বলছে— জনপ্রিয়তা অর্জন কঠিন, ধরে রাখা আরও কঠিন। জনগণ ভোট দিয়েছে প্রত্যাশা থেকে। দু’এক মাস পর থেকেই মানুষ হিসাব চাইবে; বিরোধীরা সমালোচনা করবে; প্রচারযুদ্ধ চলবে। এটাই গণতন্ত্রের স্বাভাবিক বাস্তবতা। প্রতিশ্রুতি ও বাস্তবতার ব্যবধান যত কম হবে, আস্থার ভিত্তি তত শক্ত হবে।
প্রতীকী সরলতা যদি সুশাসনের ধারাবাহিকতায় রূপ নেয়, নারীর অংশগ্রহণ যদি কাঠামোগত শক্তিতে পরিণত হয়, অর্থনীতি যদি স্থিতিশীলতার পথে এগোয় এবং গণতান্ত্রিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন থাকে— তবে সত্যিই একটি নতুন অধ্যায়ের সূচনা সম্ভব।
এখন সময় কথার চেয়ে কাজে প্রমাণ দেওয়ার। কারণ জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট— সফলতার বিকল্প নেই, সফল হতেই হবে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন।
এমবি


