Logo

মতামত

রাষ্ট্র মেরামতের দায়সহ নতুন সরকারের যত চ্যালেঞ্জ

মেহেদী হাসান শোয়েব

মেহেদী হাসান শোয়েব

প্রকাশ: ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৬:০৮

রাষ্ট্র মেরামতের দায়সহ নতুন সরকারের যত চ্যালেঞ্জ

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী প্রেক্ষাপট রাষ্ট্রপরিচালনায় নতুন আকাঙ্ক্ষার জন্ম দিয়েছে। বিগত প্রায় দেড় দশকের একটি নিরবচ্ছিন্ন রাজনৈতিক অধ্যায়ের পর, এক বিশেষ প্রেক্ষাপটে পূর্ববর্তী সরকারের পতন এবং পরবর্তী ১৮ মাস ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার প্রচেষ্টার মধ্য দিয়ে দেশ এক পরিবর্তিত বাস্তবতায় প্রবেশ করেছে। অবশেষে ২০২৬ সালের ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের মধ্য দিয়ে তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলো, তখন একদিকে যেমন মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের মাধ্যমে ক্ষমতার পালাবদল ঘটল; পাশাপাশি দেড় বছরের রাজনৈতিক ও সাংবিধানিক ধারাবাহিকতার নানা সংকট থেকে উত্তরণের নতুন সূচনাও হলো। তবে নানা কারণেই বর্তমানের এই সন্ধিক্ষণ একই সাথে প্রবল আশাবাদ ও গভীর নীতিগত চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি।

জুলাই সনদ ও সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা
নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় আদর্শিক পরীক্ষা হলো ‘জুলাই সনদ’ বাস্তবায়ন। এটি কেবল বিএনপির নির্বাচনী ইশতেহার নয়, বরং গণভোটের মাধ্যমে প্রাপ্ত জনম্যান্ডেটের এক নীতিগত দলিল। যদিও গণভোটের বৈধতা নিয়েও রয়েছে প্রশ্ন।

প্রশ্ন উঠেছে, জুলাই সনদ কি কেবল একরকম রাজনৈতিক সমঝোতা, নাকি এটি একটি নতুন সাংবিধানিক ভিত্তিমূল? এই সনদ অনুযায়ী যদি ‘এক ব্যক্তির দুই পদ’ (প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় প্রধান) পৃথকীকরণ কার্যকর করতে হয়, তবে তারেক রহমানকে নিজের দলের ওপর কর্তৃত্বের প্রথাগত বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। বাস্তব আশঙ্কা হলো—তারেক রহমান দলীয় পদ ছাড়লে দলের ও সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বে যে দ্বৈত কেন্দ্র তৈরি হবে, তাতে নীতিনির্ধারণী সিদ্ধান্ত গ্রহণে অচলাবস্থা তৈরির ঝুঁকি থেকে যায়। এখানে সত্যিকারের ক্ষমতা-ত্যাগের দৃষ্টান্ত স্থাপন এবং ক্ষমতার অতি-কেন্দ্রীকরণ রোধ করতে পারলেই রাজনৈতিক সংস্কৃতির সংস্কার সম্ভব হতে পারে। তবে তা সহজ বিষয় নয়। দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক চর্চাবলয় থেকে বেরিয়ে নতুন ভাবনা-কাঠামোকে গ্রহণ করতে বিএনপির কতটা সময় লাগে, তা এখন দেখার বিষয়।

জুলাই সনদ অনুযায়ী দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ গঠনের ধারণা বাস্তবায়নও খুব সহজেই হয়ে যাবে বলে মনে হয় না। এক্ষেত্রে প্রধান বাধা হবে এর গঠনপ্রক্রিয়া। উচ্চকক্ষের সদস্য মনোনয়নে যদি দলীয় আনুগত্যকে স্থান দেওয়া হয়, তবে এই উদ্যোগ কেবল একটি আলঙ্কারিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হবে। এটি কি কেবল কৌশলগত সমঝোতা হবে, নাকি বিরোধী দলগুলোর সাথে আদর্শগত ঐকমত্যের ভিত্তিতে হবে— সেটাও দেখার বিষয়।

ইউনূস আমলের উত্তরাধিকার ও রাজনৈতিক সমীকরণ
অন্তর্বর্তী সরকারের সময় নেওয়া সিদ্ধান্তগুলোর আইনি ও প্রশাসনিক বৈধতা দেওয়া নতুন সরকারের জন্য এক জটিল সমীকরণ। ড. ইউনূসের আমলের অনেক অধ্যাদেশ হয়তো পদ্ধতিগতভাবে কার্যকর, কিন্তু দলীয় রাজনীতির স্বার্থে সেগুলো কতটুকু ধরে রাখা সম্ভব হবে, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রশাসনে দীর্ঘদিনের যে ধারাবাহিকতা ও মনস্তাত্ত্বিক বিন্যাস তৈরি হয়েছে, মৌলিক সংস্কার ছাড়া কেবল ‘ব্যক্তি বদল’ করে সেখানে সুশাসন নিশ্চিত করা কঠিন।

অন্তর্বর্তী সরকার কোনো আইনি বা বিচারিক প্রক্রিয়ায় না গিয়ে, কোনো অভিযোগ প্রমাণের আগেই নির্বাহী আদেশে ছাত্রলীগ নিষিদ্ধ করেছে এবং আওয়ামী লীগের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী ও বৃহৎ রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে রেখেছে। এসব নির্বাহী আদেশের বিষয়েও নতুন সরকারকে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে এগোতে হবে। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দেওয়া একটি বৃহৎ রাজনৈতিক শক্তিকে মূলধারার বাইরে রেখে অংশগ্রহণমূলক রাজনীতি যে টেকসই হবে না, তা বলাই বাহুল্য। এর সাথে আন্তর্জাতিক মহলের মানবাধিকারের মানদণ্ড ও কূটনৈতিক ভারসাম্য রক্ষার বিষয়টিও নিবিড়ভাবে জড়িত।

অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বাজার নিয়ন্ত্রণ
এসব রাজনৈতিক এবং কূটনৈতিক বিষয়ের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের জন্য নিত্যপণ্যের মূল্য নিয়ন্ত্রণে রাখাও জরুরি। বাজার তদারকি করে সাময়িকভাবে দাম কমানো সম্ভব হলেও দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা এক বিশাল কর্মযজ্ঞ। অন্তর্বর্তী সরকারের শেষ সময়ে এসে বাজার মোটামুটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। ফলে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিতে না নিতেই শুরু হয়েছে পবিত্র রমজান মাস। এ সময়ে এমনিতেই প্রতি বছর দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি পায়। এবার তা যেন আরও বেশি মাত্রায় লাগামহীন। দ্রুততম সময়ের মধ্যে এই লাগাম টেনে ধরে মানুষের জীবনে স্বস্তি ফিরিয়ে আনায় বাড়তি গুরুত্ব দিতে হবে তারেক রহমানের সরকারকে।

বিশাল আকারের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের বোঝা এবং টাকার অবমূল্যায়ন রোধে কেবল সদিচ্ছাই যথেষ্ট নয়। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর ধারাবাহিক চাপ এবং প্রবাসী আয়ের (রেমিট্যান্স) ওঠানামা বা অনিশ্চয়তা সামষ্টিক অর্থনীতিকে সার্বক্ষণিক ঝুঁকির মধ্যে রাখছে।

আইএমএফ-এর শর্ত পূরণ করতে গিয়ে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি কমানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সরকার জনরোষের মুখে পড়তে পারে। বিশেষ করে, উচ্চ মূল্যস্ফীতির কশাঘাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্নআয়ের মানুষের যে ক্রমসংকুচিত ক্রয়ক্ষমতা তৈরি হয়েছে, তা দ্রুত পুনরুদ্ধার করতে না পারলে সরকারের জনসমর্থনে বড় ধরনের ধস নামতে পারে।

এর পাশাপাশি, রপ্তানি আয়ের ধীরগতি এবং শিল্প উৎপাদনে স্থবিরতা অর্থনীতিতে বহুমুখী সংকট তৈরি করেছে। শিল্পের কাঁচামাল আমদানি বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে উৎপাদন, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে। একদিকে বেকারত্বের ঊর্ধ্বমুখী হার, অন্যদিকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রায় রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি—এই দ্বিমুখী চাপ সামলে সামষ্টিক অর্থনীতিকে গতিশীল করা নতুন সরকারের জন্য এক কঠিন পরীক্ষা। দীর্ঘদিনের পদ্ধতিগত দুর্বলতা ও খেলাপি ঋণের ভারে ক্লান্ত ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানোও একটি বড় কাজ। ঋণ পুনর্গঠন এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করতে গিয়ে সরকার নিজ দলের প্রভাবশালী ব্যবসায়ী অংশকে কতটা নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখতে পারবে, তা দেখার বিষয়।

শিক্ষায় সংকট ও তরুণ প্রজন্মের প্রত্যাশা
২০২৪-এর জুলাই-আগস্টে আন্দোলনের সময় রাজপথে সক্রিয় থাকা প্রজন্মটি এখন এক দ্বৈত বাস্তবতার মুখোমুখি।

একাডেমিক বিচ্ছিন্নতা : রাজনৈতিক বাস্তবতায় শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা থেকে দীর্ঘ সময় বিচ্ছিন্ন থাকায় যে মনস্তাত্ত্বিক শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কাটিয়ে ওঠা জরুরি। তাদের এই পড়াশোনার প্রতি অনীহা দূর করে শৃঙ্খলবদ্ধ শিক্ষা ব্যবস্থায় ফিরিয়ে আনা সরকারের অন্যতম অগ্রাধিকার হওয়া উচিত।

শিক্ষাক্রম ও কর্মসংস্থান : ইউনূস আমলের শিক্ষাক্রম সংস্কারের উদ্যোগগুলো পদ্ধতিগত সুনির্দিষ্টতার অভাবে শিক্ষার্থীদের মাঝে একধরনের বিভ্রান্তি তৈরি করেছে। ফলে এই ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যক্রমের ধারাবাহিকতায়ও বড় সংকট তৈরি হয়েছে। এতে করে এক বিশাল প্রজন্ম সেশনজটসহ ঠিক কী পড়বে আর কীভাবে পড়বে তা নিয়ে অনিশ্চয়তার মুখে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। জাতীয় চাহিদার সাথে সমন্বয় করে একটি টেকসই শিক্ষানীতি প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি। শিক্ষায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা তাই তারেক রহমানের সরকারের বড় চ্যালেঞ্জ।

আইনশৃঙ্খলা ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা
জনগণ এখন কেবল পুলিশের পোশাকে পরিবর্তন বা প্রশাসনে রদবদল দেখতে চায় না, বরং ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা খোঁজে। কিন্তু বিগত ১৮ মাসের আইনশৃঙ্খলার তথ্য বলে যে ইউনূস সরকার এই ক্ষেত্রে প্রায় কোনো নিয়ন্ত্রণই করতে পারেনি। পুলিশের লুট হওয়া অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ব্যর্থতাসহ সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা, সব জায়গাতেই অবনতির চিত্র স্পষ্ট। তাই মানুষের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নতুন সরকারকে বাড়তি মনোযোগই দিতে হবে।

আইনশৃঙ্খলা ও পুলিশি সংস্কার : রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দমনের হাতিয়ার হিসেবে শত শত অজ্ঞাত আসামি দিয়ে সাজানো ‘গায়েবি মামলার সংস্কৃতি’র অবসান ঘটানো নতুন সরকারের বড় পরীক্ষা। এর পাশাপাশি, রিমান্ড ও পুলিশি হেফাজতের অস্বচ্ছ প্রথা বাতিল করে মানবাধিকার সমুন্নত রাখা এবং পুলিশ বাহিনীকে একটি নির্মোহ ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে সুনির্দিষ্ট আইনি কাঠামো প্রণয়ন জরুরি।

নিম্ন আদালত ও বিচারিক স্বচ্ছতা : কেবল উচ্চ আদালত নয়, বরং সাধারণ মানুষের শেষ আশ্রয়স্থল নিম্ন আদালতের বিচারিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। বিচার বিভাগকে রাজনৈতিক প্রভাবের বাইরে রেখে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাঁড় করানোই হবে নতুন ব্যবস্থা গড়ার অন্যতম প্রধান শর্ত।

ভূ-রাজনীতি ও কৌশলগত ভারসাম্য
পররাষ্ট্রনীতিতে ভারসাম্য রক্ষা করা এই সরকারের জন্য দীর্ঘমেয়াদী অস্তিত্বের সমীকরণ। বিশেষ করে বিগত দেড় বছরের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও বৈশ্বিক মেরুকরণের প্রেক্ষাপটে আন্তর্জাতিক মিত্রদের সাথে বোঝাপড়া স্পষ্ট করা নতুন সরকারের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ।

আঞ্চলিক শক্তির প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও ভারত-চীন সমীকরণ : ভারতের সাথে বিদ্যমান যেকোনো আস্থার সংকট কাটিয়ে উঠে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে সম্পর্ক পুনর্নির্মাণ করা নতুন সরকারের প্রথম কূটনৈতিক পরীক্ষা। পূর্ববর্তী সরকারের পতনের পর দিল্লির সাথে ঢাকার সম্পর্কে যে মনস্তাত্ত্বিক দূরত্ব তৈরি হয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সীমান্ত হত্যা, তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন এবং বাণিজ্য ঘাটতির মতো অমীমাংসিত ইস্যুগুলোতে নিজস্ব স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রেখে একটি সম্মানজনক দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক স্থাপন করা সরকারের জন্য জরুরি। একই সাথে, এশিয়ায় চীন ও ভারতের কৌশলগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে বাংলাদেশকে এমনভাবে অবস্থান নিতে হবে, যাতে কোনো একক বলয়ের প্রতি অতি-নির্ভরশীলতা বা বৈরিতা তৈরি না হয়। ভারতের ভূ-রাজনৈতিক নিরাপত্তা উদ্বেগ এবং চীনের বিশাল অর্থনৈতিক বিনিয়োগ—এই দুইয়ের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম ভারসাম্যমূলক রেখা টানা তারেক রহমানের সরকারের জন্য অত্যন্ত স্পর্শকাতর বিষয়।

বৈদেশিক ঋণ কূটনীতি বা ডেবট ডিপ্লোম্যাসি : বিশাল অংকের বৈদেশিক ঋণের কিস্তি পরিশোধ এবং নতুন উন্নয়ন সহযোগিতার ক্ষেত্রে ‘ঋণ কূটনীতি’ সরকারের জন্য বড় শঙ্কার জায়গা। বিগত সময়ের মেগাপ্রকল্পগুলোর বিপরীতে রাশিয়া, চীন ও জাপানের মতো দেশগুলোর বিপুল ঋণ পরিশোধের চাপ অর্থনীতিতে বাড়তি উদ্বেগ তৈরি করছে। এই ঋণ পরিশোধ করতে গিয়ে রাষ্ট্র যেন কোনোভাবেই ফাঁদে (ডেবট ট্র্যাপ) না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। অন্যদিকে, আইএমএফ বা বিশ্বব্যাংকের মতো পশ্চিমা সংস্থাগুলো থেকে নতুন আর্থিক সহায়তা পেতে গেলে তাদের কাঠামোগত সংস্কারের শর্ত মানতে হবে। উন্নয়ন সহযোগিতার নামে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এই বহুমুখী দরকষাকষিতে জাতীয় স্বার্থ অক্ষুণ্ণ রাখা এবং ভূ-রাজনৈতিক শর্তের বেড়াজাল এড়িয়ে চলা এক বড় চ্যালেঞ্জ।

বঙ্গোপসাগরের নিরাপত্তা সমীকরণ ও বৈশ্বিক পরাশক্তি : ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল (আইপিএস) এবং বঙ্গোপসাগরের ভূ-কৌশলগত গুরুত্বের কারণে অঞ্চলটি এখন বৈশ্বিক পরাশক্তিগুলোর মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে। একদিকে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা বলয় অবাধ ও মুক্ত সামুদ্রিক অঞ্চলের কথা বলে বাংলাদেশকে তাদের ভূ-কৌশলের অংশ করতে চায়; অন্যদিকে চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) এবং ভারতের নিজস্ব আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয়ের চাপ রয়েছে। গভীর সমুদ্রবন্দরগুলোর (যেমন : মাতারবাড়ী বা পায়রা) নিয়ন্ত্রণ, সম্ভাব্য সামরিক বা লজিস্টিক চুক্তি এবং আঞ্চলিক যোগাযোগের বা ট্রানজিটের ক্ষেত্রে নিজস্ব সার্বভৌমত্ব বজায় রেখে এই ত্রিমুখী টানাপোড়েন সামলানো সহজ হবে না। এই বহুমাত্রিক স্বার্থের সমীকরণ মেলাতে সরকারের সর্বোচ্চ কূটনৈতিক প্রজ্ঞার প্রয়োজন হবে, কারণ এখানে একটি ভুল সিদ্ধান্তও জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ হতে পারে।

তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার কি কেবল একটি ক্ষমতার পালাবদল, নাকি এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি নতুন মানদণ্ড হতে যাচ্ছে? সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ‘জুলাই সনদ’ অনুযায়ী সংস্কারের সূচনা এবং বিচার বিভাগের প্রকৃত স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করাই হবে তাদের সফলতার প্রাথমিক সূচক।

দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক বাস্তবতায় আমরা বারবার 'সরকার' পরিবর্তন হতে দেখেছি, কিন্তু 'রাষ্ট্র' বা 'ব্যবস্থা'র মৌলিক কোনো পরিবর্তন দেখিনি। এই সন্ধিক্ষণে এসে তাই ব্যক্তি বা দলের ঊর্ধ্বে উঠে কাঠামোগত সংস্কারের কোনো বিকল্প নেই। রাষ্ট্রকাঠামো এবং দলীয় সরকারের মধ্যকার বিভাজনরেখা স্পষ্ট করা না গেলে অতীতেরই পুনরাবৃত্তি ঘটবে।

এই ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে সরকারের দায়িত্ব কেবল শাসনভার গ্রহণ করা নয়, বরং একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিত রচনা করা। প্রশ্ন হলো—ক্ষমতার চিরায়ত কাঠামোয় বসে নতুন সরকার কি কেবল ব্যবস্থার দাসত্ব করে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি করবে, নাকি প্রথা ভেঙে নতুন ইতিহাস গড়বে?

মেহেদী হাসান শোয়েব : লেখক, প্রকাশক, বিতার্কিক; শিফট ইনচার্জ, বাংলাদেশের খবর

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর