Logo

মতামত

রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে গুণের জয় : বিএনপির উদার রাজনীতির এক ঐতিহাসিক অধ্যায়

জাহিদ ইকবাল

জাহিদ ইকবাল

প্রকাশ: ০৩ মার্চ ২০২৬, ১৭:২৫

রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে গুণের জয় : বিএনপির উদার রাজনীতির এক ঐতিহাসিক অধ্যায়

জাহিদ ইকবাল। ফাইল ছবি

বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় পুরস্কার— স্বাধীনতা পুরস্কার ও একুশে পদক— শুধু আনুষ্ঠানিক সম্মাননা নয়; এগুলো রাষ্ট্রের নৈতিক অবস্থান, রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং সাংস্কৃতিক দর্শনের প্রতিফলন। ক্ষমতাসীনরা কাদের স্বীকৃতি দিচ্ছেন, সেটি কেবল ব্যক্তি-সম্মানের বিষয় নয়— বরং তা একটি রাজনৈতিক বার্তা। বিএনপির সময় দলীয় আনুগত্য, নাকি জাতীয় অবদান— কোনটি বেশি গুরুত্ব পাচ্ছে, তা রাষ্ট্রীয় পুরস্কারের তালিকাই দেখিয়েছে।

১৯৭৬ সালে রাষ্ট্রপতি হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে বিএনপির শাসনামলে জিয়াউর রহমান একুশে পদক প্রবর্তন করেন। ভাষা আন্দোলনের চেতনা ও সাংস্কৃতিক অবদানকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠা করার লক্ষ্যে এই পদক চালু হয়। এটি ছিল স্বাধীনতার পর সাংস্কৃতিক স্বীকৃতির প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো শক্তিশালী করার একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

প্রথম বছরেই একুশে পদকে ভূষিত হন কবি সুফিয়া কামাল। তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান ছিল দৃঢ়, তবুও বিএনপির আমলে তাঁর সাহিত্য ও সমাজসেবামূলক অবদানকে রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। একই তালিকায় ছিলেন আবুল কালাম শামসুদ্দিন, কুদরাত-এ-খুদা এবং তফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া। তাঁদের রাজনৈতিক পটভূমি ভিন্ন হলেও বিএনপির সরকার তাদের অবদানকে অগ্রাহ্য করেননি।

১৯৭৭ সালে প্রবর্তিত হয় স্বাধীনতা পুরস্কার— দেশের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা। প্রবর্তনের বছরেই সম্মানিত হন মাওলানা ভাসানী ও জয়নুল আবেদীন। একই সময়ে পুরস্কার পান রনদা প্রসাদ সাহা, জসীমউদ্দীন, সমর দাশ ও কামরুল হাসান। তাঁদের অনেকে সরকার-সমালোচক হলেও বিএনপির স্বীকৃতি তাদের জাতীয় অবদানের জন্য নিশ্চিত করেছিল।

পরবর্তী বছরগুলোতেও একুশে পদকের তালিকায় উঠে আসে ভিন্নমতের বহু সাহিত্যিক-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের নাম। যেমন— নির্মলেন্দু গুণ, হাশেম খান, মহাদেব সাহা, শামসুর রাহমান, আহমদ ছফা, সানজীদা খাতুন, আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ, রফিকুন নবী এবং জুয়েল আইচ। তাঁদের অনেকেই বিভিন্ন সময়ে সরকার সমালোচক হলেও বিএনপির সময় তাঁদের স্বীকৃতি নিশ্চিত হয়।

১৯৯১ সালে গণতান্ত্রিক ধারায় সরকার গঠন করে প্রধানমন্ত্রী হন খালেদা জিয়া। তাঁর আমলেও স্বাধীনতা পুরস্কার পান মুনীর চৌধুরী, জহির রায়হান এবং পুনরায় স্বীকৃতি পান শামসুর রাহমান। ২০০১ সালে পুনরায় ক্ষমতায় এসে বিএনপির সরকার স্বাধীনতা পুরস্কার দেন এম আর আখতার মুকুল-কে।

এ সময় স্বাধীনতা পুরস্কারে সম্মানিত হন হাসান হাফিজুর রহমান, বারীণ মজুমদার, আবদুল লতিফ, আলতাফ মাহমুদ ও মনি সিংহ। তাদের রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হলেও বিএনপির প্রশাসন তাদের অবদানকে অগ্রাহ্য করেনি।

বাংলা একাডেমি পুরস্কার নিয়েও একই ধরনের নজির রয়েছে। গবেষক মুনতাসীর মামুন পুরস্কৃত হন যখন তাঁর রাজনৈতিক অবস্থান বিতর্কিত ছিল। এটি প্রমাণ করে—বিএনপির আমলে কিছু ক্ষেত্রে দলীয় পরিচয়কে অগ্রাহ্য করে জাতীয় অবদানকে প্রাধান্য দেওয়া হয়েছে।

অবশ্যই সব সিদ্ধান্ত বিতর্কমুক্ত ছিল না। বিভিন্ন সময়ে কিছু নাম নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। তবে সামগ্রিক চিত্র দেখালে স্পষ্ট— বিএনপির সময় ভিন্নমতের বহু গুণীজন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি পেয়েছেন, যা রাজনৈতিক সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ।

রাষ্ট্রীয় পুরস্কার যদি কেবল দলীয় আনুগত্যের প্রতীক হয়, তা জাতীয় ঐক্যের বার্তা দেয় না। কিন্তু যখন গুণ, অবদান ও সৃজনশীলতা মূল্যায়নের ভিত্তি হয়, তখন রাষ্ট্র উদারতার পরিচয় দেয়।

সমালোচকেরা বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলগুলোর বিরুদ্ধে ‘ফ্যাসিবাদী প্রবণতা’র অভিযোগ তুলেছেন। তবে ইতিহাসের দলিলপত্র দেখায়—বিএনপির আমলে রাষ্ট্রীয় পুরস্কারে উদারতার দৃষ্টান্ত পাওয়া গেছে।

রাষ্ট্র যদি গুণকে মূল্যায়ন করে এবং মতভেদকে সহনশীলতার সঙ্গে গ্রহণ করে, সেটিই গণতান্ত্রিক পরিপক্বতার লক্ষণ। 

নতুন প্রজন্মের উচিত আবেগ নয়— তথ্য, পরিসংখ্যান ও প্রামাণ্য দলিলের আলোকে সেই অধ্যায় মূল্যায়ন করা। কারণ রাষ্ট্রীয় সম্মান কেবল পদক নয়; এটি রাষ্ট্রচিন্তার আয়না।

  • লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক ও সভাপতি, বাংলাদেশ অনলাইন জার্নালিস্ট অ্যাসোসিয়েশন

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বিএনপি পুরস্কার

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর