Logo

মতামত

ঈদযাত্রা নাকি মৃত্যুকে পরিকল্পিত নিমন্ত্রণ?

Icon

এনাম রাজু

প্রকাশ: ২৫ মার্চ ২০২৬, ২১:২০

ঈদযাত্রা নাকি মৃত্যুকে পরিকল্পিত নিমন্ত্রণ?

উৎসব মানুষের জীবনে আনন্দের, মিলনের, ফিরে পাওয়ার সময়। কিন্তু যখন কোনো উৎসবের সঙ্গে ধারাবাহিকভাবে মৃত্যু, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তা জড়িয়ে যায়, তখন সেটি আর নিছক আনন্দের উপলক্ষ থাকে না। বরং এক ধরনের গভীর সামাজিক সংকটে পরিণত হয়। আমাদের দেশের ঈদযাত্রা ঠিক এমন এক বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে আছে, যেখানে আনন্দের প্রস্তুতির চেয়ে নিরাপদে পৌঁছানোর দুশ্চিন্তাই বড় হয়ে উঠেছে।

প্রতি বছর একই দৃশ্যপট। শহরের ব্যস্ততা হঠাৎ কমে আসে, টার্মিনালগুলো ভরে ওঠে মানুষের ঢলে আর শুরু হয় ঘরমুখো এক দীর্ঘ যাত্রা। এই যাত্রা একদিকে যেমন ভালোবাসার, তেমনি অন্যদিকে অজানা ঝুঁকির। কোথাও সড়কে, কোথাও নদীতে, কোথাও রেললাইনের পাশে। একটি ভুল সিদ্ধান্ত, একটি অবহেলা বা একটি নিয়ন্ত্রণহীন মুহূর্তের কারণে থেমে যায় একটি জীবন। আর সেই জীবন থেমে যাওয়ার সাথে সাথে থেমে যায়- একটি পরিবারের স্বপ্ন, কোনো এক মায়ের অপেক্ষা, একটি সন্তানের ভবিষ্যৎ।

প্রশ্নটা তাই সরাসরি, আমরা কি সত্যিই শুধু নাড়ির টানে বাড়ি ফিরছি, নাকি আমরা এমন একটি সামাজিক চাপে আটকে গেছি, যেখানে ঝুঁকি জেনেও গ্রামে ফেরা ছাড়া আর কোনো বিকল্প দেখি না? উত্তর ঠিক কীভাবে আসবে সেটা আলোচনা না করে আলোচনা অন্যকিছু হোক। 

১.

ঈদযাত্রায় সবচেয়ে বেশি দুর্ঘটনা ঘটে সড়কপথে। এটি নতুন কোনো তথ্য নয়। বরং দীর্ঘদিনের পুনরাবৃত্ত সত্য। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কেন এই পরিস্থিতি বদলাচ্ছে না?

একটি সাধারণ দৃশ্য কল্পনা করা যাক। রাত গভীর। একটি দূরপাল্লার বাস দ্রুতগতিতে ছুটে চলেছে। চালকের চোখে ক্লান্তি। কিন্তু সময়মতো পৌঁছানোর চাপ তাকে থামতে দিচ্ছে না। সামনে আরেকটি বাস ওভারটেক করার চেষ্টা। কয়েক সেকেন্ডের সিদ্ধান্ত, আর তার পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। এই দৃশ্য কল্পনা নয় এটাই বাস্তব।

অতিরিক্ত গতি এদেশে প্রধান ঝুঁকি। কিন্তু গতি শুধু একটি আচরণ নয়, এটি একটি মানসিকতা। আমরা দ্রুত পৌঁছাতে চাই, আগে পৌঁছাতে চাই, আর সেই চাওয়ার মধ্যেই আমরা ঝুঁকিকে স্বাভাবিক করে ফেলেছি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় ফিটনেসবিহীন যানবাহন। যেসব বাস বা ট্রাক নিয়মিত পরীক্ষার বাইরে। যেগুলোর যান্ত্রিক ত্রুটি স্পষ্ট।  সেগুলোও রাস্তায় চলছে অবাধে। তদারকি থাকলেও তার প্রয়োগে ঘাটতি রয়েছে।

মোটরসাইকেলের প্রসঙ্গ আলাদা করে বলতেই হয়। ঈদের সময় তরুণদের মধ্যে মোটরসাইকেল ব্যবহারের প্রবণতা অনেক বেড়ে যায়। তিনজন মিলে একটি বাইকে ওঠা, হেলমেট ছাড়া চলা, দ্রুতগতিতে চালানো। এই দৃশ্যগুলো এখন খুবই পরিচিত। কিন্তু এই পরিচিত দৃশ্যের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে অজানা বিপদ। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো-এই ঝুঁকিগুলো আমরা জানি, তবু মেনে নিই।

২. 

নদীমাতৃক দেশে নৌপথ একটি বড় সম্ভাবনার জায়গা। কিন্তু ঈদযাত্রায় এই পথটিও ঝুঁকিমুক্ত নয়। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ধারণক্ষমতার চেয়ে বেশি যাত্রী বহন। একটি লঞ্চে নির্দিষ্ট সংখ্যক যাত্রী নেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেই সংখ্যা অনেক বেশি হয়ে যায়। যাত্রীরা জায়গা পেতে চায়, মালিকরা লাভ বাড়াতে চায়। ফলে নিয়ম ভেঙে ফেলা হয় সহজেই। একটি লঞ্চের ডেকে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষদের দিকে তাকালে বোঝা যায়-এটি কেবল ভিড় নয়, এটি একটি অনিয়ন্ত্রিত ঝুঁকি। নিরাপত্তা সরঞ্জামের ক্ষেত্রেও একই চিত্র। লাইফ জ্যাকেট থাকলেও তা ব্যবহারের সংস্কৃতি গড়ে ওঠেনি। অনেকেই জানেন না কোথায় আছে, কিংবা ব্যবহার করতে হবে কেন। রাতের বেলায় অনিয়ন্ত্রিত নৌযান চলাচল, নিয়ম না মানা, পর্যাপ্ত নজরদারির অভাব। সব মিলিয়ে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।

এই বাস্তবতায়ন ‘দুর্ঘটনা’ শব্দটি অনেক সময় বাস্তবতাকে আড়াল করে। কারণ, বেশিরভাগ ঘটনাই পূর্বানুমানযোগ্য। যা প্রতিরোধ করা সম্ভব ছিল। 

৩.

রেলপথকে আমরা তুলনামূলক নিরাপদ ভাবি। কিন্তু ঈদযাত্রার সময় এই ধারণাটিও দুর্বল হয়ে পড়ে। ট্রেনের ছাদে যাত্রী বহনের দৃশ্য এখন প্রায় স্বাভাবিক হয়ে গেছে। আসন সংকট, অতিরিক্ত যাত্রী এবং দ্রুত পৌঁছানোর তাড়না- এই তিনটি বিষয় মানুষকে ঝুঁকিপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে প্রলুব্ধ করে। একজন যাত্রী যখন ট্রেনের ছাদে উঠে, তখন সেটি শুধু ব্যক্তিগত ঝুঁকি নয়। এটি একটি কাঠামোগত সমস্যার প্রতিফলন। রেলক্রসিংগুলোও একটি বড় ঝুঁকির জায়গা। অনেক স্থানে এখনো পর্যাপ্ত সিগন্যালিং ব্যবস্থা নেই, গেটম্যানের অভাব রয়েছে কিংবা থাকলেও তা সবসময় কার্যকর থাকে না। ফলে সামান্য অসাবধানতাও বড় দুর্ঘটনায় পরিণত হতে পারে।

কেন আমরা ঝুঁকি জেনেও যাত্রা করি? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজা জরুরি, কারণ সমস্যার মূল এখানেই। প্রথমত, বিকল্পের সীমাবদ্ধতা। পর্যাপ্ত নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থা না থাকলে মানুষ বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প বেছে নেয়।

দ্বিতীয়ত, সামাজিক চাপ। ঈদে বাড়ি না গেলে অনেকের কাছে তা অসম্পূর্ণতা হিসেবে দেখা হয়। পরিবার, আত্মীয়স্বজন; সবাই একটি প্রত্যাশা তৈরি করে।

তৃতীয়ত, অর্থনৈতিক বাস্তবতা। অনেকেই নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যাতায়াত শেষ করতে বাধ্য থাকেন। কারণ ছুটি সীমিত।

চতুর্থত, সচেতনতার অভাব। ঝুঁকি সম্পর্কে জানা থাকলেও অনেক সময় তা গুরুত্ব পায় না।

পঞ্চমত, শাস্তির অনিশ্চয়তা। নিয়ম ভাঙলেও যদি তার পরিণতি ভোগ করতে না হয়। তাহলে সেই নিয়ম ভাঙা স্বাভাবিক হয়ে যায়।

এই পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে আসার জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত, প্রয়োগযোগ্য এবং দৃশ্যমান পরিবর্তন। আর সেই পরিবর্তনের শুরু হতে হবে দুটি জায়গা থেকে। ব্যাপক সচেতনতা এবং কঠোর আর্থিক জরিমানা।

ক. সর্বাগ্রে প্রয়োজন ব্যাপক সচেতনতার প্রচারণা: নিরাপদ যাত্রা নিশ্চিত করতে হলে মানুষের মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। আইন প্রয়োগ গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু সচেতনতা ছাড়া তা টেকসই হয় না।

আমাদের দেশে সচেতনতা কার্যক্রম অনেক সময় আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। ঈদের আগে কিছু প্রচারণা, কিছু সতর্কবার্তা। এতেই দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। কিন্তু বাস্তবে এটি হওয়া উচিত একটি ধারাবাহিক সামাজিক উদ্যোগ। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় সব জায়গায় নিরাপদ যাত্রা নিয়ে শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। টেলিভিশন, রেডিও, সামাজিক মাধ্যম সবখানে নিয়মিতভাবে বার্তা ছড়িয়ে দিতে হবে। বিশেষ করে মোটরসাইকেল চালকদের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক প্রচারণা জরুরি।

হেলমেট ব্যবহারের গুরুত্ব শুধু জানানো নয়, তা অভ্যাসে পরিণত করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো-মানুষকে বোঝাতে হবে, দ্রুত পৌঁছানো নয়, নিরাপদে পৌঁছানোই সাফল্য।

খ. আইন ভাঙলে বড় অঙ্কের আর্থিক জরিমানা নিশ্চিত করা: বাস্তবতা কঠিন, কিন্তু সত্য অনেক সময় মানুষ জীবনের ঝুঁকির চেয়ে আর্থিক ক্ষতিকে বেশি গুরুত্ব দেয়। এই বাস্তবতাকে নীতিগতভাবে ব্যবহার করতে হবে।

ওভারস্পিডিং, ফিটনেসবিহীন যানবাহন, লাইসেন্স ছাড়া ড্রাইভিং, ওভারলোডিং এই সব ক্ষেত্রে তাৎক্ষণিক এবং বড় অঙ্কের জরিমানা নিশ্চিত করতে হবে।

এখানে ‘বড় অঙ্ক’ কথাটি গুরুত্বপূর্ণ। এমন জরিমানা, যা একজন চালক বা মালিককে দ্বিতীয়বার ভাবতে বাধ্য করবে।

শুধু জরিমানার ঘোষণা দিয়ে লাভ নেই। তা কার্যকরভাবে আদায় নিশ্চিত করতে হবে। ডিজিটাল পদ্ধতি ব্যবহার করে জরিমানা আরোপ ও সংগ্রহ করলে স্বচ্ছতা বাড়বে এবং দুর্নীতির সুযোগ কমবে।

যদি শাস্তি নিশ্চিত হয়, তবে আচরণ পরিবর্তনও দ্রুত হবে।

গ. প্রযুক্তির কার্যকর প্রয়োগ: জিপিএস ট্র্যাকিং, স্পিড মনিটরিং, অটোমেটেড ক্যামেরাÑ এই প্রযুক্তিগুলো এখন সহজলভ্য। এগুলোর ব্যবহার বাড়ালে সড়ক নিয়ন্ত্রণ আরও কার্যকর হবে।

নৌপথে যাত্রী সংখ্যা মনিটরিং, রেলপথে স্বয়ংক্রিয় সিগন্যালিংÑ এসব ব্যবস্থাও ধীরে ধীরে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।

ঘ. জবাবদিহি ও সমন্বয়: পরিকল্পনা থাকলেও তার বাস্তবায়নে ঘাটতি থেকে যায়।

এই জায়গায় জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি।

প্রতিটি সংশ্লিষ্ট সংস্থা পরিবহন, নৌপরিবহন, রেলÑ সবাইকে সমন্বয়ের মধ্যে এনে কাজ করতে হবে।

সময় এখনই; আগামী ঈদুল আজহার আগে প্রস্তুতি: এই আলোচনা যেন কেবল লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে।

আগামী ঈদুল আজহার আগেই সচেতনতা প্রচারণা এবং কঠোর জরিমানার বিষয়টি বাস্তবায়নের পথে আনতে হবে।

এটি শেষ মুহূর্তের উদ্যোগ হলে কাজ করবে না। এখন থেকেই পরিকল্পনা, প্রস্তুতি এবং বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে।

সরকার, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, পরিবহন মালিক, চালক সবাইকে এই প্রক্রিয়ার অংশ হতে হবে। একই সাথে নাগরিকদেরও দায়িত্ব নিতে হবে।

ঈদ মানে মিলন, ভালোবাসা, আনন্দ। কিন্তু সেই আনন্দ যদি ঝুঁকির মধ্যে ডুবে যায়, তাহলে আমাদের থেমে ভাবতে হবে। আমরা চাইলে এই চিত্র পরিবর্তন করতে পারি। প্রয়োজন সচেতনতা, কঠোর প্রয়োগ এবং সম্মিলিত উদ্যোগ।

আমাদের যাত্রা হোক নিরাপদ। আমাদের ফেরা হোক নিশ্চিত।

আমরা যেন বাড়ি ফিরি নিঃশঙ্কচিত্তে, নিশ্চিন্তে, প্রিয়জনের কাছে। কারণ একটি জীবনের মূল্য কোনো উৎসবের চেয়েও অনেক বেশি।

লেখক : কবি ও কলাম লেখক।  

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর