ছবি: সংগৃহীত
স্বপ্ন কোনো কল্পনা নয়; এটি মানুষকে জীবনের দিকে এগোতে সাহায্য করে, দিকনির্দেশনা দেয় ও মানসিকভাবে শক্ত রাখে। একজন মানুষের জীবনে যদি স্বপ্ন না থাকে, তাহলে সে নিজের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় ভুগতে শুরু করে। অনিশ্চয়তা যদি বাড়তে থাকে- তখন হতাশা, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও সংকট এই তিনটি একসঙ্গে জন্ম নিয়ে সমাজের জীবনে নেতিবাচকভাবে কাজ করে। বাংলাদেশে এই সমস্যাটি কেবল ব্যক্তিগত নয়। এটি একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক সংকট, বিশেষত তরুণ সমাজের ক্ষেত্রে।
বাংলাদেশে তরুণ বেকারত্ব বাস্তবে খুবই উদ্বেগজনক মাত্রায় দাঁড়িয়েছে। সরকারি পরিসংখ্যানে দেখা যায় যে, বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (BBS) কর্তৃক Labour Force Survey ২০২৩ অনুযায়ী, দেশের ১৫ ২৯ বছর বয়সী যুব শ্রমশক্তির প্রায় সাত দশমিক দুই শতাংশ বেকার। যা প্রায় এক দশমিক ৯৪ মিলিয়ন যুবককে বেকার হিসেবে চিহ্নিত করে। এই বেকারত্ব কেবল সংখ্যা নয়; এর ভেতরেও উচ্চশিক্ষিত বেকারদের একটি বড় অংশ রয়েছে- প্রায় ৩১ দশমিক পাঁচ শতাংশ বেকার যুব শিক্ষিত, মানে বিশ্ববিদ্যালয় বা সমমানের ডিগ্রিধারী। এটি বাংলাদেশের যুব সমাজের সামনে দাঁড়ানো একটি বাস্তব চিত্র।
বেকারত্বের এই বাস্তবতা যদি শুধু পরিসংখ্যান পর্যন্ত সীমাবদ্ধ থাকত, তাহলে পরিস্থিতি কিছুটা সুবিধাজনক মনে হতো। কিন্তু বাস্তবে যেটি দেখা যায়, তা হলো বেকারত্ব তরুণের মানসিক অবস্থা ও জীবনের বিশ্বাসকে গভীরভাবে প্রভাবিত করছে। একটি উচ্চশিক্ষিত যুবক যখন তার পড়াশোনার সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত চাকরি পায় না, তখন সে হতাশ হয়, আত্মবিশ্বাস হারায়, এবং নিজেকে সামাজিকভাবে অসমর্থ মনে করতে শুরু করে। এমনকি অনেক ক্ষেত্রে দেখা গেছে, তরুণেরা দীর্ঘ সময় বেকার থাকায় নিজের পরিশ্রম, দক্ষতা ও যোগ্যতার মূল্যায়ন হারিয়ে ফেলে। এই মানসিক ঘাটতি স্বপ্নহীনতার প্রবৃত্তিকে জোরদার করে।
শিক্ষা পদ্ধতি ও বাস্তবতার মধ্যে একটি বড় ব্যবধান রয়েছে। বাংলাদেশে শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও পরীক্ষানির্ভর, যেখানে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা যাচাই মূলত পরীক্ষার ফলাফলের ওপর ভিত্তি করে। এই ব্যবস্থায় সৃজনশীলতা বা আগ্রহের বিকাশের জন্য পর্যাপ্ত সুযোগ নেই। একটি সমাজে শিক্ষা এমনভাবে কাজ করা উচিত যে এটি কেবল জ্ঞান দেয় না। বরং ছাত্রকে নিজের আগ্রহ অন্বেষণ ও নিজের লক্ষ্য তৈরি করতে সহায়তা করে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা আরও চাকরি উপযোগী হওয়ার পরিবর্তে একটি ‘টেক্সটবুক পরীক্ষা’ সংস্কৃতিতে সীমাবদ্ধ। একটি বড় অংশেই শিক্ষার্থীর কাছে বারবার বলা হয়-ভাল রেজাল্ট করো, তাহলে ভালো চাকরি পাবে। অথচ প্রায়ই দেখা যায়, ভালো রেজাল্টের পরেও চাকরি পাওয়া যায় না এবং এই অমিল শিক্ষার্থীর কাছে নিজের স্বপ্ন ও লক্ষ্য সম্পর্কে সন্দেহ তৈরি করে।
শিক্ষার্থীদের জীবনে প্রথম বড় মানসিক চাপ আসে পরিবার থেকে। একটি শিশুর প্রথম স্বপ্ন তৈরি হয় পরিবারে; কিন্তু অনেক পরিবারই শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ পেশাগত পথ নির্ধারণ করে দেয়। যেমন ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার বা সরকারি চাকরি (বিশেষত বিসিএস)। এই পথে যদি সন্তান সফল না হয়, তাহলে পরিবারের মধ্যে হতাশা ও উদ্বেগ দেখা দেয়। অনেক সময় পরিবার সন্তানকে তার নিজস্ব আগ্রহ ও দক্ষতা অনুসারে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে দেয় না। ফলে অনেক অনুভূতিশীল ও সৃষ্টিশীল ছাত্র নিজের পছন্দমতো শিক্ষার দিকনির্দেশনা গড়ে তুলতে পারে না এবং ধার করা স্বপ্ন অনুসরণ করে জীবনের পথ বেছে নেয়। এই ধার করা স্বপ্ন প্রায়ই ভেঙে পড়ে যখন ছাত্র বাস্তব জীবনের কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হয় এবং তার মনে হয় যে সে অসফল বা অসমর্থ।
স্বপ্নহীনতা কেবল মানসিক সংকট নয়; এটি সমাজে বিভিন্ন নেতিবাচক প্রবণতার জন্মদাতা ক্ষেত্র হিসেবেও কাজ করতে পারে। একটি বেকার তরুণ যখন নিজের পরিবারে অবদান রাখতে পারে না, তখন সে নিজেকে সামাজিকভাবে হার মানা অনুভব করতে শুরু করে। আত্ম সম্মান কমে যায় এবং ঐতিহ্যগত নৈতিক মূল্যবোধ দুর্বল হয়ে পড়ে। এই পরিস্থিতিতে তরুণ বিপথে যেতে বা জরুরি নিরাপদ অর্থ আয় করার পথ খুঁজে নিতে পারে। এই পথের মধ্যে পড়ে অনেকে অবৈধ ব্যবসা, মাদক, অনলাইন প্রতারণা, চুরি ছিনতাই বা কিশোর গ্যাং এর মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের দিকে ঝুঁকে পড়ে। এগুলোতে লিপ্ত হওয়ার পেছনে প্রলোভন থাকে দ্রুত অর্থ আয় করার সুযোগ, সমাজের দ্রুত সমৃদ্ধির আকাক্সক্ষা এবং স্বল্পমেয়াদী উদ্দেশ্য।
সমাজে সফলতা ও সম্মানের একটি বিকৃত ধারণা তৈরি হয়েছে- যেখানে দ্রুত ধনী হওয়ার ও দ্রুত সফল হওয়ার আকাক্সক্ষা বেশি মূল্যায়িত হয়। কিন্তু যখন একজন তরুণ জেনে নেয় যে সততা ও কঠোর পরিশ্রমের মূল্যায়ন সমাজে যথেষ্ট হচ্ছে না এবং অন্য কেউ অবৈধ বা অনৈতিক পথে দ্রুত সফল হচ্ছে। তখন তার মনে দ্বন্দ্ব ও সংকট তৈরি হয়। সে নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকে- আমি কি সত্যিই সৎ থাকব, যদি তা আমাকে জীবনে খুব দূরে না নিয়ে যায়? এই প্রশ্নটি একটি নৈতিক সংকট সৃষ্টি করে, যা ধীরে ধীরে অপরাধ সমর্থক মনোভাবকে প্রযোজ্য বলে মনে করায়।
বাংলাদেশের কিছু শহরতলির এলাকায় কিশোর গ্যাং এর বৃদ্ধি এই প্রবণতার বাস্তব উদাহরণ। এখানে অনেক কিশোরের জীবনে কোনো দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য থাকে না এবং তারা দ্রুত উত্তেজনা, পরিচিতি ও অর্থের পথগুলোই জীবনের মূল লক্ষ্য মনে করে। গ্যাং এ যোগ দিয়ে তারা ছোট খাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে। যা পরে বড় ধরনের অপরাধে রূপ নিতে পারে। এর পেছনে মূলত সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতার অনুভূতি, পেশাদারিত্বের অভাব এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্যহীনতা কাজ করছে।
সমাজের মধ্যে বৈষম্য ও সামাজিক মূল্যায়নের ভিন্নতাও তরুণদের স্বপ্নহীনতার প্রবণতাকে জোরদার করে। যেখানে সমান সুযোগ ও সুষ্ঠু মূল্যায়ন নেই, সেখানে কিছু অংশের মনে মনে ধারণা গড়ে ওঠে যে সৎ পথে সফল হওয়া কঠিন বা অসম্ভব। এটি আবার সামাজিক বিশ্বাস ও মনোবলের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সমাজে যদি শুধু অর্থনৈতিক দিকটুকুই সফলতার মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়, আর নৈতিকতা, সদাচার বা শৃঙ্খলাকে গুরুত্ব দেওয়া না হয়। তাহলে তরুণদের মধ্যে বিকৃত সফলতার ধারণা বেড়ে যায়।
মানসিক স্বাস্থ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায়ই অদৃশ্য সংকট হিসেবে থেকে যায়। স্বপ্নহীনতা ও হতাশা একসঙ্গে মানসিক উদ্বেগ, দুশ্চিন্তা, আত্মবিশ্বাস হারানো এবং একাকীত্বের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এই মানসিক চাপের ফলে একজন তরুণ নিজেকে সমাজের উপযোগী মনে করতে ব্যর্থ হয় এবং সে ছোট খাটো ক্ষুদ্র আনন্দ বা ক্ষণস্থায়ী কিছুতে জীবনের মান খুঁজে নিতে পারে। যেমন মাদক, বিপথগামী বন্ধুবান্ধব, বা অন্য নেতিবাচক কর্মকাণ্ড।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে খোলামেলা আলোচনা এখনো সমাজে পর্যাপ্ত নয় এবং পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে কাউন্সেলিং, মানসিক স্বাস্থ্য সহায়তা ও সচেতনতা যথেষ্টভাবে গড়ে ওঠেনি।
রাষ্ট্র ও নীতিনির্ধারকদের কাছে এই সংকট কেবল একটি শিক্ষাগত বা সামাজিক সমস্যা নয়; এটি একটি জাতীয় উন্নয়নগত সমস্যা। যুব উন্নয়ন, কর্মসংস্থান, শিক্ষা ও মানসিক স্বাস্থ্যÑ এগুলো আলাদা আলাদা ক্ষেত্রে নীতিমালা আছে, কিন্তু একটি সমন্বিত যুবনীতি না থাকায় বাস্তবায়নের কার্যকারিতা কম। উদাহরণস্বরূপ, তরুণদের জন্য বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি থাকলেও তা কর্মসংস্থানের সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত না হওয়ায় তরুণদের জন্য বাস্তব সুফল সৃষ্টি হচ্ছে না।
একটি দেশের যুব সমাজের শক্তি সঠিকভাবে কাজে লাগাতে হলে রাষ্ট্রের উচিত- (ক) শিক্ষা ও দক্ষতার মধ্যে সামঞ্জস্য তৈরি করা; (খ) চাকরি খোঁজা থেকে চাকরি তৈরি করার পরিপ্রেক্ষিতে উদ্যোক্তা তৈরীর পরিবেশ তৈরি করা; (গ) সহজ ঋণ, মেন্টরশিপ, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও স্টার্ট আপ উদ্যোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে যুব উদ্যোক্তাদের সহায়তা করা এবং (ঘ) শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সঙ্গে সরাসরি সংযুক্ত করে দেওয়া।
আন্তর্জাতিকভাবে দেখা গেছে, উন্নত ও দ্রুত অগ্রগামী দেশগুলো তরুণদেরকে কেবল চাকরি খোঁজার শিক্ষায় না দিয়ে তাদেরকে চাকরি, উদ্ভাবন ও নেতৃত্ব তৈরির দিকে উৎসাহিত করে থাকে। যেমন দক্ষিণ কোরিয়া ও সিঙ্গাপুর- তারা শিক্ষার্থীদের দক্ষতা, উদ্ভাবনী মনোভাব ও বাস্তব জীবনের প্রয়োজনের সঙ্গে শিক্ষা ব্যবস্থাকে সংযুক্ত করে। এই ধরনের ব্যবস্থাপনা তরুণদেরকে স্বপ্ন গড়ে তুলতে সাহায্য করে এবং দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য বাস্তবায়নে উৎসাহ প্রদান করে।
সমাজের মধ্যে ইতিবাচক রোল মডেলদের প্রচার একটি অপরিহার্য ভূমিকা পালন করে। তরুণরা তাদের মতো মানুষের গল্প শুনে অনুপ্রাণিত হয় যারা সততা, নিষ্ঠা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে সফল হয়েছে। মিডিয়া, পরিবার এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সৎ সফলতার গল্পগুলোকে সামনে এনে তরুণদের সঠিক দিকনির্দেশনা দিতে পারে।
স্বপ্নহীনতা একটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; এটি একটি সামাজিক ব্যর্থতা। যদি আমরা একটি প্রজন্মকে স্বপ্ন দেখতে না শিখাতে পারি, তাহলে সেই প্রজন্ম আমাদের জন্য বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। একজন তরুণ যখন স্বপ্ন দেখে, তখন সে শুধু নিজের জন্য নয়- দেশ ও সমাজের জন্য কাজ করে। কিন্তু যখন সে স্বপ্ন হারায়, তখন সে নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে এবং সেই সীমাবদ্ধতা থেকেই অপরাধ, অনৈতিক পথ ও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড জন্ম নিতে পারে।
শেষ পর্যন্ত, আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে- আমরা কি আমাদের তরুণদের স্বপ্ন দেবো, নাকি তাদের অন্ধকারে ঠেলে দেবো? কারণ সত্যটি খুব সরল- যেখানে স্বপ্ন নেই, সেখানে অপরাধ ও হতাশা জন্ম নেয়, আর যেখানে স্বপ্ন আছে, সেখানে সম্ভাবনার আলো জ্বলে ওঠে।
লেখক : কবি ও কলাম লেখক।

