অদিতি করিম, ছবি: সংগৃহীত
একটি সরকারি সংস্থায় মহাপরিচালক পদ শূন্য হলো। এই পদের জন্য যিনি যোগ্য, সিনিয়র এবং সৎ তার পদোন্নতি নিশ্চিত প্রায়। কিন্তু যেদিন তার পদোন্নতির আদেশ জারি হবে, সেদিনই বিদেশে থাকা এক ইউটিউবার তার বিরুদ্ধে একটি কনটেন্ট পোস্ট করল। মুহূর্তেই তা ভাইরাল হয়ে গেল।
কনটেন্টটির মধ্যে কোনো তথ্য-প্রমাণ নেই। শুধু তাকে গালাগালি। এমন সব অভিযোগ তার বিরুদ্ধে আনা হলো যার ধারেকাছেও নেই ওই ব্যক্তি। কিন্তু ওই কনটেন্ট প্রচারিত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার পদোন্নতি আটকে গেল।
ইউটিউবার বিদেশে থাকলেও বাংলাদেশে তার প্রচুর ভিউ। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ভয় পেলেন। এখন যদি তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয় তাহলে হয়তো তার বিরুদ্ধেও কুরুচিপূর্ণ আক্রমণ করা হবে। তাই তাকে বাদ দিয়ে একজন দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে মহাপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হলো।পদোন্নতিবঞ্চিত কর্মকর্তা ইউটিউবে প্রচারিত কনটেন্টের বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করতে চেষ্টা করলেন। কিন্তু আদালত তার মামলাটি পর্যন্ত গ্রহণ করলেন না। কারণ জানার জন্য তিনি বিচারকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করলেন। বিচারক তার পূর্ব পরিচিত। খাস কামরায় ডেকে তাকে চা পানে আপ্যায়িত করে বললেন, এরা খুবই বিপজ্জনক। এদের বিরুদ্ধে মামলা নিলে আমারই বারোটা বাজিয়ে দেবে। অগত্যা এই হতভাগ্য কর্মকর্তা চাকরি থেকে ইস্তফা দিলেন। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার এক মাস পর তিনি জানতে পারলেন, যিনি মহাপরিচালক হয়েছেন, তিনি ইউটিউবারকে ম্যানেজ করে তার বিরুদ্ধে এই কনটেন্টটি করিয়েছেন। এই একটি ঘটনা বলে দেয় বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়া এখন কত বড় দানবে পরিণত হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ার কোনো জবাবদিহিতা নেই। নেই কোনো সেন্সর। তাদের জন্য কোনো আইন নেই। সবাই তাদের কাছে যেন রীতিমতো জিম্মি হয়ে আছে। প্রশ্ন উঠেছে, এরা কি এখন সমান্তরাল সরকার হয়ে গেছে? সরকারের বিভিন্ন সিদ্ধান্ত গ্রহণে এরা প্রভাব বিস্তার করছে।
এদের আতঙ্কে অস্থির রাজনীতিবিদ, আমলা, পুলিশ, শিক্ষক, ব্যবসায়ী সবাই। সোশ্যাল মিডিয়ার নামে এখন ব্ল্যাকমেল এবং চাঁদাবাজির মহোৎসব চলছে। এরা গুজব এবং অপতথ্য প্রচার করে সরকারকে বিব্রত করছে। এদের অপপ্রচারের কারণে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সোশ্যাল মিডিয়ার এসব ভিউ ব্যবসায়ীরা প্রথমে একজন ব্যক্তিকে টার্গেট করে। তারপর তার সঙ্গে যোগাযোগ করার চেষ্টা করে। যোগাযোগ সফল হলে, সরাসরি চাঁদা দাবি করে। তাদের কাছে এআই দিয়ে বানানো কিছু ছবি কিংবা মিথ্যা অভিযোগ তুলে ধরে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করে। টাকা না দিলে তার বিরুদ্ধে ফেসবুকে এবং ইউটিউবে এসব ছড়িয়ে দেওয়া হবে বলে হুমকি দেয়। অনেকে লোকলজ্জার ভয়ে, নিজের মানসম্মানের কথা চিন্তা করে, ভিউ ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সমঝোতা করে। তাদের টাকা-পয়সা দিয়ে নিজের মানইজ্জত বাঁচায়। এরকম একজন একটি বেসরকারি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। হঠাৎ তার হোয়াটসঅ্যাপে একের পর এক ছবি আসতে থাকে। তিনি ছবিগুলো দেখেই বুঝতে পারেন এগুলো ডিপফেক। কিন্তু লজ্জায় আইটি বিভাগে ছবিগুলো পাঠাতে পারেননি। শেষে চক্ষুলজ্জার ভয়ে কিছু টাকা দিয়ে ম্যানেজ করেন। কিন্তু সবাই এই ব্যাংক কর্মকর্তার পথে যাননি।
একজন বিচারপতির কাছে এরকম খুদে বার্তা এলে তিনি ওই ইউটিউবারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের হুমকি দেন। কিন্তু তার দুই দিন পর তাকে নিয়ে একাধিক সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম থেকে অপতথ্য ছড়ানো শুরু হয়। তখন ইউনূস সরকার। এসব অপতথ্য যাচাই না করেই সরকার তাকে অনির্দিষ্টকালের জন্য ছুটিতে পাঠায়। ক্ষোভে অপমানে তিনি পদত্যাগ করেন। কিন্তু এ ঘটনা জানাজানি হয়ে গেলে, এখন কোনো বিচারক আর সোশ্যাল মিডিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ শোনেন না। ফলে সোশ্যাল মিডিয়ায় চলছে চরিত্র হননের মহামারি। যে যেভাবে পারছে চাঁদাবাজি করছে।
ইউনূস সরকার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন বাতিল করে। কিন্তু নাগরিকদের সাইবার সুরক্ষার জন্য আইন করেনি। ফলে দেশের সব নাগরিক এখন সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে আইনি সুরক্ষার বাইরে। এর ফলে লাগামহীন হয়ে পড়ছে সাইবার অপরাধীরা। ২৪ এর জুলাই আন্দোলনের পর এরকম ২৫টি মামলা যাচাই করে দেখা গেছে, সব মামলাই হয়েছে, সোশ্যাল মিডিয়ার পোস্টের ভিত্তিতে। বিদেশে বসে কয়েকজন ফেসবুক এবং ইউটিউবে যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, তারাই মামলার আসামি। তারা আদৌ অপরাধ সংঘটনের সঙ্গে সম্পৃক্ত কিনা তা খতিয়ে না দেখেই শুধু সোশ্যাল মিডিয়ার গালিগালাজের ওপর নির্ভর করে এসব মামলা করা হয়।
এখন বাংলাদেশে সোশ্যাল মিডিয়াই আইন, এরাই পুলিশের মতো তদন্তকারী এরাই বিচারক। ইউনূস সরকার এদের কথায় চলত। এখন দেশে একটি নির্বাচিত সরকার। তাদের ক্ষমতার উৎস সোশ্যাল মিডিয়া নয়, জনগণ। তাই এসব অরাজকতার লাগাম টেনে ধরার এখনই সময়।
সোশ্যাল মিডিয়ার কারণে ব্যবসায়ীরা আতঙ্কিত, আমলারা ভীত, সব শ্রেণিপেশার মানুষ সন্ত্রস্ত। এরাই এখন যেন বিকল্প সরকার। এদের কারণে নারীরা লাঞ্ছিত হচ্ছেন। কুৎসিত আক্রমণের শিকার হয়ে অনেকের সংসার ভেঙে যাচ্ছে। কেউ কেউ আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছেন। সোশ্যাল মিডিয়া এখন এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। এখান থেকে আমাদের মুক্তি পেতেই হবে। বাংলাদেশে আজ যা ঘটছে, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে এত ভয়াবহ না হলেও এর কাছাকাছি অবস্থা ছিল। সেখান থেকে আইন করে, ফেসবুক ইউটিউবের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনের আওতায় এনে পরিস্থিতি সামাল দিয়েছে। কদিন আগেই ভারতে ফেসবুকে মাধ্যমে হেনস্তার অভিযোগে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সাইবার হয়রানির শিকার বলিউড অভিনেতা অক্ষয় কুমারের মেয়ে নিতারা ভাটিয়া। অনলাইনে গেম খেলার সময় নিতারাকে এই আপত্তিকর প্রস্তাব দেওয়া হয়, খেলার মাঝেই জনৈক ব্যক্তি নিতারার কাছে নগ্ন ছবি চেয়ে বসেন। বিষয়টি জানতে পেরেই মহারাষ্ট্র সাইবার সেলের দ্বারস্থ হয়েছিলেন অক্ষয়। তদন্তে নামে পুলিশও। তারকা কন্যাকে অশ্লীল মেসেজ পাঠানো অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়। ভারত সোশ্যাল মিডিয়াকে জবাবদিহিতার আওতায় আনার জন্য বেশ কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
ফেসবুক, ইউটিউবসহ সামাজিক প্ল্যাটফর্মগুলোকে ভারতে কার্যালয় করতে বাধ্য করেছে। তাদের ভারতীয় আইনের আওতায় আনা হয়েছে। ফলে মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও বানোয়াট তথ্য প্রকাশ করলে সরাসরি প্রথম এসব প্রতিষ্ঠানকে নিয়ন্ত্রণের জন্য বলা হয়। এর ফলে কাউকে হয়রানি করা, ব্ল্যাকমেল করা পোস্টগুলো দ্রুত প্রতিষ্ঠানগুলো নামিয়ে ফেলে। ভারতে সোশ্যাল মিডিয়া বা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম প্রধানত আইনগত নীতিমালা এবং কঠোর সরকারি নির্দেশিকার মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে। এই নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা ভুয়া খবর প্রতিরোধ, জাতীয় নিরাপত্তা এবং তথ্য সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে তৈরি করা হয়েছে।
তথ্যপ্রযুক্তি আইন, ২০০০ ((IT Act), তথ্যপ্রযুক্তি (ইন্টারমিডিয়ারি গাইডলাইনস এবং ডিজিটাল মিডিয়া এথিক্স কোড) রুলস, ২০২১ (IT Rules, ২০২১) এর মাধ্যমে ভারত মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিশ্চিত রেখেই অপতথ্য, গুজব এবং হিংসাত্মক পোস্ট প্রতিরোধে অনেকটাই সফল হয়েছে। বিভিন্ন দেশ মেটা এবং গুগলের অফিসের শাখা তাদের দেশে করতে বাধ্য করেছে। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাকে ২৬ কোটি ৩০ লাখ ডলার বা প্রায় ৩ হাজার ১৫৬ কোটি টাকা (প্রতি ডলারের বিনিময় মূল্য ১২০ টাকা ধরে) জরিমানা করেছে আয়ারল্যান্ডের ডেটা প্রোটেকশন কমিশন (ডিপিসি)। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও গুগলকে ২১ কোটি ইউরো জরিমানা করেছে ফ্রান্স সরকার। অস্ট্রেলিয়া গত বছর থেকে সোশ্যাল মিডিয়ায় গুজব, চরিত্র হনন এবং হিংসা বিদ্বেষ ছড়ানোর বিরুদ্ধে কঠোর আইন করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের সোশ্যাল মিডিয়া সব আইনের ঊর্ধ্বে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করার কেউ নেই। মেটা বা গুগলের কোনো শাখা অফিস নেই বাংলাদেশে অথচ বাংলাদেশের ৬ কোটির বেশি মানুষ ফেসবুক ব্যবহার করে। মেটার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ফেসবুক ব্যবহারের বিশ্বে দশম। কিন্তু বাংলাদেশের চেয়ে অনেক কম ব্যবহারকারী দেশ সিঙ্গাপুর, আয়ার ল্যান্ড, ইসরায়েলের মেটা অফিস খুলেছে। প্রতিবছর বাংলাদেশ থেকে গড়ে পাঁচশ কোটি টাকা আয় করে। সরকার চাইলেই মেটা বা গুগলকে এদেশে অফিস করতে বাধ্য করতে পারে। পাশাপাশি সোশ্যাল মিডিয়ায় স্বেচ্ছাচারিতা, মানুষের চরিত্র হননের বিরুদ্ধে নাগরিকদের সুরক্ষা দেওয়া সরকারের দায়িত্ব। না হলে সোশ্যাল মিডিয়ার অপব্যবহার সরকারকেই চ্যালেঞ্জ করবে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

