Logo

মতামত

ট্রাম্পের চীন সফর শুভঙ্করের ফাঁকি

Icon

অলোক আচার্য

প্রকাশ: ১৮ মে ২০২৬, ১৭:০৪

ট্রাম্পের চীন সফর শুভঙ্করের ফাঁকি

অলোক আচার্য, সংগৃহীত

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সফর মানেই এক এলাহী কাণ্ড। বিশ্বের সব রাজনীতির চোখ গিয়ে পরে মার্কিন প্রেসিডেন্টের উপর। যে দেশে যাবেন সেই দেশের সঙ্গে কি সম্পর্ক ঘটতে যাচ্ছে সেই দিকে নজর থাকে। যদি দেশটা হয় চীন তাহলে তো আরও একধাপ বেশি। কারণ শুধু চীন এখন মার্কিন মুলুকের সামনে এশিয়ার এবং বিশ্বের বড় প্রতিদ্বন্দ্বী। এবারও সেই নজর ছিল। প্রায় এক দশক পর কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের বেইজিং সফর, সঙ্গে বিশ্বের শীর্ষ প্রযুক্তি, জ্বালানি, বিমান ও আর্থিক খাতের করপোরেট প্রধানদের বিশাল বহর ছিল। তিন দিনের সফর শেষ হয়েছে। তবে আলোচনা থামেনি।

আদতে সফরে দুই দেশের কোন কোন স্বার্থ হাসিল হয়েছে তার হিসাব করতে ক্যালকুলেটর নিয়ে বসেছেন কেউ কেউ। কারণ দীর্ঘ নয় বছরের মধ্যে কোনো মার্কিন প্রেসিডেন্টের এটাই প্রথম চীন সফর ছিল। সফরে ট্রাম্প চীনের প্রেসিডেন্ট সি জিনপিংয়ের সঙ্গে বাণিজ্য, তাইওয়ান ও মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে বৈঠক করেন। প্রথম দফার বৈঠকের পর ট্রাম্প বলেন, শি জিনপিং ইরান সংকট সমাধানে সহায়তা করার প্রস্তাব দিয়েছেন। তবে একই দিনে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও জানান, যুক্তরাষ্ট্র আনুষ্ঠানিকভাবে চীনের কাছে কোনো সহায়তা চায়নি। হোয়াইট হাউসের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, হরমুজ প্রণালি খোলা রাখা জরুরি এ বিষয়ে দুই দেশ একমত হয়েছে। পাশাপাশি ইরান যেন কখনো পারমাণবিক অস্ত্র না পায়, সে বিষয়েও ঐকমত্য হয়েছে। এতে আরও বলা হয়, চীন প্রণালিতে সামরিকীকরণ বা চলাচলে টোল আরোপের বিরোধিতা করেছে। তবে চীনের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে এসব বিস্তারিত বিষয় তুলে ধরা হয়নি। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে জ্বালানি ও বাণিজ্য সহযোগিতার সম্ভাবনা থাকলেও, ইরান যুদ্ধ থামাতে এই বৈঠক এখনো বড় কোনো পরিবর্তন আনতে পারেনি। 

ফলে সংকটের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা থেকেই যাচ্ছে। কিন্তু সফর শেষে দেখা গেল, প্রত্যাশিত বড় কোনো বাণিজ্যচুক্তি হয়নি, নতুন শুল্ক সমঝোতা হয়নি, প্রযুক্তি নিষেধাজ্ঞা শিথিল হয়নি, এমনকি দুই দেশের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক কাঠামোগত বিরোধেরও দৃশ্যমান সমাধান আসেনি বলে জানিয়েছে রয়টার্স। ২০১৮ সালের বাণিজ্যযুদ্ধের পর থেকে দুই দেশের সম্পর্ক কেবল শুল্কবিরোধের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। এখন এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রযুক্তি নিয়ন্ত্রণ, সামরিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা, তাইওয়ান প্রশ্ন, দক্ষিণ চীন সাগর, সাইবার নিরাপত্তা এবং ভূরাজনৈতিক আধিপত্যের লড়াই। চীন মনে করে, যুক্তরাষ্ট্র তাদের প্রযুক্তিগত উত্থান ঠেকাতে চায়। অন্যদিকে ওয়াশিংটনের অভিযোগ, চীন রাষ্ট্রীয় ভর্তুকি, প্রযুক্তি চুরি এবং বাজার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে অসম প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। এবার আসি ট্রাম্পের সফর থেকে লাভের হিসাব খুঁজতে। এক কথায় বললে, আদতে কোনো লাভই হয়নি এক বাক্যে এই কথা বলার সুযোগ নেই। প্রথম লাভ হচ্ছে উভয় দেশের সম্পর্কে ইতিবাচক উন্নতি। সেই কারণেই ট্রাম্প এত গুরুত্ব দিয়ে চীন সফর করলেন।

বাণিজ্যিক কিছু বিষয়েও লাভ হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। তবে কূটনৈতিক ক্ষেত্রে কতটুকু লাভ হয়েছে তা নিয়ে দ্বিধা থাকছে। প্রশ্নটা ইরান যুদ্ধ নিয়ে। ইরান যুদ্ধ এখনও বন্ধ হয়নি। বিরতি চলছে। এটি আবারও শুরু হতে পারে। এটি পুরোপুরি বন্ধে যুক্তরাষ্ট্রকে সত্যিই চীন সহায়তা করতে পারবে বলে মনে হয়? ইরান ও রাশিয়ার মিত্রতার কথা যুক্তরাষ্ট্র জানে। চীন বললেই ইরান তাঁর পরমাণু কর্মসূচী বন্ধ করে দিবে? আর চীন এ ধরনের অনুরোধ করতে যাবেই বা কেন! দ্বিতীয়ত, হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দেওয়া যা ইরানের কব্জায় রয়েছে। এখানেও ইরানের হাতে কার্ড, চীনের খুব বেশি মাথা ঘামানোর দরকার নেই। কারণ ইরান তো চীনের জাহাজ আটকাচ্ছে না। এবার আসি বাণিজ্যিক বিষয় নিয়ে। দুই দেশের হাতেই কিছু ভিন্ন অস্ত্র রয়েছে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে। চীনের কাছে আছে বিরল খনিজ পদার্থ যা দিয়ে আধুনিক সেমিকন্ডাক্টর শিল্প চলছে। আর যুক্তরাষ্ট্রের হাতে আছে এই শিল্প। এখন শুধু কাজ সুষমভাবে বিনিময় করা। সেটি সম্ভব এবং তা করতে পারলে সুসম্পর্ক থাকার পাশাপাশি এই খাতও এগিয়ে যাবে। চীনের অর্থনীতিও ফুলে ফেঁপে উঠতে সময় নিবে না। 

বিরল খনিজ হলো ১৭ ধরনের রাসায়নিক উপাদানের একটি দল, যা আধুনিক প্রযুক্তির জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো ব্যবহার করা হয় যুদ্ধবিমান, স্মার্টফোন, বৈদ্যুতিক গাড়ি, কম্পিউটার চিপসহ বিভিন্ন উন্নত প্রযুক্তি তৈরিতে। উদাহরণ হিসেবে, এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান থেকে শুরু করে আইফোনÑ সবকিছুর কাজের পেছনে এই খনিজগুলোর বড় ভূমিকা আছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই খাতে চীনের নিয়ন্ত্রণ এত বেশি যে বিশ্বের অনেক দেশের সরবরাহ ব্যবস্থা তাদের ওপর নির্ভরশীল। তাই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনায় এটি বেইজিংয়ের দরকষাকষির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। গত বছরের এপ্রিলে যুক্তরাষ্ট  চীন বাণিজ্য যুদ্ধের তীব্র সময়ে চীন সাত ধরনের বিরল খনিজের ওপর লাইসেন্সিং ব্যবস্থা চালু করে। এতে এসব উপাদান ও চুম্বকের রফতানি সীমিত হয়ে যায়। অক্টোবরে এই নিয়ন্ত্রণ আরও কঠোর করা হয়। পরে দক্ষিণ কোরিয়ায় ট্রাম্প-শি বৈঠকে যে এক বছরের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, তার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপগুলো সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়। এখন যদি এসব বিষয় শিথীল হয় তবে দুই দেশের বাণিজ্য গতি লাভ করবে যার সুফল দুই দেশই ভোগ করবে। যদি য্ক্তুরাষ্ট্র্র ও চীন একসঙ্গে চলতে পারে তাহলে অনেক সংকটপূর্ণ পরিবেশ সহজেই কাটতে পারে। তবে আদৌ সেটি সম্ভব কি না সেটাই প্রশ্নের। 

যুক্তরাষ্ট্র-চীনের প্রতিযোগিতা, প্রতিদ্বন্দ্বিতা গত কয়েক বছরের আলোচিত বিষয়। দুই দেশের মধ্যে একাধিকবার চরম উত্তেজনার পর্যায়েও পৌঁছে গেছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দুই পরাশক্তিই নিজেদের সামলে নিয়েছে। তবে দুই দেশের মানসিক প্রতিযোগিতা এখনও তীব্রভাবেই চলছে। প্রতিযোগিতাপূর্ণ বিশ্বে শক্তিধর দেশগুলো স্বাভাভিকভাবেই নানাভাবে উত্তেজনাপূর্ণ অবস্থায় থাকে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে সেই উত্তেজনার পারদ এমনিতেই অনেক উপরে উঠে আছে। উভয় দেশের মধ্যে বাণিজ্য, প্রযুক্তি, আধিপত্যবাদ বিস্তার, সামরিক শক্তি প্রভৃতি বিষয়ে প্রতিযোগিতা চলে আসছে। গত কয়েক বছরে এই সম্পর্ক আরও বেশি তিক্ত হয়েছে। দুই দেশের মধ্যে চলে আসছে শীতল যুদ্ধ। যদিও সরাসরি বিষয়টি বলা হয় না কিন্তু এটা সত্যি। আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ক্রমেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে চীন। মধ্যপ্রাচ্য ইস্যুতে চীনের বর্তমান সফলতাই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অর্থনীতির দেশ এখন চীন। সুতরাং চীনকে উপেক্ষা করে পৃথিবীতে শান্তি প্রক্রিয়ার চেষ্টা অর্থহীন হবে। আর যদি উভয় পরাশক্তি দেশগুলো চায় তাহলে পৃথিবীতে শান্তি ফেরানো সম্ভব। এখন উভয় দেশের সামনে বেশ কয়েকটি ইস্যু। বৈশ্বিক অর্থনীতি, বাজার, দক্ষিণ চীন সাগরে আধিপত্য বিস্তার, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ, তাইওয়ান ইস্যু ইত্যাদি। বিশ্লেষকদের মতে, এ বৈঠকে দৃশ্যমান কোনো সফলতা না থাকলেও দুই দেশের মধ্যকার সম্পর্ক উন্নয়নের পথ খুলেছে। বিষয়টি এমনই। কোনো সরাসরি চুক্তি হলে সেটি দৃশ্যমান কোনো অর্জন বলা যায়। কিন্তু যদি সেটি না হয় তাহলে একটি সম্ভাবনা, একটি তিক্ততার অবসান ঘটার সম্ভাবনা থাকে। কারণ শেষ পর্যন্ত আলোচনাতেই সমাধানের পথ খুঁজতে হবে।  

দুই দেশের মধ্যে ‘সেমিকন্ডাক্টর চিপ’ শিল্পে আধিপত্য ধরে রাখতে রীতিমতো যুদ্ধ শুরু হয়ে গেছে। সেখানে প্রকাশিত প্রতিবেদনে দেখা যায়, চিপ মার্কেটের বর্তমান সম্পদ ৫০০ বিলিয়ন ডলারের কথা বলা হয়েছে, যা আগামী ২০৩০ সালের মধ্যে দ্বিগুণ হবে বলে আশা করা হচ্ছে। তাই এর সাপ্লাই চেইন নিয়ন্ত্রণ করতে যুক্তরাষ্ট্র ও চীন মরিয়া হয়ে উঠেছে। এই দুই দেশের মধ্যে যে তীব্র প্রতিযোগিতা হবে এটাই স্বাভাবিক। কেউ এককভাবে বিশ্বে নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখা বেশি কষ্টকর। কারণ প্রযুক্তিগত দক্ষতা এবং সামরিক ও কূটনৈতিক কৌশল কাজে লাগিয়ে বিভিন্ন দেশ ওপরের দিকে উঠে আসতে চাইছে যার মধ্যে চীন অন্যতম দাবিদার। ক্ষমতা বলতে বোঝায় আর্থিক সামর্থ্য, রাজনৈতিক দূরদর্শিতা, প্রযুক্তির ক্রমাগত উন্নয়ন এবং আধুনিকায়ন যা অন্য দেশের থেকে এগিয়ে থাকে এবং উন্নত অবকাঠামোর সমন্বয়। পৃথিবীজুড়ে বহু বছর ধরে আধিপত্য বিস্তার করে আছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বলাই বাহুল্য, এক্ষেত্রে মার্কিন প্রযুক্তি,শক্তিশালী আর্থিক ভিত্তি এবং দক্ষ রাজনীতি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। তবে প্রভাব বিস্তারের প্রধান নিয়ামক যে ক্ষমতাই তা আজ না বোঝালেও চলবে। আমাদের সামাজিক পরিমণ্ডলেও যাদের ক্ষমতা বেশি তারাই প্রভাব বিস্তার করে আছে। তাদের সিদ্ধান্তই মেনে চলতে হয়। বিশ্ব পরিমণ্ডলেও একই অবস্থা। যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, রাশিয়া, চীন এসব দেশ নিজেদের প্রভাব ধরে রাখতে মরিয়া। তবে সব মিলিয়ে এখন চলছে যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যকার তীব্র প্রতিযোগিতা।  দুই দেশের মধ্যে তাইওয়ান, দক্ষিণ চীন সাগর ঘিরে বিরোধসহ আরও কয়েকটি কারণে উত্তেজনা বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে ব্লিনকেনের এই সফর নিশ্চিতভাবেই আশার। যুক্তরাষ্ট্র এখনও যে গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে প্রযুক্তির শ্রেষ্ঠত্বে এগিয়ে আছে। এর মধ্যে রয়েছে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ, ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা এবং সর্বাধুনিক যুদ্ধ বিমান। এশিয়া এবং ন্যাটোর মাধ্যমে ইউরোপে গভীর নেটওয়ার্ক বজায় রাখতে সক্ষম যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু ট্রাম্পের সফরের মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই চীনে আসার কথা চূড়ান্ত হয়েছে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভøাদিমির পুতিনেরও। দুই পরাশক্তির এভাবে কয়েক দিনের ব্যবধানে চীন সফর করাকে একটু অন্যরকমই বলছেন বিশ্লেষকরা। কার আবদার রাখতে চীন? একদিকে মিত্র অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র। 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও কলামিস্ট। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন