কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা: টেকসই উন্নয়নে প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ
মোহাম্মদ নাভিদ শফিউল্লাহ :
প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ১৭:০৩
সংগৃহীত
ফেলে দেওয়া প্রতিটি বর্জ্যই আজ নগরের জন্য এক নীরব সংকট, যা আমাদের পরিবেশ ও টেকসই ভবিষ্যৎকে ক্রমেই চাপে ফেলছে।
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন আর শুধু পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রমের বিষয় নয়; এটি পরিবেশ সুরক্ষা, জনস্বাস্থ্য, নগর পরিকল্পনা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং টেকসই উন্নয়নের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সংশ্লিষ্ট একটি কৌশলগত উন্নয়ন-এজেন্ডা। দ্রুত নগরায়ন, জনসংখ্যা বৃদ্ধি ও শিল্পায়নের ফলে বিশ্বব্যাপী বর্জ্যের পরিমাণ ও ধরন ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ফলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা আজ সুশাসন, প্রযুক্তি, অর্থায়ন এবং নাগরিক সচেতনতার কার্যকারিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সূচকে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশেও প্রতিদিন প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার টন কঠিন বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যার বড় অংশ নগর এলাকা থেকে আসে। এর মধ্যে প্রায় ৬০-৬৫ শতাংশ জৈব বর্জ্য হলেও প্লাস্টিক, ই-বর্জ্য, চিকিৎসা ও শিল্প বর্জ্যের দ্রুত বৃদ্ধি বিদ্যমান ব্যবস্থাপনাকে আরও জটিল করে তুলছে। দুর্বল পৃথকীকরণ ব্যবস্থা, সীমিত প্রক্রিয়াজাতকরণ সক্ষমতা এবং অনিয়ন্ত্রিত নিষ্পত্তির কারণে পরিবেশ দূষণ, জলাবদ্ধতা ও জনস্বাস্থ্যের ঝুঁকি বাড়ছে। ফলে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কার্যকর ও সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।
বর্তমান চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এখনো নানা কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতায় ভুগছে। আধুনিক স্যানিটারি ল্যান্ডফিল, ট্রান্সফার স্টেশন এবং পৃথকীকরণ অবকাঠামোর ঘাটতির কারণে পুরো ব্যবস্থাপনা চেইন অনেকাংশে অপরিকল্পিত রয়ে গেছে।
উৎস পর্যায়ে জৈব ও অজৈব বর্জ্য পৃথকীকরণের দুর্বল বাস্তবায়ন রিসাইক্লিং ও নিরাপদ নিষ্পত্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে। পাশাপাশি স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয় এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের ঘাটতি নীতি বাস্তবায়নের কার্যকারিতা কমিয়ে দিচ্ছে।
অর্থায়নের সীমাবদ্ধতা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব (PPP) মডেলের সীমিত কার্যকারিতাও বড় চ্যালেঞ্জ। একই সঙ্গে Waste-to-Energy, আধুনিক কম্পোস্টিং ও উন্নত রিসাইক্লিং প্রযুক্তির সীমিত ব্যবহার টেকসই ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে ওঠাকে ব্যাহত করছে।
আইনি ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো
বাংলাদেশে পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা বিধিমালা, ২০২১ বর্জ্য ব্যবস্থাপনার প্রধান আইনগত ভিত্তি হিসেবে কাজ করছে। পাশাপাশি প্লাস্টিক ব্যবস্থাপনা নির্দেশনা প্লাস্টিক দূষণ নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে আইন ও নীতিমালার অস্তিত্ব দেশের পরিবেশ ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করেছে। এখন মনিটরিং ব্যবস্থার আরও উন্নয়ন, আন্তঃমন্ত্রণালয়ের বিভিন্ন দপ্তরের মধ্যে সমন্বয় জোরদার করা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি করার মাধ্যমে এসব আইন ও নীতিমালার কার্যকর বাস্তবায়নের সুযোগ আরও বিস্তৃত করা সম্ভব।
সমন্বিত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা
কার্যকর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা শুধু বর্জ্য অপসারণ নয়; বরং এটি উৎস থেকে প্রক্রিয়াজাতকরণ ও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি পর্যন্ত একটি সমন্বিত প্রক্রিয়া।
প্রথম ধাপে গৃহস্থালি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও শিল্প পর্যায়ে জৈব, অজৈব ও ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্য পৃথকীকরণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় ধাপে নিয়মিত সংগ্রহ ও পরিকল্পিত পরিবহনের মাধ্যমে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র পর্যন্ত পৌঁছানো হয়। তৃতীয় ধাপে রিসাইক্লিং, কম্পোস্টিং, স্যানিটারি ল্যান্ডফিল এবং Waste-to-Energy প্রযুক্তির মাধ্যমে বর্জ্যকে নিরাপদভাবে নিষ্পত্তি বা সম্পদে রূপান্তর করা হয়।
Circular Economy: বর্জ্য থেকে সম্পদ
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মূল দর্শন হলো “Waste-to-Resource”। অর্থাৎ বর্জ্যকে আর অপ্রয়োজনীয় পদার্থ হিসেবে নয়, বরং অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করা।
জৈব বর্জ্য কম্পোস্টে রূপান্তর করে কৃষিতে ব্যবহার করা যায়, প্লাস্টিক পুনর্ব্যবহার করে নতুন পণ্য তৈরি সম্ভব এবং ই-বর্জ্য থেকে মূল্যবান ধাতু পুনরুদ্ধার করা যায়। পাশাপাশি জৈব বর্জ্য থেকে উৎপাদিত বায়োগ্যাস নবায়নযোগ্য জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে কার্বন নিঃসরণ কমাতে সহায়তা করে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয় ও PPP
কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা একটি বহুমাত্রিক বিষয়, যা কোনো একক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কার্যকরভাবে পরিচালনা করা সম্ভব নয়। স্থানীয় সরকার বিভাগ, পরিবেশ মন্ত্রণালয়, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়, শিল্প মন্ত্রণালয় এবং বিদ্যুৎ ও জ্বালানি বিভাগসহ সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত ভূমিকা প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে Public-Private Partnership (PPP) একটি কার্যকর মডেল হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। বেসরকারি খাতের প্রযুক্তি, বিনিয়োগ ও ব্যবস্থাপনা দক্ষতা রিসাইক্লিং প্ল্যান্ট, আধুনিক পরিবহন ব্যবস্থা এবং Waste-to-Energy প্রকল্প বাস্তবায়নকে আরও গতিশীল করতে পারে।
প্রযুক্তি ও নাগরিক অংশগ্রহণ
আধুনিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ক্রমেই প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে উঠছে। GIS-ভিত্তিক বর্জ্য ম্যাপিং, IoT-ভিত্তিক স্মার্ট বিন এবং অনলাইন মনিটরিং সিস্টেম সেবার দক্ষতা ও জবাবদিহিতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
তবে শুধু প্রযুক্তি নয়, নাগরিক আচরণ ও অংশগ্রহণও সমান গুরুত্বপূর্ণ। উৎসে বর্জ্য পৃথকীকরণ, প্লাস্টিক ব্যবহার কমানো, পুনঃব্যবহার সংস্কৃতি এবং কমিউনিটি-ভিত্তিক পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম একটি টেকসই ব্যবস্থাপনা কাঠামো গড়ে তুলতে সহায়ক।
উপসংহার
টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় এখন জরুরি একটি কার্যকর ও সমন্বিত রূপান্তর। এ খাতে নীতি, প্রযুক্তি, অর্থায়ন, প্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং নাগরিক সচেতনতার সমন্বিত প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী বাস্তবায়ন কাঠামো এবং অংশগ্রহণমূলক উদ্যোগের মাধ্যমে বর্জ্যকে পরিবেশগত বোঝা থেকে অর্থনৈতিক সম্পদে রূপান্তর করা সম্ভব। একটি পরিচ্ছন্ন, বাসযোগ্য ও টেকসই বাংলাদেশ গড়তে তাই সমন্বিত কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনার বিকল্প নেই।
লেখক : অতিরিক্ত সচিব, পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়।
বাংলাদেশেরখবর/আরকে

