Logo

মতামত

‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে শশী থারুর পরামর্শ

Icon

আহমেদ তেপান্তর

প্রকাশ: ০৬ জুন ২০২৬, ২১:১২

‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে শশী থারুর পরামর্শ

আহমেদ তেপান্তর, ছবি: সংগৃহীত

শশী থারুর একজন ভারতীয় রাজনীতিবিদ এবং আন্তর্জাতিক কূটনীতিক। এর পাশাপাশি তিনি একাধিবার ভারতের কেরল রাজ্যের লোকসভা সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন। শশী থারুর ভারত এবং বিশ্বের অন্যান্য দেশের বিভিন্ন প্রকাশনা সংস্থা যেমন নিউইয়র্ক টাইমস, ওয়াশিংটন পোস্ট, গার্ডিয়ান প্রভৃতিতে কলামিস্ট এবং লেখক হিসেবে কাজ করেন। পাশাপাশি একজন সুবক্তা। তারুণ্যকে ঢেলে সাজাতে তিনি বহু বছর ধরে ক্রমাগত লিখে যাচ্ছেন। গত বুধবার তিনি দি ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে সদ্য প্রতিষ্ঠিত ‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে কিছু পরামর্শ দিয়ে একটি কলাম লেখেন। 

শশী থারুর তার কলামে লিখেছেন- প্রিয় জেন জি, তোমাদের তেলাপোকার মতো আচরণ করার দরকার নেই, তোমরা ভেতর থেকেই ব্যবস্থাটা বদলে দিতে পারো। যদি আর কোনো উপায় না থাকে, তবে আদালতে মামলা করো। কিন্তু তার জন্য তোমাদের একটি জোরালো যুক্তি থাকতে হবে, শুধু তোমাদের হতাশা প্রকাশ করা কিছু স্লোগান থাকলেই চলবে না।

প্রিয় জেন জি ভারতীয়েরা, যারা ‘ককরোচ জনতা পার্টি’-তে যোগ দিয়েছ: ভারতের বর্তমান পরিস্থিতি সংবাদ শিরোনাম, পরীক্ষা কেন্দ্র থেকে উঠে আসা খবর এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে আসা অমার্জিত, নির্ভেজাল কথাবার্তা দেখলে তোমাদের প্রজন্মকে আঁকড়ে ধরা সম্মিলিত হতাশার বিশাল ভার অনুভব না করে পারা যায় না।

আপনারা যারা দিশেহারা, ক্রুদ্ধ এবং মোহমুক্ত বোধ করছেন: আপনাদের কষ্ট আমরা দেখতে পাচ্ছি, এবং আপনাদের ক্রোধ আমরা শুনতে পাচ্ছি। আপনারা যে কারণে সিজেপি-তে যোগ দিয়েছেন, তা যথার্থ। যখন আপনি একটি স্বপ্নের জন্য প্রস্তুতিতে আপনার জীবনের বহু বছর উৎসর্গ করেন, ঘুম, সামাজিক যোগাযোগ এবং মানসিক সুস্থতা বিসর্জন দেন, তখন প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং ব্যবস্থার ব্যর্থতার খবর শুধু একটি শিরোনাম নয় এটি আপনার সময়, আপনার প্রচেষ্টা এবং আপনার ভবিষ্যতের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা। হতাশায় শিক্ষার্থীদের জীবন হারানোর মর্মান্তিক খবরটি একটি বিধ্বংসী অনুস্মারক যে ‘পচা ব্যবস্থা’ কেবল একটি বিমূর্ত ধারণা নয়; এর বাস্তব, মানবিক পরিণতি রয়েছে যা আমাদের সমাজের মূলে আঘাত করে। কিন্তু তোমাদের হতাশা প্রকাশের মাধ্যমকে সমস্যার সমাধান বলে ভুল করার মধ্যে একটি বিপদ রয়েছে। এটি তা নয়।

সিজেপি-র মতো আন্দোলনের উত্থান একটি শক্তিশালী, যদিও হৃদয়বিদারক, রাজনৈতিক নাটকের অংশ। এটি এমন একটি ব্যবস্থার দ্বারা ব্যবহারযোগ্য বস্তু হিসেবে বিবেচিত হওয়ার তীব্র অনুভূতিকে তুলে ধরে, যা সাধারণ নাগরিকদের সংগ্রামের প্রতি উদাসীন বলে মনে হয়। বেকারত্বের নিষ্পেষণকারী ভার, জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান ব্যয় এবং মানসম্মত শিক্ষার পথ সংকুচিত হয়ে আসার মতো সমস্যায় জর্জরিত তোমাদের জন্য এটি একটি নিরাপদ স্থান বলে মনে হয়। কিন্তু এই আন্দোলনে ক্ষোভ প্রকাশ করা এবং সংহতি খুঁজে পাওয়া মানসিক মুক্তির জন্য প্রয়োজনীয় হলেও, সেখানেই থেমে যাওয়ার একটি বিপদ রয়েছে। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়- ক্রোধ আগুন জ্বালাতে পারলেও, একটি টেকসই কাঠামো গড়ে তোলার জন্য স্থির নেতৃত্ব এবং একটি সুস্পষ্ট কৌশল প্রয়োজন। শুধু ইনস্টাগ্রাম দিয়ে তা হয় না।

যদি তুমি শুধু ক্ষণস্থায়ী মনোযোগের চেয়ে বেশি কিছু চান, তবে তোমাকে এই শক্তিকে এমন কিছু দ্বারা চালিত করতে হবে যা প্রচলিত ব্যবস্থাকে নমনীয় হতে বাধ্য করে। এ কারণেই, যে ব্যবস্থাটি তোমাকে ব্যর্থ করেছে বলে মনে হয়, তার মধ্যেই থেকে কাজ করা এবং বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে গিয়ে সেটিকে তোমার প্রয়োজন মেটানোর উপযোগী করে তোলাই হলো সামনে এগিয়ে যাওয়ার সবচেয়ে কার্যকর পথ।

নিজের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে শশী থারুর লিখেন-

প্রথমত, একজন সংসদ সদস্য হিসেবে আমি বলতে চাই যে, তোমরা তোমাদের প্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে পারো। এই ব্যবস্থাটি একক সত্তা নয়; এটি এমন মানুষদের নিয়ে গঠিত যারা, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে, তোমাদের কাছে দায়বদ্ধ। তোমাদের স্থানীয় বিধায়ক ও সাংসদদের কার্যালয়ে সুসংগঠিত অভিযোগ নিয়ে যাও। যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে তা জোরালো যুক্তিতে পেশ করো। পরীক্ষা পরিচালনা এবং নিয়োগ কোটার বিষয়ে স্বচ্ছতার দাবি জানাতে আরটিআই (তথ্য অধিকার) আইন ব্যবহার করো। যখন যথেষ্ট সংখ্যক কণ্ঠস্বর আনুষ্ঠানিকভাবে একটি উত্তরের দাবি জানায়, তখন নীরবতা একটি রাজনৈতিক দায় হয়ে দাঁড়ায়।

এরপর, তোমরা প্রাতিষ্ঠানিক চাপকে কাজে লাগাতে পারো, এমনকি যদি তোমাদের মনে হয় যে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো তোমাদের জন্য কাজ করছে না। তবু তোমরা হাল ছেড়ো না বরং গণমাধ্যমকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করো। মনে রাখতে হবে যখন তোমাদের ভিন্নমত সুনির্দিষ্ট, বাস্তবায়নযোগ্য দাবির চারপাশে সংগঠিত হয় (উদাহরণস্বরূপ, এনটিএ তদারকির জন্য নির্দিষ্ট নীতি সংস্কার, কর্মসংস্থান সৃষ্টির বাস্তব পরিকল্পনা, বিদ্যমান শূন্যপদ পূরণের জন্য সময়বদ্ধ প্রতিশ্রুতি), তখন গণমাধ্যম শুধু কেলেঙ্কারি নয়, সমাধানটিও তুলে ধরতে বাধ্য হয়। এবং সাংসদরাও প্রতিক্রিয়া জানাতে বাধ্য হন, আইনসভার ভেতরে ও বাইরে ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিতর্কে যোগ দেন। ভুলে গেলে চলবে না ভারতে এখনও অনেক ওর্গান ভালোভাবে কাজ করে। সেগুলোকে নিজেদের জন্য কাজে লাগান।

গণতান্ত্রিক ইতিহাসের সবচেয়ে সফল আন্দোলনগুলো শুধু চিৎকার করে হয়নি; তারা সংগঠিত হয়েছে, খসড়া তৈরি করেছে, তদবির করেছে, আন্দোলন করেছে। যে কারণে ছাত্র সংগঠন, আইনি গোষ্ঠী এবং নীতি নির্ধারক দলগুলোর যুক্ত হন। ফলে এক ধরনের প্রেসার গ্রুপ তৈরি হয় প্রয়োজনে আদালতে অব্ধি দৌড়াতেও পিছু হয় না। ‘এটা অন্যায়’ কথাটিকে ‘এটা ১৪ বা ২১ নং অনুচ্ছেদ লঙ্ঘন করে’। যদি অন্য সব উপায় ব্যর্থ হয়, তবে মামলা আদালতে নিয়ে যাও। কিন্তু তার জন্য তোমাকে একটি মামলা থাকতে হবে, শুধু হতাশা প্রকাশ করা কিছু স্লোগান থাকলেই চলবে না।

সকল ক্ষেত্রেই অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এটাকে এড়িয়ে গেলে সংগঠিত উপায়ে উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন বাধাগ্রস্থ হবে। সম্মিলিত অংশগ্রহণের শক্তি অনেক। যেমন স্থানীয় পৌর সংস্থাগুলিতে গঠনমূলকভাবে অংশগ্রহণ করে এবং সচেতন ভোটার সংগঠনে যুক্ত করে কর্তৃত্বপরায়ন ব্যবস্থাকে পরাভূত করা সম্ভব। এর মধ্যে দিয়ে জড়তা মুক্ত হওয়া যায়। যখন তুমি ক্ষমতাসীনদের চেয়ে বেশি সচেতন এবং সংগঠিত, তখন তুমি এমন এক শক্তিতে পরিণত হও যার সঙ্গে সরকারের যে কোনো স্টেকহোল্ডার অর্গান আলোচনায় বসতে বাধ্য হয়। অর্থাৎ অংশগ্রহণমূলক উপস্থিতি সিস্টেমেটিক উপায়ে রাষ্ট্রীয় অর্গানে সকলের পক্ষ থেকে নিজেকে মেলে ধরার সুযোগ। 

এটা মনে হওয়া সহজ যে, খেলাটা পাতানো এবং প্রতিকূলতা অজেয়। কিন্তু মনে রাখবে তুমি এমন একটি জাতির জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ, যে জাতি এখনও তার পরিচয় নির্ধারণ করছে। জাতীয় দিকনির্দেশনার কাঁটা পরিবর্তন করার জন্য তোমার কাছে সংখ্যা, ডিজিটাল দক্ষতা এবং নৈতিক উচ্চ অবস্থান রয়েছে। আকাঙ্ক্ষাগুলোই জাতির ভবিষ্যৎকে প্রতিফলিত করে। এ বিষয়গুলো অনুসরণ করলে এ প্রজন্ম শিগগিরই জনঅধিকার বাস্তবায়নে রাষ্ট্র পরিচালনায় পথ দেখাবো। এ জন্য তোমাদের সমন্বিত দাবিগুলো গঠনমূলকভাবে তুলে ধরো, জয়ের মাল্য তোমাদের গলায় শোভা পাবে। 

আরও একটি কথা। তোমাকে ককরোচের মতো আচরণ সহ্য করতে হবে না এবং এই তকমাটিকে স্থায়ী পরিচয় হিসেবে গ্রহণ করারও প্রয়োজন নেই। প্রতিটি ছাত্র এবং প্রতিটি চাকরিপ্রার্থীর মর্যাদাকে সম্মান করে এমন একটি ব্যবস্থা পুনর্গঠনের জন্য পছন্দের সকল দলের মূলধারার রাজনীতিবিদদের সঙ্গে কাজ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করো। 

বয়স বিবেচনায় তোমার ক্রোধকে উদাসীনতা বা খামখেয়ালী হতে দেওয়া যাবে না। বরং এটিকে তোমার প্রাপ্য পরিবর্তনের জন্য একটি দীর্ঘমেয়াদী, অবিচল দাবির জ্বালানি হিসেবে গ্রহণ করতে শিখো। ব্যবস্থাটি কেবল তখনই পরিবর্তিত হবে যখন এর ব্যর্থতার কারণে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার ব্যক্তিরা বাইরে থেকে নয় বরং ভেতর থেকে একে চ্যালেঞ্জ করার সিদ্ধান্ত নেবে।

পরিস্থিতি বিবেচনায় দৃঢ়তার সঙ্গে সংগঠিত উপায়ে সোচ্চার থাকা সবেচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। বর্তমান ব্যবস্থা তা পছন্দ করুক বা না করুক, তোমরাই এই দেশের (ভারত) ভবিষ্যৎ। অদম্য ইচ্ছাশক্তির বলে সুযোগটি কাজে লাগাও। কবির সুমন যেভাবে তারুণ্য জাগাতে গিটার হাতে গানে গানে উচ্চারণ করেছেন- ‘হাল ছেড়ো না বন্ধু বরং কণ্ঠ ছাড়ো জোরে, দেখা হবে তোমায় আমায় অন্য গানের ভোরে।’  হাল ছাড়বেন না। আন্দোলন, সংগ্রাম কেবল ইনস্টাগ্রামে ক্ষোভ প্রকাশ করেই সন্তুষ্ট থাকবেন না। সময়ের রোমান্টিসিজমকে বাস্তবায়িত করতে নিজেদেরকেই নিজেদের কাজ করতে হবে।

লেখক: জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক ও কলামিস্ট। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন