মো. তাহমিদ রহমান, ছবি: সংগৃহীত
শিক্ষা হলো জ্ঞান, দক্ষতা, মূল্যবোধ এবং ইতিবাচক অভ্যাস অর্জনের একটি জীবনব্যাপী প্রক্রিয়া। মানুষের অন্তর্নিহিত সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটিয়ে তার চিন্তাশক্তি ও সৃজনশীলতা বাড়িয়ে একজন দায়িত্বশীল ও আদর্শ মানুষ হিসেবে গড়ে তোলাই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য। মানবীয় বৈচিত্র্যের কারণে একজন শিক্ষার্থী সব বিষয়ে সমান পারদর্শী হবে না।
কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার একটি মৌলিক সংকট হলো আমরা এখনও বিশ্বাস করি, একজন ভালো শিক্ষার্থী হতে হলে তাকে একই ধরনের দক্ষতার মানদণ্ডে উত্তীর্ণ হতে হবে। আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো মনে করে গণিতে ভালো না হলে সে দুর্বল, ইংরেজিতে পিছিয়ে থাকলে সে মনোযোগহীন, সুন্দর হাতের লেখা না হলে সে অযোগ্য। অথচ আধুনিক মনোবিজ্ঞান, স্নায়ুবিজ্ঞান এবং শিক্ষা গবেষণা বহু আগেই প্রমাণ করেছে যে মানুষের শেখার ধরন এক নয়। কারও ভাষাগত দক্ষতা অসাধারণ, কারও সৃজনশীলতা অনন্য, কেউ আবার সংখ্যার জগতে অস্বস্তি বোধ করে। কিন্তু আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনও একটি মাত্র ছাঁচে সবাইকে ঢালতে ব্যস্ত। এই ছাঁচে গড়া বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী হলো ডিসলেক্সিয়া, ডিসগ্রাফিয়া এবং ডিসক্যালকুলিয়া বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা। এরা কোনোভাবেই কম মেধাবী নয়; বরং তাদের মস্তিষ্ক তথ্য প্রক্রিয়াকরণ করে ভিন্নভাবে।
কিন্তু সেই ভিন্নতাকে স্বীকৃতি দেওয়ার বদলে আমরা তাদেরকে ‘দুর্বল’ হিসেবে গণ্য করি। ডিসলেক্সিয়া হলো একটি স্নায়ুবিক শিখন অক্ষমতা। এর ফলে স্বাভাবিক বুদ্ধিমত্তা থাকার পরও একজন ব্যক্তি পড়তে, শব্দ চিনতে বা ভাষা প্রক্রিয়াকরণে সমস্যার সম্মুখীন হয়। ডিসগ্রাফিয়া হলো এমন একটি স্নায়ুবিক শিখন অক্ষমতা যা মানুষের লেখার দক্ষতাকে প্রভাবিত করে। ডিসগ্রাফিয়া বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ব্যক্তিরা স্বাভাবিক চিন্তাভাবনা করতে পারে কিন্তু সেই চিন্তাভাবনাকে সহজে গুছিয়ে ও স্পষ্টভাবে লিখে প্রকাশ করতে পারে না।
অন্যদিকে ডিসক্যালকুলিয়া হলো একটি নির্দিষ্ট শিখন অক্ষমতা। এই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা গণিত এবং সংখ্যা বুঝার ক্ষেত্রে জটিলতার সম্মুখীন হন। একে প্রায়ই ম্যাথ ডিসলেক্সিয়া বা গাণিতিক ডিসলেক্সিয়া বলা হয়। এসব অবস্থার সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার কোনো সম্পর্ক নেই। তবু আমাদের বিদ্যালয়গুলোতে এই শিক্ষার্থীদের প্রায়শই অলস, অমনোযোগী বা অযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শিক্ষাব্যবস্থা এবং শিক্ষকদের পড়ানোর প্রক্রিয়াগত দুর্বলতাকে অসহায় শিক্ষার্থীদের উপর নেতিবাচক ভাবে চাপিয়ে দেওয়া হয়। প্রশ্ন হলো, একজন শিক্ষার্থীকে কেন গণিত পারতেই হবে? এ প্রশ্ন শুনে অনেকেই বিস্মিত হতে পারেন। কারণ আমাদের সমাজে গণিতকে বুদ্ধিমত্তার প্রধান সূচক হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, পৃথিবীর অধিকাংশ পেশায় গণিতের প্রয়োজন হয় না। একজন চিত্রশিল্পী, সংগীতশিল্পী, সাংবাদিক, লেখক, অভিনেতা, সমাজবিজ্ঞানী কিংবা ইতিহাস গবেষকের সাফল্য নির্ভর করে অন্য ধরনের দক্ষতার ওপর।
তাহলে কেন একজন শিক্ষার্থী, যার গণিত শেখার ক্ষেত্রে স্নায়ুবৈজ্ঞানিক সীমাবদ্ধতা রয়েছে, তাকে জোর করে একই মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা হবে? একই প্রশ্ন ইংরেজির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। ইংরেজি নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক ভাষা। কিন্তু ইংরেজিতে দুর্বল হওয়া মানেই একজন শিক্ষার্থী অযোগ্য নয়। ভাষাগত দক্ষতা বহুমাত্রিক। কেউ মাতৃভাষায় অসাধারণ চিন্তা করতে পারে, সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারে, গবেষণা করতে পারে; কিন্তু বিদেশি ভাষা আয়ত্ত করতে তুলনামূলক বেশি সময় লাগতে পারে।
তাহলে কেন তার শিক্ষার পথ বন্ধ হয়ে যাবে? শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য কি সবার মধ্যে একই দক্ষতা তৈরি করা? এটা কখনোই নয় বরং শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য মানুষের অন্তর্নিহিত প্রাণশক্তি ও সম্ভাবনাকে বিকশিত করা। তাই রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিয়ে সবার জন্য শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে, না হলে রাষ্ট্র উত্তম মানবসম্পদ প্রাপ্তি হতে বঞ্চিত হবে। আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম ত্রুটি হচ্ছে শিক্ষা আনন্দদায়ক নয়। তার উপর রাষ্ট্র ব্যবস্থা এখনো শিক্ষাকে অধিকারের মর্যাদা দেয়নি। তবে রাষ্ট্রের অবশ্য কর্তব্য হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংবিধানের তৃতীয় ভাগে (অনুচ্ছেদ ২৭ থেকে ৪৪) মৌলিক অধিকারগুলো সুনির্দিষ্ট করা আছে, যার মধ্যে শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত নয়। তবে সংবিধানের ১৫ অনুচ্ছেদে অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, চিকিৎসাসহ শিক্ষাকে মানুষের অন্যতম মৌলিক চাহিদা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া, ১৭ অনুচ্ছেদে শিক্ষাকে সার্বজনীন, অবৈতনিক এবং বাধ্যতামূলক করার কথা বলা হয়েছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি হিসেবে গণ্য হয়। অর্থাৎ শিক্ষা সাংবিধানিকভাবে অধিকার না হলেও আদর্শিকভাবে অধিকারের মর্যাদাসম্পন্ন। বিশ্বের উন্নত দেশগুলো ক্রমশ ‘একই পাঠ্যক্রম, একই পরীক্ষা, একই মূল্যায়ন’ ধারণা থেকে সরে এসে ব্যক্তিকেন্দ্রিক শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
একজন ডিসলেক্সিয়া বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীকে অতিরিক্ত সময় দেওয়া হচ্ছে, অডিও ভিত্তিক শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, বিকল্প মূল্যায়নের সুযোগ দেওয়া হচ্ছে। ডিসক্যালকুলিয়ায় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন শিক্ষার্থীর জন্য পরবর্তী শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হতে গণিতকে বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে না। ইতিহাসের দিকে তাকালেও আমরা দেখি, বহু বিশ্ববিখ্যাত ব্যক্তি প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় সংগ্রাম করেছেন। আলবার্ট আইনস্টাইন সম্পর্কে প্রচলিত অনেক গল্প অতিরঞ্জিত হলেও এটি সত্য যে তিনি প্রচলিত মুখস্থনির্ভর শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করতেন না। স্যার রিচার্ড চার্লস নিকোলাস ব্র্যানসন প্রকাশ্যে বলেছেন যে তিনি ডিসলেক্সিয়ায় বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন ছিলেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতা স্টিভেন অ্যালান স্পিলবার্গ জীবনের অনেক পরে জানতে পারেন যে তিনি ডিসলেক্সিয়া বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন। তবুও তাদের সাফল্য বিশ্বকে বদলে দিয়েছে।
আসলে সমস্যা শিক্ষার্থীদের মধ্যে নয় মূল সমস্যা হচ্ছে আমাদের প্রচলিত শিক্ষা ব্যবস্থার মধ্যে, এই ব্যবস্থা বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করার বাতায়ন খোলা রাখেনি। দ্বার বন্ধ করে ভ্রম রুখতে গিয়ে বায়ু চলাচলই বন্ধ করে দিয়েছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীর যোগ্যতা নির্ধারিত হয় কয়েকটি বাধ্যতামূলক বিষয়ে প্রাপ্ত নম্বর দিয়ে। একজন শিক্ষার্থী পদার্থবিজ্ঞান, ইতিহাস, গার্হস্থ বিজ্ঞান কিংবা চারুকলায় অসাধারণ প্রতিভাবান হতে পারে। কিন্তু গণিতে একটি নির্দিষ্ট নম্বর না পাওয়ার কারণে তার সামগ্রিক শিক্ষাজীবন ব্যাহত হতে পারে। এটি শুধু অন্যায্য নয়; এটি জাতীয় সম্পদের অপচয়ও।
কারণ প্রতিটি শিশুর মধ্যে রাষ্ট্রের জন্য একটি সম্ভাবনা লুকিয়ে থাকে। কেউ ভবিষ্যতের বিজ্ঞানী, কেউ শিল্পী, কেউ উদ্যোক্তা, কেউ লেখক, কেউ খেলোয়াড়, কেউ দার্শনিক। সব শিশুকে একই শিক্ষাদ্বার দিয়ে প্রবেশ করতে বাধ্য করছি যার কারণে অসংখ্য প্রতিভা সেই দরজার বাইরেই আটকে যাচ্ছে। আজকের বিশ্বে দক্ষতার সংজ্ঞাও বদলে গেছে। বিশ্বের বড় বড় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমশ দক্ষতা, সৃজনশীলতা ও সমস্যা সমাধানের ক্ষমতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে; শুধুমাত্র পরীক্ষার নম্বরকে নয়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে তথ্য মুখস্থ রাখার গুরুত্ব কমছে, বাড়ছে চিন্তা করার ক্ষমতা, সৃজনশীলতা এবং বিশেষায়িত দক্ষতার মূল্য। সেই প্রেক্ষাপটে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে নতুন করে ভাবার সময় এসেছে। প্রথমত, ডিসলেক্সিয়া, ডিসগ্রাফিয়া ও ডিসক্যালকুলিয়াকে আনুষ্ঠানিকভাবে শিক্ষানীতির অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে। বিদ্যালয় পর্যায়ে স্ক্রিনিং ব্যবস্থা চালু করতে হবে, যাতে সমস্যাগুলো প্রাথমিক পর্যায়েই শনাক্ত করা যায়। দ্বিতীয়ত, বাধ্যতামূলক বিষয়গুলোর ধারণা পুনর্বিবেচনা করতে হবে। মৌলিক সাক্ষরতা ও সংখ্যাজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু সব বিষয় সবার জন্য সমানভাবে বাধ্যতামূলক হওয়ার প্রয়োজন নেই।
তৃতীয়ত, বিষয় নির্বাচনের স্বাধীনতা বাড়াতে হবে। একজন শিক্ষার্থী যদি ইতিহাস, সাহিত্য, চারুকলা, সংগীত বা প্রযুক্তির কোনো নির্দিষ্ট শাখায় গভীর আগ্রহ দেখায়, তাহলে তাকে সেই ক্ষেত্রেই এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ দিতে হবে। চতুর্থত, মূল্যায়ন পদ্ধতি বদলাতে হবে। শুধু লিখিত পরীক্ষার ওপর নির্ভর না করে প্রকল্প, উপস্থাপনা, মৌখিক পরীক্ষা, সৃজনশীল কাজ এবং বাস্তব দক্ষতার মূল্যায়ন যুক্ত করা প্রয়োজন। সবশেষে, আমাদের একটি মৌলিক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে: শিক্ষা কি রাষ্ট্রের সুবিধার জন্য, নাকি শিক্ষার্থীর বিকাশের জন্য? যদি উত্তর হয় শিক্ষার্থীর বিকাশ, তাহলে আমাদের স্বীকার করতে হবে সব মানুষ একইভাবে শেখে না, একইভাবে চিন্তা করে না এবং একই বিষয়ে দক্ষও নয়। একজন শিক্ষার্থী গণিতে দুর্বল হতে পারে, কিন্তু সাহিত্য সৃষ্টি করতে পারে।
কেউ ইংরেজিতে পিছিয়ে থাকতে পারে, কিন্তু অসাধারণ উদ্ভাবক হতে পারে। কারও হাতের লেখা খারাপ হতে পারে, কিন্তু তার চিন্তার গভীরতা সমাজকে বদলে দিতে পারে। শিক্ষার দরজা তখনই সত্যিকার অর্থে সবার জন্য উন্মুক্ত হবে, যখন আমরা শিক্ষার্থীদের একটি নির্দিষ্ট মানদণ্ডে বিচার করা বন্ধ করব। রাষ্ট্রের দায়িত্ব সবাইকে একই রকম বানানো নয়; বরং প্রত্যেককে তার নিজস্ব সামর্থ্য অনুযায়ী বিকশিত হওয়ার সুযোগ দেওয়া। একটি মানবিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও আধুনিক শিক্ষাব্যবস্থা সেই দিনই গড়ে উঠবে, যেদিন আমরা বলব সব শিক্ষার্থীকে সব বিষয় পারতে হবে না; কিন্তু প্রত্যেক শিক্ষার্থীর শেখার অধিকার, এগিয়ে যাওয়ার অধিকার এবং স্বপ্ন দেখার অধিকার অবশ্যই থাকতে হবে।
লেখক: শিক্ষক, গবেষক ও কলামিস্ট।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

