সৈয়দ আসিফ ইকবাল, ছবি: সংগৃহীত
স্নাতক শ্রেণির অর্থনীতিতে পাঠ করা একটি উক্তি আমার প্রায়ই মনে পড়ে, কোনো কাজে সমাজের একজনের কোনো ক্ষতি না হয়ে যদি অন্য একজনের উপকার হয় তবে প্রত্যেকের ওই কাজটা করা উচিত, এতে সমাজের মোট ভোগ বৃদ্ধি পায়।
এখন আসা যাক ভোগ বলতে কী বোঝায়। অর্থনীতির ভাষায় বলা হয়েছে উপযোগ নষ্ট করাকে ভোগ বলা হয়। অর্থাৎ ধরা যাক আমার একটা শার্ট/জামা/ভোগ্যপণ্য আছে, আমি এটি পরিধান/ব্যবহার করতে থাকলে এক পর্যায়ে সেটি আর ব্যবহার উপযোগী থাকবে না, নষ্ট হয়ে যাবে। আবার আমি যদি উক্ত পণ্যটি ব্যবহার না করে দীর্ঘদিন রেখে দেই তবেও সেটি একদিন নষ্ট হয়ে যাবে অর্থাৎ ব্যবহার উপযোগী থাকবে না। এভাবে উপযোগ নষ্ট করাকে ভোগ বলা যাবে না এটিকে বলা যায় অপচয়।
এ পৃথিবীতে যত ভোগ্যসামগ্রী আছে এবং পৃথিবীতে যত লোক সংখ্যা আছে তাতে সমস্ত ভোগ্য সামগ্রী পৃথিবীর সমস্ত মানুষের চাহিদা মিটাতে যথেষ্ট। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা সমস্ত সম্পদ সব মানুষের মধ্যে সমভাবে বণ্টন করে দেননি।
এ প্রসঙ্গে আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বিভিন্নভাবে উল্লেখ করেছেন, ‘আল্লাহ নিজ বান্দাদের মধ্যে যাকে ইচ্ছা রিজিক সচ্ছল করিয়া থাকেন এবং যাকে ইচ্ছা সংকীর্ণ করিয়া দেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ সব বিষয়ে সমগ্র অবগত (সুরা আনকাবুত-৬২)।
আল্লাহতায়ালা যাকে ইচ্ছা প্রচুর জীবিকা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সংকীর্ণ করিয়া দেন (সুরা রাদ-২৬)। আর তিনিই সর্ববিষয়ে শ্রবণকারী, দর্শনকারী, আসমানসমূহ ও জমিনের চাবিগুলো তাঁরই আয়ত্তে রহিয়াছে, যাকে ইচ্ছা জীবিকা প্রচুর করিয়া দেন আর যাকে ইচ্ছা কম করিয়া দেন, নিঃসন্দেহে তিনি সব বিষয়ে জ্ঞাত (সুরা শূরা-১৯)।
তারা কি জানিতে পারে নাই যে, আল্লাহই যাকে ইচ্ছা প্রচুর রিজিক দিয়া থাকেন এবং তিনিই যাকে ইচ্ছা সংকীর্ণ করিয়া থাকেন, এতে মুমিনদের জন্য নিদর্শনসমূহ রহিয়াছে (সুরা জুমার-৫২)।
আল্লাহ যাকে ইচ্ছা প্রচুর জীবিকা দান করেন এবং যাকে ইচ্ছা সংকীর্ণ করিয়া দেন, এতে নিদর্শনসমূহ রহিয়াছে ইমানদার লোকদের জন্য। সুতরাং আত্মীয়স্বজনকে, অভাবী ও মুসাফিরদের তাদের প্রাপ্য হক প্রদান কর (সুরা রুম-৩৭)।
উপরোক্ত আয়াতসমূহ হতে এটা স্পষ্ট যে, মহান আল্লাহ সমাজে একজনকে অন্য জনের ওপর নিভরশীল করে পাঠিয়েছেন, এর কারণও বিভিন্ন আয়াতে ব্যাখ্যা করেছেনÑ পৃথিবীতে তাদের জীবিকা আমিই বণ্টন করিয়াছি, অথচ সেই বণ্টনের ব্যাপারে আমি তাদের একজনকে অন্যজনের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়া রাখিয়াছি যাতে একে অন্যের কাজ উদ্ধার করতে পারে (সুরা জুখরফ-৩২)।
অন্যত্র বলেছেন আর যদি আল্লাহ নিজের সমস্ত বান্দার জীবকা সচ্ছল করিয়া দিতেন তবে তারা ভূপৃষ্ঠে দুরন্তপনা আরম্ভ করিয়া দিত, কিন্তু যেই পরিমাণ জীবিকা ইচ্ছা করেন সেই পরিমাণ নাজিল করিয়া থাকেন, তিনি নিজ বান্দাগণ সম্বন্ধে ওয়াকেবহাল (সুরা শূরা, ২৮)।
এর পাশাপাশি আল্লাহ তাঁর সচ্ছল (যাদের তিনি রিজিকে শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন) বান্দাগণের প্রতি নিম্নের বিভিন্ন নির্দেশনা দিয়েছেনÑ
সব পুণ্য ইহাতেই নহে যে তোমরা স্বীয় মুখকে পূর্ব দিকে কর কিংবা পশ্চিম দিকে, বরং পুণ্য ইহাতে- কোনো ব্যক্তি ইমান রাখে আল্লাহর প্রতি, কিয়ামত দিবসের প্রতি, ফেরেশতাদের প্রতি, কেতাব এবং নবীগণদের প্রতি আর মাল প্রদান করে আল্লাহর সহবতে আত্মীয়স্বজনদের এবং এতিমদিগকে এবং মিসকিনদিগকে এবং রিক্তহস্ত মোসাফিরগণকে এবং ভিক্ষুকদিগকে এবং দাসত্ব মোচনে।
নিশ্চয়ই যারা তাদের উপার্জন থেকে রাতে বা দিনে, প্রকাশ্যে বা গোপনে, সচ্ছল বা অসচ্ছল অবস্থায় দান করে, তাদের জন্য তাদের প্রতিপালকের কাছে পুরস্কার রয়েছে, তাদের কোনো ভয় বা পেরেশানি থাকবে না (সুরা বাকারা-২৭৪)।
তোমরা প্রকাশ্যে দান করলে তাও ভালো আর যদি গোপনে অভাবীকে দাও তা আরো ভালো। দানের কারণে তোমাদের অনেক পাপ মোচন হবে। তোমরা যা করো আল্লাহ তা জানেন (সুরা বাকারা, ২৭১)।
নিঃসন্দেহে মুত্তাকিগণ তাদের প্রতিপালকের পুরস্কার আনন্দে উচ্ছল হয়ে উঠবে যেহেতু তারা তার আগে পৃথিবীতে নেক্কার ছিল। তারা ইবাদতরত থাকার দরুন রাতে কম ঘুমাতো এবং শেষ রাতে ক্ষমা প্রার্থনা করিত আর তাদের আর্থিক ইবাদত এরূপ ছিল যে, তাদের ধনসম্পদের মধ্যে প্রার্থী-অপ্রার্থী নির্বিশেষে সবারই অংশ ছিল। অর্থাৎ তারা এমন দৃঢ়তা সহকারে দান করিত, যেন তাদের ওপর গ্রহীতাদের কোনো দাবি ছিল (সুরা জারিয়াত ১৬-১৯)।
তোমারা আল্লাহর প্রতি এবং তাঁর রাসুলের প্রতি ইমান আনয়ন কর আর যে সম্পদে তিনি তোমাদিগকে অন্যের স্থলাভিষিক্ত করিয়াছেন তা থেকে (আল্লাহর পথে) ব্যয় কর; সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা ইমান আনবে এবং আল্লাহর পথে ব্যয় করবে তাদের জন্য বড় ছওয়াব রহিয়াছে (সুরা হাদিদ-৭)।
নিঃসন্দেহে দানশীল পুরুষ ও নারী যারা আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে, শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির লক্ষ্যে অন্যের জন্য ব্যয় করে, তাদের জন্য পছন্দনীয় বিনিময় রহিয়াছে (সুরা হাদিদ-১৮)।
হে মুমিনগণ তোমাদের ধন-সম্পদ ও তোমাদের সন্তান-সন্ততি তোমাদিগকে যেন আল্লাহতায়ালার সরণ হইতে গাফেল করিতে না পারে, আর যাহারা এইরূপ করিবে তাহারাই বিফল থাকিবে। কেননা পার্থিব উপভোগ নিঃশেষ হইয়া যাইবে আর পরকালের ক্ষতি সহায়ক থাকিয়া যাইবে। আর আমি যাহা তোমাদিগকে দান করিয়াছি উহা হইতে ব্যয় কর উহার পূর্বে যে তোমাদের মধ্যে কাহারও মৃত্যু আসিয়া উপস্থিত হয়, অনন্তর সে বলে হে আমার রব আমাকে কেন আরও কিছুদিনের অবকাশ প্রদান করিলেন না যে, আমি দান-খয়রাত করিয়া লইতাম এবং নেক্কারগণের অন্তর্ভুক্ত হইতাম আর আল্লাহ কাহাকেও কখনো অবকাশ দেন না যখন তাহার সময় আসিয়া পড়ে আর আল্লাহ তোমাদের সমস্ত কার্যাবলি সম্বন্ধে পূর্ণ অবহিত আছেন (সুরা মুনাফিকুন ৯-১১)।
তাছাড়া হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেছেন সম্পদ জমা বা সংরক্ষণকারীগণকেÑ ‘যাহারা (অতি লোভের বশবর্তী হইয়া) স্বর্ণ ও রৌপ্য জমা করিয়া রাখে এব উহা আল্লাহর পথে ব্যয় করে না।
অতএব আপনি তাহাদিগকে অতি যন্ত্রণাময় এক শাস্তির সংবাদ শুনাইয়া দিন যাহা সেই দিন ঘটিবে, যেই দিন দোজখের অগ্নিতে সেগুলোকে উত্তপ্ত করা হইবে, অতঃপর সেগুলো দ্বারা তাহাদের ললাটসমূহে এবং পার্শ্বদেশ সমূহে এবং পৃষ্ঠদেশসমূহে দাগ দেওয়া হইবে (এবং বলা হইবে) উহা তাহাই যাহা তোমরা নিজেদের জন্য সঞ্চয় করিয়া রাখিয়াছিলে, সুতরাং এখন নিজেদের সঞ্চয়ের স্বাদ গ্রহণ কর (সুরা তওবা-৩৪)।
নিরতিশয় অনিষ্ট রহিয়াছে প্রত্যেক এমন বক্তির জন্য যে কাহারও অগোচরে নিন্দা করে এবং সাক্ষাতে ধিক্কার দেয়, যে লোভের আতিশয্যে মাল জমা করে এবং উহা বারবার গণনা করে। সে মনে করে যে তাহার ধন-সম্পদ তাহার নিকট চিরকাল থাকবে, কখনো না, আল্লাহর কসম সে এমন অগ্নিতে নিক্ষিপ্ত হইবে যে, উহাতে যাহারা পতিত হয় উহা চূর্ণ-বিচূর্ণ করিয়া ফেলে আর আপনার কি জানা আছে সেই চূর্ণ-বিচূর্ণকারী অগ্নি কিরূপ? উহা আল্লাহর অগ্নি যা প্রজ¦লিত করা হইয়াছে যাহা শরীরে লাগিবা মাত্র হৃৎপিণ্ড পর্যন্ত যাইয়া পৌঁছিবে উহা তাহাদের ওপর আবদ্ধ করিয়া দেওয়া হইবে (সুরা হুমাজাহ)।
তোমারা অবশ্যই জাহান্নাম দেখবে, আবার বলছি তোমারা অবশ্যই নিজ চোখে জাহান্নাম দেখবে। তোমরা নিশ্চিত থাক, সেদিন তার দেওয়া নেয়ামত দিয়ে তোমরা কী করেছ সে সম্পর্কে জবাবদিহি করতে হবে (সুরা তাকাছুর ৬-৮)
পবিত্র কোরআনের উপরোক্ত আয়াতসমূহ বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিন ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর সৃষ্ট বান্দাদের মধ্যে রিজিক অসমভাবে বণ্টন করিয়াছেন, কিছু আয়াতে এই অসম বণ্টনের যথার্থতা ব্যাখ্যা করিয়াছেন এবং অন্যান্য আয়াতের মাধ্যমে তিনি তাঁর সচ্ছল বান্দাদেরকে তাহাদের মালের কিছু অংশ অপেক্ষকৃত অসচ্ছল (যাহাদের তিনি রিজিক কম করে দিয়েছেন) বান্দাগণের মধ্যে দান করার নির্দেশ দিয়েছেন।
যাই হোক পাঠককে কৃপণতা না করার পরামর্শ দেওয়া এবং দান-ছদকায় উদ্বুদ্ধ করা আলোচ্য লেখার উদ্দেশ্যে নহে বরং বক্তব্যের শুরুতে ফিরে আসা যাক ‘সমাজের একজনের কোনো ক্ষতি না হয়ে যদি অন্য একজনের উপকার হয় তবে সমাজের মোট ভোগ /কনজামশন বৃদ্ধি পায়।’
অর্থাৎ আমরা যদি আমাদের প্রয়োজনাতিরিক্ত, অব্যবহৃত, বাড়তি পণ্যসমূহ ঘরে অব্যবহৃত অবস্থায় ফেলে না রেখে অন্য একজনকে ব্যবহারের জন্য দিয়ে দেই তাহলে সমাজে একজনের কোনো ক্ষতি/সম্পদের হ্রাস ছাড়াই আরেকজনের উপকার হতে পারে; অর্থাৎ সমাজের মোট ভোগ/কনজামশন বৃদ্ধি পেতে পারে।
কিছু উদাহরণ দেওয়া যাকÑ শিশুদের দ্রুত বর্ধনশীল শরীরের জামা, জুতা, খেলনা ইত্যাদি প্রায় নতুন থাকা অবস্থায়ই পড়ার/ব্যবহার উপযোগী হয়ে পড়ে।
আমাদের অব্যবহৃত বাড়তি, কিছুটা পুরোনো জামা কাপড়, জুতা, ব্যাগ বা অন্য যেকোনো পণ্যসামগ্রী আমাদের অজান্তেই দিনের পর দিন ঘরে অব্যবহৃত অবস্থায় পরে থাকে এবং এক পর্যায়ে এগুলো ব্যবহার উপযোগী থাকে না।
আধুনিক ব্যস্ত সময়ে সবাই আমরা নিজেদের কর্মকাণ্ডে এতটাই ব্যস্ত থাকি যে প্রায়শ উক্ত পণ্যসামগ্রী (শিশুদের অথবা বড়দের) সঠিক লোক খুঁজে তাদের মধ্যে বিতরণ সম্ভব হয় না।
তাই পাঠকগণের প্রতি আমার আহ্বান আসুন আমরা প্রত্যেক মহল্লায় একটি নির্দিষ্ট জায়গা/স্থান তৈরি করে সেখানে আমাদের বাড়তি, অব্যবহৃত পণ্যসামগ্রীগুলো রেখে দেই এবং এভাবে সমাজের অপেক্ষকৃত দরিদ্র মানুষগণকে এগুলো ব্যবহারের সুযোগ দেই তাহলে গোটা সমাজ উপকৃত হবে এবং কিছুটা হলেও ভারসাম্য আসবে বলে মনে হয়।
লেখক : পরিবেশ উন্নয়ন কর্মী ও বিশ্লেষক।

