এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কি বদলে দিবে দেশের শ্রমবাজার?
জুলীয়াস চৌধুরী
প্রকাশ: ০৭ জুলাই ২০২৬, ১৭:০৭
ছবি: সংগৃহীত
বাংলাদেশের অর্থনীতি গত দুই দশকে উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। কৃষিনির্ভর অর্থনীতি ধীরে ধীরে শিল্প, সেবা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতির দিকে এগিয়েছে। তৈরি পোশাকশিল্প, ওষুধশিল্প, তথ্যপ্রযুক্তি, কৃষি প্রক্রিয়াজাতকরণ, লজিস্টিকস, নির্মাণ এবং সেবাখাতের সম্প্রসারণ নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করেছে। কিন্তু একই সময়ে একটি বৈপরীত্যও স্পষ্ট হয়েছে। হাজার হাজার শিক্ষিত তরুণ চাকরির জন্য অপেক্ষা করছেন, আবার বহু প্রতিষ্ঠান প্রয়োজনীয় দক্ষ কর্মী খুঁজে পাচ্ছে না। অর্থাৎ বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সবচেয়ে বড় সংকট শুধু কর্মসংস্থানের অভাব নয়, বরং দক্ষতা, তথ্য এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের মধ্যে কার্যকর সংযোগের অভাব।
এই বাস্তবতায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ‘এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ’ বা কর্মসংস্থান বিনিময় কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার ঘোষণা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী নীতিগত উদ্যোগ। সরকার যে লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, তা কেবল চাকরির তথ্য সরবরাহ নয়; বরং চাকরিপ্রার্থীর দক্ষতা মূল্যায়ন, প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের সঙ্গে সংযোগ, নিয়োগদাতার চাহিদা অনুযায়ী জনবল নির্বাচন এবং স্থানীয় শ্রমবাজারকে আরও কার্যকর করে তোলা। উদ্যোগটি সফল হলে এটি বাংলাদেশের কর্মসংস্থান ব্যবস্থায় একটি কাঠামোগত পরিবর্তনের সূচনা করতে পারে। তবে ব্যর্থ হলে এটি আরেকটি প্রচলিত সরকারি দপ্তরে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিও বহন করবে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর সর্বশেষ শ্রমশক্তি জরিপ অনুযায়ী, ২০২৪ সালে দেশের শ্রমশক্তির আকার প্রায় সাত কোটি ১৭ লাখ। এর মধ্যে প্রায় ছয় কোটি ৯১ লাখ মানুষ কর্মরত এবং প্রায় ২৬ লাখ মানুষ বেকার। একই সময়ে জাতীয় বেকারত্বের হার বেড়ে তিন দশমিক ৬৬ শতাংশে পৌঁছেছে, যা সাম্প্রতিক কয়েক বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। শহরাঞ্চলে বেকারত্বের হার গ্রামাঞ্চলের তুলনায় বেশি। এই পরিসংখ্যান শুধু কর্মসংস্থানের চাপই নয়, শ্রমবাজারের কাঠামোগত দুর্বলতাও তুলে ধরে।
তবে বেকারত্বের হারই পুরো বাস্তবতা নয়। বাংলাদেশের শ্রমবাজারের বড় বৈশিষ্ট্য হলো বিপুলসংখ্যক মানুষ অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। তাদের বড় অংশের কাজ অনিশ্চিত, সামাজিক সুরক্ষা সীমিত এবং দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগও অপ্রতুল। একই সঙ্গে বহু তরুণ শিক্ষা শেষ করার পরও শ্রমবাজারে নিজেদের জন্য উপযুক্ত স্থান খুঁজে পান না। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বলে আসছে, শুধু কর্মসংস্থানের সংখ্যা বৃদ্ধি যথেষ্ট নয়; উৎপাদনশীল, মর্যাদাপূর্ণ এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান নিশ্চিত করাই টেকসই উন্নয়নের মূল শর্ত। এ কারণেই আধুনিক রাষ্ট্রগুলো শ্রমবাজার তথ্যব্যবস্থাকে কর্মসংস্থান নীতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করে।
এই প্রেক্ষাপটে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের ধারণাকে সঠিকভাবে বোঝা জরুরি। এটি কোনো নিয়োগ কমিশন নয়, চাকরি দেওয়ার সরকারি দপ্তরও নয়। এটি মূলত একটি সমন্বিত প্ল্যাটফর্ম, যেখানে চাকরিপ্রার্থী, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠান এবং সরকারের নীতিনির্ধারণী সংস্থাগুলো একই তথ্যভিত্তিক কাঠামোর মধ্যে যুক্ত থাকে। একজন চাকরিপ্রার্থীর শিক্ষাগত যোগ্যতা, কারিগরি দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও আগ্রহের তথ্য যেমন সেখানে সংরক্ষিত থাকবে, তেমনি নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের শূন্য পদ, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং ভবিষ্যৎ জনবল চাহিদার তথ্যও থাকবে। এই দুই দিকের কার্যকর সমন্বয়ই একটি আধুনিক এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মূল শক্তি।
বাংলাদেশের শ্রমবাজারে দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক সমস্যা হলো ‘স্কিল মিসম্যাচ’ বা দক্ষতার অমিল। বিশ্ববিদ্যালয় বা কলেজ থেকে পাস করা অনেক শিক্ষার্থী কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা, ভাষাজ্ঞান কিংবা সমস্যা সমাধানের দক্ষতা নিয়ে বের হতে পারেন না। অন্যদিকে শিল্পপ্রতিষ্ঠান, প্রযুক্তি কোম্পানি বা রপ্তানিমুখী খাতগুলো দক্ষ জনবলের অভাবে কাক্সিক্ষত গতিতে সম্প্রসারণ করতে পারে না। বিশ্বব্যাংকও একাধিক বিশ্লেষণে উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতির পরবর্তী ধাপের প্রবৃদ্ধি অনেকাংশে নির্ভর করবে দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ ব্যবস্থার কার্যকর সংযোগের ওপর। দক্ষতার এই ব্যবধান কমাতে না পারলে উচ্চ প্রবৃদ্ধিও কাক্সিক্ষত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারবে না।
এখানেই এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের গুরুত্ব। এটি যদি শুধু চাকরির বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে দক্ষতা মূল্যায়ন, পুনঃপ্রশিক্ষণ, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং এবং স্থানীয় শিল্পের চাহিদা বিশ্লেষণের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠে, তাহলে কর্মসংস্থান ব্যবস্থার গুণগত পরিবর্তন সম্ভব। বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এই উদ্যোগের গুরুত্ব আরও বেশি। কারণ দেশের প্রতিটি জেলার অর্থনৈতিক চরিত্র এক নয়। গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ বা চট্টগ্রামের শিল্পাঞ্চলের প্রয়োজনীয় দক্ষতা যেমন ভিন্ন, তেমনি রাজশাহী, রংপুর, বরিশাল বা কক্সবাজারের সম্ভাবনাও আলাদা। স্থানীয় অর্থনীতি, স্থানীয় শিল্প এবং স্থানীয় জনশক্তির মধ্যে সমন্বয় ঘটাতে পারলে রাজধানীকেন্দ্রিক কর্মসংস্থানের চাপও কিছুটা কমবে।
এই উদ্যোগকে বাংলাদেশের জনমিতিক বাস্তবতার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখতে হবে। বর্তমানে দেশের মোট জনসংখ্যার একটি বড় অংশ কর্মক্ষম বয়সে রয়েছে। অর্থনীতিতে একে ‘ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড’ বলা হয়। ইতিহাস বলে, এই সুযোগ দীর্ঘস্থায়ী নয়। যেসব দেশ কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীকে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে পেরেছে, তারাই দ্রুত অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। আবার যারা পারেনি, তারা উচ্চ বেকারত্ব, নিম্ন উৎপাদনশীলতা এবং সামাজিক বৈষম্যের চক্রে আটকে গেছে। বাংলাদেশের জন্যও আগামী এক দশক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই সময়ের মধ্যে দক্ষতা, প্রযুক্তি এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে তুলতে না পারলে জনমিতিক সুফল ধীরে ধীরে বোঝায় পরিণত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাও একই শিক্ষা দেয়। জার্মানির ফেডারেল এমপ্লয়মেন্ট এজেন্সি নিয়মিত শ্রমবাজার বিশ্লেষণ করে এবং প্রয়োজন অনুযায়ী পুনঃদক্ষতা অর্জনের সুযোগ দেয়। সিঙ্গাপুরের ওয়ার্কফোর্স সিঙ্গাপুর ভবিষ্যতের দক্ষতার চাহিদা নির্ধারণ করে নাগরিকদের প্রশিক্ষণ কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত করে। যুক্তরাজ্যের জবসেন্টার প্লাস কর্মসংস্থানের পাশাপাশি ব্যক্তিকেন্দ্রিক ক্যারিয়ার পরিকল্পনায় সহায়তা করে। ভারতের ন্যাশনাল ক্যারিয়ার সার্ভিসও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে চাকরিপ্রার্থী, নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান এবং প্রশিক্ষণ সংস্থাকে একই নেটওয়ার্কে যুক্ত করার চেষ্টা করছে। এসব অভিজ্ঞতা স্পষ্টভাবে দেখায়, আধুনিক এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ কোনো দপ্তরের নাম নয়; এটি রাষ্ট্রের শ্রমবাজার ব্যবস্থাপনার একটি কৌশলগত অবকাঠামো।
তবে আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা যেমন সম্ভাবনার কথা বলে, তেমনি কিছু কঠিন বাস্তবতার কথাও মনে করিয়ে দেয়। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের সফলতা ভবনের সংখ্যা বা নতুন দপ্তর খোলার ওপর নির্ভর করে না; বরং নির্ভর করে তথ্যের নির্ভুলতা, প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার, দক্ষ জনবল, আন্তঃপ্রাতিষ্ঠানিক সমন্বয় এবং মানুষের আস্থার ওপর। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে একটি এমন ব্যবস্থা গড়ে তোলা, যেখানে চাকরিপ্রার্থী ও নিয়োগকারী প্রতিষ্ঠান উভয়েই এটিকে নির্ভরযোগ্য ও কার্যকর প্ল্যাটফর্ম হিসেবে গ্রহণ করবে।
প্রথম শর্ত হলো একটি সমন্বিত জাতীয় ডিজিটাল কর্মসংস্থান তথ্যব্যবস্থা গড়ে তোলা। একজন চাকরিপ্রার্থী একবার নিবন্ধন করলেই তার শিক্ষা, প্রশিক্ষণ, কর্মদক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও সনদের তথ্য নিরাপদভাবে সংরক্ষিত থাকবে এবং দেশের যেকোনো প্রান্তের উপযুক্ত চাকরির সঙ্গে তাঁর মিল খুঁজে বের করা যাবে। একইভাবে সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে নিয়মিত শূন্য পদের তথ্য হালনাগাদ করতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক মিল নির্ধারণ ব্যবস্থা চালু করা গেলে নিয়োগপ্রক্রিয়া আরও দ্রুত ও নির্ভুল হতে পারে।
দ্বিতীয় শর্ত হলো শিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং শিল্পখাতের মধ্যে স্থায়ী সংযোগ গড়ে তোলা। বর্তমানে অনেক প্রশিক্ষণ কর্মসূচি পরিচালিত হলেও সেগুলোর উল্লেখযোগ্য অংশ শ্রমবাজারের প্রকৃত চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। ফলে প্রশিক্ষণ শেষ করেও অনেক তরুণ চাকরি পান না। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জের মাধ্যমে যদি দক্ষতার ঘাটতি শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে উপযুক্ত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানে পাঠানো যায় এবং প্রশিক্ষণ শেষে সরাসরি নিয়োগদাতার সঙ্গে যুক্ত করা যায়, তাহলে এই উদ্যোগ বাস্তব অর্থেই ফলপ্রসূ হবে।
তৃতীয়ত, বেসরকারি খাতকে এই ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় অংশীদার করতে হবে। বাংলাদেশের মোট কর্মসংস্থানের বড় অংশই সৃষ্টি হয় বেসরকারি উদ্যোগে। অথচ অনেক প্রতিষ্ঠান এখনও পরিচিতজন, অনানুষ্ঠানিক যোগাযোগ বা বেসরকারি নিয়োগ সংস্থার ওপর নির্ভর করে। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ যদি দক্ষ প্রার্থী দ্রুত খুঁজে দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারে, তাহলে নিয়োগদাতারাও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করবেন। একই সঙ্গে ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদেরও এই সেবার আওতায় আনতে হবে।
চতুর্থত, নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি, দীর্ঘদিনের বেকার, প্রত্যাগত অভিবাসী এবং সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য বিশেষ কর্মসূচি প্রয়োজন। অনেক নারী দক্ষ হওয়া সত্ত্বেও নিরাপদ কর্মপরিবেশ, উপযুক্ত তথ্য বা সামাজিক সীমাবদ্ধতার কারণে শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে পারেন না। আবার বিদেশফেরত বহু কর্মী তাদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগানোর সুযোগ পান না। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ যদি এই জনগোষ্ঠীর জন্য পৃথক সহায়তা, পুনঃদক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্যারিয়ার পরামর্শ চালু করে, তাহলে অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মসংস্থানের পথ আরও সুগম হবে।
এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বের দাবি রাখে। বর্তমানে বাংলাদেশের উল্লেখযোগ্যসংখ্যক তরুণ শিক্ষা, কর্মসংস্থান কিংবা প্রশিক্ষণ, কোনোটির সঙ্গেই যুক্ত নন। আন্তর্জাতিক পরিসরে এদের এনইইটি নামে চিহ্নিত করা হয়। এই তরুণদের শ্রমবাজারে ফিরিয়ে আনতে লক্ষ্যভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা ছাড়া টেকসই কর্মসংস্থাননীতি কল্পনা করা যায় না। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ এই গোষ্ঠীকে চিহ্নিত করে স্থানীয় পর্যায়ে দক্ষতা উন্নয়ন, শিক্ষানবিশ কর্মসূচি এবং কর্মসংস্থানের সুযোগের সঙ্গে যুক্ত করতে পারলে এর সামাজিক প্রভাবও সুদূরপ্রসারী হবে।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং। বাংলাদেশে এখনও অধিকাংশ শিক্ষার্থী বিষয় নির্বাচন, পেশা পরিকল্পনা কিংবা শ্রমবাজারের পরিবর্তিত চাহিদা সম্পর্কে পদ্ধতিগত দিকনির্দেশনা পান না। ফলে উচ্চশিক্ষা শেষ করার পর অনেকেই বুঝতে পারেন, তাদের অর্জিত যোগ্যতা এবং কর্মক্ষেত্রের চাহিদার মধ্যে বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ যদি জীবনবৃত্তান্ত প্রস্তুত, সাক্ষাৎকার দক্ষতা, ডিজিটাল সক্ষমতা, ভাষাজ্ঞান এবং পেশাগত পরিকল্পনা বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ প্রদান করে, তাহলে কর্মসংস্থানের গুণগত মানও উন্নত হবে।
তবে এই উদ্যোগের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রশাসনিক নয়, সুশাসনসংক্রান্ত। যদি এটি রাজনৈতিক প্রভাব, সুপারিশ, স্বজনপ্রীতি কিংবা দুর্নীতির শিকার হয়, তাহলে মানুষের আস্থা দ্রুত নষ্ট হবে। তাই শুরু থেকেই স্বচ্ছ ডিজিটাল প্রক্রিয়া, স্বাধীন তদারকি, তথ্যের নিয়মিত নিরীক্ষা এবং কর্মসম্পাদনের পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণ করতে হবে। কতজন নিবন্ধিত হলেন, সেটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও যথেষ্ট নয়। প্রকৃত মূল্যায়ন হবে কতজন চাকরি পেলেন, কতজন প্রশিক্ষণের পর কর্মসংস্থানে যুক্ত হলেন, কত দ্রুত শূন্য পদ পূরণ হলো এবং নিয়োগদাতাদের সন্তুষ্টির মাত্রা কত, তার ভিত্তিতে।
একই সঙ্গে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জকে ভবিষ্যতের শ্রমবাজারের জন্যও প্রস্তুত থাকতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, রোবটিকস এবং ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তারের ফলে আগামী বছরগুলোতে বহু পেশার চরিত্র বদলে যাবে। অন্যদিকে সাইবার নিরাপত্তা, ডেটা বিশ্লেষণ, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্বাস্থ্যসেবা, উন্নত উৎপাদন প্রযুক্তি এবং সৃজনশীল শিল্পে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। তাই শুধু বর্তমানের শূন্য পদ নয়, ভবিষ্যতের দক্ষতার চাহিদা বিশ্লেষণ এবং সেই অনুযায়ী শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ নীতিকে সহায়তা করাও এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হওয়া উচিত।
সবশেষে একটি মৌলিক সত্য মনে রাখা প্রয়োজন। কর্মসংস্থান কেবল অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচক নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা, মানবিক মর্যাদা এবং রাষ্ট্রের প্রতি নাগরিকের আস্থারও ভিত্তি। একজন তরুণ যখন যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ পান, তখন তিনি শুধু আয় করেন না; রাষ্ট্রের উন্নয়নযাত্রার সক্রিয় অংশীদারও হয়ে ওঠেন। বিপরীতে দীর্ঘস্থায়ী বেকারত্ব হতাশা, বৈষম্য এবং সামাজিক অস্থিরতার ঝুঁকি বাড়ায়।
বাংলাদেশ এমন এক সময়ে দাঁড়িয়ে আছে, যখন জনমিতিক সম্ভাবনা, শিল্পায়ন, প্রযুক্তিগত রূপান্তর এবং বৈশ্বিক শ্রমবাজারের পরিবর্তন একসঙ্গে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করছে। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ সেই সুযোগকে কাজে লাগানোর একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হতে পারে। তবে এটি যেন কেবল একটি নতুন সরকারি প্রকল্পে সীমাবদ্ধ না থাকে। প্রয়োজন একটি তথ্যনির্ভর, প্রযুক্তিসমৃদ্ধ, জবাবদিহিমূলক এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক শ্রমবাজার ব্যবস্থা, যেখানে দক্ষতা, শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের মধ্যে একটি কার্যকর সেতুবন্ধন গড়ে উঠবে। কারণ ভবিষ্যতের বাংলাদেশে প্রকৃত প্রতিযোগিতা হবে শুধু কর্মসংস্থান সৃষ্টি নয়, সঠিক মানুষকে সঠিক দক্ষতার মাধ্যমে সঠিক কর্মক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত করার সক্ষমতায়। সেই সক্ষমতা অর্জন করতে পারলেই এমপ্লয়মেন্ট এক্সচেঞ্জ একটি প্রশাসনিক উদ্যোগের গণ্ডি পেরিয়ে দেশের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম ভিত্তিতে পরিণত হতে পারবে।
লেখক: সাংবাদিক, কলাম লেখক ও উদ্যোক্তা।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

