রফিক সুলায়মান, ছবি: সংগৃহীত
নবীজিকে নিয়ে সারা বিশ্বের কবি-সাহিত্যিক বাণী সাজিয়েছেন। তাদের মধ্যে গ্যাটে, ইকবাল, শেখ সাদী এবং নজরুল অন্যতম। গ্যাটের 'Song of Muhammad', ইকবালের 'To the Holy Prophet', শেখ সাদী'র 'বালাগাল উলা' এবং নজরুলের অযুত বাণী উল্লেখযোগ্য। বস্তুত নজরুলের ইসলামি গান তার শ্রেষ্ঠতম রচনা। প্রত্যেকটি গানই শব্দ, মাধুর্য এবং উপমার গুণে কালোত্তীর্ণ হয়েছে।
গ্যাটে তার অঞ্জলি সাজিয়েছিলেন জার্মান ভাষায়। মাত্র ২১-২২ বছর বয়সের রচনা। সঙ্গীত গুরু ফ্রাঞ্জ শুবার্ট সেখানে সুর বসানোর চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু কাজটি অসমাপ্ত থেকে যায়। তবে বিভিন্ন অপেরা উৎসবে Song of Muhammad বাজানো হয়, মিউজিক কে শেষ করেছিলেন তা আমার জানা নেই।
Song of Muhammad কবিতাটি পাহাড়, ঝরনা, নদী এবং মহাসাগর কেন্দ্রীক। পাহাড় থেকে ঝরনাধারা নীচে পতিত হয়ে নদীর সৃষ্টি করে। সেখান থেকে নদী মহাগরের টানে ছুটে যায়। নজরুলের গানে এরকম একটি চরণ আছে : ‘নদী কী আর থাকতে পারে সাগর যখন টানে।' গ্যাটে আরবের এক মহাপুরুষের জন্ম এবং বেড়ে ওঠাকে প্রকৃতির সঙ্গে তুলনা করে সৃষ্টি করেছেন অমর পঙক্তিমালা। তরুণ বয়সেই তিনি কবিতায় প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছিলেন সন্দেহ নেই।
আল্লামা ইকবাল To the Holy Prophet লিখেছিলেন জীবন সায়াহ্নে, ১৯৩৬ সালে। ততদিনে তিনি স্বাস্থ্য ও কণ্ঠ হারিয়ে তীব্র হতাশায় নিমজ্জিত। ইউরোপীয় ঔপনিবেশিক শাসন এবং ব্রিটিশ ভারতে মুসলমানদের রাজনৈতিক প্রান্তিকীকরণের প্রেক্ষাপটে তিনি নবীজির কাছে একটি মুনাজাত নিবেদন করেন। তার রচিত এই কবিতাটি একটি আধ্যাত্মিক আবেদন এবং সাংস্কৃতিক সমালোচনা হিসেবে কাজ করে। এর মাধ্যমে ইকবাল আধুনিক মুসলমানদের মধ্যে আধ্যাত্মিক উদ্দীপনার অবক্ষয়ের জন্য আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন এবং তাদের ধর্মীয় পরিচয় ও বিশ্বাসের পুনরুজ্জীবনের জন্য দয়াল নবীজির কাছে আবেদন জানিয়েছেন। মূল কবিতাটি ফার্সি ভাষায় রচিত।
আমরা জানি যে, হজরত শেখ সা'দীর 'বালাগাল উলা বেকামালিহি' অবলম্বনে কবি নজরুল তিনটি স্তবক রচনা করেছিলেন :
'কুল মাখলুক গাহে হজরত বালাগাল উলা বেকামালিহি
আঁধার ধরায় এলে আফতাব কাশাফাদ্দোজা বেজামালিহি।
রৌশনিতে আজো ধরা মশগুল তাইতো ওফাতে করিনা কবুল
হাসুনাতে আজো উজালা জাহান, হাসুনাত জমিউ খিসালিহি।
নাস্তিরে করি নিতি নাজেহাল জাগে তৌহিদ দ্বীন-ই-কামাল
খুশবোতে খুশী দুনিয়া বেহেশ্ত সাল্লু আলাহহে ওয়া আলেহি।'
এর পাশাপাশি অসংখ্য না'তে রাসুল রচনা করেছেন তিনি। মুহম্মদ [সা.], তার জন্মভূমি মক্কা, প্রশাসনিক ক্ষেত্র মদিনা, আল কোরানুল মজিদ, হেরা গুহা, মদিনার পথ ইত্যাদিকে বারবার গান ও কবিতায় মহিমান্বিত করেছেন তিনি। কবির রচিত এসব গান বাংলা সাহিত্যের অনন্য সম্পদ হিসেবে বিবেচিত আজ।
পার্থিব দুঃখ-যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতেও তিনি মুহম্মদ [সা.]-কে স্মরণ করেছেন :
'ইয়া মুহম্মদ বেহেশ্ত হতে খোদায় পাওয়ার পথ দেখাও
এই দুনিয়ার দুঃখ থেকে এবার আমায় নাজাত দাও।'
মদিনা আল-মনোয়ারা নিয়ে কবি অনেক গান লিখেছেনঃ 'ওরে ও মদিনা বলতে পারিস কোন্ সে পথে তোর' কিংবা 'আমি যই আরব হতাম মদিনারই পথ।' মদিনায় যাওয়ার তীব্র বাসনা প্রকাশ পেয়েছে এই গানেঃ 'আয় মরুপারের হাওয়া নিয়ে যারে মদিনায় / জাত পাক মোস্তফার রওজা মোবারক যথায়।'
বুলবুলি পাখি মুহম্মদের নাম প্রথম জপেছিলো বলে এক গানে কবি লিখছেন : 'মোহাম্মদের নাম জপেছিলি বুলবুলি তুই আগে / তাই কী রে তোর কণ্ঠের গান এমন মধুর লাগে।' অন্য একটি গানে কবি লিখেছেন যে এই ধরণী যে আজ এতো উজালা এর প্রধান কারণ মুহম্মদের জন্ম : 'আমার প্রিয় হজরত নবী কামলেওয়ালা / যাঁহার রোশনিতে দ্বীন-দুনিয়া উজালা / যাঁরে খুঁজে ফেরে কোটি গ্রহ তারা / ঈদের চাঁদ যাঁহার নামের ইশারা / বাগিচায় গুলাব গুল গাঁথে যাঁর মালা।'
আরো অনেক না'তে রাসুলের ভীড়ে নজরুল বিরচিত একটি চরণ খুব আকর্ষণীয়। নবীজির প্রশস্তিতে তিনি লিখছেন : 'নিখিল দরূদ পড়ে লয়ে ও-নাম / সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম / জীন পরী ফেরেশতা সালাম / জানায় নবীর পায়।' বাংলা ভাষার সাথে আরবী ভাষা মিলিয়ে অন্ত্যমিল সৃষ্টির এই গুণটি রবীন্দ্রনাথকেও মুগ্ধ করেছিলো বলে আমরা জানি। ['খেয়া পারের তরণী' কবিতার 'লা শারিক আল্লা'র ব্যবহার নিয়ে রবীন্দ্রনাথ তাঁর প্রতিক্রিয়া জানিয়েছিলেন একবার।]
বাংলায় ইসলামি গান অনেকেই রচনা করেছেন। নবীজির প্রশস্তিও অনেকে রচনা করেছেন। কিন্তু জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের মতো সুনির্দিষ্ট, দরদী ও সুখশ্রাব্য চরণ আর কোনো কবি রচনা করতে পারেননি। নিকট ভবিষ্যতে পারবেন বলেও মনে হয় না।
লেখক: শিল্প সমালোচক।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

