Logo

মতামত

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষা: বিকাশ নাকি বিকৃতি?

Icon

মো. তাহমিদ রহমান

প্রকাশ: ০৮ আগস্ট ২০২৬, ২০:৫৭

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষা: বিকাশ নাকি বিকৃতি?

ছবি: সংগৃহীত

প্রমিত শব্দে আমরা মনের ভাব প্রকাশ করতে ‘আমি’ যে অর্থে ব্যবহার করি, দেশের উত্তরের সীমান্তবর্তী জেলা পঞ্চগড়ের সদর উপজেলায় সেই শব্দটি মুই, ঠিক তার পাশের উপজেলাটিতে আবার  শব্দটি উচ্চারিত হয় ‘মি’। এটাই মূলত ভাষার বৈচিত্র্যময় বিকাশগত সৌন্দর্য। ভাষা কোনো স্থবির বা জমানো জলাশয় নয়; এটি একটি প্রবহমান নদী। মানুষের সমাজ, সংস্কৃতি, রাজনৈতিক রূপান্তর, অর্থনৈতিক পরিবর্তন এবং প্রযুক্তির অভিঘাতের সমন্বয়ে ভাষা প্রতিনিয়ত নতুন রূপে পরিগ্রহ লাভ করে। যেকোনো জীবন্ত ভাষার অন্যতম মৌলিক শক্তি হলো তার পরিবর্তনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতা। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে পুরোনো রূপ পেছনে ফেলে নতুন শব্দ, বাক্যরীতি ও প্রয়োগকৌশল গ্রহণ করেই একটি ভাষা টিকে থাকে। একবিংশ শতাব্দীর এই প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে ভাষার এই বিবর্তনের গতি বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষার ব্যবহারে একটি নতুন ভাষিক পরিসর তৈরি হয়েছে। এই পরিসরে বাংলা তার ঐতিহ্যগত রূপ হারিয়ে ক্রমশ প্রযুক্তি, ইংরেজি, বহুভাষিকতা এবং নতুন প্রজন্মের যোগাযোগ-প্রয়োজনের সঙ্গে বিবর্তিত হচ্ছে। বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম যেমনÑ ফেসবুক, ইউটিউব, এক্স, হোয়াটসঅ্যাপ এবং ইনস্টাগ্রামের ব্যাপক প্রসারের ফলে বাংলা ভাষার ব্যবহারের ক্ষেত্রে এসেছে এক আমূল পরিবর্তন। কিন্তু এই পরিবর্তন অনেকাংশেই বিতর্কিত প্রশ্নের সম্মুখীন হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষার এই নতুন প্রয়োগ ও রূপান্তর কি মূলত ভাষার স্বাভাবিক ‘বিকাশ’, নাকি এটি অবক্ষয় ও ‘বিকৃতি’? সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম আজ আর কেবল বিনোদনের কিংবা কুশল বিনিময়ের মাধ্যম নয়; এটি হয়ে উঠেছে জনমত গঠন, তথ্য আদান-প্রদান এবং চিন্তা প্রকাশের প্রধানতম ক্ষেত্র। এই মাধ্যমে ভাষা ব্যবহারের শৈলী চিরাচরিত প্রাতিষ্ঠানিক বা প্রমিত বাংলা ভাষার চেয়ে অনেকটাই আলাদা। এখানে শব্দ ব্যবহারের ক্ষেত্রে গতি এবং তাৎক্ষণিকতাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। লেখার সময় ব্যাকরণের কঠোর নিয়ম অনুসরণের চেয়ে নিজের ভাবটি কত দ্রুত ও সহজে অন্যের কাছে পৌঁছানো গেল, সেটিই ব্যবহারকারীর কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে। ফলে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন শব্দ, সংক্ষিপ্ত রূপ এবং বাক্যগঠনের ভিন্নধর্মী ঢং। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষার ব্যবহারকে যারা ‘বিকাশ’ হিসেবে দেখেন, তাদের যুক্তির পাল্লাটিও বেশ ভারী। প্রথমত, তথ্যপ্রযুক্তির বিকাশের শুরুর দিকে ডিজিটালি বাংলা লেখার সুযোগ ছিল অত্যন্ত সীমিত।

বিভিন্ন বাংলা কিবোর্ড ও ইউনিকোডের সহজলভ্যতার কারণে আজ কোটি কোটি মানুষ বাংলা অক্ষরে লিখতে পারছে। ভার্চুয়াল জগতে বাংলা ভাষার এই বিপুল উপস্থিতি নিঃসন্দেহে ভাষার প্রসার ও টিকে থাকার লড়াইয়ে এক বিশাল সাফল্য। যে তরুণ প্রজন্ম হয়তো কখনো প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য চর্চার সঙ্গে যুক্ত হতো না, তারাও প্রতিদিন সামাজিক মাধ্যমে বাংলায় নিজেদের আবেগ, ক্ষোভ, আনন্দ ও চিন্তাভাবনা প্রকাশ করছে। দ্বিতীয়ত, মতামত প্রকাশ এবং ভাষা প্রসারের ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক বিশাল গণতান্ত্রিক পরিসর তৈরি করেছে। প্রাতিষ্ঠানিক সাহিত্য বা গণমাধ্যমের যে নির্দিষ্ট নিয়ম ও গণ্ডি ছিল, তা ভেঙে সাধারণ মানুষ তাদের নিজস্ব আঞ্চলিক ভাষা, মুখের ভাষা ও নতুন শব্দ নিয়ে এই ভার্চুয়াল জগতে স্থান করে নিয়েছে। নতুন নতুন ‘স্মার্ট’ শব্দ, হিউমার বা ট্রোলিংয়ের মাধ্যমে তৈরি হওয়া সংকেত, মিম সংস্কৃতি ভাষার শব্দভাণ্ডারকে নতুন মাত্রা দিচ্ছে। আধুনিক জীবনের জটিল অনুভূতি ও পরিস্থিতি প্রকাশের জন্য নতুন প্রতিশব্দ তৈরি হচ্ছে, যা ভাষার স্বতঃস্ফূর্ত রূপকেই ফুটিয়ে তোলে। বিশ্বের যেকোনো ভাষার ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, মুখের ভাষা বা জনমানুষের ব্যবহৃত ভাষাই কালক্রমে সাহিত্যের ভাষায় পরিণত হয়। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাংলা ভাষাকে নতুন প্রাণশক্তি দিচ্ছে এবং যুগের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আধুনিক করে তুলছে। তবে মুদ্রার অন্য পিঠটি বেশ উদ্বেগজনক। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বাংলা ভাষার ব্যবহার বিশ্লেষণ করলে ‘বিকৃতি’র যে চিত্রটি ফুটে ওঠে, তা অবহেলা করার মতো নয়। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় সংকটটি তৈরি করেছে বিকৃত রোমান হরফে বাংলা লেখার প্রবণতা যা সকলের কাছে ‘বাংলিশ’ নামে পরিচিত। ইংরেজি হরফ দিয়ে বাংলা উচ্চারণ লিখে প্রকাশের ফলে বাংলা বর্ণমালার মৌলিক সৌন্দর্য ও অস্তিত্ব হুমকির মুখে পড়ছে। এতে করে নতুন প্রজন্ম বাংলা বর্ণমালার সঠিক উচ্চারণ ও সঠিক বানান রীতি থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। ‘কোরব’ (করবো), ‘খাব’ (খাবো), ‘ক্যান’ (কেন) এ ধরনের ভুল ও বিকৃত উচ্চারণের লিখিত রূপ সামাজিক মাধ্যমে অহরহ দেখা যাচ্ছে। বানান ভুলের মহোৎসব সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রমিত বাংলা বানানের যে সুনির্দিষ্ট নিয়ম বাংলা একাডেমি বা ব্যাকরণবিদরা নির্ধারণ করেছেন, তা এই মাধ্যমে মারাত্মকভাবে উপেক্ষিত। প্রযুক্তির সুবিধা সত্ত্বে অনেক সময় অসচেতনতা, আলস্য অথবা ইচ্ছা করেই বিকৃত বানান ব্যবহার করা হয়। এর পাশাপাশি রয়েছে ভাষায় শব্দদূষণ। বাক্য গঠনের সময় অযাচিতভাবে ইংরেজি, হিন্দি বা অন্যান্য ভাষার শব্দের মিশ্রণ ঘটিয়ে এক ধরনের সংকর ভাষার চর্চা করা হচ্ছে, যা বাংলা ভাষার স্বাভাবিক মাধুর্য ও স্বকীয়তা নষ্ট করছে। শুধু বানান বা শব্দেই শেষ নয়, বাক্যের গঠন ও ভাষার নান্দনিকতার ক্ষেত্রেও অবক্ষয় স্পষ্ট। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দ্রুত বার্তা পাঠানোর তাগিদে ব্যাকরণগত শুদ্ধতা বজায় রাখার মানসিকতা লোপ পাচ্ছে। দীর্ঘ বাক্য পাঠের ধৈর্য কমে যাওয়ার ফলে ছোট ছোট, বিচ্ছিন্ন ও কটু বাক্যের ব্যবহার বাড়ছে। তার চেয়েও বড় আশঙ্কার বিষয় হলো গালিগালাজ, সাইবার বুলিং, ট্রোলিং এবং উগ্র কুরুচিপূর্ণ শব্দপ্রয়োগের মাধ্যমে ভাষার গাঠনিক মর্যাদা হানি করা হচ্ছে। অনেক সময় তথাকথিত ‘ভাইরাল’ হওয়ার প্রবণতা থেকে ইচ্ছা করে বিকৃত ভাষার ব্যবহার করা হয়, যা তরুণ সমাজ দ্রুত গ্রহণ করে এবং দৈনন্দিন জীবনে তা প্রয়োগ করতে শুরু করে। সামাজিক মাধ্যম মূলত একটি অনানুষ্ঠানিক মাধ্যম, সেখানে ভাষার নমনীয়তা বা স্বাধীনতা থাকাটাই স্বাভাবিক। কিন্তু বিপত্তি ঘটে তখন, যখন অনানুষ্ঠানিক ক্ষেত্রের এই বিকৃত ও ভুল ভাষা প্রাতিষ্ঠানিক বা আনুষ্ঠানিক ক্ষেত্রে ঢুকে পড়ে। বর্তমানে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রে, এমনকি গণমাধ্যম ও প্রাতিষ্ঠানিক যোগাযোগের ক্ষেত্রেও সামাজিক মাধ্যমে ব্যবহৃত ভুল বানান, আঞ্চলিকতা ও বাংলিশের নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। তরুণ প্রজন্ম প্রমিত ভাষা ও সামাজিক মাধ্যমের ভাষার মধ্যকার পার্থক্য বুঝতে ভুল করছে, যা ভাষার মৌলিক কাঠামোর জন্য এক মারাত্মক হুমকি। তাহলে কি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বাংলা ভাষার জন্য আশীর্বাদ নাকি অভিশাপ? এই প্রশ্নের উত্তর কোনো একক সমীকরণে দেওয়া সম্ভব নয়। প্রযুক্তি নিজেই ভালো বা খারাপ হতে পারে না; নির্ভর করে মানুষের ব্যবহারের ওপর। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম আমাদের ভাষাকে উন্মুক্ত ও গতিশীল করার সুযোগ দিয়েছে, এটি যদি হয় বিকাশ, তবে ব্যাকরণহীনতা, অপ্রয়োজনীয় বিকৃতি ও স্বকীয়তা বিসর্জন দেওয়া নিশ্চিতভাবেই অবক্ষয়। একটি ভাষার বিবর্তন তখনই ইতিবাচক বা বিকাশ হিসেবে গণ্য হয়, যখন তা ভাষার অভ্যন্তরীণ সৌন্দর্য ও ব্যাকরণিক ভিত্তিকে ধ্বংস না করে নতুন উপাদান যুক্ত করে। কিন্তু যখন বিবর্তন বা পরিবর্তন ভাষার মূল সুরটিকেই ধূলিসাৎ করে দেয়, তখন তা আর বিকাশ থাকে না, তা হয়ে ওঠে বিকৃতি। এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ সম্পূর্ণ প্রযুক্তি পরিত্যাগ করা নয়, বরং প্রযুক্তিকে সচেতনভাবে ব্যবহার করা। এজন্য প্রমিত বাংলা ব্যবহারের ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সচেতনতা ও দায়বদ্ধতা বৃদ্ধি করতে হবে। সামাজিক মাধ্যমগুলোতে বাংলা অক্ষর ও প্রমিত বানান ব্যবহারের এক ধরনের সামাজিক আন্দোলন বা সুস্থ সংস্কৃতি গড়ে তোলা জরুরি। ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে  অটো-কারেক্ট বা বাংলা স্পেল চেকার প্রযুক্তির অধিকতর সংস্কার ও সহজলভ্যতা এ ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা পালন করতে পারে। পাশাপাশি পরিবার ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে শুদ্ধ ভাষা চর্চার গুরুত্ব অনুধাবন করাতে হবে। বিদ্যালয়ের পাঠ্যসূচিতে কেবল ব্যাকরণ মুখস্থ করানো নয়, বরং ডিজিটাল জগতে কীভাবে শুদ্ধ বাংলা চর্চা করা যায়, তার ব্যবহারিক শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন। আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রমিত ভাষা ও আঞ্চলিক ভাষার বৈচিত্র্যের নিজস্ব স্থান রয়েছে, কিন্তু সেটিকে কৃত্রিমভাবে বিকৃত করা ভাষার কোনো সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে না। সর্বোপরি গণমাধ্যম ও দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজকে সামাজিক মাধ্যমে প্রমিত ও নান্দনিক বাংলা ব্যবহারের দৃষ্টান্ত স্থাপন করতে হবে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অসীম সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলা সাহিত্য, কবিতা ও জ্ঞানচর্চাকে আরও ব্যাপকভাবে ডিজিটাল দুনিয়ায় ছড়িয়ে দিতে হবে, যাতে তরুণ সমাজ ভাষা নিয়ে ইতিবাচক চর্চায় উদ্বুদ্ধ হয়। 

পরিশেষে বলা যায়, ভাষা পরিবর্তনশীল এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম সেই পরিবর্তনের গতিকে ত্বরাণ্বিত করেছে। এই বিবর্তনকে সম্পূর্ণ রুদ্ধ করা সম্ভব নয় এবং তা সমীচীনও নয়। তবে বিকাশ ও বিকৃতির মধ্যবর্তী সূক্ষ্ম রেখাটি আমাদের চিনতে হবে। প্রযুক্তির এই বিশাল ক্যানভাসে বাংলা ভাষা যেন তার ইতিহাস, ঐতিহ্য ও শুদ্ধতা হারিয়ে এক বিকৃত সংকর ভাষায় পরিণত না হয়, সে বিষয়ে আমাদের সচেতন থাকতে হবে। পঙ্গু বা বিকৃত করার ক্ষেত্র না হয়ে সকলের প্রচেষ্টায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম হয়ে উঠুক বাংলা ভাষাকে বিশ্বদরবারে ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম। এই অঙ্গীকারই হোক আমাদের আধুনিক ভাষা চর্চার মূলমন্ত্র। 

লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন