ড. লিপন মুস্তাফিজ, ছবি: সংগৃহীত
ব্যাংকে টাকা আছে, কিন্তু সেই টাকা নেওয়ার লোক নেই। ব্যাংকগুলোতে বাড়ছে উদ্বৃত্ত তারল্য, অথচ কমছে বেসরকারি খাতে ঋণের চাহিদা। ব্যবসা সম্প্রসারণ, নতুন কারখানা কিংবা বিনিয়োগের বদলে উদ্যোক্তাদের বড় অংশ এখন অপেক্ষার অবস্থানে। ফলে ব্যাংকের ভল্টে টাকা জমলেও অর্থনীতির চাকা সেই অনুপাতে ঘুরছে না। পত্রিকার খবরে প্রকাশিত যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গত জুন শেষে ব্যাংক খাতে উদ্বৃত্ত তারল্য বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় চার লাখ আট হাজার কোটি টাকা। মে মাসে যা ছিল তিন লাখ ৩৭ হাজার কোটি টাকা।
অর্থাৎ এক মাসেই ব্যাংকগুলোতে অতিরিক্ত অর্থ বেড়েছে প্রায় ৭১ হাজার কোটি টাকা। অথচ একই সময়ে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি নেমে এসেছে চার দশমিক ৪৭ শতাংশে। মে মাসে এ হার ছিল চার দশমিক ৯৮ শতাংশ। অর্থনীতির স্বাভাবিক নিয়মে ব্যাংকে টাকা বাড়লে তার একটি বড় অংশ ঋণ হিসেবে ব্যবসা-বাণিজ্যে যাওয়ার কথা। সেই ঋণ দিয়ে উদ্যোক্তারা কারখানা বাড়াবেন, যন্ত্রপাতি কিনবেন, নতুন কর্মী নেবেন, উৎপাদন বাড়াবেন। কিন্তু এখন ঘটছে উল্টোটা। ব্যাংকের হাতে অর্থ বাড়ছে, অথচ ঋণের চাহিদা কমছে। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে উঠে আসছে বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা।
নতুন করে ব্যবসায় নামার আগে একজন উদ্যোক্তাকে এখন শুধু ঋণের সুদ হিসাব করলেই হচ্ছে না। তাকে ভাবতে হচ্ছে গ্যাস থাকবে কি না, বিদ্যুৎ নিয়মিত পাওয়া যাবে কি না, উৎপাদন খরচ কতটা বাড়বে, বাজারে পণ্যের চাহিদা কেমন থাকবে। এসব প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত হলে বড় অঙ্কের ঋণ নিয়ে বিনিয়োগের ঝুঁকি নেওয়া কঠিন। তাই অনেক ব্যবসায়ী নতুন প্রকল্পে না গিয়ে পুরোনো ব্যবসা টিকিয়ে রাখার দিকেই বেশি মনোযোগ দিচ্ছেন। শিল্প খাতে জ্বালানি পরিস্থিতি এই অনিশ্চয়তাকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। গ্যাস বা বিদ্যুতের সরবরাহে সমস্যা হলে কারখানা পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো যায় না। উৎপাদন কমে গেলেও ঋণের কিস্তি, সুদ, শ্রমিকের মজুরি, ভাড়া ও অন্যান্য খরচ ঠিকই দিতে হয়। ফলে ঋণ নিয়ে সম্প্রসারণের বদলে অপেক্ষা করাকেই অনেক উদ্যোক্তা নিরাপদ মনে করছেন।
ঋণের সুদের হারও এ ক্ষেত্রে বড় বিষয়। বিনিয়োগ বাড়াতে বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশ থেকে কমিয়ে নয় দশমিক ৫০ শতাংশ করেছে। কিন্তু নীতি সুদহার কমলেই ব্যবসায়ীদের ঋণের খরচ একই হারে কমে যায় না। ব্যাংকের অন্যান্য খরচ, ঝুঁকি এবং গ্রাহকের ধরন অনুযায়ী ঋণের প্রকৃত সুদহার ভিন্ন হতে পারে। ফলে শুধু সুদের হার কমিয়ে বিনিয়োগকারীদের বাজারে ফেরানো কঠিন। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে ব্যাংকগুলোর সতর্কতা। অতীতে যাচাই-বাছাইয়ের দুর্বলতা ও নানা অনিয়মের কারণে বিতরণ করা বিপুল ঋণের একটি অংশ এখন খেলাপিতে পরিণত হয়েছে। ফলে নতুন ঋণ দেওয়ার ক্ষেত্রে ব্যাংকগুলো আগের তুলনায় অনেক বেশি হিসাবি। গ্রাহকের ব্যবসা, নগদ প্রবাহ, জামানত এবং ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যাংকের হাতে টাকা থাকলেও ঝুঁকিপূর্ণ গ্রাহকের পেছনে সেই অর্থ দিতে অনীহা তৈরি হয়েছে।
আবার ঋণের চাহিদা কম থাকায় ব্যাংকগুলোর সামনে অন্য পথও খোলা আছে। তারা সরকারি বিল-বন্ডের মতো তুলনামূলক নিরাপদ খাতে অর্থ বিনিয়োগ করতে পারছে। এতে ব্যাংকের অর্থ পুরোপুরি অলস পড়ে থাকছে না, কিন্তু উৎপাদনশীল বেসরকারি খাতও প্রয়োজনীয় অর্থ পাচ্ছে না। অর্থনীতির জন্য সমস্যাটা এখানেই। আমানত ও ঋণের প্রবৃদ্ধির ব্যবধানও পরিস্থিতিটা স্পষ্ট করে। দেশের দৈনিক পত্রিকার মাধ্যমে জানা যায় যে, জুনে ব্যাংক আমানতের প্রবৃদ্ধি ছিল ১০ দশমিক ৭৪ শতাংশ। বিপরীতে বেসরকারি খাতে ঋণ বেড়েছে মাত্র চার দশমিক ৪৭ শতাংশ। অর্থাৎ ব্যাংকে মানুষের ও প্রতিষ্ঠানের টাকা জমা পড়ছে, কিন্তু সেই অর্থের তুলনায় অনেক কম অংশ ব্যবসা ও বিনিয়োগে যাচ্ছে। ফলে উদ্বৃত্ত তারল্য বাড়ছে। এ অবস্থায় ব্যাংকে বিপুল অর্থ থাকা শুনতে স্বস্তিদায়ক মনে হলেও বাস্তবে এটি অর্থনীতির দুর্বল চাহিদারও ইঙ্গিত দিতে পারে। একটি অর্থনীতিতে ব্যাংকের অর্থ তখনই কার্যকর হয়, যখন তা উৎপাদন, ব্যবসা ও কর্মসংস্থানে ব্যবহৃত হয়। ঋণের চাহিদা কমে গেলে নতুন শিল্প স্থাপনের গতি কমে, বিদ্যমান ব্যবসার সম্প্রসারণ থেমে যায়। এর প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়েও। তবে সমস্যার সমাধান শুধু ব্যাংকের হাতে নেই। বিনিয়োগের পরিবেশ ঠিক না হলে ব্যাংকের সুদ সামান্য কমিয়ে খুব বেশি ফল পাওয়া যাবে না। উদ্যোক্তাদের আস্থা ফিরিয়ে আনতে নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস-বিদ্যুৎ, স্থিতিশীল নীতি, উৎপাদন ব্যয় নিয়ন্ত্রণ, সহজ ঋণপ্রক্রিয়া এবং ব্যবসা পরিচালনায় অপ্রয়োজনীয় বাধা কমানো জরুরি। একই সঙ্গে ব্যাংক খাতে সুশাসন ও খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর পদক্ষেপ দরকার।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটা ব্যাংকের হাতে কত টাকা আছে, তা নয়। প্রশ্ন হলো সেই টাকা অর্থনীতির কোথায় যাচ্ছে। ব্যাংকের ভল্টে যদি লাখ লাখ কোটি টাকা পড়ে থাকে, কিন্তু উদ্যোক্তা নতুন বিনিয়োগের সাহস না পান, তাহলে তারল্যের এই পাহাড় অর্থনীতির জন্য খুব বেশি কাজে আসে না। টাকার গতি ফিরিয়ে আনতে হলে আগে ফিরিয়ে আনতে হবে ব্যবসার আস্থা। কারণ বিনিয়োগের ইচ্ছা না থাকলে ব্যাংকের টাকা যতই থাকুক, অর্থনীতির গতি বাড়বে না।
লেখক: সাহিত্যিক, ব্যাংকার ও কলাম লেখক।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

