Logo

মতামত

সততার সংকট: গবেষণাপত্র প্রত্যাহার আমাদের কী শেখায়?

Icon

ড. লিপন মুস্তাফিজ

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:৩৮

সততার সংকট: গবেষণাপত্র প্রত্যাহার আমাদের কী শেখায়?

ড. লিপন মুস্তাফিজ, ছবি: সংগৃহীত

একটি দেশের জ্ঞানভিত্তিক উন্নয়নের অন্যতম সূচক তার গবেষণার মান। বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং বিজ্ঞানীদের সৃষ্ট জ্ঞানই ভবিষ্যতের নীতি, প্রযুক্তি, স্বাস্থ্যসেবা, কৃষি ও অর্থনীতির ভিত্তি নির্মাণ করে। তাই গবেষণায় সততা কেবল একটি নৈতিক মূল্যবোধ নয়; এটি জাতীয় উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। সম্প্রতি বাংলাদেশি গবেষকদের ৩২৫টি গবেষণাপত্র চৌর্যবৃত্তি, তথ্য বিকৃতি এবং বিভিন্ন ধরনের গবেষণা-অনিয়মের অভিযোগে আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার হওয়ার ঘটনা আমাদের উচ্চশিক্ষা ও গবেষণা অঙ্গনের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা।

এটি কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই; বরং এটি গবেষণা সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত দুর্বলতা, জবাবদিহির ঘাটতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের একটি প্রতিফলন। গবেষণাপত্র প্রত্যাহার বা রিট্র্যাকশন বৈজ্ঞানিক প্রকাশনার একটি স্বীকৃত প্রক্রিয়া। কোনো গবেষণায় গুরুতর ত্রুটি, তথ্য জালিয়াতি, চৌর্যবৃত্তি, ভুয়া তথ্য ব্যবহার, একই গবেষণা একাধিক স্থানে প্রকাশ বা অন্য কোনো গুরুতর অনৈতিক আচরণ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট জার্নাল সেটিকে প্রত্যাহার করে। এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য কাউকে অপমান করা নয়; বরং বৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ভাণ্ডারকে নির্ভুল ও বিশ্বাসযোগ্য রাখা। কিন্তু যখন একটি দেশের বিপুল সংখ্যক গবেষণাপত্র একই ধরনের অনিয়মে প্রত্যাহার হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে সমস্যাটি কি কেবল কিছু ব্যক্তির, নাকি পুরো গবেষণা ব্যবস্থার?

বাংলাদেশে গত দুই দশকে উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার পরিসর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, আন্তর্জাতিক জার্নালে বাংলাদেশি গবেষকদের উপস্থিতিও আগের তুলনায় অনেক বেশি। এটি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক অগ্রগতি। কিন্তু একই সঙ্গে গবেষণাপত্র প্রকাশকে কেন্দ্র করে এক ধরনের প্রতিযোগিতাও তৈরি হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক নিয়োগ, পদোন্নতি, গবেষণা অনুদান, এমনকি বিদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগও গবেষণাপত্রের সংখ্যার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে। ফলে গবেষণার গুণগত মানের চেয়ে প্রকাশনার সংখ্যা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এই প্রবণতা গবেষণাকে জ্ঞানচর্চার পরিবর্তে অনেক সময় প্রশাসনিক প্রয়োজন পূরণের উপায়ে পরিণত করেছে। প্রকাশনার এই চাপ থেকে জন্ম নেয় অনৈতিক শর্টকাটের সংস্কৃতি। কেউ অন্যের লেখা নিজের নামে ব্যবহার করেন, কেউ তথ্য বিকৃত করেন, কেউ গবেষণার ফলাফলকে ইচ্ছামতো সাজিয়ে তোলেন, আবার কেউ একই গবেষণাকে সামান্য পরিবর্তন করে একাধিক জার্নালে প্রকাশের চেষ্টা করেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, গবেষণাপত্র লেখার নামে বাণিজ্যিক সেবা, ভুয়া রিভিউ নেটওয়ার্ক এবং তথাকথিত প্রিডেটরি জার্নাল অনেকের জন্য সহজ পথ তৈরি করেছে। এসব অনৈতিক চর্চা সাময়িকভাবে কিছু সুবিধা এনে দিলেও শেষ পর্যন্ত ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান এবং দেশের সুনামকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে।

তবে এই সংকটের সব দায় ব্যক্তির ওপর চাপিয়ে দিলে বাস্তব চিত্রটি সম্পূর্ণ বোঝা যাবে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণা নৈতিকতা বিষয়ে বাধ্যতামূলক ও ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এখনো পর্যাপ্ত নয়। অনেক গবেষক উদ্ধৃতি পদ্ধতি, তথ্য সংরক্ষণ, লেখকত্বের আন্তর্জাতিক নীতিমালা কিংবা গবেষণা প্রকাশের নৈতিক মানদণ্ড সম্পর্কে পর্যাপ্ত দিকনির্দেশনা পান না। একই সঙ্গে গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার, মানসম্মত তত্ত্বাবধান এবং দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা পরিকল্পনারও ঘাটতি রয়েছে। সীমিত সম্পদ ও অতিরিক্ত প্রত্যাশার এই বৈপরীত্য অনেক সময় গবেষণার পরিবেশকে দুর্বল করে তোলে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, কয়েকজনের অনৈতিক আচরণের মূল্য দিতে হয় পুরো গবেষণা সমাজকে। আন্তর্জাতিক জার্নাল, বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা অর্থায়নকারী সংস্থাগুলো একটি দেশের গবেষকদের মূল্যায়নের সময় সেই দেশের সামগ্রিক গবেষণা সংস্কৃতিকেও বিবেচনায় নেয়। ফলে যারা নিষ্ঠা, পরিশ্রম এবং সততার সঙ্গে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করছেন, তারাও অযথা সন্দেহের মুখে পড়েন। এতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা, যৌথ গবেষণা, বিদেশি অনুদান এবং মেধাবী শিক্ষার্থীদের সুযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

তবে এই ঘটনাকে কেবল হতাশার দৃষ্টিতে দেখলে ভুল হবে। বরং এটিকে আত্মসমালোচনার সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। গবেষণায় অনিয়ম শনাক্ত হওয়া এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গবেষণাপত্র প্রত্যাহার হওয়া প্রমাণ করে যে বৈজ্ঞানিক বিশ্বে এখনো আত্মশুদ্ধির ব্যবস্থা কার্যকর রয়েছে। প্রশ্ন হলো, আমরা কি সেই সতর্কবার্তা থেকে শিক্ষা নেব? প্রথমত, গবেষণা নৈতিকতা বিষয়ে বাধ্যতামূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ চালু করতে হবে। স্নাতকোত্তর পর্যায় থেকেই গবেষণা পদ্ধতির পাশাপাশি গবেষণা-নৈতিকতা, চৌর্যবৃত্তি, তথ্য ব্যবস্থাপনা এবং প্রকাশনা নীতিমালা শেখানো জরুরি। দ্বিতীয়ত, প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে কার্যকর গবেষণা নৈতিকতা কমিটি গঠন করতে হবে, যারা অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত করবে এবং প্রয়োজনে ব্যবস্থা নেবে। তৃতীয়ত, গবেষণাপত্র জমা দেওয়ার আগে আধুনিক প্লেজিয়ারিজম শনাক্তকরণ সফটওয়্যারের ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা উচিত। এর পাশাপাশি গবেষণার মূল্যায়ন পদ্ধতিতেও পরিবর্তন আনতে হবে। একজন গবেষকের সাফল্য কেবল কতগুলো প্রবন্ধ প্রকাশ করেছেন, তা দিয়ে বিচার না করে তার গবেষণার মৌলিকত্ব, সামাজিক প্রভাব, আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা এবং দীর্ঘমেয়াদি অবদানকে গুরুত্ব দিতে হবে। ‘বেশি প্রকাশনা’ নয়, ‘ভালো গবেষণা’ এই দর্শন প্রতিষ্ঠা না হলে সমস্যার মূল কারণ দূর হবে না।

সরকার, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগও অপরিহার্য। গবেষণায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন, মানসম্পন্ন গবেষণাগার, দক্ষ তত্ত্বাবধান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার সুযোগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে সৎ গবেষকদের স্বীকৃতি ও প্রণোদনা নিশ্চিত করতে হবে, যাতে গবেষণায় নৈতিকতা অনুসরণ করাই সবচেয়ে লাভজনক ও সম্মানজনক পথ হয়ে ওঠে। সবশেষে একটি বিষয় স্মরণ রাখা জরুরি গবেষণা কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যের বিষয় নয়; এটি একটি জাতির বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয়। একটি ভুয়া গবেষণা ভুল নীতিনির্ধারণ, জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি কিংবা অর্থনৈতিক অপচয়ের কারণ হতে পারে। অন্যদিকে একটি সৎ ও মানসম্পন্ন গবেষণা লক্ষ মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে। তাই গবেষণায় সততা রক্ষা করা মানে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের প্রতি দায়িত্ব পালন করা। বাংলাদেশের গবেষণা অঙ্গনে অসংখ্য সৎ, মেধাবী ও বিশ্বমানের গবেষক রয়েছেন। তাদের অবদানই আমাদের আশা জাগায়। তাই ৩২৫টি গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনাকে জাতীয় আত্মসমালোচনার উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে, কিন্তু এটিকে পুরো গবেষণা সমাজের পরিচয় হিসেবে নয়। এখনই যদি নৈতিকতা, জবাবদিহি এবং মানসম্পন্ন গবেষণার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া যায়, তবে এই সংকটই ভবিষ্যতের শক্তিতে পরিণত হতে পারে। কারণ জ্ঞানের জগতে শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে কেবল সেই গবেষণাই, যার ভিত্তি সত্য, সততা এবং নির্ভরযোগ্যতা।

গবেষণায় চৌর্যবৃত্তি ও অনিয়মের কারণে শত শত গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনা বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে উদ্বেগজনক। তবে এই ঘটনাকে কেবল ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে চলবে না; বরং এটিকে গবেষণা-ব্যবস্থার দুর্বলতা চিহ্নিত করে তা সংশোধনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। গবেষণার প্রকৃত উদ্দেশ্য কখনোই কেবল প্রবন্ধের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং নির্ভরযোগ্য ও মানবকল্যাণে কাজে লাগবে এমন জ্ঞান সৃষ্টি করা। তাই গবেষণায় নৈতিকতা, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং গুণগত মান নিশ্চিত করার কোনো বিকল্প নেই। বাংলাদেশে অসংখ্য মেধাবী ও সৎ গবেষক নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছেন। তাদের সাফল্যই প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা করা আমাদের পক্ষে সম্ভব। এখন প্রয়োজন গবেষণা-সংস্কৃতিকে আরও শক্তিশালী করা, নৈতিকতা শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা, অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান নেওয়া এবং মানসম্পন্ন গবেষণাকে সর্বোচ্চ উৎসাহ দেওয়া। মনে রাখতে হবে, একটি গবেষণাপত্র শুধু একজন গবেষকের পরিচয় বহন করে না; এটি একটি বিশ্ববিদ্যালয়, একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং সর্বোপরি একটি দেশের ভাবমূর্তির প্রতিনিধিত্ব করে। তাই গবেষণায় সততা রক্ষা করা মানে জাতির মর্যাদা রক্ষা করা। সত্য, সততা ও জবাবদিহির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা গবেষণা-সংস্কৃতিই বাংলাদেশকে বিশ্বজ্ঞানচর্চার অঙ্গনে আরও সম্মানজনক অবস্থানে নিয়ে যেতে পারে।

লেখক: সহকারী মহাব্যবস্থাপক, বেসিক ব্যাংক পিএলসি এবং সহযোগী অধ্যাপক (খণ্ডকালীন), সাউথ ইস্ট বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন