Logo

মতামত

আগামী দিনের শিক্ষা ও আমাদের ব্যর্থতা

Icon

আশেকুল হক

প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৭:০২

অ
আগামী দিনের শিক্ষা ও আমাদের ব্যর্থতা

আশেকুল হক, ছবি: সংগৃহীত

শিক্ষা সম্পর্কিত ধারণাটি পৃথিবীর উৎপত্তিকাল থেকেই কর্তৃত্ব ও চালকের আসনে অধিষ্ঠিত। মানুষের চিন্তার জগৎ ও আচরণে শিক্ষার প্রভাব চিরায়ত। বিশ্বে মোড়ল হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে চাইলে দূরদৃষ্টিসম্পন্ন শিক্ষা বাস্তবায়নের বিকল্প নেই। মানসম্মত শিক্ষার সাথে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির সম্পর্ক মজবুত ও সরাসরি। বাংলাদেশের শিক্ষাকে উন্নত সংস্করণে উন্নীত করার চেষ্টাগুলো কাঙ্ক্ষিত আলোর দেখা পায়নি কখনো।

চাহিদা-ভিত্তিক ও বাস্তবায়নযোগ্য কারিকুলাম প্রণয়নের ব্যর্থতা, শিক্ষার নানা পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় অনাকাঙ্ক্ষিত রাজনৈতিক আগ্রাসন, বাজেটীয় দারিদ্র্য ও জনসংখ্যার আধিক্য, মূলত— এ চারটি কারণ এ দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা দুষ্টচক্র থেকে বের হয়ে আন্তর্জাতিকতায় প্রবেশ করতে পারছে না।

যন্ত্র ও প্রযুক্তি চিকিৎসক-এর মতো পেশাকে অনেকাংশে টেকনিশিয়ান নির্ভর করে দিচ্ছে। ড্রাইভিং-এর মতো ঝুঁকিপূর্ণ কাজ যন্ত্র ও অ্যাপস-এর মাধ্যমে করা যাচ্ছে অনায়াসে। প্রেক্ষাপট এমন দাঁড়িয়েছে যে, দূর ভবিষ্যতে প্রথাগত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হয়ে গেলে আশ্চর্য হওয়ার কিছু থাকবে না। শিক্ষা গ্রহণের মতো মৌলিক বিষয়টি কাঠামোবদ্ধ থাকবে না, এটাই স্বাভাবিক। মূলত— পৃথিবীর শিক্ষা ব্যবস্থা একটি অচেনা ধারার দিকে ধাবিত হচ্ছে, যেখানে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পাশাপাশি মানবিক আবেগ অনুভূতিও সম্পৃক্ত হবে। তবে সে পর্যন্ত পৌঁছাতে হলে ডাটা অ্যানালাইসিস, কোডিং, সফট স্কিল, রোবোটিক্স, এআই ইত্যাদিকে শিক্ষার প্রাথমিক স্তর থেকে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। প্রথাগত কারিকুলামের পরিবর্তে শিক্ষার্থীর আগ্রহ ও যোগ্যতাকে প্রাধান্য দিয়ে শিক্ষা উপকরণ ও মাধ্যম উন্মুক্ত করে দিতে হবে। অস্বীকার করার উপায় নেই, আগামীর বিশ্বকে শাসন করবে উদ্ভাবনমুখী জ্ঞানকৌশল।

একসময় শিক্ষার মূল লক্ষ্য ছিলো চরিত্র গঠন, যুদ্ধজয় ও স্রষ্টাতুষ্টি। ধারাবাহিক শিল্প বিপ্লব, দ্রুত ক্রমবর্ধিষ্ণু প্রযুক্তিগত জ্ঞানের উৎকর্ষ, মানুষের জীবনবোধ সম্পর্কিত ধারণার বিবর্তন ইত্যাদি কারণে শিক্ষার আধুনিক লক্ষ্যমাত্রায়ও নতুন উপাদান যুক্ত হয়েছে। শুধু বেঁচে থাকার চেয়ে মানুষ এখন অমরত্ব নিয়ে ভালোভাবে বাঁচতে চায়, জনসংখ্যাকে জনসম্পদে নয়, বৈশ্বিক নাগরিক হিসেবে টেকসই করতে চায়। সংগত কারণেই প্রথাগত শিক্ষার অসারতা ক্রমশ দৃশ্যমান হয়। তৃতীয় শিল্প বিপ্লবের পর থেকেই বৈশ্বিক চাহিদায় নতুন নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে দ্রুততার সাথে। আবার এসব চাহিদাকেন্দ্রিক নতুন পেশাও সৃষ্টি হচ্ছে এবং বিলুপ্ত হচ্ছে পুরাতন পেশা। ফলাফল হিসেবে চতুর্থ শিল্প বিপ্লব সূচিত ব্ল্যান্ডেড এডুকেশন বর্তমানের চাহিদা পূরণ করতে পারলেও অগ্রসরমান জ্ঞান-বিজ্ঞান এ ধারণাটিকেও সেকেলে করে দিবে অচিরেই। এখনকার সর্বাধিক আলোচিত বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রকৌশল, শিল্প ও গণিত (এসটিইএএম) সমন্বিত শিক্ষা পদ্ধতির সাথে মানবিক মূল্যবোধ সম্পন্ন শিক্ষার দাবি যোগ হতে বেশি সময় লাগবে না। জ্ঞান অর্জন করা অপেক্ষা কীভাবে জ্ঞান অর্জন করতে হয় সে (লারনিং বাই ডোয়িং) পদ্ধতিটি জনপ্রিয়তা পেয়েছে সারা পৃথিবীতে। জোরেশোরে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে অনলাইন ও অফলাইন সমন্বিত হাইব্রিড মডেল, সনাতন শিক্ষা উপকরণের স্থান দখল করে নিয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও ডিজিটাল কনটেন্ট। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও কোডিং-এর যৌথ প্রভাব আগামীর শিক্ষাকে ঠিক কোথায় নিয়ে দাঁড় করাবে তা অনুমান করাও ধৃষ্টতার শামিল।

আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ ও বাস্তবায়নের জন্য শিক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়, ইউজিসি, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়, সাধারণ শিক্ষা বোর্ড, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড, মাদ্রাসা শিক্ষা বোর্ড, মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদপ্তর, প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তর, কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তর, মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর ইত্যাদি নানাবিধ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের নিজেদের মধ্যকার সমন্বয়হীনতা, প্রশাসনিক ও তথ্য যোগসূত্র স্থাপনের অসহযোগিতা সর্বজনবিদিত। আবার কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে স্বায়ত্তশাসিত, ফলে অধিকাংশ নীতি ও সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারে। শিক্ষা প্রশাসন সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকটি প্রতিষ্ঠান হয় সুপিরিয়রিটি না হয় ইনফিরিয়রিটি কমপ্লেক্সে ভোগে। প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্রিটিশ প্রভুত্ববাদী মনোভাবের পাশাপাশি নিজ অধিক্ষেত্রে একক কর্তৃত্ববাদ বজায় রাখার মানসিকতার কারণে স্বাধীনতার পঞ্চান্ন বছর পরও এ দেশে প্রাথমিক থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত গ্রহণযোগ্য সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি। ফলে প্রযুক্তি নির্ভর বৈশ্বিক নাগরিক সৃষ্টির পথে আমাদের অবস্থান তলানিতেই থেকে গেছে। কার্যকর সমন্বিত উদ্যোগের স্বার্থে শিক্ষা প্রশাসনকে একীভূতকরণের বিপরীতে বরং প্রতিনিয়ত চলছে বিকেন্দ্রীকরণ।

রাজনৈতিক প্রভাব মরণব্যাধীর জীবাণুসম গোপনে ও প্রকাশ্যে ধ্বংস করছে শিক্ষা ব্যবস্থাকে। নৈতিকতার দুর্ভিক্ষে আক্রান্ত রাজনীতির কালো ছায়ায় শিক্ষা পদ্ধতি, শিক্ষা প্রশাসন, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষার পরিবেশ থেকে শ্রেণিকক্ষ পর্যন্ত কলুষিত হচ্ছে। শুধু ক্ষমতাসীনদের রাজনৈতিক ভাবাদর্শের কারণে শিক্ষার প্রাণভোমরা কারিকুলামকে বিকৃত করা হচ্ছে বারবার। শিক্ষক এবং শিক্ষার নীতিনির্ধারক নিয়োগেও যোগ্যতা অপেক্ষা মুখ্য হয়ে রয়েছে রাজনৈতিক জাতপাত ও অর্থের প্রভাব। নৈতিক শিক্ষার নামে ধর্মীয় প্রভাব সংকুচিত করছে শিক্ষার বৈশ্বিক ধারণাকে। ফলে পিছিয়ে পড়ার গল্পটি হচ্ছে দীর্ঘতর। প্রাথমিক থেকে উচ্চ শিক্ষার সব স্তরে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারি, বেসরকারি, আধাসরকারি, ধর্ম নির্ভর, বিভিন্ন রাষ্ট্রীয় সংস্থা নির্ভর, ট্রাস্ট নির্ভর, এনজিও নির্ভর, বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি ভার্শন, ইংরেজি মাধ্যম ইত্যাদি নানা ধারায় পরিচালিত হচ্ছে। এরকম বহুমাত্রিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে বিশ্বমানে উন্নীত করা নিঃসন্দেহে চ্যালেঞ্জ বৈকি।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুসারে, ১৮৯টি সদস্যদেশের মধ্যে যে ১০টি দেশ অর্থনীতির আকারের তুলনায় শিক্ষা খাতে সবচেয়ে কম বরাদ্দ দেয়, বাংলাদেশ তাদের একটি। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ শিক্ষা খাতে জিডিপির ছয় শতাংশের উপরে ব্যয় করলেও আমরা দুই দশমিক পাঁচ শতাংশের উপরে যেতে পারিনি। শিক্ষার্থীপ্রতি ব্যয়ের দিক থেকেও আমাদের অবস্থান সন্তোষজনক নয়। বাংলাদেশে শিক্ষার্থীপ্রতি গড় ব্যয় ২০ হাজার থেকে ২৫ হাজার টাকা, ভারতে ৪২ হাজার থেকে ৫৬ হাজার টাকা, সিঙ্গাপুরে ১২ লাখ থেকে ১৮ লাখ টাকা, যুক্তরাজ্যে ১৪ লাখ থেকে ১৯ লাখ টাকা এবং ফিনল্যান্ডে ১৪ থেকে ২০ লাখ টাকা। মাথাপিছু ব্যয়ের অনুপাত (পারসেন্টেজ অব জিডিপি পার কেপিটা) পদ্ধতি এবং ক্রয়ক্ষমতা সমতা (পিপিটি— পারচেসিং পাওয়ার পেরিটি) পদ্ধতিতে শিক্ষার্থীপিছু ব্যয়ের পরিমাণে তারতম্য থাকলেও প্রকৃত চিত্রটা একই রকম।

সীমাবদ্ধতা স্বীকার করেও যুগোপযোগী শিক্ষা বাস্তবায়নের চেষ্টা এ অঞ্চলে হয়নি এমনটি নয়। বিভিন্ন নামে ব্রিটিশ শাসনামল থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত এ অঞ্চলের শিক্ষা ব্যবস্থা ছোট-বড়ো ২০টি শিক্ষা কমিশনের মুখ দেখেছে। কমিশনের রিপোর্টগুলি যে সুদূরপ্রসারী দুরদৃষ্টিসম্পন্ন ছিলো এমনটিও নয়, আবার বাস্তবতা বিবর্জিতও ছিলো না। কমিশনগুলোর সুপারিশের আলোকে শিক্ষানীতি প্রণয়নসহ নানামুখী কর্মকাণ্ড গ্রহণ করা হলেও মানসম্মত শিক্ষার অগ্রগতি ছিলো শম্বুকগতির। প্যাডাগোজির সর্বাধিক সমর্থনপুষ্ট একটি শিক্ষাক্রম ২০২১ সালে প্রবর্তন করা হলেও এর উপকরণ, প্রয়োগযোগ্যতা ও মূল্যায়ন পদ্ধতি নিরূপণের ব্যর্থতা এবং উপযুক্ত জনশক্তির অভাবে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। আবার কোনো ধরনের সংশোধনের উদ্যোগ ছাড়াই এটি সম্পূর্ণ বাতিল করে পুরাতন কারিকুলামে ফিরে যাওয়া হয়। ফলে যুগোপযোগী মানসম্মত দেশিয় শিক্ষার রথ আরো একবার হোঁচট খায়।

পৃথিবীজুড়ে এখন জ্ঞান চর্চার বিপ্লব চলছে। জ্ঞানের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বিষয়াদি নিয়ে এখন গবেষণা চলছে বিশ্বময়। প্রয়োজনীয়তা দেখা দিচ্ছে এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার, যা হবে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক, বৃত্তিমূলক, প্রযুক্তি-নির্ভর, নৈতিকতাসম্পন্ন, আনন্দদায়ক, কর্মমুখী, সৃজনশীল, দক্ষতা নির্ভর এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, রোবোটিক্স ও কোডিং-এর সমন্বয়ে বাস্তবায়িত। দুর্বল অর্থনৈতিক কাঠামো, দক্ষ জনশক্তির অভাব, প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর নিম্ন-জীবনমান, বিদ্যমান শিক্ষার বহুমুখী ধারা ইত্যাদি প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করে এ ধরনের একটি শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবায়ন করা স্বল্পমেয়াদে অসম্ভব মনে হলেও দীর্ঘমেয়াদে অবশ্যই সম্ভব।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, কবি ও কলাম লেখক। 

বাংলাদেশের খবর/আরইউ

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন