Logo

মতামত

তালেবান : ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের জন্য বড় হুমকি!

বেলায়েত হুসাইন

বেলায়েত হুসাইন

প্রকাশ: ১২ জানুয়ারি ২০২৫, ১৯:৩৪

অ
তালেবান : ভারতের চেয়ে পাকিস্তানের জন্য বড় হুমকি!

গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর

মার্কিন মদদপুষ্ট আফগানিস্তানের প্রেসিডেন্ট আশরাফ গনি ২০২১ সালের ১৫ আগস্ট দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এদিন দ্বিতীয়বারের মতো কাবুলের ক্ষমতায় বসে তালেবান। এই খবরটি বিশ্বের অসংখ্য ‘সচেতন’ মুসলিমের জন্য ছিল বড় সুখবর। এমনকি আফগানিস্তানে মার্কিনিদের পতন উদযাপিত হয়েছিল পাকিস্তানেও। কিন্তু লক্ষ্য করা যাচ্ছে- তালেবান সরকারের মেয়াদ যত বৃদ্ধি পাচ্ছে, ততই তাদের নিয়ে অস্বস্তি বাড়ছে পাকিস্তান সরকারের। কিন্তু কেন এই অস্বস্তি? এর পেছনে রয়েছে বেশকিছু বিষয়ের যোগফল। 

তালেবানের ইতিহাস বলে, তারা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়েই বেশি চিন্তিত। আন্তর্জাতিক কোনো ব্যাপারে এখন পর্যন্ত সেভাবে মুখ খোলেনি তারা। ‘ইসলামি শাসনব্যবস্থা’র ধারক হওয়া সত্ত্বেও তারা কখনো রোহিঙ্গা ইস্যু, উইঘুর কিংবা নির্যাতিত ফিলিস্তিনিদের নিয়ে ফরমাল বিবৃতি দিয়েছে বলেও শোনা যায়নি। অথচ একটি ‘ইসলামি রাষ্ট্র’ হিসেবে মজলুম মুসলিমদের প্রোটেক্ট করা তাদের দায়িত্বের মধ্যে পড়ে এবং এই দায়িত্বের ব্যাপারে তালেবান সরকার যে, ভালোভাবে অবগত, সে বিষয়ে সন্দেহেরও কোনো অবকাশ নেই।

আসলে তালেবানের চরিত্র রহস্যময়; তারা এখন পর্যন্ত কোনো বিষয়েই সেভাবে মুখ খোলেনি। তারা তাদের নিজেদের কাজটিই করে যাচ্ছে। ফলাফল- দীর্ঘ লড়াই শেষে তারা মার্কিনিদের মতো পরাশক্তিকেও পরাজিত করে দেশছাড়া করেছে। আর তারা যে আন্তর্জাতিক বিষয় নিয়ে ভাবে না, শুধুমাত্র তাদের ‘চুপথাকা’র ওপর ভিত্তি করে এটি বলা যায় না; বরং আসলে তারা কী করতে চায়, এটি পরিপূর্ণ বোঝা যায়, তাদের কাজ সম্পন্ন হলে। এজন্য তারা নির্যাতিত মুসলিমদের নিয়ে ভাবে না, এটা বলার সময় এখনো আসেনি।

আর এ ব্যাপারে দ্বিতীয় যে বিষয়টি বলা যায়, তা হলো- একজন আদর্শিক মুসলিমের কাছে পুরো পৃথিবীটা মাতৃভূমি। আর যেহেতু তালেবান নিজেদের শাসনব্যবস্থাকে ইসলামি শাসনব্যবস্থা দাবি করে, এজন্য তাদেরও নীতিও অবশ্যই এটা যে, পুরো পৃথিবীটাই তাদের; যার কেন্দ্রবিন্দু হলো কাবুল। তাদের পরবর্তী লক্ষ্য ইসলামাবাদ, নয়াদিল্লি, উইঘুরদের জিনজিয়াং, এরপর গোটা বিশ্ব। অন্তত তাদের গত সাড়ে তিন বছরের মনোভাবে তাই মনে হচ্ছে। যদিও ক্ষমতায় বসার পরই বেইজিংকে তারা আশ্বস্ত করেছে যে, উইঘুর কিংবা চীনের মুসলিমদের বিষয়ে নাক গলাবে না তালেবান। 

চীনের মুসলিমদের বিষয়ে নাক না গলানোর বিষয়টি রাজনৈতিক চতুরতা। কারণ, দ্বিতীয়বার ক্ষমতায় বসতে চীন ছিল তাদের প্রধান মিত্র এবং দেশটিতে তাদের ধর্মীয় কোনো প্রভাবশালী বন্ধুও নেই। এজন্য নাক না গলোনোর সিদ্ধান্তটা তালেবানের দিক থেকে খুবই উপযুক্ত সিদ্ধান্ত। কিন্তু প্রতিবেশীকে নিয়ে নাক না গলানোর সিদ্ধান্তটা যে তাদের আসল নীতি নয়, এটা বোঝা যায়- পাকিস্তানের সীমান্ত এলাকা খাইবার পাখতুনখোয়ায় তালেবানের ভাবাদর্শিক সশস্ত্র সংগঠন তেহরিক-ই তালিবান পাকিস্তানের (টিটিপি) সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ড দেখে। বিশ্লেষকদের মতে- টিটিপি মূলত মূল তালেবানের পাকিস্তানি সংস্করণ।

সম্প্রতি পাকিস্তানের আফগানিস্তান সীমান্তে নিজেদের কার্যক্রম আরও জোরদার করেছে টিটিপি। যার সর্বশেষ উদাহরণ হলো- গত ১১ জানুয়ারির খবর অনুযায়ী- অন্তত ১৬ জন পাকিস্তানি পরমাণু গবেষককে অপহরণ করেছে টিটিপি। শুধু তাই নয়; বরং কয়েক দিন আগে টিটিপির বিরুদ্ধে পাকিস্তানের দক্ষিণ ওয়াজিরিস্তানে থানায় ঢুকে এক অফিসারকে অপহরণেরও অভিযোগ উঠেছিল। পাকিস্তানি সৈন্যদের সঙ্গে টিটিপি যোদ্ধাদের এসব ধারাবাহিক সংঘর্ষকে নিছক কোনো সংঘাত জ্ঞান করার কোনো কারণ নেই। আর পাকিস্তান সরকারও এটিকে সাধারণভাবে নিচ্ছে না; বরং তারাও অনেক আগে থেকেই তালেবান সরকারকে নিয়ে বেশ চিন্তিত।

পাকিস্তান যে, আগে থেকেই তালেবান ও টিটিপির প্রতি সতর্ক তার বড় উদাহরণ হচ্ছে- ২০২২ সালের মাঝামাঝিতে দেশটির সরকারি ব্যবস্থাপনায় মুফতি তাকি উসমানিসহ আলেমদের একটি প্রতিনিধি দলের আফগানিস্তান সফর। পাকিস্তান সরকারের পরামর্শের ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত ওই সফরের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধবিরতিসহ সীমান্তে পাকিস্তানের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট নানা বিষয়ে টিটিপিকে নমনীয় করা। টিটিপিকে দমাতে পাকিস্তান অন্য কৌশলও অবলম্বন করতে পারত, কিন্তু মুসলিম বিশ্বে মুফতি তাকি উসমানির যে সর্বজনপ্রিয়তা, সেটাকে কাজে লাগাতেই তার নেতৃত্বে ১৩ সদস্যের ওই প্রতিনিধি দলটি পাঠানো হয় বলে ধারণা করা হয়। আর টিটিপি যেহেতু ‘ইসলামি শাসনব্যবস্থায়’ বিশ্বাসী, এজন্য হয়ত ইসলামি স্কলার দিয়েই তাদের নরম করা উদ্দেশ্য ছিল। কিন্তু ওই সফর কতটা কাজে দিয়েছে, তা সময়ই বলে দেবে। তবে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে- তা খুব একটা ফলপ্রসু হয়নি।

আর টিটিপির কাঁধে ভর করে তালেবানের ভারতে ঢোকার চেয়ে পাকিস্তানের দিকে অগ্রসর হওয়া বেশ কয়েকটি দিক থেকে সহজ। এর অন্যতম একটি কারণ, ভারতে তালেবানের ধর্মীয় বন্ধুর সংখ্যা কম। কিন্তু পাকিস্তানে সাধারণ মানুষের মধ্যে এমন অনেকে আছেন, যারা তালেবানের শাসনব্যবস্থাকে পছন্দ করেন এবং তারা চান- তাদের দেশেও শরিয়াহ আইন চালু হোক। সেক্ষেত্রে যখন এ লক্ষ্যে টিটিপি যোদ্ধারা ইসলামাবাদের দিকে অগ্রসর হবে, তখন পাকিস্তানি নাগরিকদের উপরোক্ত শ্রেণি তাদের সহযোগিতা করবে কিংবা তাদের বিরুদ্ধে দাঁড়াবে না। কিন্তু ভারতের নাগরিকদের থেকে এরকম সহযোগিতা পাবে না বর্তমান আফগান সরকার। এজন্য ভূমি সম্প্রসারণের রাজনৈতিক দিক থেকে ভারতের চেয়ে তালেবানের কাছে পাকিস্তান উর্বর ভূমি। পাশাপাশি যখন তারা পাকিস্তানের প্রতি আগ্রাসী হবে, তখন স্বাভাবিকভাবেই ভারত তাদের পাশে দাঁড়াবে এবং এরই মধ্যে ভারত সরকার উন্নয়ন খাত ইত্যাদিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার মাধ্যমে কাবুলের অনেকটা কাছাকাছি চলে এসেছে। এজন্য মুসলিম দেশ হয়েও ‘ইসলামি শরিয়াহ ভিত্তিক পরিচালিত দেশ’টিকে নিজেদের জন্য বেশি ভয়ের কারণ মনে করছে পাকিস্তান আর অমুসলিম অধ্যুষিত দেশ হয়েও আপাতত কিছুটা নিরাপদে মোদির ভারত।

লেখক: বাংলাদেশের খবরের রিলিজিয়াস এডিটর

এইচকে/বিএইচ

Logo
সম্পাদক ও প্রকাশক মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন