Logo

অন্যান্য

লাল চুলের জিন টিকে আছে ১০ হাজার বছর ধরে

Icon

অনলাইন ডেস্ক

প্রকাশ: ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ১৭:৫২

লাল চুলের জিন টিকে আছে ১০ হাজার বছর ধরে

সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বিবর্তনের চমকপ্রদ তথ্য উঠে এসেছে , সেখানে দেখা গেছে, ইউরোপে মানুষের লাল চুলের জন্য দায়ী জিনটি গত ১০ হাজার বছর ধরে প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে টিকে থাকার দৌড়ে এগিয়ে আছে।

‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’র বিজ্ঞানীদের এ গবেষণা প্রমাণ করেছে, কৃষিকাজ শুরুর পরও মানুষের জৈবিক বিবর্তন থমকে যায়নি, বরং পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিতে তা আরও দ্রুত কাজ করেছে।

ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম গার্ডিয়ান লিখেছে, লাল চুলের অধিকারী যারা এতদিন হাসি-ঠাট্টা বা ‘উগ্র মেজাজি’ হওয়ার মতো কথা শুনে আসছেন তাদের জন্য এটি সুখবর। বিবর্তনের দৃষ্টিকোণ থেকে তারা আসলে অন্যদের চেয়ে এগিয়ে।  এ গবেষণার মূল লক্ষ্য কেন এমন হয়েছে, সে উত্তর খোঁজা ছিল না, বরং বিজ্ঞানীরা দেখতে চেয়েছিলেন কৃষিকাজ শুরুর পর থেকে মানুষের বিবর্তন থমকে গেছে কি না।

প্রায় ১৬ হাজার প্রাচীন মানুষের অবশিষ্টাংশ এবং ৬ হাজারেও বেশি জীবিত ব্যক্তির ডিএনএ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা জোরালো প্রমাণ পেয়েছেন যে, মানুষের জৈবিক বিবর্তন আসলে বেশ দ্রুত গতিতেই এগিয়ে চলছে।

বিজ্ঞানীরা ৪৭৯টি জিনগত পরিবর্তন শনাক্ত করেছেন, যা প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে টিকে আছে। লাল চুল, ফর্সা চামড়া, সিলিয়াক রোগের ঝুঁকি তৈরি করা জিন এবং ডায়াবেটিস, টাক পড়া ও রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসের ঝুঁকি কমায় এমন সব জিন মানুষের সাম্প্রতিক ইতিহাসে আরও বেশি সাধারণ হয়ে উঠেছে।

গবেষকরা বলেছেন, হয়ত চার হাজার বছর আগে লাল চুল থাকাটা কোনোভাবে উপকারী ছিল বা হতে পারে অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে তা বাড়তি পাওনা হিসেবে এসেছে।

আগের কিছু গবেষণায় উঠে এসেছিল, লাল চুল ও ফর্সা ত্বকের মানুষ অন্যদের চেয়ে বেশি কার্যকরভাবে ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে। হতে পারে, উত্তর গোলার্ধের ঠান্ডা জলবায়ুতে টিকে থাকার জন্য এটি তাদের বাড়তি সুবিধা দিয়েছিল। এর আগে, প্রাকৃতিক নির্বাচনের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কেবল ২১টি জিনগত বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছিল, যার মধ্যে প্রাপ্তবয়স্ক অবস্থায় দুধ হজমের সক্ষমতার বিষয়টিও ছিল।

প্রমাণের এ স্বল্পতা থেকে ধারণা করা হত, প্রায় তিন লাখ বছর আগে আফ্রিকায় আধুনিক মানুষের উদ্ভব এবং পরে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে বিবর্তনের এ ধারা খুব একটা দেখা যায়নি। তবে এ নতুন গবেষণায় নজিরবিহীন সংখ্যক প্রাচীন ডিএনএ নমুনা ও উন্নত কম্পিউটার প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়েছে। এতে দেখা গেছে, পশ্চিম ইউরেশিয়ায় শত শত জিনের প্রসার বা কমে যাওয়ার পেছনে বিবর্তনীয় নির্বাচন বড় ভূমিকা রেখেছে, বিশেষ করে মানুষ যখন শিকারি জীবন ছেড়ে কৃষিকাজে অভ্যস্ত হতে শুরু করে তখন থেকেই এই বিবর্তনের গতি আরও বেড়ে গেছে।

‘হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি’র অধ্যাপক ও এ গবেষণার প্রধান লেখক ড. আলী আকবরী বলেছেন, নতুন প্রযুক্তি ও বিশাল সংখ্যক প্রাচীন জিনতাত্ত্বিক তথ্যের সাহায্যে আমরা এখন বাস্তব সময়ের মতো পর্যবেক্ষণ করতে পারছি যে, বিবর্তন কীভাবে আমাদের জীববিজ্ঞানকে পরিবর্তন করেছে।

বিবর্তনের মাধ্যমে টিকে যাওয়া কিছু জিনের উপযোগিতা বেশ স্পষ্ট। বিজ্ঞানীরা বলছেন, লাল চুল ও ফর্সা ত্বকের বিভিন্ন জিন সম্ভবত কম সূর্যালোক পাওয়া অঞ্চলগুলোর কৃষকদের জন্য সহায়ক ছিল। তাদের খাদ্যাভ্যাসে ভিটামিন ডি কম থাকায় শরীর যাতে সূর্যালোক থেকে বেশি করে তা তৈরি করতে পারে সেজন্যই হয়ত প্রাকৃতিকভাবে এসব বৈশিষ্ট্য টিকে গেছে।

তবে অন্যান্য কিছু পরিবর্তন ব্যাখ্যা করা বেশ কঠিন। যেমন, সিলিয়াক রোগ, যা এক ধরনের অটোইমিউন ডিসঅর্ডারের বড় ঝুঁকি তৈরি করে এমন এক জিনগত পরিবর্তন প্রায় চার হাজার বছর আগে দেখা দিয়েছিল এবং এরপর থেকে তা আরও বেশি ছড়িয়ে পড়েছে।

গবেষণায় উঠে এসেছে, জিনটি বহনকারী ব্যক্তিদের কোনো এক অটোইমিউন রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি থাকার পরও তাদের বেঁচে থাকার এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে নিজেদের জিন পৌঁছে দেওয়ার সম্ভাবনা অন্যদের চেয়ে বেশি। একইভাবে ‘টিওয়াইকেটু’ নামের এক রোগ প্রতিরোধক জিন, যা যক্ষ্মার ঝুঁকি ব্যাপকভাবে বাড়িয়ে দেয় সেটি ৯ হাজার থেকে তিন হাজার বছর আগে মানুষের মধ্যে ক্রমাগত বেড়েছিল। তবে পরবর্তীতে এর হার আবার কমতে শুরু করে।

একটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে, এ রোগ-ঝুঁকি বাড়ানো বিভিন্ন জিন হয়ত নির্দিষ্ট কোনো সময়ে এমন কিছু জীবাণুর বিরুদ্ধে সুরক্ষা দিয়েছিল, যা সেই যুগে খুব সাধারণ ছিল। গবেষণায় আরও উঠে এসেছে, শরীরের চর্বি বা ফ্যাট বাড়ানোর জন্য দায়ী জিনের সমন্বয়গুলো বিবর্তনের ধারায় ধীরে ধীরে কমেছে, যাকে বিজ্ঞানীরা ‘থ্রিফটি জিনস হাইপোথিসিস’ বা সাশ্রয়ী জিন তত্ত্ব দিয়ে ব্যাখ্যা করেছেন।

এ তত্ত্ব অনুসারে, চর্বি জমা করে রাখার জিনগত সক্ষমতা শিকারি সংগ্রহ করা যুগের মানুষের জন্য অভাবের সময়ে বেঁচে থাকতে সাহায্য করত। তবে কৃষিকাজ শুরুর ফলে যখন খাবারের নিশ্চয়তা তৈরি হয় তখন এই বাড়তি চর্বি জমানোর বৈশিষ্ট্যটি উপকারের বদলে দেহের জন্য উল্টো অসুবিধার কারণ হয়ে দাঁড়াল।

‘হার্ভার্ড মেডিকেল স্কুল’-এর জেনেটিক্স বিভাগের অধ্যাপক ও এ গবেষণার সিনিয়র লেখক ডেভিড রাইখ বলেছেন, গবেষণাটি আমাদের সেসব প্রভাবকে একটি নির্দিষ্ট স্থান ও সময়ের সাপেক্ষে দেখার সুযোগ করে দিয়েছে, যা আমাদেরকে আজকের এই রূপ দিয়েছে।

গবেষণাটি পশ্চিম ইউরেশিয়ার বিবর্তনীয় ধারার ওপর আলোকপাত করেছে। কারণ ডিএনএ নমুনাগুলো সেখান থেকেই সংগ্রহ হয়েছিল। তবে এসব বিবর্তনীয় প্রবণতা কি কেবল ওই নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষের মধ্যেই সীমিত ছিল নাকি বিশ্বজুড়ে সব মানুষের ক্ষেত্রে ঘটেছে সেই প্রশ্নের উত্তর এ গবেষণায় খোঁজা হয়নি।

লাল চুলের জিন নিয়ে গবেষণাপত্রটি প্রকাশ পেয়েছে বিজ্ঞান সাময়িকী ‘নেচার’-এ।


বাংলাদেশের খবর/এইচআর

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন