পার্থেনিয়ামের বিষাক্ত থাবা
বিপন্ন কৃষক, ফসল ও প্রাণবৈচিত্র্য
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৫:০১
সবুজ মাঠের এক কোণে কিংবা রাস্তার ধারে অবহেলায় বেড়ে ওঠা ছোট ছোট সাদা ফুলের ঝোপ দেখে প্রথম দেখায় যে কারও চোখ জুড়িয়ে যেতে পারে। দূর থেকে মনে হতে পারে, প্রকৃতি যেন নিজ হাতে সাজিয়ে রেখেছে কোনো বুনো ফুলের বাগান। কিন্তু এই সৌন্দর্যের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক ভয়ংকর বাস্তবতা। এর নাম পার্থেনিয়াম। দেখতে নিরীহ হলেও এটি বিশ্বের অন্যতম আক্রমণাত্মক ও ক্ষতিকর আগাছা। কৃষিবিজ্ঞানীরা একে প্রায়ই ‘নীরব ঘাতক’ বলে আখ্যায়িত করেন।
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সীমান্তবর্তী জেলা চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ ও যশোরের বিভিন্ন এলাকায় পার্থেনিয়ামের উদ্বেগজনক বিস্তার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। রাস্তার ধারে, পতিত জমিতে, ফসলের খেতে, এমনকি বসতবাড়ির আশপাশেও দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে এই আগাছা। এর প্রভাব শুধু কৃষিজমির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি কৃষক, গবাদিপশু, পরিবেশ এবং জনস্বাস্থ্যের জন্যও একটি গুরুতর হুমকি হয়ে উঠেছে।
পার্থেনিয়াম (Parthenium hysterophorus) মূলত উত্তর ও মধ্য আমেরিকার একটি আগ্রাসী উদ্ভিদ। বিভিন্ন গবেষণা ও কৃষি বিশেষজ্ঞদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, আমদানিকৃত শস্য কিংবা সীমান্তবর্তী অঞ্চলের মাধ্যমে এর বীজ নতুন নতুন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। বাংলাদেশের অনুকূল আবহাওয়া ও উর্বর মাটি পেয়ে এটি দ্রুত বিস্তার লাভ করছে। একটি পূর্ণবয়স্ক পার্থেনিয়াম গাছ বছরে ১০ হাজার থেকে ২৫ হাজার পর্যন্ত বীজ উৎপাদন করতে পারে। বাতাস, পানি, যানবাহন কিংবা পশুর মাধ্যমে এসব বীজ সহজেই বিস্তৃত এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এই আগাছার সংস্পর্শে এসে কৃষক ও মাঠকর্মীরা নানা ধরনের স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখে পড়ছেন। পার্থেনিয়ামের শরীরে থাকা ‘পার্থেনিন’ নামক রাসায়নিক উপাদান মানুষের ত্বকে অ্যালার্জি, চুলকানি, ডার্মাটাইটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী চর্মরোগ সৃষ্টি করতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এর ফুলের রেণু বাতাসে ভেসে শ্বাসনালিতে প্রবেশ করে হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট ও অন্যান্য অ্যালার্জিজনিত সমস্যার কারণ হয়। চুয়াডাঙ্গাসহ বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকদের মধ্যে এমন সমস্যার অভিযোগ ক্রমেই বাড়ছে।
এই আগাছার ক্ষতি শুধু মানুষের শরীরেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি কৃষিজমির উৎপাদনশীলতার জন্যও বড় হুমকি। উদ্ভিদবিজ্ঞানের ভাষায় পার্থেনিয়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘অ্যালিলোপ্যাথি’। অর্থাৎ, এটি এমন কিছু রাসায়নিক পদার্থ নিঃসরণ করে যা আশপাশের ফসল ও দেশীয় উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত করে। ফলে ফসলের ফলন কমে যায়, দেশীয় উদ্ভিদ বিলুপ্তির ঝুঁকিতে পড়ে এবং জীববৈচিত্র্যের ভারসাম্য নষ্ট হতে থাকে।
গবাদিপশুর জন্যও এই আগাছা ক্ষতিকর। চারণভূমিতে এর আধিক্য থাকলে পশুর স্বাভাবিক খাদ্য সংকট তৈরি হয়। অনেক সময় পশু ভুলবশত এই আগাছা খেয়ে ফেললে স্বাস্থ্যগত সমস্যায় আক্রান্ত হতে পারে। ফলে কৃষিভিত্তিক গ্রামীণ অর্থনীতির ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো, এই আগ্রাসী আগাছার বিস্তার কি হঠাৎ করে ঘটেছে? বাস্তবতা বলছে, না। পার্থেনিয়াম বহু বছর ধরেই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাচ্ছিল। কিন্তু সময়মতো কার্যকর নজরদারি, গবেষণা এবং জনসচেতনতা কার্যক্রম জোরদার না হওয়ায় আজ এটি একটি বড় উদ্বেগে পরিণত হয়েছে।
দুঃখজনক হলেও সত্য, মাঠপর্যায়ের অনেক কৃষক এখনও পার্থেনিয়াম সম্পর্কে জানেন না। তারা এটিকে সাধারণ আগাছা ভেবে উপেক্ষা করেন। কোথাও কোথাও সচেতনতামূলক কার্যক্রম পরিচালিত হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই সীমিত। কৃষক আক্রান্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগেই প্রতিরোধমূলক উদ্যোগ নেওয়া বেশি কার্যকর—এই বাস্তবতাকে আমরা এখনও যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছি না।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্থানীয় প্রশাসন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং পরিবেশ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে আরও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নিয়মিত জরিপ, সচেতনতা বৃদ্ধি, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সমন্বিত আগাছা ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম জোরদার করা এখন সময়ের দাবি। পাশাপাশি সীমান্তবর্তী অঞ্চলে বিশেষ নজরদারি বাড়াতে হবে, যাতে নতুন করে এই আগাছার বিস্তার রোধ করা যায়।
পার্থেনিয়াম নিয়ন্ত্রণে কৃষকদেরও সচেতন হতে হবে। খালি হাতে এই গাছ স্পর্শ না করা, গ্লাভস ও মাস্ক ব্যবহার করা, ফুল ও বীজ উৎপাদনের আগেই গাছ উপড়ে ফেলা এবং নিরাপদভাবে ধ্বংস করার মতো পদক্ষেপ কার্যকর হতে পারে। তবে এটি কোনো একক ব্যক্তি বা কৃষকের পক্ষে মোকাবিলা করা সম্ভব নয়; প্রয়োজন রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক পর্যায়ের সমন্বিত উদ্যোগ।
আমরা যখন নিরাপদ খাদ্য, টেকসই কৃষি এবং পরিবেশবান্ধব বাংলাদেশের স্বপ্ন দেখি, তখন পার্থেনিয়ামের মতো আগ্রাসী আগাছা সেই স্বপ্নের জন্য একটি নীরব হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। চুয়াডাঙ্গা, ঝিনাইদহ কিংবা যশোরের কৃষকের শরীরে যে অ্যালার্জির ক্ষত দেখা যাচ্ছে, তা আসলে আমাদের কৃষি ব্যবস্থার গভীরে জমে থাকা একটি বৃহত্তর সংকটের ইঙ্গিত।
প্রকৃতি সাধারণত হঠাৎ করে বিপর্যয়ের বার্তা দেয় না; সে আগে সতর্ক করে। পার্থেনিয়ামের সাদা ফুলগুলো হয়তো সেই সতর্কবার্তাই বহন করছে। দূর থেকে যাকে সৌন্দর্য মনে হয়, কাছে গেলে দেখা যায় তা মাটি, মানুষ, ফসল ও প্রাণবৈচিত্র্যের জন্য এক নীরব বিপদের প্রতীক।
আজ যদি আমরা এই সংকেতকে গুরুত্ব না দিই, তাহলে আগামী দিনে এর মূল্য আরও বেশি দিতে হবে। কৃষককে বাঁচাতে হলে কৃষিজমি বাঁচাতে হবে, কৃষিজমি বাঁচাতে হলে রক্ষা করতে হবে মাটির স্বাভাবিক পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্যকে। আর সে কারণেই পার্থেনিয়ামের বিরুদ্ধে সমন্বিত ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখনই।
লেখক: কৃষি উদ্যোক্তা, সংগঠক ও প্রশিক্ষক

