Logo

অন্যান্য

নিরাপদ খাদ্যের জন্য বিষমুক্ত কৃষি কেন জরুরি

Icon

মিনহাজ উদ্দীন আত্তার

প্রকাশ: ১৬ জুন ২০২৬, ২১:৫৬

নিরাপদ খাদ্যের জন্য বিষমুক্ত কৃষি কেন জরুরি

একটি ছয় মাসের শিশু। পৃথিবীকে সে এখনও পুরোপুরি চিনে উঠতে পারেনি। তার চোখে বিস্ময়, মুখে নিষ্পাপ হাসি, ভবিষ্যৎজুড়ে অসংখ্য সম্ভাবনা। অথচ সেই কোমল শরীরের রক্তে যদি প্রবাহিত হয় সীসা, ক্যাডমিয়াম কিংবা অন্য কোনো ভারী ধাতুর বিষ—তাহলে সেটি শুধু একটি শিশুর নয়, একটি জাতির ভবিষ্যতের জন্যও অশনি সংকেত।

এটি কোনো কল্পকাহিনি নয়, বাংলাদেশের এক নির্মম বাস্তবতা। সম্প্রতি কৃষিমন্ত্রী যখন জনসমক্ষে শিশুদের শরীরে হেভি মেটালের উপস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন, তখন বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। যে কৃষি মানুষের জীবন বাঁচানোর কথা, সেই কৃষি যদি অনিয়ন্ত্রিত রাসায়নিক ব্যবহারের কারণে ধীরে ধীরে মানুষের শরীরে বিষ ঢুকিয়ে দেয়, তাহলে আমাদের নিজেদের কাছেই প্রশ্ন রাখতে হয়—উৎপাদনের এই অন্ধ প্রতিযোগিতা আমাদের কোথায় নিয়ে যাচ্ছে?

একসময় বাংলার মাঠ মানেই ছিল সবুজের সমুদ্র, কুয়াশাভেজা ভোর আর কৃষকের ঘামে ভেজা আশার গল্প। আজও সেই দৃশ্য আছে, কিন্তু তার আড়ালে জমে উঠছে এক নীরব সংকট। ফসলের ফলন বাড়ানোর প্রতিযোগিতায় আমরা মাটির ওপর এমন এক চাপ সৃষ্টি করেছি, যার মূল্য দিচ্ছে প্রকৃতি, মানুষ এবং আগামী প্রজন্ম।

মাটির শরীরে জমে থাকা বিষের গল্প

স্বাধীনতার পর খাদ্য উৎপাদনে বাংলাদেশ অসাধারণ সাফল্য অর্জন করেছে। একসময় খাদ্য ঘাটতির দেশ আজ খাদ্য উৎপাদনে অনেকাংশে স্বয়ংসম্পূর্ণ। কিন্তু এই অর্জনের পেছনে যে কৃষি ব্যবস্থা গড়ে উঠেছে, সেখানে রাসায়নিক সার ও বালাইনাশকের ওপর নির্ভরতা উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে দেশে বালাইনাশকের ব্যবহার ছিল প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন। বর্তমানে সেই ব্যবহার বেড়ে ৩৭ থেকে ৪৫ হাজার মেট্রিক টনের মধ্যে পৌঁছেছে। অর্থাৎ মাত্র তিন দশকে ব্যবহার বেড়েছে প্রায় পনের গুণ।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে কৃষক প্রয়োজনের তুলনায় দুই থেকে পাঁচ গুণ বেশি বালাইনাশক ব্যবহার করছেন। বিশেষ করে সবজি চাষে এই প্রবণতা বেশি দেখা যায়।

এদিকে বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশের উল্লেখযোগ্য অংশের কৃষিজমিতে লেড, ক্যাডমিয়াম, আর্সেনিক ও ক্রোমিয়ামের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যাচ্ছে। কিছু কিছু সবজিতে অনুমোদিত মাত্রার কয়েকগুণ বেশি সীসা শনাক্ত হওয়ার তথ্যও গবেষণায় উঠে এসেছে। ভূগর্ভস্থ পানির আর্সেনিক সেচের মাধ্যমে ধান ও অন্যান্য খাদ্যশস্যে প্রবেশ করছে—যা দীর্ঘমেয়াদে জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

সবচেয়ে বড় শিকার আমাদের শিশুরা

এই সংকটের সবচেয়ে করুণ দিক হলো—এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী তারা, যারা নিজেদের রক্ষা করার ক্ষমতাও রাখে না।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক শিশু সিসা দূষণের ঝুঁকিতে রয়েছে। সিসা শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে বাধা সৃষ্টি করে, শেখার ক্ষমতা কমিয়ে দেয় এবং দীর্ঘমেয়াদে শারীরিক ও মানসিক বিকাশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

একটি জাতির ভবিষ্যৎ তার শিশুদের হাতে গড়ে ওঠে। কিন্তু যদি সেই শিশুদের শরীরেই ধীরে ধীরে বিষ জমা হতে থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের উন্নয়ন কেবল অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে; মানবসম্পদের ভিত দুর্বল হয়ে পড়বে।

কৃষকও আজ এই বিষচক্রের শিকার

এই গল্পে কৃষক কোনো অপরাধী নন; বরং তিনিও একজন ভুক্তভোগী। যে কৃষক দিনরাত পরিশ্রম করে মানুষের জন্য খাদ্য উৎপাদন করেন, তিনিই অনেক সময় প্রয়োজনীয় সুরক্ষা ছাড়া বিষাক্ত রাসায়নিক ব্যবহার করেন। ফলে বিভিন্ন চর্মরোগ, শ্বাসকষ্ট, স্নায়বিক সমস্যা ও দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকির মুখোমুখি হচ্ছেন।

ফসলের নিবিড়তা বাড়ছে, জমি বছরে একাধিকবার ব্যবহার হচ্ছে, কিন্তু মাটিকে বিশ্রাম দেওয়ার বা তার হারানো জৈব শক্তি ফিরিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ তুলনামূলক কম। ফলে মাটির জীববৈচিত্র্য কমে যাচ্ছে, উর্বরতা হ্রাস পাচ্ছে এবং কৃষি আরও বেশি রাসায়নিকনির্ভর হয়ে উঠছে। নিরাপদ খাদ্য শুধু স্বাস্থ্য নয়, অর্থনীতিরও প্রশ্ন বিষমুক্ত কৃষির প্রশ্ন কেবল জনস্বাস্থ্যের নয়; এটি অর্থনীতিরও প্রশ্ন।

বর্তমান বিশ্ববাজারে নিরাপদ ও ট্রেসেবল (Traceable) খাদ্যের চাহিদা দ্রুত বাড়ছে। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা এবং মধ্যপ্রাচ্যের বাজারে কৃষিপণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে খাদ্য নিরাপত্তা ও মান নিয়ন্ত্রণ এখন অন্যতম প্রধান শর্ত।

কিন্তু যদি আমাদের কৃষিপণ্যে অতিরিক্ত রাসায়নিক বা ভারী ধাতুর উপস্থিতি পাওয়া যায়, তাহলে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ফলে কৃষক যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হন, তেমনি ক্ষতিগ্রস্ত হয় দেশের রপ্তানি সম্ভাবনাও।

আমি দীর্ঘদিন ধরে কৃষি, কৃষক ও নিরাপদ খাদ্য নিয়ে কাজ করছি। ‘কতকিছুর হাট’-এর মাধ্যমে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের কৃষক, খামারি ও ভোক্তাদের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে একটি বিষয় খুব স্পষ্টভাবে উপলব্ধি করেছি—মানুষ এখন শুধু খাদ্য চায় না, তারা নিরাপদ খাদ্য চায়। কিন্তু নিরাপদ খাদ্যের যাত্রা বাজার থেকে শুরু হয় না; শুরু হয় মাটি থেকে। মাটি অসুস্থ হলে নিরাপদ খাদ্যের স্বপ্নও অপূর্ণ থেকে যায়।

ফেরার পথ কোথায়?

আশার কথা হলো, এখনও সময় শেষ হয়ে যায়ন।কৃষি মন্ত্রণালয় ইতোমধ্যে জৈব বালাইনাশক ব্যবহারে উৎসাহ, ক্ষতিকর রাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ এবং মানসম্মত কৃষি উপকরণ নিশ্চিত করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করছে। তবে বাস্তব পরিবর্তনের জন্য আরও কিছু বিষয় জরুরি।

প্রথমত, মাঠপর্যায়ে কৃষকদের ব্যাপক প্রশিক্ষণ দিতে হবে। Integrated Pest Management (IPM) বা সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা জনপ্রিয় করতে হবে।

দ্বিতীয়ত, কৃষকের হাতে সহজলভ্য ও সাশ্রয়ী মূল্যে জৈব সার এবং প্রাকৃতিক বালাইনাশক পৌঁছে দিতে হবে।

তৃতীয়ত, খামার থেকে ভোক্তার টেবিল পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে খাদ্যের মান পরীক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে এবং নিরাপদ খাদ্য সার্টিফিকেশনকে আরও কার্যকর করতে হবে।

শেষ কথা: মাটির কাছে আমাদের ঋণ

আমরা প্রায়ই উন্নয়নের কথা বলি। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়ন তখনই অর্থবহ, যখন তা মানুষের স্বাস্থ্য, পরিবেশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের নিরাপত্তা নিশ্চিত করে।

বাংলার মাটি শুধু উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি। সেই মাটিকে যদি আমরা বিষাক্ত করে ফেলি, তাহলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হবো আমরা নিজেরাই।

তাই এখনই সময় ফিরে তাকানোর। উৎপাদনের পরিমাণের পাশাপাশি উৎপাদনের মান নিয়েও ভাবার। কৃষিকে শুধু অধিক ফলনের প্রতিযোগিতা থেকে বের করে নিরাপদ, টেকসই ও মানবিক কৃষির পথে নিয়ে যাওয়ার।

যেন আগামী দিনের কোনো শিশুর রক্তে বিষের নীল ছাপ না থাকে। যেন তার শিরায় প্রবাহিত হয় সুস্থ মাটি, নিরাপদ খাদ্য এবং একটি দায়িত্বশীল জাতির ভবিষ্যৎ।

লেখক: কৃষি উদ্যোক্তা, সংগঠক ও প্রশিক্ষক

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন