মেহেরপুর থেকে রাজবাড়ী
কেন বারবার ক্ষতির মুখে পেঁয়াজচাষী
মিনহাজ উদ্দীন আত্তার
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১১:২২
বাংলাদেশের কৃষক কখনো প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করেন, কখনো রোগ-পোকার আক্রমণের সঙ্গে, আবার কখনো অনিশ্চিত বাজারব্যবস্থার সঙ্গে। বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রম, ঘাম আর স্বপ্নের বিনিময়ে যিনি দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করেন, তিনিই সবচেয়ে বেশি অনিশ্চয়তার মধ্যে জীবন কাটান। কৃষকের জীবনে ঝুঁকি নতুন নয়। কিন্তু সবচেয়ে বড় বেদনার বিষয় হলো, অনেক সময় সেই ঝুঁকি সৃষ্টি হয় মানুষের ভুল সিদ্ধান্ত, অপর্যাপ্ত পরিকল্পনা এবং দুর্বল বাজার ব্যবস্থাপনার কারণে।
সাম্প্রতিক সময়ে দুটি ঘটনা সেই বাস্তবতাকেই নতুন করে সামনে এনে দিয়েছে। একদিকে মেহেরপুরে সরকারি সহায়তায় ব্যবহৃত ‘এয়ার ফ্লো মেশিন’-এ পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে বহু কৃষক বড় ধরনের লোকসানের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে রাজবাড়ীতে ভালো ফলন হলেও বাজারদর অস্বাভাবিকভাবে কমে যাওয়ায় উৎপাদন খরচই তুলতে পারছেন না পেঁয়াজচাষিরা। দুটি ঘটনার কারণ আলাদা হলেও পরিণতি এক—সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হচ্ছে কৃষককে।
মেহেরপুরের কৃষকেরা সরকারি পরামর্শে আধুনিক সংরক্ষণ প্রযুক্তির ওপর আস্থা রেখেছিলেন। আশা ছিল, দীর্ঘদিন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে ভালো দামে বিক্রি করতে পারবেন। কিন্তু বাস্তবে সংরক্ষিত পেঁয়াজের বড় অংশ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে শুধু ফসলের ক্ষতিই নয়, বিদ্যুৎ বিল, সংরক্ষণ ব্যয়, শ্রমিকের মজুরি ও অন্যান্য বিনিয়োগ মিলিয়ে তাঁদের লোকসান আরও বেড়ে যায়। স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—প্রযুক্তিটি কি মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্তভাবে পরীক্ষা ও যাচাই করা হয়েছিল? যদি হয়ে থাকে, তবে এমন বিপর্যয় কেন ঘটল? আর যদি না হয়ে থাকে, তবে এর দায় কার?
অন্যদিকে রাজবাড়ীর কৃষকের সংকটের চিত্র ভিন্ন হলেও বাস্তবতা সমান কঠিন। এখানে উৎপাদনের সমস্যা নেই; সমস্যা বাজারে। মাসের পর মাস পরিশ্রম করে উৎপাদিত পেঁয়াজ কৃষকদের বিক্রি করতে হচ্ছে উৎপাদন খরচের কাছাকাছি বা তারও কম দামে। অথচ একই সময়ে দেশের বিভিন্ন খুচরা বাজারে ভোক্তাদের তুলনামূলক অনেক বেশি দাম গুনতে হচ্ছে। কৃষক ও ভোক্তার মাঝখানের এই বিশাল মূল্য ব্যবধান স্বাভাবিকভাবেই বাজারব্যবস্থা, সরবরাহ শৃঙ্খল এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
এখানেই সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য। বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো অনেক ক্ষেত্রেই নিজেদের পণ্যের মূল্য নির্ধারণে প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু যে কৃষক নিজের শ্রম, মেধা ও পুঁজি বিনিয়োগ করে খাদ্য উৎপাদন করেন, তিনি তাঁর উৎপাদিত পণ্যের দাম নির্ধারণের ন্যূনতম ক্ষমতাও রাখেন না। কখনো প্রযুক্তির ব্যর্থতা, কখনো বাজারের অস্থিরতা—প্রতিটি সংকটের শেষ বোঝা এসে পড়ে কৃষকের কাঁধেই।
এই দুই ঘটনা আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়। কৃষকের সংকট শুধু উৎপাদনের সংকট নয়; এটি গবেষণা, প্রযুক্তি, সংরক্ষণ, বিপণন, বাজারব্যবস্থা এবং নীতিনির্ধারণ—সবকিছুর সম্মিলিত সংকট। কৃষি উন্নয়নের নামে নতুন প্রযুক্তি অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই প্রযুক্তির মাঠপর্যায়ের কার্যকারিতা নিশ্চিত না করে কৃষকের হাতে তুলে দেওয়া উচিত নয়। একইভাবে উৎপাদন বাড়ানোই যথেষ্ট নয়; কৃষক যদি তাঁর উৎপাদিত ফসলের ন্যায্য মূল্য না পান, তবে সেই উন্নয়ন দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
কৃষি নিয়ে আমরা প্রায়ই ‘কৃষিবান্ধব’ নীতির কথা বলি। কিন্তু এখন সময় এসেছে প্রকৃত অর্থে ‘কৃষকবান্ধব’ নীতি বাস্তবায়নের। কৃষকের ন্যায্য মূল্য নিশ্চিত করতে কার্যকর বাজার তদারকি, আধুনিক সংরক্ষণব্যবস্থা, কৃষিপণ্য বিপণনের সংস্কার এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে সরাসরি সরকারি হস্তক্ষেপ আরও জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে নতুন প্রযুক্তি মাঠে ছড়িয়ে দেওয়ার আগে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, আঞ্চলিক উপযোগিতা যাচাই এবং প্রদর্শনী কার্যক্রম নিশ্চিত করা জরুরি।
আমাদের মনে রাখতে হবে, কৃষকের জমি কোনো পরীক্ষাগার নয়, আবার বাজারও এমন একটি জায়গা হতে পারে না যেখানে সবচেয়ে দুর্বল পক্ষটি সব সময় ক্ষতিগ্রস্ত হবে। কৃষকের প্রতিটি মৌসুম, প্রতিটি বীজ এবং প্রতিটি বিনিয়োগ তাঁর পরিবার, জীবিকা ও ভবিষ্যতের সঙ্গে অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
মেহেরপুরের সংরক্ষণ বিপর্যয় এবং রাজবাড়ীর বাজারদর ধস—দুটি ঘটনাই আমাদের একই বার্তা দেয়। কৃষি উন্নয়নের প্রকৃত মানদণ্ড শুধু উৎপাদন বৃদ্ধি নয়; কৃষকের নিরাপত্তা, ন্যায্য মূল্য এবং সম্মান নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। কারণ কৃষক বাঁচলে কৃষি বাঁচবে, আর কৃষি বাঁচলে টিকে থাকবে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা।
লেখক: আলেম, কৃষি উদ্যোক্তা ও প্রশিক্ষক

