বিরল ঘটনা
সুবিস্তৃত অণুশৈবালে ইসরায়েলের অধিকাংশ পানি শোধনাগার বন্ধ
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৫:৪১
ভূমধ্যসাগরে মাইলজুড়ে ছড়িয়ে পড়া অণুশৈবালের কারণে ইসরায়েলের সুপেয় পানি শোধনাগারগুলোতে বড় ধরনের বিপর্যয় দেখা দিয়েছে। গত রবিবার দেশটির উপকূলীয় ছয়টি শোধনাগারের মধ্যে পাঁচটিই বন্ধ হয়ে যায়। ইসরায়েলের জাতীয় পানি সরবরাহ কোম্পানি 'মেকোরোট' এই তথ্য জানিয়েছে।
বেসরকারি মালিকানাধীন ও পরিচালিত এই শোধনাগারগুলোর কয়েকটি পরবর্তীতে আংশিক কাজ শুরু করলেও গত বৃহস্পতিবার নাগাদ মাত্র একটি শোধনাগার সম্পূর্ণ ক্ষমতায় সচল ছিল। মেকোরোটের মুখপাত্র লিওর গুটম্যান বলেন, 'ইসরায়েলে এই ধরনের ঘটনা এর আগে কখনো ঘটেনি... এটি অত্যন্ত বিরল একটি ঘটনা।' তবে তিনি জোর দিয়ে বলেন, প্রায় ৯৯ শতাংশ ক্ষেত্রেই সুপেয় পানির কোনো বড় ধরনের ঘাটতি হয়নি।
তা সত্ত্বেও সুপেয় পানির জন্য শোধন প্রযুক্তির ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীল এই দেশে এটি একটি চরম উদ্বেগজনক পরিস্থিতি। শুষ্ক জলবায়ুর দেশ ইসরায়েলে কোনো বড় নদী বা পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত নেই। বর্তমানে দেশের অন্তত ৬৫ শতাংশ সুপেয় পানি আসে সমুদ্রের লোনা পানি শোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে, যার বেশিরভাগ শোধনাগার ভূমধ্যসাগরীয় উপকূলে অবস্থিত।
ইসরায়েলের বেন-গুরিওন বিশ্ববিদ্যালয়ের পানি গবেষণা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইডো বার-জেভ বলেন, গত সপ্তাহের শেষের দিকে ইসরায়েলি উপকূলে হঠাৎ এক বিশাল দূষণকারী উপাদান ছড়িয়ে পড়ার পর সমস্যার সূত্রপাত হয়। বিজ্ঞানীরা নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পান যে এগুলো হলো অণুশৈবাল বা মাইক্রোঅ্যালগি। এগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র অণুজীব, যা সূর্যালোক, কার্বন ডাই-অক্সাইড এবং পানির পুষ্টি উপাদান গ্রহণ করে অত্যন্ত দ্রুত বংশবৃদ্ধি করতে পারে।
বার-জেভের মতে, অন্তত বারো মাইলেরও বেশি এলাকাজুড়ে বিস্তৃত এই অণুশৈবালের উৎপত্তি হয়েছিল নীল নদের বদ্বীপে। পরবর্তীতে সাগরের তীব্র স্রোতের টানে তা উত্তর দিকে ধাবিত হয়ে ইসরায়েলের উপকূলে এসে পৌঁছায়। গত ২০ বছর ধরে উপকূলীয় পানি পরীক্ষা করে আসা বার-জেভ বলেন, 'আমি আমার জীবনে প্রথমবার এত বিশাল মাত্রায় এমন কিছু দেখলাম।'
দেশটির শোধনাগারগুলো মূলত 'রিভার্স অসমোসিস' বা বিপরীত অভিস্রবণ প্রযুক্তি ব্যবহার করে। এই প্রক্রিয়ায় পানির বড় বড় দূষণকারী উপাদানগুলো দূর করতে পানিকে প্রথমে প্রাক-পরিশোধন করা হয়। এরপর ফিল্টারের সাহায্যে লবণ, ব্যাকটেরিয়া এবং অন্যান্য অণু দূর করে বিশুদ্ধ পানি আলাদা করা হয়।
ইউটা বিশ্ববিদ্যালয়ের মিডল ইস্ট সেন্টারের পরিচালক মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, শৈবাল এবং এর থেকে নির্গত উপাদানগুলো ফিল্টারের মেমব্রেন বা ছাঁকনিগুলোকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও অকেজো করে ফেলতে পারে। পানিতে ভাসমান অপদ্রব্যের পরিমাণ অতিরিক্ত বেশি হলে সাধারণ শোধন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা পরিষ্কার করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর আগেও ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ওমান উপসাগরে ক্ষতিকর লাল জোয়ারের (রেড টাইড) কারণে এই অঞ্চলের অনেক শোধনাগার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল।
মেকোরোটের মুখপাত্র গুটম্যান জানান, শোধনাগারগুলো বন্ধের পর সৃষ্ট ঘাটতি মেটাতে সরকারের পানি বণ্টন ব্যবস্থা তাৎক্ষণিক বিকল্প পদক্ষেপ নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে গ্যালিলি সাগর থেকে পানি পাম্প করা হয়েছে, ভূগর্ভস্থ কূপগুলো সচল করা হয়েছে এবং জাতীয় পানির রিজার্ভ ব্যবহার করা হয়েছে। কিছু শহরে সাময়িকভাবে বাগানে সেচ ও সুইমিং পুলের পানি ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপ করা হলেও মূলত কৃষকদের ক্ষেত্রে সুপেয় পানি ব্যবহারে বড় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।
গুটম্যান জানান, ঘটনাটি এমন এক সময়ে ঘটেছে যখন গ্রীষ্মকাল এবং এই সময়ে ইসরায়েলে পানির চাহিদা সবচেয়ে শীর্ষে থাকে। ফলে পরিস্থিতি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং হয়ে উঠেছে। গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ সালে ইসরায়েলের জল কর্তৃপক্ষ জেরুজালেমের দামেস্ক গেটের কাছে জরুরি সুপেয় পানির ট্যাংক স্থাপন করেছে।
ইসরায়েল ওশেনোগ্রাফিক অ্যান্ড লিমনোলজিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সামুদ্রিক পরিবেশবিদ তামার গাই-হাইম বলেন, পানিতে পুষ্টি উপাদান, তাপমাত্রা, আলো, স্রোত এবং সমুদ্রের পানির মিশ্রণের মতো পরিবেশগত উপাদানগুলোর এক বিশেষ সমীকরণ তৈরি হলে শৈবালের এই অভাবনীয় বংশবৃদ্ধি বা ব্লুম ঘটে থাকে। মেকোরোটের মতে, সামুদ্রিক ঝড় এবং সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বেড়ে ৮৬ ডিগ্রি ফারেনহাইট (৩০ ডিগ্রি সেলসিয়াস) বা তার বেশি হওয়ার মতো বিরল সমীকরণের কারণেই এই সংকট তৈরি হয়েছে।
এর আগে জেলিফিশ বা শৈবালের কারণে কোনো একক শোধনাগার সাময়িকভাবে বন্ধ হলেও, দেশের উপকূলের একটি বিশাল অংশে একসঙ্গে একাধিক শোধনাগার বন্ধ হওয়া সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক বলে মন্তব্য করেছেন অধ্যাপক বার-জেভ। তিনি সতর্ক করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আগামীতে এই ধরনের ঘটনার হার আরও বৃদ্ধি পাবে।
মানুষের জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর কারণে বিশ্বজুড়ে তাপমাত্রা রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাচ্ছে, সমুদ্রের স্রোত পরিবর্তিত হচ্ছে এবং শক্তিশালী ঝড়ের কারণে পানিতে ক্ষতিকর সার ও বর্জ্য মিশে শৈবালের এই বিশালাকার ব্লুমকে ত্বরান্বিত করছে। রিশন লেজিওন শহরের কাছে অবস্থিত সোরেক ডেসালিনেশন প্ল্যান্টটি সাময়িকভাবে বন্ধ হওয়া পাঁচটি শোধনাগারের অন্যতম।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই সাময়িক সংকট একটি বৃহত্তর উদ্বেগের বিষয়কে সামনে এনেছে। জলবায়ু সংকটের তীব্র তাপদাহ ও খরার মুখে বিশ্বজুড়ে সমুদ্রের পানি শোধনের জনপ্রিয়তা বাড়ছে, কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় কারিগরি সমাধানের ওপর এই অতিরিক্ত নির্ভরশীলতা বড় ঝুঁকিও বহন করে। মাইকেল ক্রিস্টোফার লো বলেন, 'এই ঘটনাটি ব্যাপক আশঙ্কার সৃষ্টি করেছে এবং আমাদের পুরো পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ভঙ্গুরতাকে প্রকাশ করে দিয়েছে।'
প্রাকৃতিক বা জলবায়ুগত কারণ ছাড়াও সামরিক ও সাইবার হামলার ঝুঁকিও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। ইতিপূর্বে মার্কিন-ইরান যুদ্ধের সময় পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের শোধনাগারগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। এ ছাড়া হ্যাকাররাও পানি শোধনাগারগুলোকে লক্ষ্য করে সাইবার হামলা চালাচ্ছে। তেল ছড়িয়ে পড়াও আরেকটি বড় উদ্বেগ। বার-জেভ বলেন, 'শোধনাগারের আশপাশে সমুদ্রে তেল ছড়িয়ে পড়ার ঘটনা কোনো অসম্ভব বিষয় নয়। উপসাগরীয় তেল উৎপাদনকারী দেশগুলোর অনেক শোধনাগারই এই ঝুঁকিতে রয়েছে।' তিনি সতর্ক করে বলেন, সমুদ্রে বড় ধরনের তেল নিঃসরণ ঘটলে এই অণুশৈবালের চেয়েও অনেক দীর্ঘ সময়ের জন্য শোধনাগারগুলো সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়তে পারে, যা আরও বেশি ভীতিকর।
বাংলাদেশের খবর/এইচআর

