গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর
জুলাই সনদ বাস্তবায়ন ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ রাজনৈতিক নানা বাস্তবতায় আগামী অক্টোবর মাস দেশের জন্য 'টার্নিং পয়েন্ট' হতে পারে। এ সময়ে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনের কার্যক্রম দৃশ্যমান হবে। পাশাপাশি সংস্কার কার্যক্রম কতটুকু বাস্তবায়ন হবে সেটিও দেখা যাবে। এছাড়া রাজনৈতিক দলগুলোতে যে বিভাজন চলছে সেটিও কতটুকু কমে আসবে তা পরিষ্কার হবে। অক্টোবরে দেশ ও রাজনীতির জন্য ইতিবাচক ফল অথবা স্থিতিশীলতা হুমকির মুখে পড়ার শঙ্কাও রয়েছে।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক আব্দুল লতিফ মাসুম দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, দেশের রাজনীতি কোন দিকে যাচ্ছে তা বুঝতে আরো কিছুদিন অপেক্ষা করতে হবে। আগামী এক থেকে দেড় মাস দেশের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোতে চলমান বিভাজন আরো বাড়লে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নষ্ট হতে পারে।
জানা গেছে, অন্তর্বর্তী সরকার আগামী ফেব্রুয়ারির প্রথমার্ধে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে। বড় দল বিএনপি সরকারের এ ঘোষণাতে খুশি। কিন্তু জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে জামায়াতে ইসলামীসহ সমমনা ছয়টি দল। আগামী শুক্রবার দলগুলোর কর্মসূচির প্রথম ধাপ শেষ হবে। এছাড়া জাতীয় নাগরিক পার্টি এনসিপি সংবিধান সংস্কারে গণপরিষদ নির্বাচন চায়। এসব ঘটনাপ্রবাহে আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সরকারের প্রতিশ্রুত সময়ে করা নিয়েও চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এর মধ্যে হঠাৎ গত সোমবার ভারতের একটি বাংলা পত্রিকায় সাক্ষাৎকার দেন বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। ওই সাক্ষাৎকার নিয়ে এখন রাজনীতির মাঠ গরম। ওই সাক্ষাৎকারে একটি অংশে তিনি বলেন, ‘জামায়াত আমাদের কাছে ৩০টা আসন চেয়েছে। আমরা উৎসাহ দেখাইনি। অনেক কম একটা সংখ্যার কথা বলেছি, যা তাদের মনঃপূত হয়নি। আপনাকে আশ্বাস দিচ্ছি, জামায়াতকে আর আমরা মাথায় উঠতে দেব না। তারা যত বড় না শক্তি, আমরা অকারণে তার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়েছি। পিআর-টিআর সবই বিএনপির উপরে চাপ সৃষ্টির কৌশল। আর এনসিপি আমাদের কাছে আসন না চাইলেও বিএনপি যেন সরকার গঠন করতে না পারে সেজন্য দলটির নেতারা উঠে পড়ে লেগেছে।’
মির্জা ফখরুলের এ বক্তব্যের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে জামায়াত। মঙ্গলবার জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার গণমাধ্যমে দেওয়া বিবৃতিতে এ প্রতিবাদ জানান। তিনি বলেন, ‘এ বক্তব্য অসত্য ও প্রতিহিংসাপরায়ণ। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মতো প্রবীণ রাজনীতিবিদ এ ধরনের বক্তব্য দিয়েছেন তা বিশ্বাস করতে আমাদের কষ্ট হয়। এই বক্তব্যের সঙ্গে সত্য ও শিষ্টাচারের কোনো মিল নেই। বিএনপি মহাসচিব যদি তার বক্তব্যের পক্ষে প্রমাণ উপস্থাপন করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তার বক্তব্যের জন্য জনগণের সামনে দুঃখ প্রকাশ করবেন।’
যদিও বিএনপির মিডিয়া সেলের সদস্য শায়রুল কবির খান বলেছেন, ‘বিএনপি মহাসচিব এ ধরনের বক্তব্য দেননি। একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি ধরনের অবান্তর কথা কখনো বলেন না।’
ঠিক এই মুহূর্তে মির্জা ফখরুলের বক্তব্যে সংকট আরো বাড়তে পারে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ কেউ।
সাক্ষাৎকারের আরেকটি অংশে মির্জা ফখরুল বলেন, ‘আমরা বলেছি, আওয়ামী লীগ ও তাদের শরিকরা সবাই, এমনকি জাতীয় পার্টিও নির্বাচনে অংশ নিক। একটা সুষ্ঠু ও অবাধ ভোট হোক। এ জন্য অনেকে আমাকে ভারতের এজেন্ট, আওয়ামী লীগের দালাল বলে গালাগাল দিচ্ছে। কিন্তু শেখ হাসিনার অপকর্ম আমরাও কেন করব? হাসিনা ১৫ বছর প্রতিপক্ষকে ভোটে দাঁড়াতেই দেননি, তার শাস্তি পেয়েছেন। একই কাজ করলে আমরাও তো প্রতিফল পাব।’
বিএনপি মহাসচিবের এ বক্তব্যের নিন্দা জানিয়েছেন এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম। মঙ্গলবার দলীয় কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন-আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন থেকে সরে আসার রাজনীতি করা উচিত বিএনপির।
এছাড়া গত সোমবার ইসলামী আন্দোলনের আমির ও চরমোনাই পীর মুফতি সৈয়দ রেজাউল করিমকে নিয়ে বিএনপি নেতা শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানির বিতর্কিত মন্তব্য দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষের জন্ম দিয়েছে।
এদিকে, গত ১৫ সেপ্টেম্বর ঐকমত্য কমিশনের মেয়াদ শেষ হয়। পরবর্তীতে আরো এক মাস মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলোর ঐকমত্য বিষয়গুলো নিয়ে এখনো বিশেষ কোনো পদক্ষেপে যেতে পারেনি কমিশন। এছাড়া সরকার যে ১১টি সংস্কার কমিশন করেছিল তার সব কটির মেয়াদ শেষ হলেও এখনো প্রকৃত সংস্কার আলোর মুখ দেখিনি। ফলে, সামনে আরো অসন্তোষ বাড়তে পারে।
তবে, জুলাই সনদ ও পিআর পদ্ধতি নিয়ে শেষ পর্যন্ত দলগুলোকে এককাতারে আনতে পারবে কিনা তা নিয়ে ঐকমত্য কমিশনের বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ রয়েছে।
এক্ষেত্রে রাজনৈতিক দলগুলো কতটুকু ছাড় দেবে তাও পরিষ্কার হবে কিছুদিনের মধ্যে। সব মিলিয়ে চলতি মাস ও অক্টোবর দেশের জন্য খুব গুরুত্বপূর্ণ।

