বিএনপির নির্বাচনী জোট কেমন হতে যাচ্ছে
আসন ভাগাভাগিতে তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া কী হবে
ডিজিটাল ডেস্ক
প্রকাশ: ৩১ অক্টোবর ২০২৫, ১০:১৯
কোলাজ : বাংলাদেশের খবর
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি এখন জোট গঠনের শেষ পর্যায়ের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। তবে কেন্দ্রের পরিকল্পনা ও তৃণমূলের মনোভাবের মধ্যে যে ফারাক তৈরি হচ্ছে, তা এখন দলের বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা দিয়েছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বাঞ্ছারামপুরে গত ১২ অক্টোবরের ঝাড়ু মিছিল যেন সেই অঘোষিত বিভেদেরই ইঙ্গিত দিয়েছে।
সেদিন শতাধিক নারী ‘সচেতন মহিলা সমাজ’-এর ব্যানারে একটি বিক্ষোভ মিছিল করে গণসংহতি আন্দোলনের প্রধান সমন্বয়ক এবং বিএনপির সহযোগী জোট ‘গণতন্ত্র মঞ্চ’র অন্যতম শীর্ষ নেতা জোনায়েদ সাকিকে ‘ইসলামবিদ্বেষী’ উল্লেখ করে উপজেলায় অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন।
এই মিছিল শুধু একটি স্থানীয় ঘটনা নয়— বরং তা জোটের ভেতরের টানাপোড়েনের প্রতীক হিসেবেই দেখা হচ্ছে।
গণসংহতি আন্দোলনের স্থানীয় নেতারা অভিযোগ তুলেছেন, বিএনপিরই একটি অংশ এই মিছিলের পেছনে ছিল, যাতে সাকির প্রার্থীতা ঠেকানো যায়। উপজেলা সমন্বয়ক শামীম শিবলী বলেন, ‘নির্বাচন সামনে রেখে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাকে প্রার্থী হতে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা চলছে।’
তবে বিএনপির স্থানীয় নেতারা এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। বাঞ্ছারামপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘দলীয় কেউ এসব মিছিলে অংশ নেয়নি। বরং সাকি বিএনপির ভোটব্যাংক ব্যবহার করে এমপি হতে চান— এমন ধারণা থেকেই স্থানীয় মানুষের প্রতিক্রিয়া এসেছে।’
কিন্তু এই ঘটনায় রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জোটের শরীকদের জন্য আসন ছাড়তে গেলে বিএনপিকে তৃণমূল পর্যায়ে প্রতিরোধের মুখে পড়তে হতে পারে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া, পটুয়াখালি, বগুড়া বা কুমিল্লা— বেশ কয়েকটি জেলায়ই একাধিক স্থানীয় নেতা এমপি পদে মনোনয়ন চান। কোথাও ১০-১২ জন পর্যন্ত সম্ভাব্য প্রার্থী রয়েছেন। প্রত্যেকে ভাবছেন, ‘যদি বিএনপির টিকিট পাওয়া যায়, তাহলে জেতা সহজ।’
এমন অবস্থায় জোটের কোনো শরীক দলকে যদি ঐ আসনে প্রার্থী করা হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত তৃণমূল কতটা মানবে— সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
ঢাকার বিএনপি হাইকমাণ্ডও এই আশঙ্কা জানে। এ কারণেই সম্প্রতি দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের নেতাদের বৈঠকে একক প্রার্থীর নাম ঘোষণা না করে ‘ঐক্য বজায় রাখার’ নির্দেশ দেওয়া হয়।
স্থানীয় এক নেতা বলেন, ‘কাউকেই গ্রিন সিগন্যাল দেওয়া হয়নি। বলা হয়েছে, প্রার্থী যেই হোক, আমরা যেন ঐক্যবদ্ধ থাকি।’
বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, দলটি প্রথম ধাপে প্রায় দুইশ আসনে প্রার্থী চূড়ান্ত করছে। বাকি একশ আসনে প্রার্থী বাছাই হবে জোটের সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে।
স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘দুইশ আসনে আমরা গ্রিন সিগন্যাল দিতে পারব। বাকি একশ আসনেও কাজ শুরু হয়েছে। সেখানে জোটের শরীকদের জন্য আসন রাখা হবে।’
তবে জোটের শরীকরা কত আসন চাইছে, তা নিয়ে শুরু হয়েছে দরকষাকষি।
গণতন্ত্র মঞ্চের পক্ষ থেকে অন্তত ৫০ থেকে ৬০টি আসনের দাবি তোলা হয়েছে। মঞ্চের অন্যতম নেতা সাইফুল হক বলেন, ‘আমরা একশ আটত্রিশ আসনে প্রার্থী ঘোষণা করেছি। বিএনপির সঙ্গে আলোচনায় এ তালিকা থেকে ৫০-৬০ আসনে শর্টলিস্ট করা হতে পারে।’
অন্যদিকে গণঅধিকার পরিষদ, এলডিপি, বার দলীয় জোট, বিজেপি ও আরও কিছু ছোট দলের সঙ্গেও এখনো আসন ভাগাভাগি নিয়ে চূড়ান্ত সমঝোতা হয়নি। এমনকি সম্ভাব্য নতুন শরীক হিসেবে আলোচনায় থাকা জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সঙ্গেও আনুষ্ঠানিক আলোচনা হয়নি বলে জানিয়েছেন সালাহউদ্দিন আহমদ।
দলের অভ্যন্তরেই কেউ কেউ বলছেন, সর্বোচ্চ ৫০টি আসন ছাড়তে পারে বিএনপি। কিন্তু শরীকদের দাবি তার চেয়ে অনেক বেশি। ফলে সমঝোতার পথে এগোতে গেলে একদিকে জোটের দাবি মেটানো, অন্যদিকে স্থানীয় নেতাদের ক্ষোভ সামাল দেওয়া—এই দুই চাপই সামলাতে হবে বিএনপিকে।
আর এই ক্ষোভের ফল হতে পারে ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক বলেন, ‘অতীতে দেখা গেছে, শরীক দলকে আসন দেওয়ার পরও বড় দলের স্থানীয় নেতারা বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে দাঁড়াতেন। এখন জোটের বোঝাপড়ার গভীরতা দেখাবে, সেটা বিএনপি কতটা সামলাতে পারে।’
তবে বিএনপি নেতারা আশাবাদী। সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করছি। আশা করি বিদ্রোহী প্রার্থীর আশঙ্কা খুব একটা থাকবে না।’
রাজনীতি বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপি যে পরিসরে জোট গঠন করছে, সেটি একদিকে সরকারের বিকল্প শক্তি তৈরির ইঙ্গিত দিচ্ছে, কিন্তু অন্যদিকে এর ভেতরের বিভাজন নির্বাচনের আগে বড় পরীক্ষায় ফেলতে পারে দলটিকে।
বিশেষত, তৃণমূলে যাদের দীর্ঘদিনের প্রতীক্ষা ছিল প্রার্থী হওয়ার, তারা যদি শরীক দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে না চান— তাহলে ঐক্যের বার্তা বাস্তবে রূপ নিতে সময় লাগবে।
ফলে প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— বিএনপির নেতৃত্বে এই নতুন নির্বাচনী জোট আসলে কতটা টেকসই হবে, আর আসন ভাগাভাগিতে তৃণমূলের প্রতিক্রিয়া শেষ পর্যন্ত কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে— তার উত্তর মিলবে হয়ত আগামী কয়েক সপ্তাহেই।

