Logo

রাজনীতি

জামায়াত জোটে টানাপড়েন

Icon

এম. ইসলাম

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৮

জামায়াত জোটে টানাপড়েন

গ্রাফিক্স : বাংলাদেশের খবর

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আসন সমঝোতা নিয়ে তীব্র টানাপোড়নে পড়েছে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় জোট। শেষ মুহূর্তে চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা ঘোষণার জন্য ডাকা সংবাদ সম্মেলন স্থগিত হওয়ায় জোটে অসন্তোষ ও অনিশ্চয়তা প্রকাশ্যে এসেছে। বিশেষ করে ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কাঙ্ক্ষিত আসন না পাওয়ায় জোটে থাকা না থাকা নিয়ে দ্বিধায় রয়েছে, যদিও অধিকাংশ দল এখনো জামায়াত জোটে থাকার পক্ষে। এর মধ্যেই ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে নতুন রাজনৈতিক জোট গঠনের ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। আসন বণ্টন নিয়ে মতবিরোধ, শেষ সময়ে নতুন দল যুক্ত হওয়া এবং কিছু বিষয় ঘিরে বিভক্ত অবস্থানের কারণে জোটে শেষ পর্যন্ত কতটি দল থাকবে— তা নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে, যার নিষ্পত্তি আগামী বৃহস্পতি বা শুক্রবারের মধ্যেই হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

নির্বাচনের শেষ মুহূর্তে জোটটিতে চলছে নাটকীয়তা। গতকাল বুধবার জোটের পক্ষ থেকে চূড়ান্ত আসন বিন্যাস ঘোষণা করতে সংবাদ সম্মেলন ডেকে কয়েক ঘণ্টার ব্যবধানে তা স্থগিত করা হয়। যার নেপথ্যে, চরমোনাই পীর সৈয়দ মোহাম্মদ রেজাউল করিমের নেতৃত্বাধীন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ কাক্সিক্ষত আসন পাওয়া না পাওয়ার হিসাব-নিকাশ। জোটে থাকা না থাকা প্রশ্নে খোদ ইসলামী আন্দোলনে অসন্তোষ রয়েছে বলেও জোটের একজন নেতা জানিয়েছেন। 

জামায়াতের সঙ্গে আসন সমঝোতা যখন জটিলতায়, তখন নতুন জোটের ইঙ্গিত দিলেন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান।

এদিকে, ১১ দলের মধ্যে নয়টি দলে আসন সমঝোতা নিয়ে কোনো সমস্যা না থাকলেও ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশেই সদস্যা চলছে। পাশাপাশি মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশে কিছুটা অসন্তোষ রয়েছে। 

ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের অনুরোধে বুধবার সংবাদ শেষ পর্যন্ত স্থগিত করা হয়েছে বলেও দলগুলোর কয়েকজন জ্যেষ্ঠ নেতা নিশ্চিত করেছেন। যদিও দলটির নেতারা তা স্বীকার করেননি। 

জামায়াত ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘আসন সমঝোতার বিষয়ে বুধবার যৌথ সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করা হয়েছিল। কিন্তু কোনো কোনো দলের সঙ্গে অল্প কয়েকটি আসনে  নিয়ে সমঝোতা না হওয়ায় স্থগিত করা হয়েছে। সব আসনে সমঝোতা চূড়ান্ত করে দ্রুত সময়ের মধ্যে সংবাদ সম্মেলন থেকেই চূড়ান্ত ঘোষণা আসবে।’

নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই আসন সমঝোতায় চেষ্টা করে আসছিল জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ অন্য ছয়টি দল। ছয়টি দল হলো- বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস, নেজামে ইসলাম পার্টি, খেলাফত মজলিস, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলন, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি (জাগপা) ও‌ বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি। আসন ভাগাভাগিতে খুব একটা সমস্যা নেই উল্লিখিত ছয় দলের। 

এদিকে গত ২৮ ডিসেম্বর জোটে যুক্ত হয় আরও তিনটি দল।  মুক্তিযোদ্ধা কর্নেল (অব.) অলি আহমদের নেতৃত্বাধীন লেবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) ও জুলাই যোদ্ধাদের সমন্বয়ে গঠিত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং আমার বাংলাদেশ পার্টি (এবি পার্টি)।  

শেষ মুহূর্তে এসে এই তিনটি দল, বিশেষ করে এনসিপি জোটে যুক্ত হওয়ায় নিজেদের কাক্সিক্ষত আসন না পাওয়া নিয়ে সংশয় তৈরি হওয়ায় জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলনের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। 

গত কয়েকদিনে দলগুলোর দফায় দফায় বৈঠকে, শেষ পর্যন্ত আসন সমঝোতা প্রায় চূড়ান্ত হয়। 

দলগুলোর একাধিক সূত্র বলছে, জামায়াত-১৯০ আসন, ইসলামী আন্দোলন-৪৫ আসন,  এনসিপি-২৯ আসন, মামুনুল হকের বাংলাদেশ খেলাফত মজলিস ১৪, আহমদ আব্দুল কাদেরের নেতৃত্বাধীন খেলাফত মজলিস-৫, জাগপা-১, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টি ১, খেলাফত আন্দোলন ১, নেজামে ইসলাম পার্টি ১, এলডিপি-৫ এবং এবি পার্টিকে তিনটি আসনে মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। 

এই হিসাবে দলগুলো ২৯৫ আসনে নিজেদের মধ্যে সমঝোতা করেছে। অবশিষ্ট ৫ আসনের মধ্যে অমুসলিম, বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রার্থী এবং খেতাবপ্রাপ্ত মুক্তযোদ্ধাদের জন্য রাখা হয়েছে। তারা বিশেষ কোনো দলের অন্তর্গত নন। তবে, শেষ পর্যন্ত কোনো কোনো দলের ক্ষেত্রে দুই একটি আসন বাড়তে বা কমতে পারে।

জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের সূত্র জানায়, ইসলামী আন্দোলনের সর্বশেষ চাওয়া ৬০টি আসন। যা নিয়ে মঙ্গলবার রাতেও দল দুটির মধ্যে ইতিবাচক বৈঠক হয়। কিন্তু বুধবার সকাল থেকে সংকট তৈরির খবর আসতে থাকে। এর মাঝেই বেলা সাড়ে ১১টায় ১১ দলের পক্ষে জামায়াত ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদের গণমাধ্যম পাঠানো প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, বিকাল সাড়ে ৪টার ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। ওই সংবাদ সম্মেলন থেকেই জোটের প্রার্থিতা ঘোষণা বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আসবে। 

কিন্তু দুপুর ২টার পর সেই সংবাদ সস্মেলন স্থগিত করা হয়। জানা গেছে, শেষ মুহূর্তে এসে ইসলামী আন্দোলনের পক্ষ থেকে সংবাদ সস্মেলনের পেছানোর জন্য অনুরোধ করা হলে জামায়াত নেতা তাদের ‘রেসপন্স’ করেন। 

একটি সূত্র জানায়, বুধবার রাতেও দলগুলোর শীর্ষ নেতারা বৈঠক করেছেন। সেখানে ইতিবাচকভাবেই আলোচনা হয়েছে। আজ বৃহস্পতিবার বা আগামীকাল শুক্রবার ঘোষণা আসতে পারে বলে জানা গেছে। 

তবে, শেষ পর্যন্ত জামায়াত জোটে ১০ দল নাকি ১১ দল থাকছে তা নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। 

নতুন জোটের ইঙ্গিত ইসলামী আন্দোলনের 
ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও মুখপাত্র গাজী আতাউর রহমান বলেন, ২০ তারিখ (২০ জানুয়ারি) হলো মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ দিন। নির্বাচন হলো ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখ। তাই না? ফেব্রুয়ারির ১২ তারিখের আগ পর্যন্ত যেকোনো কিছু ঘটতে পারে।

বুধবার বিকেলে রাজধানীর পুরানা পল্টনে ইসলামী আন্দোলনের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্নে এ কথা বলেন চরমোনাই পীরের দলটির মুখপাত্র। তার ভাষ্যে, তাদের প্রতি যাদের শ্রদ্ধা রয়েছে, তাদের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছেন তারা।

সংবাদ সম্মেলনে গাজী আতাউর বলেন, আশা করা হয়েছিল, মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের আগে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু গত মঙ্গলবার পর্যন্ত সেটি হয়নি। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বৈঠক করে দলের সর্বস্তরের নেতাদের মতামত নেওয়া হয়েছে। মাঠের তথ্য নেওয়া হয়েছে, প্রার্থীদের কথা শোনা হয়েছে। এসব বিষয় নিয়ে কথা বলতে বুধবার তাদের মজলিশে আমেলার (দলের নীতি-নির্ধারণী ফোরাম) বৈঠক হয়েছিল। যাদের নিয়ে শুরু থেকে পথচলা, তাদের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন যোগাযোগ করছে।

‘ওয়ান বক্স’ পলিসির আওতায় আগামীর পথচলা কেমন হবে, তা নিয়ে আলোচনা চলছে জানিয়ে তিনি বলেন, দু-এক দিনের মধ্যেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত জানানো হবে।

সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে ইসলামী আন্দোলনের মুখপাত্র বলেন, জামায়াতে ইসলামীর আমির বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করে ঘোষণা দিয়ে এসেছেন, তারা সামনে ঐক্যবদ্ধভাবে সরকার গঠন করার জন্য আলোচনা করবেন। এ আলোচনা নির্বাচনের পরও হবে। জাতীয় সরকারের ব্যাপারেও তিনি কথা বলেছেন। জামায়াতের আমির বলেছেন, খালেদা জিয়া ঐক্যের যে পাটাতন তৈরি করেছিলেন, সেই ঐক্যের পাটাতনের ওপরে দাঁড়িয়ে তারা আগামীতে রাষ্ট্র চালাবেন। তবে সেই ঐক্যের পাটাতন খালেদা জিয়ার জীবদ্দশাতেই ভেঙে দেওয়া হয়েছে। সেই পাটাতন আবার মেরামত করার জন্য বলেছেন জামায়াতের আমির। এটা ইসলামী আন্দোলনের মধ্যে একটু সংশয় তৈরি করেছে, জামায়াত কি জাতীয় পার্টির মতো ভূমিকা পালন করবে?

জামায়াতের জোটে বিভাজন বিএনপিকে সুবিধা করে দেবে কি না, এমন প্রশ্নে গাজী আতাউর রহমান বলেন, ‘এটা তো স্বাভাবিক। এটার দায় কি আমাদের? এটা এখানে যদি কেউ অ্যাডভান্টেজ পায়, সেটা পাইতে পারে।’

নতুন করে বিএনপির সঙ্গে কোনো আলোচনা হচ্ছে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিএনপি তো ফিক্সড করে ফেলেছে, তাদের জোট এবং তাদের যে ডিজাইন, সেটা তো হয়ে গেছে।’

সে ক্ষেত্রে ইসলামী আন্দোলন এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেবে কি না, প্রশ্নে গাজী আতাউর বলেন, এখন পর্যন্ত স্পষ্ট কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। অনেকের সঙ্গেই আমাদের আলোচনা চলছে। আলোচনার পর দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে অগ্রসর হবো আমরা। 

বিকেপি/এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর