Logo

রাজনীতি

আলজাজিরার বিশ্লেষণ

জামায়াত কি বাংলাদেশের নেতৃত্বে আসতে পারে?

Icon

ডিজিটাল ডেস্ক

প্রকাশ: ২১ জানুয়ারি ২০২৬, ০৯:৫৬

জামায়াত কি বাংলাদেশের নেতৃত্বে আসতে পারে?

ঢাকায় এক সমাবেশে জামায়াতে ইসলামীর নেতা ও সমর্থকরা [ফাইল : মুনির উজ জামান/এএফপি]

বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন মোড়ের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দেশ। দীর্ঘদিন নিষিদ্ধ, দমন-পীড়নের শিকার এবং প্রায় রাজনৈতিকভাবে নিশ্চিহ্ন করে দেওয়া একটি দল— বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী— এবার প্রথমবারের মতো বাস্তব অর্থেই ক্ষমতার কাছাকাছি পৌঁছেছে বলে মনে করছেন দলটির সমর্থক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা।

বুধবার (২১ জানুয়ারি) আলজাজিরার এক বিশ্লেষণী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইতিহাসে প্রথমবারের মতো ক্ষমতাসীন জোটের নেতা হিসেবে ক্ষমতা দখলের সত্যিকারের সুযোগ পেয়েছে এই ইসলামপন্থী দলটি। বাংলাদেশের খবরের পাঠকদের জন্য প্রতিবেদনের বিশ্লেষণ তুলে ধরো হলো। 

ফরিদপুরের ৪৫ বছর বয়সী ব্যাংকার আবদুর রাজ্জাক তার জীবনে প্রথমবারের মতো বিশ্বাস করছেন যে, তার সমর্থিত রাজনৈতিক দলটি একটি নির্বাচনী জোটের নেতা হিসেবে রাষ্ট্রক্ষমতায় আসার বাস্তব সুযোগ পেয়েছে। নিজের শহরে জামায়াতে ইসলামীর ‘দাঁড়িপাল্লা’ প্রতীকের পক্ষে প্রচারণা চালানোর সময় রাজ্জাক বলেন, সাধারণ মানুষ এখন জামায়াতকে ভোট দেওয়ার জন্য ঐক্যবদ্ধ। 

বিশ্বের অষ্টম জনবহুল এবং চতুর্থ বৃহত্তম মুসলিম জনসংখ্যার দেশ বাংলাদেশে জামায়াতে ইসলামী একটি অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শক্তি বলে মনে করছেন দলটির সমর্থকরা।

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর এটিই প্রথম ভোট। অভ্যুত্থান পরবর্তী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকার শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করেছে। ফলে আসন্ন এই নির্বাচনটি মূলত একটি দ্বিমুখী লড়াইয়ে রূপ নিয়েছে। একদিকে রয়েছে ফ্রন্টরানার হিসেবে পরিচিত বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী এবং ২০২৪ সালের আন্দোলনের ছাত্র নেতাদের গঠিত ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) ও অন্যান্য ইসলামি দলগুলোর সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘শক্তিশালী’ নির্বাচনী জোট।

রাজ্জাকের এই আত্মবিশ্বাসের পেছনে কাজ করছে সাম্প্রতিক বিভিন্ন জনমত জরিপ। জরিপগুলো বলছে, কয়েক দশক ধরে মিত্র হিসেবে থাকা বিএনপির জনসমর্থনের খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে জামায়াত। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্টারন্যাশনাল রিপাবলিকান ইনস্টিটিউট (IRI)-এর ডিসেম্বর মাসের জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির প্রতি সমর্থন ৩৩ শতাংশ, আর জামায়াতের সমর্থন ২৯ শতাংশ। অন্যদিকে, গত সপ্তাহে ন্যারেটিভ (NarratiV), প্রজেকশন বিডি এবং জগরণ ফাউন্ডেশনসহ কয়েকটি স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থার যৌথ জরিপে দেখা গেছে, বিএনপির সমর্থন ৩৪.৭ শতাংশ এবং জামায়াতের সমর্থন ৩৩.৬ শতাংশ।

যদি জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট বিজয়ী হয়, তবে তা হবে দলটির জন্য এক নাটকীয় প্রত্যাবর্তন। শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে জামায়াত ভয়াবহ দমন-পীড়নের শিকার হয়েছিল। ওই সময়ে দলটিকে নিষিদ্ধ করা হয়, শীর্ষ নেতাদের ফাঁসিতে ঝোলানো হয় এবং হাজার হাজার নেতাকর্মীকে গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার হতে হয়। শেখ হাসিনা ২০১০ সালে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধে বিতর্কিত ভূমিকার দায়ে জামায়াত নেতাদের বিচার শুরু করেছিলেন।

কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় হলো, গত নভেম্বরে সেই একই ট্রাইব্যুনাল শেখ হাসিনাকে ২০২৪ সালের ছাত্র আন্দোলনে ১,৪০০ মানুষকে হত্যার দায়ে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছে। হাসিনা বর্তমানে ভারতে নির্বাসনে আছেন এবং ইউনূস প্রশাসন বারবার তাকে ফেরত চাইলেও ভারত এখনো তাতে সাড়া দেয়নি।

কয়েক দশকের দমন-পীড়ন শেষে পুনরুত্থান
১৯৭১ সালের যুদ্ধে পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়ায় জামায়াতের ভূমিকা এখনো অনেক বাংলাদেশিকে ক্ষুব্ধ করে। তবে শেখ হাসিনার পলায়ন এবং শীর্ষ নেতাদের কারামুক্তির পর দলটি এখন অনেক বেশি আত্মপ্রত্যয়ী। রাজ্জাক আল জাজিরাকে বলেন, ‘হাসিনার আমলে আমাদের নেতারা প্রাণ দিয়েছেন, ছাত্রশিবিরের কর্মীরা নিহত হয়েছেন। এখন মানুষ আমাদের সততা দেখে আমাদের দিকে ঝুঁকছে।’

১৯৪১ সালে সৈয়দ আবুল আলা মওদুদীর হাত ধরে গঠিত এই দলটি ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরোধিতা করেছিল। স্বাধীনতার পর শেখ মুজিবুর রহমান দলটিকে নিষিদ্ধ করলেও ১৯৭৯ সালে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেন। নব্বইয়ের দশকে দলটি একটি উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক শক্তিতে পরিণত হয় এবং ১৯৯১ সালে বিএনপির সাথে জোট গঠন করে। ২০০১ সালে তারা খালেদা জিয়ার সরকারে দুটি মন্ত্রিত্বও পায়।

২০০৯ সালে হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর দলটির ভাগ্য আবার বদলে যায়। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দলটির প্রধান মতিউর রহমান নিজামী এবং সেক্রেটারি জেনারেল আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদসহ শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি দেওয়া হয়। দীর্ঘ ১৫ বছর দলটি রাজনৈতিকভাবে কোণঠাসা ছিল।

২০২৪-এর অভ্যুত্থানের পর বর্তমান আমির ডা. শফিকুর রহমানের নেতৃত্বে জামায়াত অত্যন্ত শক্তিশালীভাবে সংগঠিত হয়েছে। দলটির নায়েবে আমির ড. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের বলেন, ‘বিগত ৫৫ বছর ধরে বাংলাদেশ মূলত দুটি দল (আওয়ামী লীগ ও বিএনপি) শাসন করেছে। মানুষ তাদের ওপর হতাশ এবং তারা এখন নতুন রাজনৈতিক শক্তি চায়।’ জামায়াতের দাবি অনুযায়ী, তাদের প্রায় ২০ মিলিয়ন সমর্থক এবং ২ লাখ ৫০ হাজার প্রশিক্ষিত ‘রুকন’ সদস্য রয়েছে।

ইসলামি দল নিয়ে উদ্বেগ ও জামায়াতের অবস্থান
জামায়াতের এই উত্থানে অনেকেই আশঙ্কা করছেন যে, দলটি ক্ষমতায় আসলে শরিয়াহ আইন বা নারী স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ করবে কি না। তবে জামায়াত নেতারা দাবি করছেন, তারা দেশের বর্তমান সংবিধান এবং সংস্কার এজেন্ডার ওপর ভিত্তি করেই দেশ চালাবেন। ড. তাহের বলেন, ‘আমরা কোনো রক্ষণশীল দল নই, বরং আমরা একটি মধ্যপন্থী ইসলামি শক্তি। আমরা দুর্নীতির অবসান এবং সুশাসনের লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করব।’

নিজেদের উদার প্রমাণ করতে জামায়াত এবারই প্রথম খুলনায় একজন হিন্দু প্রার্থী (কৃষ্ণ নন্দী)-কে মনোনয়ন দিয়েছে।

বিশ্লেষক আসিফ বিন আলী বলেন, বাংলাদেশের মানুষ আগের চেয়ে বেশি ধার্মিক হলেও তারা রাজনৈতিকভাবে বাস্তববাদী। তারা সাধারণত ওলামাদের চেয়ে রাজনীতিকদেরই প্রাধান্য দেয়।

ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের টমাস কিন বলেন, ‘জামায়াত এবার তাদের ইতিহাসের সেরা ফলাফল করতে যাচ্ছে। তবে তারা এককভাবে ক্ষমতায় আসার মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে কি না, সে বিষয়ে আমি এখনো সন্দিহান, কারণ আগে কখনো তাদের ভোটের হার ১২ শতাংশের বেশি ছিল না।’

এনসিপির সাথে জোটের গুরুত্ব
বিশ্লেষকরা মনে করছেন, জামায়াতের এই উত্থান কেবল ধর্মীয় আদর্শের কারণে নয়, বরং সুশাসনের আকাঙ্ক্ষার কারণে। এসওএএস (SOAS) ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক মুশতাক খান বলেন, ‘মানুষ এখন ক্লিন ইমেজের প্রার্থী খুঁজছে। জামায়াতের দিকে মানুষের এই ঝোঁক মূলত দুর্নীতি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে একটি অবস্থান।’

বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে সাম্প্রতিক সময়ে ওঠা চাঁদাবাজির অভিযোগ জামায়াত-এনসিপি জোটকে সুবিধাজনক অবস্থানে দাঁড় করিয়েছে।

এনসিপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক এএসএম সুজা উদ্দিন বলেন, ‘ভারতের হেজেমনি বা আধিপত্যবাদী রাজনীতি রুখতে এবং ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশ গড়তেই এই কৌশলগত জোট গঠন করা হয়েছে।’

ভূ-রাজনীতির পরীক্ষা
আসন্ন নির্বাচন এবং জামায়াতের ফলাফল ভারত ও পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে একটি বড় পরীক্ষা হবে।

টমাস কিন সতর্ক করেছেন যে, জামায়াত ক্ষমতায় আসলে ভারতের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করা বিএনপির চেয়েও বেশি কঠিন হবে।

অন্যদিকে, হাসিনা সরকারের পতনের পর পাকিস্তানের সাথে বাংলাদেশের কূটনৈতিক ও বাণিজ্যিক যোগাযোগ আবার বৃদ্ধি পেতে শুরু করেছে।

অধ্যাপক মুশতাক খানের মতে, এই নির্বাচন কেবল ইসলাম বনাম ধর্মনিরপেক্ষতা বা বাম বনাম ডানের লড়াই নয়; এটি মূলত ‘সংস্কার’ বনাম ‘পুরানো ব্যবস্থার’ লড়াই। যে জোট স্থিতিশীলতা ও সংস্কারের বিশ্বাসযোগ্য প্রতিশ্রুতি দিতে পারবে, তারাই আগামী নির্বাচনে জয়ী হবে।

এমএইচএস

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর