সাড়ে তিন দশক পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাচ্ছে দেশ?
বাংলাদেশের প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২১:৩৭
ছবি: সংগৃহীত
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়েই সংসদে যাচ্ছে বিএনপি। ২৯৯ আসনের মধ্যে জোটগতভাবে ২১২ আসনে জয় পেয়েছে দলটি। ধানের শীষ প্রতীকে জিতেছে ২০৯ আসনে। দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জয় নিয়ে সরকার গঠনের পথে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন বিএনপি।
সরকার গঠন করলে কে হবেন প্রধানমন্ত্রী—এ আলোচনা এখন সর্বত্র। ইতিহাসও যেন তারেক রহমানের পক্ষেই কথা বলছে। তাঁর মা খালেদা জিয়া প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই প্রধানমন্ত্রী হয়েছিলেন। তারেক রহমানেরও এটি প্রথম নির্বাচন। দলের চেয়ারম্যানও তিনি। মাঠের আলোচনা সত্যি হলে তারেক রহমানই হচ্ছেন দেশের আগামীর প্রধানমন্ত্রী। তা হলে প্রায় সাড়ে তিন দশক পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী পাবে বাংলাদেশ।
১৯৮৯ সালে প্রধানমন্ত্রী ছিলেন কাজী জাফর আহমেদ। ১৯৯০ সালের পর দেশে আর কোনো পুরুষ প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব পালন করেননি। দীর্ঘ সময় বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া এবং আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনা সরকারপ্রধানের দায়িত্বে ছিলেন। এর মধ্যে খালেদা জিয়া তিন দফায় প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন। সর্বশেষ ক্ষমতায় ছিলেন শেখ হাসিনা।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে যান শেখ হাসিনা। এরপর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেয়। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের ভোটগ্রহণের মধ্য দিয়ে দেশের রাজনীতির চাকা নতুন মোড় নিয়েছে। সামনে এসেছে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সম্ভাবনা।
বিএনপি নির্বাহী কমিটির সদস্য অ্যাডভোকেট রফিক সিকদার বলেন, নেতৃত্বে নারী-পুরুষের বিচার নয়, নেতৃত্বের যোগ্যতা ও দক্ষতাই মুখ্য। দেশনেত্রী খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী ছিলেন—তাঁর কথাবার্তার শালীনতা মানুষ পছন্দ করত। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সভাপতি শেখ হাসিনাও প্রধানমন্ত্রী ছিলেন, কিন্তু তাঁর কথাবার্তা মানুষ পছন্দ করেনি।
মায়ের মতোই প্রথমবার নির্বাচিত হয়েই প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন তারেক?
১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের পতনের পর ১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত পঞ্চম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নেন খালেদা জিয়া। ওই নির্বাচনে বগুড়া-৭, ঢাকা-৫, ঢাকা-৯, ফেনী-১ ও চট্টগ্রাম-৮ আসনে লড়ে সব কটিতে বিপুল ভোটে জয়ী হন তিনি। পরে ফেনী-১ আসনটি প্রতিনিধিত্ব করার সিদ্ধান্ত নেন এবং বাকি চারটি আসন থেকে পদত্যাগ করেন। দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন খালেদা জিয়া।
অনেকেই মনে করছেন, মা খালেদা জিয়ার মতোই রাজনীতিতে পুনরুত্থান ঘটছে ছেলে তারেক রহমানেরও। তিনিও এবার প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশ নিয়েছেন। দুই আসনেই জিতেছেন। সংসদ নির্বাচনে প্রথমবার অংশ নিয়েই প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ার সুযোগ এসেছে তাঁর সামনেও। শেষ পর্যন্ত তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলে সেটি খালেদা জিয়ার প্রথমবার প্রধানমন্ত্রী হওয়ার ঘটনারই পুনরাবৃত্তি হবে বলে মনে করছেন অনেকে। বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবেই দেখছেন সমর্থকেরা।
যা বলছেন বিশ্লেষকেরা
দীর্ঘ সাড়ে তিন দশক পর পুরুষ প্রধানমন্ত্রী আসা—এটি কি বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে প্রজন্মান্তরের প্রতীক, নাকি কেবল নেতৃত্বের পরিবর্তন? এমন প্রশ্নের জবাবে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও রাজনীতি বিশ্লেষক মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, রাজনৈতিক নেতৃত্বকে লিঙ্গভিত্তিক ধারণা থেকে দেখাটা আধুনিক সময়ে বাস্তবসম্মত নয়।
তিনি বলেন, ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দলগুলোর নারী নেতৃত্ব নিয়ে বিভিন্ন নেতিবাচক অবস্থান থাকলেও আধুনিক বিশ্বে রাজনীতি, ব্যবসা-বাণিজ্য ও সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনে লিঙ্গবৈষম্য দূর করাই মূল লক্ষ্য। রাজনৈতিক নেতৃত্বের ক্ষেত্রে ডা. জুবাইদা রহমান, সৈয়দা শামিলা রহমান সিঁথি ও জাইমা রহমানের মতো নারীর অংশগ্রহণ একটি ইতিবাচক রাজনৈতিক পরিবেশের বার্তা দেয়।
১৯৯১ থেকে এখন পর্যন্ত নারী প্রধানমন্ত্রীদের অভিজ্ঞতা এবং পুরুষ-নারী নেতৃত্বের পালাবদল দেশের নেতৃত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে কোনো পরিবর্তন এনেছে কি না—এ প্রশ্নের জবাবে মোবাশ্বের হোসেন টুটুল বলেন, বাংলাদেশের বিশেষ রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দুইটি প্রধান রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বের হাল ধরতে হয়েছিল পরিবারের নারী সদস্যদের। সেই প্রেক্ষাপটের সঙ্গে বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতাকে এক করে দেখার সুযোগ সীমিত। বরং বলা যায়, প্রভাবশালী রাজনৈতিক পরিবারগুলো তাদের পরবর্তী প্রজন্মকে নেতৃত্বের জন্য যেভাবে প্রস্তুত করছে, রাজনীতি সেভাবেই এগোচ্ছে।
তিনি বলেন, পরিবারতান্ত্রিক রাজনীতির সমালোচনা থাকলেও দলের শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতার ক্ষেত্রে সুযোগ্য নেতৃত্বকে নেতিবাচক হিসেবে দেখার সুযোগ কম। নারীর ক্ষমতায়নের জন্য রাজনীতিতে তাঁদের অংশগ্রহণ ও নেতৃত্ব তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ।
মোবাশ্বের হোসেন টুটুল আরও বলেন, একসময় সর্বোচ্চ নেতৃত্বে নারী থাকলেও মাঠপর্যায়ে তাঁদের অংশগ্রহণ কম ছিল। তবে ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান থেকে শুরু করে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন পর্যন্ত মাঠপর্যায়ে নারীর অংশগ্রহণ সবার নজর কাড়ে। এর মধ্য দিয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় নারীর অংশগ্রহণ আরও নিশ্চিত হবে।
এএস/

