জাতীয় সংসদে বিরোধী দল হিসেবে দায়িত্বশীল, কার্যকর ও গঠনমূলক ভূমিকা পালন করতে চায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)। দল দুটির শীর্ষ নেতারা বলছেন, সরকারের জনকল্যাণমূলক ও ইতিবাচক পদক্ষেপে তারা সহযোগিতা করবেন।
তবে রাষ্ট্রীয় স্বার্থ, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ কিংবা জনগণের প্রত্যাশা অনুয়ায়ী গণভোটে ‘হ্যাঁ’ পাস হওয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নে গড়িমসি করার চেষ্টা করলে সংসদের ভিতরে কঠোর বিরোধিতা এবং প্রয়োজনে রাজপথে আন্দোলনের কর্মসূচি দেওয়া হবে।
জামায়াত ও এনসিপির একাধিক শীর্ষনেতা জানান, দেশের সা¤প্রতিক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে একটি শক্তিশালী ও দায়িত্বশীল বিরোধী দলের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে।
তাদের মতে, গণতন্ত্র কেবল সরকার পরিচালনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, কার্যকর বিরোধী দল ছাড়া সংসদীয় ব্যবস্থা পূর্ণতা পায় না। সংঘাত নয়, যুক্তিনির্ভর বিরোধিতার রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চান তারা।
জামায়াতের ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনোরেল ও ১১-দলীয় জোটের মুখপাত্র হামিদুর রহমান আযাদ দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেছেন, আমরা একটি কার্যকর সংসদ গড়ে তুলতে চাই। সরকারকে ভালো কাজের সহযোগিতা করব। আবার দেশের স্বার্থের বিরুদ্ধে সরকারের ভূমিকার গঠনমূলক সমালোচনা করব। এটি ১১ দলীয় জোট বা বিরোধী জোটের অবস্থান।’
তিনি আরো বলেন, ‘জুলাই সনদের ভিত্তিতেই নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে। সুতরাং গণভোটে পাস হওয়া জুলাই সনদ বাস্তবায়ন নিয়ে কোনো টালবাহানা করলে আমরা কোনো ছাড় দেবে না। সে ক্ষেত্রে রাজপথে ফয়সালা হবে।’
এনসিপির সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ আসনের নির্বাচিত সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বলেন, ‘অহেতুক কোনো তর্কে লিপ্ত হয়ে আমরা মূল্যবান সময় নষ্ট করতে চাই না। এখন সবাই মিলে দেশ গড়তে চাই। তবে, সরকার যদি জুলাই সনদ বাস্তবায়ন বা কোনো ক্ষেত্রে গণরায় উপেক্ষা করতে চায় তবে, রাজপথে আমরা মোকাবেলা করব।’
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক সাব্বির আহমদের মতে, ‘যদি বিরোধী দল তাদের ঘোষিত অবস্থান বাস্তবে কার্যকর করতে পারে, তবে সংসদীয় রাজনীতিতে নতুন ধারা তৈরি হতে পারে। নীতিনির্ভর বিতর্ক, তথ্যভিত্তিক সমালোচনা এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে ঐকমত্যের সমন্বয়ে গণতন্ত্র আরও শক্তিশালী হতে পারে। আমরা সেটি আশা করছি।’
সংসদে সক্রিয় ভূমিকার প্রতিশ্রুতি: দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদ অধিবেশনে নিয়মিত উপস্থিতি, বিল ও প্রস্তাবের ওপর বিস্তারিত পর্যালোচনা, বাজেট আলোচনা, প্রশ্নোত্তর পর্বে সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং প্রয়োজন হলে সংশোধনী প্রস্তাব উত্থাপনের মাধ্যমে তারা নিজেদের ভূমিকা দৃশ্যমান করতে চায়। বিরোধী দলের নেতারা মনে করেন, শুধু বক্তৃতা বা বর্জনের মাধ্যমে প্রতীকী প্রতিবাদ নয়- প্রাসঙ্গিক তথ্য-উপাত্ত ও বিকল্প নীতি প্রস্তাবের মাধ্যমে সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই হবে তাদের প্রধান লক্ষ্য।
পাশাপাশি সরকার যদি শিক্ষা, স্বাস্থ্য, অর্থনীতি, কর্মসংস্থান বা দুর্নীতিবিরোধী কার্যক্রমে ইতিবাচক পদক্ষেপ নেয় তাতে সহযোগিতা করবে বিরোধী দল।
জাতীয় স্বার্থে ‘আপসহীন’ অবস্থান
তবে জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার বা সাংবিধানিক কাঠামোর পরিপন্থী কোনো সিদ্ধান্ত এলে তার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার চিন্তাভাবনা করছে বিরোধী দল। নেতাদের ভাষ্য, সংসদের ভেতরে যুক্তিপূর্ণ বিতর্ক, গণমাধ্যমে বক্তব্য এবং প্রয়োজনে শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের মাধ্যমে তারা অবস্থান পরিষ্কার করবে। তারা রাজপথকে সবক্ষেত্রে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নিতে চান না। তবে, জনগণের রায় ও স্বার্থ উপেক্ষিত হলে গণতান্ত্রিক আন্দোলন করতে চান তারা।
মুক্তিযুদ্ধ ও ‘জুলাই চেতনা’ রক্ষার অঙ্গীকার: জামায়াত ও এনসিপি নেতারা জানিয়েছেন, মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পাশাপাশি ‘জুলাই চেতনা’ অক্ষুণ্ন রাখা তাদের রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতির অংশ। বিশেষ করে ‘জুলাই হত্যাকাণ্ড’-এর বিচার দ্রুত, নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় সম্পন্ন করার দাবি জানিয়েছে দল দুটি। এ বিষয়ে কোনো ধরনের বিলম্ব, গড়িমসি বা আপসের ইঙ্গিত পেলে তারা সংসদে কঠোর অবস্থান নেওয়ার পাশাপাশি রাজপথেও কর্মসূচি ঘোষণা করতে পারেন।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্ন: গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয়ী হওয়ার পর যে সংস্কার ও অঙ্গীকার সামনে এসেছে, তা বাস্তবায়নকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে বিরোধী দল। নেতারা বলেন, গণভোট জনগণের প্রত্যক্ষ রায়। এটি উপেক্ষা করা মানে জনগণের সিদ্ধান্তকে অস্বীকার করা।
তাদের মতে, গণভোট-পরবর্তী সংস্কার প্রক্রিয়া থেকে সরকার সরে আসার কোনো লক্ষণ দেখা গেলে তা গণতন্ত্রের জন্য অশনি সংকেত হবে। সে ক্ষেত্রে সংসদীয় প্রতিবাদ থেকে শুরু করে বৃহত্তর রাজনৈতিক কর্মসূচিও দেওয়া হতে পারে।
এখন দেখার বিষয়, ঘোষিত অঙ্গীকার কতটা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং সংসদ ও রাজপথ-দুই অঙ্গনেই বিরোধী দল কতটা প্রভাব বিস্তার করতে পারে।
বিকেপি/এমবি

