ছবি: সংগৃহীত
বর্তমান সরকারের স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ‘দলীয় প্রতীক’ তুলে দেওয়ার ঘোষণায় গণ অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও কার্যক্রম নিষেধাজ্ঞায় থাকা আওয়ামী লীগের অনেকেই তাতে অংশগ্রহণের সুযোগ নিতে পারে।
দলটির পদ-পদবিতে নেই কিন্তু কট্টর সমর্থক ও স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী অনেকেই ভোটে অংশগ্রহণের পরিকল্পনা করছেন। যদিও হামলা ও মামলার আশঙ্কায় তারা আগেভাগে নাম প্রকাশ করতে চাইছেন না।
যদিও বিএনপি ও জামায়াত নেতারা আওয়ামী লীগের এই সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তারা মনে করছেন, সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডের আওতায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ রয়েছে।
গতকাল বুধবারের সংসদ অধিবেশনে দলটির নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী আইনে রূপ দেওয়া হয়েছে। তাই দলটির কোনো কর্মী-সমর্থক ভোটে অংশ নিতে পারবেন না বলে সরকার ও ইসির নির্দেশনা আসবে।
বর্তমান সরকার গঠনের পর থেকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন কবে হবে সে প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে থাকে। তবে এ প্রশ্নের উত্তরের আগে সরকার স্থানীয় নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকবে কিনা সে বিষয়টি সামনে আসছে।
এমন প্রশ্নের উত্তরে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম গত কয়েকদিন একাধিক অনুষ্ঠানে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে দলীয় প্রতীক থাকছে না।’
এই সিদ্ধান্তে স্থানীয় পর্যায়ে ব্যক্তিকেন্দ্রিক রাজনীতির গুরুত্ব বাড়াবে এবং দলীয় পরিচয়ের বাইরে প্রার্থীদের গ্রহণযোগ্যতা বড় ‘ফ্যাক্টর’ হয়ে উঠবে বলেও নির্বাচন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ও বিদায়ী অন্তর্বর্তী সরকারের নির্বাচন ব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের এক সদস্য দৈনিক বাংলাদেশের খবরকে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে আসলে দলীয় প্রতীক রাখা উচিত নয়। এতে প্রার্থীদের ব্যক্তিকেন্দ্রিক ইমেজের থেকে দলের প্রভাব বেশি প্রতিফলিত ঘটে। স্থানীয় নির্বাচন দলীয় প্রতীকবিহীন হলে ব্যক্তিকেন্দ্রিক যোগ্যতার প্রমাণ সামনে আসে।’
এ ছাড়া আওয়ামী লীগের নির্বাচনে অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রতীক না থাকলে দলটির কোনো কোনো সমর্থক নির্বাচনে অংশ গ্রহণের সুযোগ পেতে পারেন। কোনোভাবেই তাদের নির্বাচনের বাইরে রাখার সুযোগ থাকবে না।’
আড়ালে থেকে ‘সচেষ্ট’ আওয়ামী লীগ: দেশের বিভিন্ন প্রান্তের আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বলছেন, দলের যেসব নেতা পদ-পদবিতে নেই কিন্তু নিজ নিজ এলাকায় প্রভাবশালী ও সংগঠক হিসেবে পরিচিত, তাদের অনেকেই স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তারা স্থানীয়ভাবে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগ বাড়াচ্ছেন। পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্ক সক্রিয় করার চেষ্টা করছেন।
তবে হামলা, গ্রেপ্তার ও মামলার আশঙ্কায় অধিকাংশই এখনো প্রকাশ্যে নিজেদের প্রার্থিতা ঘোষণা করতে চাইছেন না। সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার সীমান্তবর্তী কাকডাঙ্গা ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য এক চেয়ারম্যান প্রার্থী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি অনুকূল নয়। তবে জনগণের সঙ্গে আমাদের যে সম্পর্ক, তা কাজে লাগিয়ে সুযোগ পেলে নির্বাচনে অংশ নেব।’
আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা যা ভাবছেন: কার্যক্রম নিষিদ্ধে থাকা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম কার্যত সরকার পতনের পর থেকে দেশের বাইরে অবস্থান করছেন। তিনি টেলিফোনে বলেন, ‘স্থানীয় সরকার নির্বাচনে প্রতীক না থাকলে হয়তো নির্বাচনে অংশ নিতে পারবেন অনেকে। কিন্তু তার থেকে বড় কথা আমরা রাজনীতিতে ফিরতে চাই। এখন যারা দেশে গণতন্ত্রের কথা বলছেন তাদের কাছে প্রশ্ন তাহলে আমাদের দল নিষিদ্ধ কেন?’
তিনি বলেন, ‘আমাদের রাজনীতি শুধু প্রতীকের ওপর নির্ভরশীল নয়। জনগণের সঙ্গে আমাদের সম্পর্কই সবচেয়ে বড় শক্তি। সেই জায়গা থেকেই আমরা ফিরে আসবো।’
আরেকজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, ‘আইনি জটিলতা ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি পরিষ্কার না হলে অনেকেই শেষ পর্যন্ত সামনে আসতে সাহস পাবেন না।’
বিএনপি ও জামায়াতের কড়া বার্তা: অন্যদিকে বিএনপি ও জামায়াত নেতারা আওয়ামী লীগের এই সম্ভাব্য অংশগ্রহণের বিষয়টিকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। তাদের দাবি, সন্ত্রাসবিরোধী কর্মকাণ্ডের আওতায় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ রয়েছে এবং এই নিষেধাজ্ঞাকে স্থায়ী আইনে পরিণত করার প্রক্রিয়া চলছে।
বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান ড. আসাদুজ্জামান রিপন বলেন, ‘আইনগতভাবে নিষিদ্ধ একটি দলের কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে এটা বাস্তবসম্মত নয়। নির্বাচন কমিশন ও আদালতই এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেবে। তার আগে আমরা বিষয়টিতে চিন্তা করতে চাই না।’
জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, ‘সন্ত্রাসবিরোধী আইনে যে দল নিষিদ্ধ তাদের কেউ নির্বাচনে অংশ নিতে পারবে বলে মনে হয় না। বিষয়টি পরবর্তীতে দেখা যাবে।’
প্রতীক রাজনীতি থেকে প্রতীকহীনতা শুরু যেভাবে: আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৫ সালের ৩০ নভেম্বর মন্ত্রিসভায় স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। যা পরবর্তীতে আইন হিসেবে কার্যকর হয়। সে সময় বিএনপি ও জামায়াত এই ব্যবস্থার তীব্র সমালোচনা করে বলেছিল, এতে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার স্বতন্ত্র চরিত্র ক্ষুণ্ন হয়েছে।
সাম্প্রতিক প্রশাসক নিয়োগ ও বিতর্ক: বর্তমান সরকার গঠনের পর কয়েকটি সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলে তা নিয়ে তুমুল বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিরোধীদের অভিযোগ করে, নির্বাচনের আগে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ নিশ্চিত করতে এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যদিও সরকার দাবি করে, প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল রাখতেই এ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। সরকার দ্রুত স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ঘোষণা দিয়েছে।
অবশ্য, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর অল্প সময়ের মধ্যে সিটি করপোরেশন, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদের বহু পদে প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব স্থানে দায়িত্বে থাকা আওয়ামী লীগের অনেক জনপ্রতিনিধি গুম-খুনসহ বিভিন্ন মামলার আশঙ্কায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন। ফলে স্থানীয় প্রশাসন ও রাজনৈতিক কাঠামোয় এক ধরনের শূন্যতা তৈরি হয়।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

