ছবি: সংগৃহীত
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে কোনোভাবেই মাঠে দাঁড়াতে দেবে না সরকারি দল বিএনপি ও বিরোধী দল জামায়াত-এনসিপি জোট। ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও আইনি সংকটে থাকা আওয়ামী লীগ ফের সক্রিয় হওয়ার খবরে দলগুলোতে এমন চিন্তাভাবনা চলছে। নানা বিষয়ে নিজেদের মধ্যে বিভেদ থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে তাদের মধ্যে দৃঢ় ঐক্য রয়েছে।
দলগুলোর নেতারা বলছেন, গণহত্যায় অভিযুক্ত শেখ হাসিনার আওয়ামী লীগকে রাজনীতি করতে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। বরং জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত শেষ করার তাগিদ রয়েছে তাদের মাঝে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ ভারতে আশ্রয় নিয়েছেন। দেশে অবস্থানকারী কর্মীরা হামলা-মামলায় জর্জরিত। বেশ কিছুদিন নীরব থাকলেও দলটির নেতারা এখন সরব হওয়ার চেষ্টা করছেন। আওয়ামী লীগ সভাপতি ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এখন নানাভাবে কর্মীদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন। নেতাকর্মীদের সঙ্গে ভার্চুয়াল বৈঠক, বিদেশি কূটনৈতিক মহলে যোগাযোগের চেষ্টা, আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে নিজেদের অবস্থান তুলে ধরছেন শেখ হাসিনাসহ দলটির শীর্ষ নেতারা। এরপর দলটিকে নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী প্রফেসর দিলারা চৌধুরী বাংলাদেশের খবরকে বলেন, আওয়ামী লীগের দ্রুত রাজনীতিতে ফিরে আসার সম্ভাবনা এখনো ক্ষীণ।
তার মতে, কর্মী-সমর্থকদের চাঙা রাখতে শেখ হাসিনা বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন। বিচ্ছিন্নভাবে কোথাও কোথাও ঝটিকা মিছিল দেখা গেলেও সেটিকে আওয়ামী লীগের কার্যকর রাজনৈতিক প্রত্যাবর্তন বলা যায় না। বর্তমান রাজনৈতিক ও আইনি বাস্তবতায় দলটির জন্য রাজনীতির মূলধারায় ফিরে আসা সহজ হবে না। নিজের অস্তিত্বের প্রশ্নে বর্তমান সরকারি দল ও বিরোধী দল আওয়ামী লীগকে রাজনীতিতে করতে দেবে না এটাই স্বাভাবিক।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সংস্কার, নির্বাচন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কিংবা রাষ্ট্র পরিচালনার বিভিন্ন প্রশ্নে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগ ইস্যুতে তাদের অবস্থান প্রায় অভিন্ন। দলগুলো মনে করে, জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থান, রাজনৈতিক দমন-পীড়ন, গুম-খুন এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের দায় থেকে আওয়ামী লীগকে বিচারের মুখোমুখি না করে রাজনীতিতে ফেরার সুযোগ দেওয়া হলে তা গণআকাক্সক্ষার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
নিষিদ্ধ হওয়ার পটভূমি: গণঅভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকারের সময় প্রথমে নির্বাহী আদেশের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্থগিত করা হয়। পরে জাতীয় সংসদে প্রয়োজনীয় আইন ও সংশোধনী পাসের মাধ্যমে দলটির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ফের নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। ফলে নিবন্ধন, নির্বাচনী কার্যক্রম এবং প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ বড় ধরনের আইনি বাধার মুখে পড়ে। ইতোমধ্যে শেখ হাসিনা ও সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালকে মানবতিাবিরোধী অপরাধে ফাঁসির রায়ও দিয়েছেন আদালত।
ছাড় দেবে না বিএনপি: বিএনপির নীতিনির্ধারকরা বলছেন, গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। দলটি গণহত্যায় জড়িত। তাই দলটির রাজনৈতিক পুনর্বাসনের প্রশ্নই ওঠে না। তাদের মতে, বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ নেই।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য বেগম সেলিমা রহমান বাংলাদেশের খবরকে বলেন, বিগত সময়ে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর যে দমন-পীড়ন চালানো হয়েছে, তার বিচার কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত আওয়ামী লীগকে পুনরায় মাঠে নামতে দেবে না জনগণ। আওয়ামী লীগকে ফিরতে দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। দলটির গণহত্যাকারীদের আগে তাদের বিচার নিশ্চিত করবে সরকার।
সম্প্রতি দলটি ফের সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা প্রশ্নে তিনি বলেন, কেউ কেউ ঝটিকা মিছিলের চেষ্টা করছে। প্রশাসন শক্তভাবে সেগুলো দমন করবে। যেহেতু তারা নিষিদ্ধ সুতরাং তাদরকে ফেরার সুযোগ নেই। বিএনপির ক্ষতিগ্রস্ত নেতাকর্মীরা এ ব্যাপারে ছাড় দেবে না।
জামায়াতের আপসহীন অবস্থান: জাতীয় সংসদের বিরোধী দল জামায়াতে ইসলামীর নেতারাও আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক পুনর্বাসনের বিপক্ষে কঠোর অবস্থান নিয়েছেন। তাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে দলীয়করণ, নির্বাচন ব্যবস্থার ওপর আস্থাহীনতা তৈরি এবং বিদেশে পাচারসহ বিরোধী মত দমনে দায়ের হওয়া মামলায় আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচার নিশ্চিত শক্ত অবস্থানে রয়েছে জামায়াত। পতনের পর থেকেই আওয়ামী লীগের প্রশ্নে শক্ত অবস্থানে রয়েছে জামায়াত।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও দলটির মিডিয়া বিভাগের প্রধান এহসানুল মাহবুব জুবায়ের বলেন, জনগণের আন্দোলনের মাধ্যমে যে রাজনৈতিক পরিবর্তন এসেছে, সেটিকে ব্যর্থ করতে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তনের কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। প্রয়োজন হলে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিকভাবে দলটির পুনরুত্থান ঠেকাতে সব গণতান্ত্রিক শক্তিকে সঙ্গে নিয়েই দলটিকে মোকাবেলা করা হবে।
প্রয়োজনে ফের মাঠে নামবে এনসিপি: নতুন রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগিরিক পার্টিও (এনসিপি) আওয়ামী লীগের পুনর্বাসনের প্রশ্নে কঠোর অবস্থানে রয়েছে। দলটির নেতারা বলছেন, নতুন বাংলাদেশ গঠনের যে অঙ্গীকার নিয়ে যে গণঅভ্যুত্থান হয়েছে আওয়ামী লীগের প্রত্যাবর্তন সেই লক্ষ্যকে বাধাগ্রস্ত করবে। সুতরাং এ ব্যাপাওে কোনো ছাড় দেবে না দলটি।
এনসিপির সদস্য ও রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন বাংলাদেশের খরবকে বলেন, জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বার্থে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে আনা গণহত্যাসহ সব অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু নিষ্পত্তি প্রয়োজন। দলটির বিচার হওয়া জরুরি। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম স্বাভাবিক করার কোনো সুযোগ নেই। প্রয়োজনে ফের মাঠে নামবে ছাত্র-জনতা।
মতভেদ থাকলেও আওয়ামী লীগ প্রশ্নে ঐক্য: রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, নির্বাচন পদ্ধতি, রাষ্ট্র সংস্কার, স্থানীয় সরকার নির্বাচন কিংবা ক্ষমতার ভারসাম্য নিয়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যে নানা মতভেদ রয়েছে। বিভিন্ন সময় এসব ইস্যুতে প্রকাশ্য বিতর্কও দেখা গেছে। তবে আওয়ামী লীগ প্রশ্নে তিন পক্ষের অবস্থান প্রায় অভিন্ন।
তাদের অভিন্ন বক্তব্য হলোÑ গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, রাজনৈতিক জবাবদিহি এবং বিচারিক প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার আগে আওয়ামী লীগের পুনর্বাসন গ্রহণযোগ্য নয়। রাজনৈতিক প্রতিযোগিতায় পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও আওয়ামী লীগের পুনরুত্থান ঠেকানোর প্রশ্নে তারা একই কাতারে অবস্থান করছে।
বাংলাদেশের খবর/আরইউ

