আল্লামা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমী রহ. ছিলেন এক আলোকিত জীবনের পথিকৃৎ
মাওলানা মোস্তফা ওয়াদুদ
প্রকাশ: ২৯ নভেম্বর ২০২৫, ২১:৩৪
বাংলাদেশের সমকালীন ইসলামী চিন্তা ও আদর্শভিত্তিক রাজনীতির অঙ্গনে যাঁরা নীরবে কিন্তু দৃঢ়ভাবে প্রভাব রেখে গেছেন- তাঁদের অন্যতম আল্লামা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমী (রহ.)। তিনি ছিলেন একাধারে প্রাজ্ঞ মুহাদ্দিস, তীক্ষ্ণ অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন আলেম, তাকওয়াভিত্তিক ইসলাহি রাহবার এবং দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদ। আজ তাঁর ইন্তেকালের মধ্য দিয়ে এক আলোকিত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটল; তবে তাঁর চিন্তা, শিক্ষা ও আদর্শ বেঁচে থাকবে বহুদিন।
জন্ম ও বংশীয় উত্তরাধিকার
১৯৫৮ সালের ২০ ডিসেম্বর কুমিল্লা জেলার চড্ডা গ্রামের এক ধর্মভীরু পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। তাঁর পিতা মৌলভী আব্দুল ওয়াদুদ (রহ.) ছিলেন একান্ত ধার্মিক ও আল্লাহওয়ালা মানুষ। বাবার তত্ত্বাবধানে প্রাথমিক ইলমী শিক্ষা গ্রহণের মধ্য দিয়েই তাঁর জীবনে রোপিত হয় ইলম, তাকওয়া ও খেদমতের বীজ; যা পরবর্তীতে মহীরুহ হয়ে ওঠে।
ইলমী যাত্রার সূচনা
শৈশবেই তাঁর মাঝে জ্ঞানের প্রতি তীব্র আকর্ষণ লক্ষ্য করা যায়। ১৯৬৫ সালে প্রাথমিক শিক্ষা শেষে তিনি নাঙ্গলকোট হাফেজিয়া মাদরাসায় ভর্তি হয়ে পূর্ণাঙ্গ হিফজ সম্পন্ন করেন। এরপর শরিয়তপুরের নন্দনসার মাদরাসায় ভর্তি হন, যেখানে তাঁর বড় ভাই আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমী (রহ.) এর সরাসরি তত্ত্বাবধানে হেদায়াতুন্নাহু পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন।
হাটহাজারী থেকে দেওবন্দ: ইলমের পরিপূর্ণতা
মধ্যম স্তরের পড়াশোনা শেষে তিনি ভর্তি হন চট্টগ্রামের ঐতিহ্যবাহী হাটহাজারী মাদরাসায় এবং সেখানে জালালাইন পর্যন্ত কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন। তবে তাঁর জ্ঞানপিপাসা এখানেই পূর্ণতা পায়নি। আরও উচ্চতর ইলমের সন্ধানে তিনি পাড়ি জমান ভারতবর্ষের বিশ্বখ্যাত দারুল উলুম দেওবন্দে।
১৯৮৫ সালে দারুল উলুম দেওবন্দ থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে দাওরায়ে হাদিস সমাপ্ত করেন। সেখানে তিনি যুগশ্রেষ্ঠ আলেম ও মুহাদ্দিসদের সান্নিধ্য লাভ করেন। যেমন- মাওলানা রিয়াসাত আলী বিজনূরী (রহ.), মাওলানা কামরুদ্দীন (রহ.), মুফতি সাঈদ আহমদ পালনপুরী (রহ.), মাওলানা আব্দুল খালেক মাদরাজী (রহ.), মুফতি আমীন পালনপুরী (রহ.) প্রমুখ।
এই মহান মনীষীদের সোহবত তাঁর চিন্তাধারা, আত্মিক গভীরতা ও হাদিসবোধকে সুসংহত করে তোলে।
শিক্ষকতা, তাকরীর ও দাওয়াতি জীবন
দেশে ফিরে ১৯৮৬ সালে তিনি চৌধুরীপাড়া মাদরাসায় মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে দীর্ঘদিন তিনি জামিয়া মাহমুদিয়া ইসহাকিয়া, মানিকনগরে নায়েবে মুহতামিম ও শায়খে ছানী হিসেবে ইলম ও আমলের সেবায় নিয়োজিত থাকেন।
তিনি ছিলেন একজন স্বীকৃত মুহাদ্দিস। দাওরায়ে হাদিসে তাঁর দরসে থাকত গভীর তাহকিক, সহজ উপস্থাপনা ও আত্মশুদ্ধির দিকনির্দেশনা। রাজধানীর শাহজাহানপুর মসজিদের দীর্ঘদিনের খতিব হিসেবে তাঁর জুমার খুতবা ও বয়ান সাধারণ মানুষকে দ্বীনের পথে দৃঢ়ভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।
আদর্শভিত্তিক রাজনীতিতে ভূমিকা
আল্লামা কাসেমী (রহ.) ছিলেন কেবল মাদরাসার দেয়ালে আবদ্ধ আলেম নন; বরং আদর্শিক ও ইসলামী রাজনীতির ক্ষেত্রেও তিনি ছিলেন দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ এক পথপ্রদর্শক। ক্ষমতার লোভ নয়; বরং নীতি, ন্যায় ও ইসলামী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাঁর রাজনৈতিক চিন্তার কেন্দ্রবিন্দু। এজন্য ইলমী অঙ্গন ও রাজনীতির উভয় মহলেই তিনি ছিলেন শ্রদ্ধেয় ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিত্ব।
ছাত্রদের কাছে একজন অভিভাবক
ছাত্রদের সাথে তাঁর সম্পর্ক ছিল মায়ামাখা ও অনুপ্রেরণামূলক। পিতার মতো শাসন, বন্ধুর মতো পরামর্শ এবং মুরব্বির মতো দোয়া; সবই ছিল তাঁর আচরণে। লেখকের জন্য সৌভাগ্যের বিষয়, তাঁর কাছে নূরুল ঈযাহ অধ্যয়ন এবং শরহে বেকায়া সময়ে মেশকাত শরীফের শেষ ঘণ্টার দরসে অংশগ্রহণ আজও স্মৃতির অমলিন অনুষঙ্গ।
ব্যক্তিত্ব ও পারিবারিক জীবন
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ছিলেন অতি সাধারণ, বিনয়ী ও নির্লোভ। নিঃস্ব ও অসহায় মানুষের প্রতি ছিল তাঁর হৃদয়ভরা মমতা। নাম-যশ নয়, বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিই ছিল তাঁর জীবনের চূড়ান্ত লক্ষ্য।
পারিবারিক জীবনে তিনি ছিলেন সফল ও প্রশান্ত। রেখে গেছেন ২ পুত্র ও ৩ কন্যা; যাঁদের মধ্যে দুই পুত্র আজ ইলমী অঙ্গনে প্রতিষ্ঠিত আলেম হিসেবে দ্বীনের খেদমতে নিয়োজিত।
বিদায়, কিন্তু চিরঅম্লান স্মৃতি
আজ আল্লামা আব্দুল কুদ্দুস কাসেমী (রহ.) আমাদের মাঝ থেকে বিদায় নিয়েছেন। কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া ইলম, হাদিসের দরস, খুতবা, আদর্শ, শিষ্যদের হৃদয়ে রোপিত দ্বীনের ভালোবাসা; এসবই তাঁর প্রকৃত উত্তরাধিকার। ইতিহাস তাঁকে মনে রাখবে একজন দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদ, প্রজ্ঞাবান মুহাদ্দিস এবং আল্লাহওয়ালা আলেম হিসেবে।
আল্লাহ তাআলা তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মর্যাদা দান করুন। আমীন।

