শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত সম্পর্কে ইসলামের বিধান
মুফতী খায়রুল হাসান বিন মুজাহিদ
প্রকাশ: ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ১২:১০
পরিবার মানুষের জীবনের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান। সুখী পরিবারই জীবনে প্রশান্তি, মানসিক স্বস্তি ও সমাজে স্থিতি আনে। কিন্তু বাস্তবে আমরা দেখি—অবহেলা, দায়িত্বহীনতা, অহংকার ও ভুল বোঝাবুঝির কারণে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও অশান্তি বেড়ে যায়। স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক সম্মান, শ্বশুর-শাশুড়ি ও বৌয়ের সুসম্পর্ক, সন্তানদের কর্তব্য পালন—এসব মিলেই একটি শান্তিপূর্ণ পরিবারের ভিত্তি গড়ে ওঠে।
ইসলামের শিক্ষা হলো—ভালোবাসা, সহযোগিতা ও দায়িত্ববোধ ছাড়া পরিবার কখনো স্থায়ী শান্তি পাবে না। আজকের সমাজে একটি প্রচলিত ধারণা হলো—স্ত্রীর জন্য শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত হাদীসে নেই। অনেকেই এ নিয়ে বিতর্ক করেন। কিন্তু এটি ভুল। হাদীসে কোথাও লেখা নেই যে খেদমত করা নিষিদ্ধ। বরং নবীজী (সা.) নিজে খেদমতে খালক করেছেন। খেদমতের ফজিলত সকলের জন্য—মানুষ হোক, জীব-জন্তু হোক বা পশু-পাখি—সমানভাবে প্রযোজ্য। নবীজি (সা.) খেদমতের জন্য উৎসাহ দিয়েছেন। তাই শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমতের সময় “হাদীসে নেই” বলে অস্বীকার করা মূলত ভুল।
মূল সমস্যা হলো, আমরা আমাদের দায়িত্ব ঠিকভাবে বুঝি না। নিজের কর্তব্য ভুলে অন্যের উপর চাপ দেওয়া বা অনাধিকার প্রয়োগ—এ কারণে পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও কলহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ইসলামি আদর্শ ছাড়া পারিবারিক শান্তি সম্ভব নয়।
অনেকে বিবাহের মাধ্যমে এই ধারণা পোষণ করেন যে, স্ত্রীকে শুধু শ্বশুর-শাশুড়ির খেদমত করানোই যথেষ্ট। আসলে এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ ভুল। স্ত্রী কাজের মেয়ে নয়, বরং স্বামীর অধিকার ও সম্মানের অংশ। যদি মায়ের খেদমত প্রয়োজন হয়, তাহলে প্রয়োজনমতো দায়িত্বের জন্য কোনো কর্মচারীকে নিয়োগ করে বেতন দিয়ে খেদমত করানো যেতে পারে।
মূল বিষয় হলো—আমাদের মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে হবে। খেদমতকে জোর করে বোঝানো বা স্ত্রীর মর্যাদা হ্রাস করা উচিত নয়; বরং ভালোবাসা, সম্মান ও স্বেচ্ছায় সম্পর্ক মজবুত করতে হবে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, আর তোমার রব আদেশ দিয়েছেন যে, তোমরা তাঁকে ছাড়া অন্য কারো ইবাদাত করবে না এবং পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করবে। তাদের একজন অথবা উভয়েই যদি তোমার নিকট বার্ধক্যে উপনীত হয়, তবে তাদেরকে ‘উফ’ বলো না এবং তাদেরকে ধমক দিও না। আর তাদের সাথে সম্মানজনক কথা বল।” — [সূরা আল-ইসরা, আয়াত নং ২৩]
আল্লাহ আরো বলেন, “তোমরা ইবাদাত কর আল্লাহর, তাঁর সাথে কোন কিছুকে শরীক করো না। আর সদ্ব্যবহার কর মাতা-পিতার সাথে, নিকট আত্মীয়ের সাথে, ইয়াতীম, মিসকীন, নিকট আত্মীয়- প্রতিবেশী, অনাত্মীয়- প্রতিবেশী, পার্শ্ববর্তী সাথী, মুসাফির এবং তোমাদের মালিকানাভুক্ত দাস-দাসীদের সাথে। নিশ্চয় আল্লাহ পছন্দ করেন না তাদেরকে যারা দাম্ভিক, অহঙ্কারী।” (সূরা নিসা, আয়াত নং ৩৬)
এই আয়াত ও হাদীসগুলো থেকে স্পষ্ট—খেদমত শুধু দায়িত্ব নয়, এটি সওয়াবের কাজ। স্ত্রীকে খেদমতকে বাধ্যতামূলক মনে না করে সওয়াবের উদ্দেশ্যে করতে হবে। স্বামীর দায়িত্ব হলো খেদমত নিজের দায়িত্ব হিসেবে গ্রহণ করা, জোর করে করানো নয়। শ্বশুর-শাশুড়ি যেন বৌমাকে কেবল কাজের মানুষ হিসেবে না দেখে, কন্যার মতো সম্মান করে। এভাবে প্রত্যেকে দায়িত্ব বুঝলে পারিবারিক দ্বন্দ্ব কমে আসে এবং সংসার শান্তিপূর্ণ হয়।
দ্বন্দ্ব কমানোর জন্য প্রথমে দায়িত্ব ও অধিকার সঠিকভাবে বোঝা জরুরি—কোন কাজ ফরজ, কোনটা নফল, কোনটা মুস্তাহাব। সমস্যা হলে রাগ বা অভিযোগ না করে সরাসরি খোলামেলা আলোচনা করা উচিত। এছাড়া ক্ষমা ও ধৈর্য—ভুলে সহজে রাগ না করা—পারিবারিক সম্পর্ককে মজবুত করে।
আল্লাহ তাআলা বলেন, “আর মন্দের প্রতিফল অনুরূপ মন্দ অতঃপর যে ক্ষমা করে দেয় ও আপস-নিষ্পত্তি করে তার পুরস্কার আল্লাহর কাছে আছে। নিশ্চয় তিনি যালিমদেরকে পছন্দ করেন না।” (সূরা শূরা, আয়াত নং ৪০)
সুতরাং, পরিবার তখনই সুখী হবে, যখন স্বামী দায়িত্ব বুঝবে, স্ত্রী খেদমত করবে সওয়াবের উদ্দেশ্যে, এবং শ্বশুর-শাশুড়ি বৌমাকে কন্যার মতো সম্মান করবে। পারস্পরিক ভালোবাসা, সহযোগিতা এবং ইসলামের নির্দেশনা মেনে চলাই পারিবারিক শান্তির মূল চাবিকাঠি।
লেখক : মুহাদ্দিস ও সিনিয়র শিক্ষক- সাতগাঁও মাদ্রাসা বিজয়নগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
আইএইচ/

