পূজা দেখতে যাওয়া মুসলমানের জন্য জায়েজ কি?
মুফতি খায়রুল হাসান বিন মুজাহিদ
প্রকাশ: ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২৫, ০৮:৩৪
মানবজাতি শুরু থেকেই সামাজিক জীব। সমাজে নানা প্রকার উৎসব, অনুষ্ঠান ও রীতিনীতির প্রচলন রয়েছে। কিন্তু ইসলাম এসেছে মানবজাতিকে শিরক, কুসংস্কার ও বিদআত থেকে মুক্ত করতে এবং একমাত্র আল্লাহর ইবাদতে নিয়োজিত করতে। এ কারণে মুসলমানদের জন্য আল্লাহ তাআলা দুটি বিশেষ ঈদ দান করেছেন- ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা। এর বাইরে অন্য কোনো ধর্মীয় উৎসব ইসলামে স্বীকৃত নয়।
বর্তমান যুগে দেখা যায়, অনেক মুসলমান অমুসলিমদের বিভিন্ন উৎসবে অংশগ্রহণ করে, অভিনন্দন জানায়, এমনকি আনন্দ-উৎসবে শরিক হয়। যেমন বর্তমানে সারা দেশে হিন্দুদের দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে, এতে মুসলমানদের অনেককে অংশ নিতে দেখা যায়। প্রশ্ন হলো- এটি শরীয়তের দৃষ্টিতে বৈধ কি না?
হাকিমুল উম্মত আশরাফ আলী তানভী (রহ.) তাঁর উর্দু ফতোয়ার বিখ্যাত গ্রন্থ ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে উল্লেখ করেছেন, ‘হিন্দুদের উপাসনালয়ের মেলায় সাধারণ মুসলমানদের যাওয়া, বিশেষ করে আলেমদের সেখানে যাওয়া- আর তা-ও যদি কোনো জোরালো দুনিয়াবি প্রয়োজন না থাকে, কেবল ভ্রমণ ও ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে হয়, তাহলে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ও খুবই নিন্দনীয় কাজ।’
হাদিসেও এসেছে, ‘যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের সংখ্যা বাড়ায়, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত।’
সহিহ হাদিসে আরও এসেছে- কিয়ামতের কাছাকাছি সময়ে একটি সেনাদল কাবা ধ্বংসের উদ্দেশ্যে রওনা দেবে। পথিমধ্যে তারা সবাই মাটির নিচে ধসে যাবে। নবিজীর এক স্ত্রী জিজ্ঞেস করলেন, ইয়া রাসুলুল্লাহ তাদের মধ্যে ব্যবসায়িক আছে যারা যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করে না, তাদের কি অপরাধ? তখন রাসূল (সা.) বলেন- আল্লাহর শাস্তি যখন আসে, তখন তা সবার ওপর সাধারণভাবে আসে। কিয়ামতের দিন অবশ্যই প্রত্যেককে নিজের নিয়তের ভিত্তিতে উঠানো হবে। এ থেকে স্পষ্ট হলো, যারা কেবল ব্যবসার কারণে তাদের সাথে ছিল তারাও শাস্তি থেকে রক্ষা পেল না। তাহলে যারা কোনো প্রয়োজন ছাড়াই শুধু ভ্রমণ বা আনন্দ করার জন্য অমুসলিমদের এমন সমাবেশে যাবে, তারা কীভাবে আল্লাহর গজব থেকে নিরাপদ থাকবে? (ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৯, পৃষ্ঠা ৪২৬-৪২৭, মাকতাবায়ে যাকারিয়া বুক ডিপো ইন্ডিয়া)
আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর যখন তুমি দেখো তারা আমাদের আয়াতসমূহ নিয়ে তামাশা ও অর্থহীন আলোচনায় লিপ্ত হচ্ছে, তখন তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নাও, যতক্ষণ না তারা অন্য কোন কথায় লিপ্ত হয়। আর যদি শয়তান তোমাকে ভুলিয়ে দেয়, তবে স্মরণে আসার পর তুমি আর কখনোই সেই জালেমদের সাথে বসো না।’ (সূরা আল-আন‘আম, আয়াত: ৬৮)
কুরআন মাজীদে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘রহমানের বান্দা তারা, যারা অন্যায় কাজে শামিল হয় না এবং যখন কোনো বেহুদা কার্যকলাপের নিকট দিয়ে যায়, তখন আত্মসম্মান রক্ষা করে চলে যায়।’ (আল-ফুরকান: ৭২)
মুফতি শফী (রহ.) তাঁর তাফসীরে মারেফুল কোরআনে এই আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, তারা মিথ্যা ও বাতিল মজলিসে যোগদান করে না। সর্ববৃহৎ মিথ্যা ও বাতিল হলো শিরক ও কুফর। এরপর রয়েছে সাধারণ পাপ কর্ম। উদ্দেশ্য হলো, আল্লাহর প্রিয় বান্দারা এরূপ মজলিস থেকেও বিরত থাকে। হযরত ইবনে আব্বাস (রা.) এর মতে, এখানে মুশরিকদের ঈদ, মেলা ইত্যাদি বোঝানো হয়েছে। হযরত মুজাহিদ ও মুহাম্মদ ইবনে হানাফিয়া বলেন, এই আয়াতে গান-বাজনার আসর বোঝানো হয়েছে। (ইবনে কাছীর)
হযরত ছাওবান (রা.) থেকে বর্ণিত রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতক্ষণ না আমার উম্মতের কিছু গোত্র মুশরিকদের সাথে মিলিত হবে এবং মূর্তিপূজা করবে। আর আমার উম্মতের মধ্যে ত্রিশজন বড় বড় মিথ্যাবাদী আসবে, প্রত্যেকে দাবি করবে যে সে নবী। অথচ আমি হচ্ছি নবীদের শেষ নবী, আমার পর আর কোনো নবী নেই।’ (সুনান আত-তিরমিযী, হাদীস নং: ২২১৯)
খলিফা উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.) বলেন, ‘তোমরা মুশরিকদের মন্দিরে তাদের ঈদের দিনে প্রবেশ করো না; কারণ তখন আল্লাহর গজব তাদের ওপর নাযিল হয়।’ (আল-বাইহাকী, হাদীস নং: ১৯৩৩৩)
উপরোক্ত দলিলগুলো থেকে সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, অমুসলিমদের ধর্মীয় উৎসবে অংশগ্রহণ করা, তাদের অভিনন্দন জানানো বা তাদের রীতিনীতি অনুসরণ করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। ইসলাম মুসলমানদের নিজস্ব পরিচয় ও উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে শিক্ষা দিয়েছে। তাই একজন প্রকৃত মুসলিমের কর্তব্য হলো- নিজস্ব ঈমানি মর্যাদা রক্ষা করা এবং এমন কাজ থেকে বিরত থাকা, যা ইসলামী আকীদা ও আমলকে ক্ষুণ্ণ করে।
লেখক : মুহাদ্দিস ও সিনিয়র শিক্ষক সাতগাঁও মাদ্রাসা বিজয়নগর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া
আইএইচ/

