Logo

ধর্ম

মাজারকে সিজদার স্থান বানানো কি জায়েজ?

Icon

আরিফ মাহমুদ

প্রকাশ: ০৬ অক্টোবর ২০২৫, ১৫:০০

মাজারকে সিজদার স্থান বানানো কি জায়েজ?

সিজদার উপযুক্ত একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তিনি ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা সম্পূর্ণ হারাম। তা যে উদ্দেশ্যই হোক না কেন। আর ইবাদতের উদ্দেশ্যে কাউকে সিজদা করলে সে মুশরিক হয়ে যাবে। গাইরুল্লাহকে সিজদা করা যে হারাম তা কুরআন-হাদীসের অকাট্য দলিলাদি দ্বারা প্রমাণিত। অতএব যারা বলে, ভক্তি-শ্রদ্ধার উদ্দেশ্যে পীর সাহেবকে বা মাজারে সিজদা করা জায়েয তাদের এ কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর।

আর অজ্ঞ লোকেরাই মূলত কবরকে সিজদা করে, কবরের তাওয়াফ করে, এর চৌকাঠে চুমু খায়- এই সকল কর্মকাণ্ড শরীয়তে সম্পূর্ণ না-জায়েয। আমাদের আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের ইমামগণ এসব কাজকে স্পষ্ট ভাষায় হারাম ও না-জায়েয বলেছেন। কারণ তাওয়াফ, সিজদা, রুকু, হাত বেঁধে দাঁড়ানো- এগুলো ইবাদত-উপাসনার বিভিন্ন রূপ। আমাদের শরীয়ত কারও কবরকে এরূপ সম্মানের অনুমতি দেয়নি, যা পূজা ও উপাসনার পর্যায়ে পৌঁছায়।

আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই সেজদার স্থানসমূহের মালিক আল্লাহ তাআলা। অতএব তোমরা তার সাথে কারো ইবাদত করো না।’ (সুরা জিন : আয়াত ১৮)

নবী করিম (সা.) জানতেন, আগের উম্মতের পথভ্রষ্টতার কারণ ছিল চরমপন্থা। তাই তিনি আপন উম্মতকে এসকল কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকার আদেশ দিয়ে গেছেন। 

উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা সিদ্দীকা (রা.) বলেন, নবী করিম (সা.) তাঁর অন্তিম দিনগুলোতে বলেছেন- ইহুদি ও নাসারাদের ওপর আল্লাহর অভিশাপ। ওরা ওদের নবীগণের কবরসমূহকে সিজদাগাহ বানিয়েছে। (সহীহ বুখারী, হাদীস ১৩৯০; সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫২৯)

অন্য হাদীসে ইরশাদ হয়েছেন- তোমাদের আগের লোকেরা নিজেদের নবী-ওলীগণের কবরকে সিজদাগাহ বানাতো। সাবধান! তোমরা কখনো কবরকে সিজদার জায়গা বানাবে না। আমি তোমাদের নিষেধ করে যাচ্ছি। (সহীহ মুসলিম, হাদীস ৫৩২/২৩; মিশকাত পৃ. ৬৯)

কায়িস ইবনু সা’দ (রাযি.) সূত্রে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি (কুফার) আল-হীরা শহরে এসে দেখি, সেখানকার লোকেরা তাদের নেতাকে সিজদা্ করছে। আমি ভাবলাম, (তাহলে তো) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই সিজদা অধিক হকদার। অতঃপর আমি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর খেদমতে এসে বলি, আমি আল-হীরা শহরে দেখে এসেছি, সেখানকার লোকরো তাদের নেতাকে সিজদা করে। সুতরাং হে আল্লাহর রাসূল! আপনিই তো এর অধিক হকদার যে, আমরা আপনাকে সিজদা করি? 

তিনি বললেন, যদি (মৃত্যুর পর) তুমি আমার কবরের পাশ দিয়ে যাও তখন কি তুমি সেটাকে সিজদা করবে? আমি বললাম- না। তিনি বললেন, সাবধান! তোমরা এরূপ করবে না। আমি যদি কোনো মানুষকে সিজদা করার অনুমতি দিতাম তবে স্ত্রীদেরকে দিতাম তাদের স্বামীদেরকে সিজদা করতে। কেননা আল্লাহ স্ত্রীদের উপর স্বামীদের অধিকার দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২১৪০) 

চিন্তা করে দেখুন, নবী করিম (সা.) নিজ উম্মতের ব্যাপারেও কবর-পূজার আশঙ্কা কত গভীরভাবে করেছেন! ফলে কত স্পষ্টভাষায় তা নিষেধ করেছেন! কবরকে সিজদাকারীকে অভিশাপ করেছেন এবং ঐ কবরকে ‘মূর্তি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন! এ গর্হিত কর্মকে আল্লাহর ক্রোধ প্রজ্বলিত হওয়ার কারণ সাব্যস্ত করেছেন!

এই সকল হাদীসের কারণে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের আলেমগণের সিদ্ধান্ত, কবরে সিজদা করা ‘শিরকে জলী’ (প্রকাশ্য শিরক)। 

মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.)-এর ব্যাখ্যায় বলেছেন, ‘ইহুদি ও নাসারার উপর অভিশাপ হওয়ার কারণ হয়ত এই যে, নবীগণের ভক্তি-সম্মানার্থে ওরা তাঁদের কবরে সিজদা করত। এটা শিরকে জলী। কিংবা এই যে, ওরা নবীগণের সমাধিতে আল্লাহ তাআলার জন্যই নামায পড়ত। তবে নামাযে কবরের দিকে মুখ করত ও তার উপর সিজদা করত। ওদের ধারণা ছিল, ওরা একসাথে দু’টি পুণ্যের কাজ করছে- আল্লাহর ইবাদত এবং নবীগণের চুড়ান্ত সম্মান। এটা শিরকে খফী। প্রচ্ছন্ন র্শিক। কারণ এতে মাখলুকের এমন তাজিম আছে, যার অনুমতি নেই। সুতরাং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজ উম্মতকে এ কাজ করতে নিষেধ করেছেন হয়ত এ কারণে যে, এটা ইহুদিদের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কাজ কিংবা একারণে যে, এতে ‘শিরকে খফী’ (প্রচ্ছন্ন শিরক) রয়েছে। (মিশকাতুল মাসাবীহ, টীকা পৃ. ৬৯)   

হযরত শাহ ওলিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ.) ‘আলফাউযুল কাবীর’ কিতাবে বলেন, তোমরা যদি মুশরিকদের আকীদা-আমলের পূর্ণ ছবি দেখতে চাও তাহলে এ যুগের আওয়াম ও জাহিলদের দেখ, ওরা মাযারে-মাযারে এবং নিদর্শনের স্থানসমূহে কত ধরনের শিরকে কীভাবে লিপ্ত হয়! অতীতের এমন কোনো বিপদ নেই যাতে এ যুগের কোনো না কোনো গোষ্ঠী অনুরূপ বিশ্বাস নিয়ে লিপ্ত হয়নি। এহেন আমল-আকীদা থেকে খোদা তাআলা আমাদের রক্ষা করুন। 

হযরত কাযী ছানাউল্লাহ পানিপথী (রহ.) বলেন, ওলীদের কবরে সিজদা করা, কবরের তাওয়াফ করা, তাদের কাছে প্রার্থনা করা, তাদের জন্য মান্নত গ্রহণ করা হারাম। এসবের অনেক কিছুই কুফর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়ে থাকে। আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়সাল্লাম এসবের উপর অভিশাপ দিয়েছেন এবং এসব কাজে লিপ্ত হতে নিষেধ করেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, আমার কবরকে মূর্তি বানিও না। (মা-লাবুদ্দা মিনহু পৃ. ৮৮)

ফাতাওয়ায়ে আলমগীরীতে আছে- বুরহান তুরজুমানী বলেন, আমরা কবরে হাত রাখাকে সুন্নতও মনে করি না, ভালো কাজও না। তবে কেউ হাত লাগালে গুনাহও মনে করি না। আইনুল আইম্মা কারাবীছি বলেন, ‘আমরা সালাফ থেকে এভাবেই কোনো আপত্তি ছাড়া পেয়েছি।’ শামসুল আইম্মা মক্কী বলেন, এ বিদআত। (কিনয়া) কবরে হাত বুলাবে না, চুমু খাবে না। কারণ এটি খ্রিস্টানদের রীতি। (খ. ৫ পৃ. ৩৫১) 

এ ফতোয়ার সারকথা এই যে, সুন্নত বা ভালো কাজ মনে না করলে কবরে হাত দিয়ে স্পর্শ করলে কোনো দোষ নেই। তবে হাত বুলানোকে বরকতের কারণ মনে করা, চুমু দেওয়া বিদআত। এটা সালাফে সালেহীনের তরীকা না বরং, খ্রিস্টানদের রীতি। 

সূত্র: ইখতিলাফে উম্মত আওর সিরাতে মুস্তাকীম

লেখক : শিক্ষার্থী, ফিজিওথেরাপি ডিপার্টমেন্ট সিআরপি, সাভার- ঢাকা

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন