সন্তান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার পক্ষ থেকে অমূল্য নিয়ামত। প্রতিটি শিশুসন্তানই বিস্ময়কর সম্ভাবনার অধিকারী। তারা স্নেহ, আদর-আহ্লাদ ও ভালোবাসা পাওয়ার অধিকারী। শিশুদের ভালবাসা, লালন -পালন করা, সুস্থ এবং সুন্দর পরিবেশে বড় করা, তাদের সম্ভাবনার পূর্ণ বিকাশ ঘটানো পিতা- মাতার নৈতিক দায়িত্ব। প্রত্যেক মুসলিম পিতা-মাতার আল্লাহ প্রদত্ত একটি দায়িত্ব হলো, তাদের সন্তানের জীবনকে আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও কুরআন-সুন্নাহর আলোয় আলোকিত করা শৈশব থেকেই।
আজকের শিশু আগামীর কর্ণধার। তাঁদেরকে যোগ্য উত্তরসূরী হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁদের প্রতি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। তাদেরকে গড়ে তুলতে হবে প্রিয় নবী (সা.)-এর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে। শৈশব থেকেই শিশুদেরকে সঠিকপন্থায় পরিচর্যা না করার কারনে এর ফল আমাদেরকে ভোগ করতে হবে পরবর্তী সময়ে।
জীবনের সর্বক্ষেত্রেই আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ রোল মডেল হলেন রাসূল (সা.)। তাঁর কথা, কাজ সবকিছুই আমাদের প্রেরণার উৎস; বাতিঘর।
রাসূল সা. বলেছেন, "নিঃসন্দেহে ঈমানদারদের মধ্যে সবচেয়ে পরিপূর্ণ ঈমানের অধিকারী সেই ব্যক্তি যে আচার-আচরণে সর্বোত্তম এবং তার পরিবারের প্রতি সবচেয়ে দয়ালু।" (সুনানুত তিরমিজি)
ইসলামে সন্তানের প্রতি পিতামাতার যেমন অধিকার রয়েছে পিতা মাতার প্রতিও সন্তানের তেমন অধীকার রয়েছে। তা হলো প্রত্যেক পিতা মাতা সন্তানকে নবীজীর জীবনের আলোকে লালন পালন করবে। শিশুদের সাথে নবীজীর আচার-আচরণ যেমন ছিল তেমন আচার-আচরণ আমাদেরও করতে হবে। শিশুদের সাথে নবীজী (সা.)-এর আচরণ কেমন ছিল নিম্নে কিছু উল্লেখ করা হলো।
১। শিশুদের প্রতি নবীজির ভালোবাসা : রাসূল (সা.) শিশুদের প্রতি তার কোমল ভালবাসা এবং করুণার প্রকাশ হিসাবে প্রায়শই শিশুদের চুম্বন করতেন এবং আলিঙ্গন করতেন। এ সম্পর্কিত এক হাদীসে আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনা করেন যে, আল-আকরা বিন হাবিস আল্লাহর রাসূল (সা.)-কে হাসান (নবীর নাতি) কে চুম্বন করতে দেখেছেন। (এ দৃশ্য দেখে) তিনি (আল-আকরা') বললেন: "আমার দশটি সন্তান আছে, কিন্তু আমি তাদের কাউকে চুম্বন করিনি"। তখন আল্লাহর রাসূল (সা.) বলেন, যে ব্যক্তি (তার সন্তানদের প্রতি) দয়া করে না, তার প্রতি কোন দয়া করা হবে না।" (সহীহ মুসলিম)
শিশুরা ফুলের মতো স্নিগ্ধ ও কোমল। যখন তারা একটু আদর, আহ্লাদ পায় তখন তাদের মন ভালো থাকে, চেহারায় থাকে একধরনের পবিত্র আভা। মন থাকে ফুরফুরে। যদি তারা আদর, ভালোবাসা না পায়। পিতা মাতা যদি রুক্ষ ব্যবহার করে তখন তাদের চেহারায় এর ছাপ লেগে থেকে । মন থাকে সব সময় উদাস। তাই রাসূল (সা.) যেমন শিশুদের আদর, আহ্লাদ করতেন আমাদেরও তাদের কে আদর আহ্লাদ করতে হবে।
২। শিশুদেরকে নবীজীর সান্তনা প্রদান : একবার আবু উমাইর নামে ছোট শিশুর পোষা পাখি মারা গেল। রাসূল (সা.) বুঝতে পারলেন, পাখি মারা যাওয়ার কারনে শিশুটির মন খারাপ। তাই রাসূল (সা.) নিজে তাঁকে সান্তনা দিলেন। ইচ্ছে করলে রাসূল (সা.) বিষয়টি এড়িয়ে যেতে পারতেন। কিন্তু তিনি এড়িয়ে গেলেন না। কারণ তিনি রহমাতুল্লিল আলামীন, সমগ্র সৃষ্টির জন্য রহমত। ব্যাথা দূরকারী, সান্তনাপ্রদানকারী।
আমরা প্রায়শই এমন করি, শিশুদের কোনো কারণে মন খারাপ হলে তাকে সান্তনা না দিয়ে ধমকাতে শুরু করি বা অকথ্য কথা বলি; যা মোটেও উচিত নয়। এতে শিশুদের মানসিক বিকাশ বাঁধাগ্রস্থ হয়।
৩। শিশুদের প্রতি নবীজীর ধৈর্য : নবীজী সা. অন্যান্যদের প্রতি যেমন ধৈর্যশীল ছিলেন তেমন ধৈর্যশীল ছিলেন শিশুদের প্রতিও। আমরা অনেক সময় শিশুদের প্রতি অধৈর্যশীল হয়ে যায় এমনকি অধৈর্যশীল হয়ে কখনো কটু কথা বা চড় থাপ্পরও মারি কিন্তু রাসূল তা কখনো করতেন না।
আনাস ইবনে মালেক (রায.) শিশুকাল থেকেই নবী (সা.)-এর খেদমত করার গৌরব অর্জন করেছিলেন। তাঁর থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তাঁর দশ বছরের খেদমতের সময়, নবী (সা.) কখনও অধৈর্যের কথা বলেননি বা তাঁকে তিরস্কার করেননি।
আনাস (রা.) বলেন, "আমি দশ বছর ধরে নবী সা.-এর সেবা করেছি এবং তিনি আমাকে কখনো 'উফ' বলেননি (অধৈর্য বোঝায় একটি ছোটখাটো কঠোর শব্দ) এবং কখনোই আমাকে এই বলে দোষারোপ করেননি যে, "কেন তুমি এটা করলে বা কেন করোনি? " (সহীহ বুখারী)
শিশুরা ভুল করবে এটাই স্বাভাবিক ও সহজাত বিষয়। কারণ তাদের বুঝশক্তি পরিপূর্ণ নয়। বড়দের উচিত তা ধৈর্যধারণ করে কৌশলে তাদেরকে নিয়ন্ত্রণ করা। আপনি শিশুদের সাথে যত অধৈর্যের পরিচয় দিবেন ততই তাদের মন-মেজাজ বিক্ষিপ্ত হতে থাকবে। একসময় তাদের মন হয়ে যাবে পাথরের মতো শক্ত। তখন সেখানে আর সোনালী স্বপ্নের চাষাবাদ করতে পারবেন না। তাদের প্রতি ধৈর্যশীল হওয়া মানে জমিনে পানি সিঞ্চন করা। যত বেশী ধৈর্যশীল হতে পারবেন তত বেশি আপনার জমিন সবুজ পত্রপল্লবে ভরপুর হবে।
৪। নিজ কন্যা ফাতিমার প্রতি নবীজীর আন্তরিকতা : নিজ সন্তানকে গুরুত্ব দেওয়া ও তাকে অপমান না করা। এটি সন্তান প্রতি পালনের ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রায়শই আমরা এ ভুল করি। নিজ সন্তানকে যখন ইচ্ছা তখনই অপমান, তাচ্ছিল্য করি। পরীক্ষায় রেজাল্ট খারাপ হলেই পাশের বাসার ছেলে বা মেয়ের সাথে তুলনা দেই। "অমুকের ছেলে কত ভালো রেজাল্ট করেছে আর তুই" এসব তুলনাতে ছেলে-মেয়েদের মাঝে হতাশা বাড়ে।
মনে রাখতে হবে, আপনার সন্তানের সাথে আপনার সম্পর্ক হতে হবে বন্ধুত্বপূর্ণ। রেজাল্ট খারাপ হলেই তাকে বকাবকি না করে তাকে আগের তুনায় আরো বেশি গুরুত্ব দিন। সাহস দিন। তার মূল সমস্যা কোথায় তা তার সাথে সুন্দরভাবে আলোচনা করে খোঁজে বের করুন এবং তা ধৈর্যের সাথে সমাধান করুন। নবীজী সা. কখনোই সন্তানদের অপমান, তাচ্ছিল্য করতেন না। এমনকি তারা বড় হয়ে গেলেও না।
মনে রাখতে হবে, তাদের থেকে শ্রদ্ধা ভালোবাসা পেতে হলে শৈশব থেকে তাদেরকে সেভাবে গড়ে তুলতে হবে। তাদেরকে এপ্লাস অর্জনকারী শিক্ষার্থী বানানোর চেয়ে এ প্লাস অর্জনকারী মানুষ বানানোর দিকে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
৫। শিশুদের প্রতি সমতা আচরণের তাগিদ : খুবই দুঃখের একটি বিষয় হলো, সব সন্তানের প্রতি সমান আচরণ না করা। এক সন্তানকে আরেক সন্তানের তুলনায় বেশি অনুগ্রহ করা। এটা দেখা যায় ছেলে সন্তান ও মেয়ে সন্তানের ক্ষেত্রে। অনেক সময় পরিবারের মেয়ে সন্তানদের তুলনায় ছেলে সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বড় মাছ রান্না করলে মাছের মাথা সবসময় ছেলের পাতেই দেওয়া হয়। ছেলে সন্তানের জন্য দুধ, ডিমের ব্যবস্থা থাকে। মেয়ের ভাগ্যে তা জুটে না। রাসূল সা. এমনটি করতে নিষেধ করেছেন।
রাসুলুল্লাহ (সা.) সকল সন্তানদের প্রতি ন্যায়পরায়ণতার নির্দেশ দিয়েছেন। এক সন্তানের প্রশংসা করা, একজনকে বেশি আদর করা, একজনের সাথে আরেকজনের তুলনা করা, পুত্রকে কন্যার চেয়ে বেশি পছন্দ করা বা বেশি প্রাধান্য দেওয়া; এগুলো হচ্ছে প্রচলিত কিছু পারিবারিক এমন সমস্যা, যেগুলোকে আমরা সমস্যা মনে করি না। এটি যেকোনো মূল্যে এড়ানো উচিত। কারন এতে আপনার সন্তানের আত্মসম্মানবোধ কমে যেতে পারে। ফলে তার সারাজীবন ভুগতে হবে হীনমন্যতায়। যার জন্য যে দায়ী আপনি নিজে। সে দিকে আপনার খোয়াল নেই। পিতা-মাতা হিসেবে উচিত সব সন্তানকে সমান চোখে দেখা।
প্রকৃতপক্ষে, আমরা দেখেছি কিভাবে নবী মুহাম্মদ (সা.) শিশুদের যত নেওয়ার ক্ষেত্রে একজন আদর্শ ছিলেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে তাদের সাথে ভাল আচরণ করতে হয় এবং কীভাবে তাদের প্রতি ভালবাসা এবং আনন্দ প্রকাশ করতে হয়। শিশুদেরকে সত্যিকারের মানুষ হিসেব গড়ে তুলাই আমাদের পৃথিবী ও পরকালের আসল বিনিয়োগ। আমাদেরকে এদিকে সজাগ দৃষ্টি দিতে হবে।
লেখক : আলেম, খতীব, প্রাবন্ধিক
আইএইচ/

