Logo

ধর্ম

কথাবার্তায় সংযমতা অপরিহার্য

Icon

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৫, ০৯:১০

কথাবার্তায় সংযমতা অপরিহার্য

মানুষ আল্লাহ তাআলার এক অনুপম, অসাধারণ ও রহস্যময় সৃষ্টি। সমগ্র সৃষ্টিজগতে এমন সম্মান ও মর্যাদা আর কাউকে দান করা হয়নি। তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন নিজের খলিফা হিসেবে, জ্ঞান, বিবেক ও বুদ্ধির অফুরন্ত ভাণ্ডার দিয়ে। মানুষকে সম্মানিত করেছেন ‘আবদিয়্যাত’-এর মহান গুণ দ্বারা। যে গুণের মাধ্যমে সে তার রবের সামনে বিনয়, আনুগত্য ও দাসত্ব প্রকাশ করে।

আল্লাহ তাআলা মানুষকে দয়া, মায়া, মহব্বত ও অনুকম্পার অমূল্য সম্পদ দান করেছেন, যেন সে পৃথিবীতে তাঁর কিছু গুণাবলির প্রতিফলন ঘটাতে পারে। সৃষ্টিকুলের মধ্যে মানুষই একমাত্র সত্তা, যাকে আল্লাহ নিজের গুণাবলির এক ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি হিসেবে গড়ে তুলেছেন।

এই বিশেষ অনুগ্রহগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ‘কথা বলার ক্ষমতা’। এটা এমন এক ক্ষমতা, যা মানুষকে চিন্তা, অনুভূতি ও জ্ঞানের প্রকাশ ঘটানোর অনন্য সুযোগ করে দেয়। এই গুণটি আল্লাহর এক চিরন্তন গুণ, কারণ তিনিই ‘কালিম’ (বক্তা), যিনি নিজের বাণী দ্বারা সৃষ্টি করেছেন বিশ্বজগৎ, এবং যার কালামই সর্বশ্রেষ্ঠ সত্য। সেই মহামূল্যবান গুণের সামান্য ছোঁয়া মানুষকেও দান করেছেন, যাতে সে ভাষা ও বাকশক্তির মাধ্যমে নিজের চিন্তা, কৃতজ্ঞতা, দোয়া ও ইবাদত প্রকাশ করতে পারে। যখন আল্লাহ তাআলা মানুষকে এই ক্ষমতা দান করেছেন, তখন তিনি এর সঠিক ব্যবহার ও নিয়ন্ত্রণের নির্দেশনাও দিয়েছেন।

কুরআন-হাদিসে রয়েছে ভাষা ও কথার সঠিক ব্যবহার সম্পর্কিত অসংখ্য নির্দেশনা। ভাষার সঠিক ব্যবহার হলো সততার সঙ্গে কথা বলা। বক্তব্যে সংযম ও গাম্ভীর্যতা বজায় রাখা মানুষের দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ ও সংস্কারের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সত্য-সঠিক কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের আমল পরিশুদ্ধ করে দেবেন এবং তোমাদের পাপরাশি ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের আনুগত্য করে, সে মহা সাফল্য অর্জন করল।’ (সুরা আহযাব : ৭০–৭১)

সত্য ও ন্যয় কথা বলা এবং সুন্দর, মার্জিত ও কল্যাণকর বক্তব্য প্রদান ইসলামের মৌলিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্ত। একজন মুসলমানের চরিত্রের পূর্ণতা ও সমাজে তার প্রভাবের অন্যতম পরিচায়ক হলো তার মুখের কথা। যে ব্যক্তি জিহ্বাকে সংযত রাখে, সে জীবন ও সমাজ— দু’টিতেই সম্মানিত হয়। আর যিনি মুখের যত্রতত্র ব্যবহারে অন্যকে কষ্ট দেন, তার ঈমান ও নৈতিকতা বিপদের মুখে পড়ে। এই মহান নীতির ব্যাপারে রহমাতুল্লিল আলামিন (সা.)-এর অসংখ্য নির্দেশনা ও উপদেশমালা রয়েছে।

তিনি মানুষের চরিত্র গঠনের মূলভিত্তি হিসেবে ‘সুন্দর কথা বলা’-কে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর কাছে সত্যবাদিতা শুধু একটি নৈতিক গুণ ছিল না, বরং তা ঈমানের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ।

হজরত আবু হুরায়রা (রাযি.) বর্ণনা করেন, রাসুল (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহর প্রতি এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪৭৫)

এই হাদিসটি সংক্ষিপ্ত হলেও এর অর্থ ও মর্ম গভীর। এর মাধ্যমে রাসুল (সা.) আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন যে, একজন ঈমানদার ব্যক্তি তার কথায় দায়িত্বশীল হবে। সে এমন কিছু বলবে না, যা অন্যের ক্ষতি ডেকে আনে, মন ভাঙে বা বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে। যদি ভালো কিছু বলার সুযোগ না থাকে, তাহলে সে নীরব থাকবে। কারণ, নীরবতা অনেক সময় বিবাদ-বিশৃঙ্খলা রোধ করে।

তিনি আরও বলেছেন, ‘মানুষ তার জিহ্বার ফসলের কারণেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।’ (তিরমিজি, হাদিস ২৬১৬) এছাড়াও, রাসুল (সা.) মুসলমানদের এমনসব কথাবার্তা থেকে কঠোরভাবে বিরত থাকার নির্দেশ দিয়েছেন, যা তাদের চরিত্রকে কলুষিত করে বা সমাজে বিরূপ প্রভাব ফেলে। তিনি শিক্ষা দিয়েছেন যে, একজন প্রকৃত মুমিনের মুখে কখনো অশালীন, অশ্রাব্য কিংবা তুচ্ছ-তাচ্ছিল্যপূর্ণ কথা মানায় না। তার মুখ সর্বদা যেন হয় সততা, নম্রতা ও শিষ্টাচারের প্রতিচ্ছবি।

হজরত আবু দারদা (রাযি.) বা অন্যান্য সাহাবাদের সূত্রে বর্ণিত, রাসুল (সা.) বলেন, ‘মুমিন সেই ব্যক্তি নয়, যে অভদ্রভাবে কথা বলে, গালাগাল করে, অশ্লীল শব্দ ব্যবহার করে কিংবা নিন্দা-অপবাদে লিপ্ত থাকে।’ (জামে তিরমিজি, হাদিস ১৯৭৭)

এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং তা ঈমানেরও একটি পরীক্ষা। একজন মুমিনের জিহ্বা যদি অন্যের সম্মান রক্ষায় ব্যর্থ হয়, তবে তার ঈমান পূর্ণতা পায় না। তাই তিনি এমন ভাষা, আচরণ ও উচ্চারণকে নিন্দা করেছেন, যা মানুষের অন্তরে কষ্ট দেয় ও তাদের মাঝে বিভেদ সৃষ্টি করে।

বোঝা গেল, নবী (সা.)-এর নিকটবর্তী হওয়ার পথ কেবল নামাজ, রোজা বা ইবাদতেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং উত্তম চরিত্র ও শালীন কথাবার্তাও একজন মুসলমানকে তাঁর প্রিয় বানায়। হজরত উমর ইবনুল খাত্তাব (রাযি.) প্রায়ই বলতেন, ‘যে ব্যক্তি বেশি কথা বলে, তার পাপও বেশি হবে; আর যার পাপ বেশি, তার জন্য জাহান্নামই উপযুক্ত স্থান।’ (কাশফুল খফা, ২/৩২৫)

মহান তাবেঈ হজরত হাসান বসরি (রহ.) বলতেন, ‘কোনো ব্যক্তির আমানতদারি তখনই সঠিক হয়, যখন তার জিহ্বা সোজা থাকে। আর জিহ্বা তখনই সোজা হয়, যখন তার অন্তর সোজা হয়।’ (বাহজাতুল মজালিস, ২/৫৭৬)

অন্তরের শুদ্ধতা থেকেই জন্ম নেয় জিহ্বার সততা। আর জিহ্বার সততা মানুষকে করে তোলে সত্যবাদী, ন্যায়পরায়ণ ও বিশ্বাসযোগ্য— যা প্রকৃত ঈমানদারের অন্যতম গুণ।

বিশিষ্ট তাবেঈ হজরত ইউনুস ইবনে উবাইদ (রহ.) বলতেন, ‘কোনো বান্দার মধ্যে যদি দুটি জিনিস সঠিক থাকে, তাহলে তার বাকি সবকিছুই ঠিক হয়ে যায়। সে দুটি হলো— তার নামাজ ও তার জিহ্বা।’ (সিয়ার আলামিন নুবালা, ৬/২৮৮)

ইসলাম মানুষের জীবনের প্রতিটি দিকের মতো কথাবার্তা সম্পর্কেও অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দিকনির্দেশনা প্রদান করেছে। একজন মানুষকে কেবল তার অন্তরের পবিত্রতা দিয়েই নয়, বরং তার কথাবার্তার মাধ্যমে আরও বেশি করে চেনা যায়। কারণ, জিহ্বা হচ্ছে হৃদয়ের অনুবাদক; হৃদয়ে যা থাকে, তা-ই জিহ্বা প্রকাশ করে। তাই কুরআন ও হাদিসের অসংখ্য শিক্ষায় বারবার বলা হয়েছে, ‘যে কথাবার্তায় মানুষ সততার পথ অবলম্বন করে।’

ইসলামের এসব শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষ যেন কথা বলায় সংযম ও সচেতনতা অবলম্বন করে, প্রয়োজন ছাড়া কথা না বলে। একজন সচেতন ও পরহেজগার মুমিনের উচিত কথা বলার আগে নিজের কাছে কিছু প্রশ্ন তোলা— ‘আমি কী বলব? কেন বলব? কখন ও কোথায় বলব? কতটুকু বলব? এবং আমার কথার ফলাফল কী হতে পারে? তা কি কারও উপকারে আসবে, না ক্ষতির কারণ হবে?’

যে ব্যক্তি এসব প্রশ্নের উত্তর ভেবে নিয়ে কথা বলে, তার জিহ্বা কখনো অন্যের সম্মানহানি করে না। তার কথা মানুষের মনে কষ্ট দেয় না; বরং তার বাক্য হয় শান্তিময়, অনুপ্রেরণাদায়ক ও সান্ত্বনাদায়ক। এমন মানুষের কথা মানুষকে আল্লাহর দিকে টানে, আর তার জিহ্বা হয় তাকওয়া ও প্রজ্ঞার প্রতীক।

এই কারণেই প্রিয় নবী (সা.) তাঁর উম্মতকে সতর্ক করে বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস রাখে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে অথবা নীরব থাকে।’

অতএব, প্রতিটি মুমিনের উচিত নিজের জিহ্বাকে সংযমের পথে পরিচালিত করা, কথাবার্তায় প্রজ্ঞা ও কল্যাণ বজায় রাখা এবং এমন জীবন গঠন করা, যেখানে কথা হবে হৃদয়ের পবিত্রতার প্রতিচ্ছবি। আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে এমন জিহ্বা দান করুন, যা সর্বদা সত্য, ন্যায় ও কল্যাণের পথে পরিচালিত হয় এবং আমাদের জিহ্বার অপব্যবহারের ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করুন। আমিন।

লেখক : মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা। 

বিকেপি/এমএইচএস 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন