"নববর্ষ" এই শব্দটি আমাদের মনে একইসঙ্গে ফেলে আসা সময়ের স্মৃতি আর ভবিষ্যতের স্বপ্ন জাগিয়ে তোলে। জীবন নামক এক দীর্ঘ যাত্রাপথে আমরা প্রতি বছর একটি নতুন মাইলফলকে এসে দাঁড়াই। এই সময়টি আনন্দ-উৎসবের পাশাপাশি আত্ম-অনুসন্ধান, আত্মসমালোচনা এবং ভবিষ্যতের পথরেখা অঙ্কনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পুরাতন বছরের ধুলো ঝেড়ে ফেলে নতুন আলোয় পথচলার সংকল্পই হলো নববর্ষের মূলমন্ত্র। নতুন বছর আসে নতুন আশা, নতুন উদ্দীপনা আর একটা প্রত্যাশা নিয়ে। ক্যালেন্ডারের পাতা উল্টে যাওয়া মানেই শুধু সময়ের পরিবর্তন নয়, এটি হল জীবনকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার এক সুবর্ণ সুযোগ ১. কেন প্রয়োজন নববর্ষের পরিকল্পনা
নতুন বছরের সংকল্প বা "নিউ ইয়ার রিজুলেশন" কোনো নিছক আনুষ্ঠানিকতা নয়। এটি হলো নিজের ভেতরের সুপ্ত সম্ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার একটি দৃঢ় অঙ্গীকার। গত বছর কী পেলাম, কী হারালাম, কোন কাজগুলো অসম্পূর্ণ রইল, আর কোন ভুলগুলো আমাকে পিছিয়ে দিল-এই হিসাব-নিকাশ করার সময় এটি। একটি সুচিন্তিত পরিকল্পনা আমাদের লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়া থেকে রক্ষা করে এবং জীবনের উদ্দেশ্যকে স্পষ্ট করে তোলে। পরিকল্পনা ছাড়া জীবন হলো মাঝি বিহীন নৌকার মতো, যা কোনো নির্দিষ্ট গন্তব্যে পৌছাতে পারে না। ২. নতুন বছরের পরিকল্পনা ও করণীয় একটি নতুন বছরকে অর্থবহ করে তোলার জন্য নিম্নলিখিত বিষয়গুলো আমাদের করণীয় তালিকায় রাখা উচিত।
ক. ধার্মিকতা ও আধ্যাত্মিক উন্নতি :
আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোন ধর্মের অনুসারী। আর একমাত্র ধর্মই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে মানুষকে প্রকৃত মনুষ্যত্ববোধে জাগ্রত করতে। প্রত্যেক ধর্মই মানুষকে সঠিক পথে পরিচালিত করার শিক্ষা দেয়। যে ব্যক্তি তার ধর্মকে সঠিকভাবে পালন করে সে কখনো অন্যায় অবিচার মূলক কাজ করতে পারে না। সুতরাং প্রত্যেকেই নিজ নিজ ধর্মের পূর্ণাঙ্গ, প্রকৃত অনুসারী হওয়া অবশ্য প্রয়োজন।
খ. আত্ম-উন্নয়ন ও শিক্ষার প্রসার :
জীবনের মূলধন হলো জ্ঞান ও দক্ষতা। নতুন বছরে আমাদের দ্বিতীয় পরিকল্পনা হওয়া উচিত নিজেদের দক্ষতা বৃদ্ধি করা। অধ্যায়নরত ছাত্রছাত্রীদের জন্য নির্ধারিত পাঠা বইয়ের বাইরে প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় জ্ঞানার্জনের জন্য বরাদ্দ করা। তা হতে পারে নতুন কোনো ভাষা শেখা, পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি করা বা সাহিত্য-বিজ্ঞানের বই পড়া।
গ. নতুন দক্ষতা অর্জন :
অন্তত একটি নতুন বিষয়ে হাতেকলমে দক্ষতা অর্জন করা, যা আমাদের পেশাগত বা ব্যক্তিগত জীবনে কাজে লাগবে (যেমন: ডিজিটাল মার্কেটিং, কোডিং, বর্তমান সময়ের জনপ্রিয়, সময়োপযোগী যেকোনো হাতের কাজ ইত্যাদি)।
ঘ. বাস্তবসম্মত লক্ষ্য নির্ধারণ :
আকাশকুসুম স্বপ্ন না দেখে ছোট, স্পষ্ট এবং পরিমাপযোগ্য লক্ষ্য নির্ধারণ করা। যেমন: "এই বছরে আমি আমার সঞ্চয় ১০ শতাংশ বাড়াব অথবা এক ইনকামের পাশাপাশি আর অন্য ইনকামের চেষ্টা করব অথবা প্রতি সপ্তাহে একটি করে বই পড়ব অথবা প্রত্যেকদিন একটি করে মানব উন্নয়নমূলক কাজ করব।"
৩. সম্পর্ক ও সামাজিক বন্ধন রক্ষা :
মানুষ সামাজিক জীব। আমাদের আশেপাশের সম্পর্কগুলো আমাদের জীবনের ভিত্তি। পরিবার, বন্ধু-বান্ধব ও প্রিয়জনদের জন্য গুণগত সময় বরাদ্দ করা। সম্পর্কগুলোকে সজীব রাখতে তাদের সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রাখা। অতি ডিজিটালাইজেশন এর এই সময় আমরা সোশ্যাল প্ল্যাটফর্মে অনেক বন্ধু তৈরি করছি। কিন্তু সত্যিকার অর্থে নিজস্ব প্রিয়জনদের সাথে, আত্মীয়দের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখতে পারছি না। কিন্তু মানব জীবনে আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখা অত্যন্ত জরুরী। আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করার বিষয়ে প্রত্যেক ধর্মেই নিষেধ করা হয়েছে।
চ. ক্ষমা ও কৃতজ্ঞতা :
কারো প্রতি বিদ্বেষ না রেখে ক্ষমা করার অভ্যাস তৈরি করা। ছোট ছোট সাফল্যের জন্য সৃষ্টিকর্তা ও মানুষের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা। মানুষকে ক্ষমা করলে নিজেও ক্ষমা পাওয়া যায়। নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহে ওয়া সাল্লাম বলেছেন- "যে দয়া করে সে দয়া পায়। আর যে দয়া করে না, সে দয়া পায় না।"
ছ. আর্থিক শৃঙ্খলা :
অর্থনৈতিক নিরাপত্তা জীবনকে স্থিতিশীলতা দেয়। অর্থনৈতিক বিষয়ে যার কোন সুষ্ঠু পরিকল্পনা নেই, সে কখনো সফল হতে পারেনা। সেজন্য নিােক্ত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখতে হবে।
সঞ্চয় ও বিনিয়োগ: আয়ের একটি অংশ নিয়মিত সঞ্চয় করা এবং ভবিষ্যতের জন্য বিচক্ষণতার সাথে বিনিয়োগ করা। অপ্রয়োজনীয় কাজে কোন ভাবেই অর্থ অপচয় বা ব্যয় করা যাবে না।
ঋণমুক্ত থাকা: অপ্রয়োজনীয় ঋণ এড়িয়ে চলা এবং অতীতের ঋণ পরিশোধের পরিকল্পনা করা। যতটা সম্ভব ঋণ মুক্ত জীবন রাখতে হবে। ঋণ মানুষকে ধ্বংস করে। বিশেষ করে ঋণের উচ্চহারের সুদ মানুষকে আরো নিঃস্ব করে দেয়।
৩. নতুন বছর থেকে বর্জনীয়
ভালো কিছু অর্জনের জন্য খারাপ কিছু অভ্যাস ত্যাগ করা অপরিহার্য। নিম্নে আমি কিছু বর্জনীয় কাজের তালিকা দিলাম। তালিকাটি ছোট হলেও এর গুরুত্ব অপরিসীম।
ক, অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম : মোবাইল, কম্পিউটার বা টিভির পর্দায় উদ্দেশ্যহীনভাবে সময় নষ্ট করা (বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে)।
খ. পরনিন্দা ও পরচর্চা : অন্যের ব্যক্তিগত বিষয় নিয়ে আলোচনা করা বা নেতিবাচক মনোভাব পোষণ করা। যা শুধু আমাদের মানসিক শান্তিই নষ্ট করে। এসব কাজে সময় নষ্ট করা যাবে না।
গ. আলস্যতা : যেকোনো কাজের প্রেক্ষিতে 'কাল করব', 'আজকের মত থাক' -এই মনোভাব ত্যাগ করে আজকের কাজ আজই শেষ করার অভ্যাস গড়ে তোলা। কাজের ক্ষেত্রে কোন ভাবেই অলসতা করা যাবে না। সময়ের কাজ সময়ে করা বিচক্ষণতার পরিচয় দেয়
ঘ. অতীতের ব্যর্থতা নিয়ে হতাশা : অতীতের ভুল নিয়ে অতিরিক্ত চিন্তা না করে তা থেকে শিক্ষা নিয়ে বর্তমানের প্রতি মনোযোগ দেওয়া। অতীতের ব্যর্থতার বিষয় নিয়ে হতাশা প্রকাশ না করে ভুল ত্রুটিগুলো বিশ্লেষণ করতে হবে। সে ভুলগুলো যেন পরবর্তীতে আর না হয়, সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
৪. নতুন বছরকে ঘিরে আমাদের প্রত্যাশা
ব্যক্তিগত পরিকল্পনার পাশাপাশি সমষ্টিগতভাবেও নতুন বছরের কাছে আমাদের কিছু প্রত্যাশা থাকে। এই প্রত্যাশাগুলো সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নতির জন্য সহায়ক। যেমন নিম্নে কিছু বর্ণনা করলাম।
ক, ব্যক্তিগত প্রত্যাশা শান্তিময় জীবন :
উদ্বেগ, ভয় ও অসুস্থতা মুক্ত একটি শান্তিময় জীবনের প্রত্যাশা। সৃজনশীলতার বিকাশ: নিজেদের সৃজনশীল শক্তিকে কাজে লাগিয়ে নতুন কিছু সৃষ্টির সুযোগ লাভ করা।
সংকল্পে স্থিরতা : বছরের শুরুতে নেওয়া সংকল্পগুলোতে স্থির থেকে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌছানো।
খ. জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রত্যাশা :
সুশাসন ও ন্যায়বিচার : দেশে আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা পাবে, দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতি কমে আসবে। এমন প্রত্যাশা আমাদের সকলের। আমরা চাই এদেশের সকল অন্যায় অবিচার, ঘুষ ও দুর্নীতি দূর হোক। দেশের বিদ্যমান সকল বৈষম্য দূর হয়ে যাক। প্রত্যেক নাগরিক তার অধিকার বুঝে পাক।
অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি : দেশের অর্থনীতি আরও গতিশীল হবে এবং দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতার মধ্যে থাকবে। কৃষক তার ফসলের ন্যায্য মূল্য পাবে। বহির্বিশ্বে রপ্তানি বৃদ্ধি পাবে। এতে করে বৈদেশিক আয় বৃদ্ধি হবে। প্রত্যেক নাগরিক তার রাষ্ট্রের নির্ধারিত কর সঠিকভাবে পরিশোধ করবে। এতে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক অবস্থা আরো সমৃদ্ধ হবে।
সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি : সকল ধর্ম ও বর্ণের মানুষের মধ্যে ঐক্য ও ভ্রাতৃত্ব বজায় থাকবে এবং সংঘাতমুক্ত পৃথিবী গড়ার পথে আমরা আরও একধাপ এগিয়ে যাব। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে রোল মডেল হিসেবে পরিচিত হবে। বাংলাদেশের পাশাপাশি বিশ্বের সকল প্রান্তে সাম্প্রদায়িক সংঘাত দূর হোক এ প্রত্যাশা করি।
নতুন বছরের আগমন এক নতুন সুযোগের বার্তা নিয়ে আসে। এটি কেবল একটি তারিখের পরিবর্তন নয়, বরং এটি আত্মা-সংশোধন এবং নতুন উদ্যমে জীবন শুরু করার একটি শুভক্ষণ। আমরা যদি নতুন বছরে বিচক্ষণ পরিকল্পনা গ্রহণ করি, ক্ষতিকর অভ্যাসগুলো বর্জন করি এবং ইতিবাচক প্রত্যাশা নিয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাই, তবে নিশ্চিতভাবেই আমাদের জীবন আরও সুন্দর ও সার্থক হয়ে উঠবে। আসুন, এই নববর্ষে আমরা প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই আমরা আরও সহনশীল, আরও মানবিক এবং আরও দায়িত্বশীল মানুষ হয়ে উঠব। আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টাই পারে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে। শুভ নববর্ষ:
লেখক : প্রাবন্ধিক, সালনা, গাজীপুর

