জাতীয় মিম্বার থেকে
জুলাই বিপ্লব : জালিমদের ওপর আল্লাহর আজাব
মুফতি মুহাম্মদ আব্দুল মালেক
প্রকাশ: ১০ জানুয়ারি ২০২৬, ০৮:৩৪
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। আজকের জুমার খুতবায় পবিত্র কোরআনের সূরা আল-মা’আরিজ-এর ২২ থেকে ৩৭ নম্বর আয়াতের আলোকে প্রকৃত নামাজি বা ‘মুসল্লি’র গুণাবলি এবং বর্তমান সমাজের প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় সম্পর্কে আলোচনা করা হবে।
আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনে নামাজিদের সুসংবাদ দিয়েছেন এবং তাদের বিশেষ কিছু গুণাবলি উল্লেখ করেছেন। একজন মানুষ কেবল নামেমাত্র মুসলমান বা মসজিদ কমিটির সদস্য হলেই প্রকৃত মুসল্লি হতে পারেন না; বরং তার চরিত্রে ও কর্মে নির্দিষ্ট কিছু বৈশিষ্ট্য থাকতে হবে।
আল্লাহ তায়ালা এরশাদ করেছেন, ‘‘তারা ব্যতীত, যারা নামাজ আদায়কারী এবং যারা নিজেদের নামাজে সব সময় অটল থাকে।’’ (সূরা আল-মা'আরিজ, আয়াত ২২-২৩)।
একজন প্রকৃত মুসল্লির প্রধান গুণ হলো তিনি নিয়মিত নামাজ আদায় করবেন। তার নামাজ কখনো কাজা হবে না। ফজর থেকে এশা; পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ তিনি সময়মতো আদায় করবেন। আমাদের সমাজে একটি রেওয়াজ দেখা যায় যে, মাগরিবের সময় মসজিদে মুসল্লি বেশি হয় কিন্তু ফজরের সময় কাতার খালি থাকে। অথবা বছরে দুই ঈদের নামাজ বা সপ্তাহে শুধু জুমার নামাজে মসজিদ ভরে যায়। একে খতিব সাহেব রূপক অর্থে ‘আটকি নামাজ’, ‘খাটকি নামাজ’ (জানাজা) বা ‘সালকি নামাজ’ (বছরের নামাজ) বলে অভিহিত করেছেন। কিন্তু আল্লাহ এমন মৌসুমি মুসল্লি চাননি। প্রকৃত মুসল্লি তিনি, যার নামাজে কোনো বিরতি নেই, যিনি জীবনের সব অবস্থায় নামাজের ওপর অটল থাকেন।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহ বলেন, ‘‘যাদের ধন-সম্পদে নির্ধারিত হক রয়েছে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের জন্য।’’ (সূরা আল-মা'আরিজ, আয়াত ২৪-২৫)।
একজন মুসল্লি কেবল নামাজ পড়বেন তা নয়, বরং তিনি বিশ্বাস করবেন যে তার অর্জিত সম্পদ মূলত আল্লাহর দান। নিজের উপার্জিত অর্থে গরিব, দুঃখী এবং আত্মীয়-স্বজনের হক রয়েছে। যাকাত দেওয়া ফরজ, যা ইসলামের অন্যতম স্তম্ভ। কিন্তু যাকাতের বাইরেও নফল সদকা এবং বিপদগ্রস্ত মানুষের পাশে দাঁড়ানো একজন মুমিনের দায়িত্ব। অভিশপ্ত কারুন যেমন মনে করত- তার সম্পদ তার নিজের যোগ্যতায় অর্জিত, একজন মুমিন কখনোই তেমনটা মনে করতে পারেন না। তিনি জানেন, মেধা, বুদ্ধি এবং উপার্জনের সকল সুযোগ আল্লাহরই দান। তাই ফিলিস্তিনের গাজা বা বিশ্বের যেকোনো প্রান্তে নির্যাতিত মুসলমানদের জন্য সাহায্য পাঠানো এবং নিজের পাড়া-প্রতিবেশীর খোঁজ নেওয়া নামাজি ব্যক্তির আবশ্যিক গুণ।
প্রকৃত মুসল্লির আরেকটি গুণ হলো, তিনি কেয়ামত বা বিচার দিবসে দৃঢ় বিশ্বাস রাখেন। আল্লাহ বলেন, ‘‘যারা কর্মফল দিবসকে সত্য বলে বিশ্বাস করে।’’ (সূরা আল-মা’আরিজ, আয়াত ২৬)।
যিনি পরকালে বিশ্বাস করেন, তিনি দুনিয়ার জীবনে কখনোই দুর্নীতি, প্রতারণা বা ওজনে কম দেওয়ার মতো কাজ করতে পারেন না। তিনি জানেন, দুনিয়ার আদালতে পার পাওয়া গেলেও আখেরাতের আদালতে প্রতিটি পাই-পয়সার হিসাব দিতে হবে। ব্যবসায়িক সততা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। শোয়াইব (আ.)-এর সম্প্রদায়ের লোকেরা মাপে কম দিত। তাদের এই অন্যায়ের প্রতিবাদ করে নবী জানিয়েছিলেন যে, নামাজ মানুষকে অশ্লীল ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে। তাই একজন ব্যবসায়ী যখন নামাজি হন, তখন তার পণ্যে ভেজাল থাকতে পারে না, তিনি মাপে কম দিতে পারেন না এবং মিথ্যার আশ্রয় নিতে পারেন না। আজ আমাদের সমাজে খাদ্যে ভেজাল ও ব্যবসায়িক প্রতারণা মহামারি আকার ধারণ করেছে, যা প্রমাণ করে যে আমরা নামাজের প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করতে পারিনি।
মুমিন বান্দা সর্বদা আল্লাহর শাস্তিকে ভয় করেন। আল্লাহ বলেন, ‘‘নিশ্চয়ই তাদের রবের শাস্তি এমন, যা থেকে নিশ্চিত থাকা যায় না।’’ (সূরা আল-মা'আরিজ, আয়াত ২৮)।
দুনিয়ার ক্ষমতা, দলীয় পরিচয় বা প্রভাব-প্রতিপত্তি কাউকে আল্লাহর আজাব থেকে রক্ষা করতে পারবে না। কবরে ও হাশরের ময়দানে একমাত্র ঈমান ও নেক আমল ছাড়া আর কোনো সাহায্যকারী থাকবে না। তাই প্রকৃত মুসল্লি সর্বদা ভীত থাকেন যে, তার কোনো কাজ আল্লাহর অসন্তুষ্টির কারণ হচ্ছে কিনা।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সমসাময়িক বিষয় হলো চারিত্রিক পবিত্রতা। আল্লাহ বলেন, ‘‘যারা নিজেদের লজ্জাস্থানের হেফাজত করে।’’ (সূরা আল-মা’আরিজ, আয়াত ২৯)।
প্রকৃত নামাজি জিনা, ব্যভিচার এবং সব ধরনের অশ্লীলতা থেকে নিজেকে দূরে রাখেন। তিনি তার দৃষ্টি, শ্রবণ ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করেন। ইসলামে নারী-পুরুষের বৈধ সম্পর্কের একমাত্র পথ হলো বিবাহ। এর বাইরে বন্ধুত্ব, লিভ-টুগেদার বা প্রেমের নামে অবাধ মেলামেশা ইসলামে সম্পূর্ণ হারাম।
আজ আমাদের দেশে পশ্চিমা অপসংস্কৃতি আমদানির গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। সমকামিতা বা এলজিবিটি-র মতো জঘন্য পাপাচার, যা লুত (আ.)-এর কওমের ধ্বংসের কারণ ছিল, তা আজ মানবাধিকার বা স্বাধীনতার নামে আমাদের সমাজে ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। পাঠ্যপুস্তকে শরীফ থেকে শরীফা হওয়ার গল্পের মাধ্যমে কোমলমতি শিশুদের মগজধোলাই করা হচ্ছে। আল্লাহ পুরুষকে পুরুষ এবং নারীকে নারী হিসেবে সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু এখন আইনের দোহাই দিয়ে বলা হচ্ছে, কেউ নিজেকে যা দাবি করবে, তাকে তাই মেনে নিতে হবে। এটি আল্লাহর সৃষ্টির বিরুদ্ধে এক প্রকার যুদ্ধ ঘোষণা।
যে সমাজে সমকামিতার মতো অভিশপ্ত কাজ ছড়িয়ে পড়ে, সেখানে আল্লাহর রহমত উঠে যায় এবং গজব নেমে আসে। আমাদের সংবিধান ও আইনে এমন কোনো ধারা সংযোজন করা যাবে না যা কোরআন-সুন্নাহর পরিপন্থী এবং মানুষের স্বাভাবিক বিবেক-বুদ্ধির সাথে সাংঘর্ষিক। বিয়ে হতে হবে একজন জন্মগত পুরুষ এবং একজন জন্মগত নারীর মধ্যে। এর বাইরে কোনো বিকৃত সম্পর্ককে বৈধতা দেওয়া হলে তা মুসলিম হিসেবে আমরা মেনে নিতে পারি না।
মনে রাখবেন, জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থান কারও পৈতৃক সম্পত্তি না। জুলাই বিপ্লব কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ছিল না, এটি ছিল অন্যায়ের বিরুদ্ধে, জুলুমের বিরুদ্ধে। এটি ছিল আল্লাহর পক্ষ থেকে জালিমদের প্রতি এক প্রকার সতর্কবার্তা ও আজাব। কিন্তু মনে রাখতে হবে, যদি আমরা এক জালিমকে বিদায় করে সেখানে নতুন কোনো অন্যায়ের রাজত্ব কায়েম করি, তবে আল্লাহর সাহায্য থাকবে না। যদি হাসিনা সরকারের পতনের পর এখন পশ্চিমা অশ্লীলতা, বেহায়াপনা এবং ইসলামবিদ্বেষী আইন সমাজে চাপিয়ে দেওয়া হয়, তবে তা হবে শহীদদের রক্তের সাথে বেইমানি।
যারা জুলাই বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসেছেন বা আসবেন, তাদের মনে রাখতে হবে; এ দেশের মানুষ আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের সম্মানের প্রশ্নে আপসহীন। মানুষের বিবেক-বুদ্ধি, লজ্জা ও শালীনতার সম্মান রক্ষা করা সরকারের দায়িত্ব। যদি এই দেশে ইসলামের বিধান ও ইনসাফ কায়েম থাকে, তবে মুসলিম-অমুসলিম সবাই শান্তিতে থাকবে। কিন্তু যদি অশ্লীলতাকে আইনগত বৈধতা দেওয়া হয়, তবে আল্লাহর আজাব থেকে কেউ রেহাই পাবে না।
পরিশেষে, আমাদের প্রত্যেককে প্রকৃত মুসল্লি হতে হবে। নামাজের সময়সূচি মেনে চলার পাশাপাশি নামাজের শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও ব্যবসায়িক জীবনে বাস্তবায়ন করতে হবে। আমাদের চরিত্রকে পবিত্র রাখতে হবে এবং যেকোনো প্রকার অশ্লীলতার বিরুদ্ধে সোচ্চার হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের সকলকে পবিত্র কোরআনের এই আয়াতগুলোর ওপর আমল করার এবং ফেতনা-ফাসাদ থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
অনুলিখন : সহ-সম্পাদক, দৈনিক বাংলাদেশের খবর


