বনানীর মুফতি আব্দুল মালেকের গবেষণাগ্রন্থ বেস্টসেলার
কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় বাংলাদেশের গৌরব
মুফতি উবায়দুল হক খান
প্রকাশ: ৩০ জানুয়ারি ২০২৬, ২৩:১৩
মিশরের রাজধানী কায়রোতে অনুষ্ঠিতব্য আন্তর্জাতিক ইসলামী বইমেলায় বাংলাদেশের আলেম ও লেখকদের অভাবনীয় সাফল্য দেশের ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে নতুন করে আশার সঞ্চার করেছে। বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ও মর্যাদাপূর্ণ এই বইমেলায় বাংলাদেশি আলেমদের রচিত গবেষণামূলক গ্রন্থ পাঠকদের ব্যাপক আগ্রহ কেড়েছে। বিশেষ করে বনানী জামিআ মুহাম্মাদিয়া ইসলামিয়া মাদরাসার প্রধান মুফতি ও সিনিয়র মুহাদ্দিস, বিশিষ্ট আলেম আবু সাহবান মুফতি আব্দুল মালেক রচিত একটি আরবি গবেষণাগ্রন্থ মেলায় বেস্টসেলার হয়েছে।
গত ২১ জানুয়ারি শুরু হওয়া কায়রো আন্তর্জাতিক ইসলামী বইমেলা আগামী ৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলবে। বিশ্বের ৮৩টি দেশের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ বইমেলা বরাবরের মতোই ইসলামী জ্ঞান, গবেষণা ও প্রকাশনার এক মহামিলনমেলায় পরিণত হয়েছে। দুর্লভ পাণ্ডুলিপি, গবেষণাধর্মী প্রকাশনা এবং প্রামাণ্য ইসলামী গ্রন্থের বিশাল সমাহার বইপ্রেমী ও গবেষকদের কাছে মেলাটিকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছে।
এবারের বইমেলায় বাংলাদেশি আলেমদের উপস্থিতি ও সাফল্য বিশেষভাবে নজর কেড়েছে আন্তর্জাতিক মহলের। এর মধ্যে সবচেয়ে আলোচিত হয়েছে বাংলাদেশের বিশিষ্ট আলেম আবু সাহবান মুফতি আব্দুল মালেক রচিত গবেষণাগ্রন্থ- ‘التحفة السنية في التعريف بكتب الفقه والفتاوى للحنفية’ “আত-তুহফাতুস সানিয়্যাহ ফিত তারিফ বিকুতুবিল ফিকহি ওয়াল ফাতাওয়া লিল হানাফিয়্যাহ”।
হানাফি ফিকহ ও ফাতাওয়া বিষয়ক প্রসিদ্ধ ও দুর্লভ গ্রন্থসমূহের পরিচিতি, মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় তথ্য সংবলিত এ কিতাবটি সম্প্রতি জর্ডানের স্বনামধন্য প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দারুর রায়াহীন থেকে প্রায় ৮০০ পৃষ্ঠায় প্রকাশিত হয়। প্রকাশের পর থেকেই কিতাবটি আলেমসমাজে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। চলমান কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় কিতাবটি পাঠকদের মধ্যে বিপুল সাড়া ফেলে এবং অল্প সময়ের মধ্যেই এর সব কপি বিক্রি হয়ে যায়।
বইমেলার সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা সূত্র জানায়, পাঠকদের ব্যাপক আগ্রহ ও চাহিদার কারণে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই কিতাবটির স্টক শেষ হয়ে যায়। আন্তর্জাতিক বইমেলায় কোনো গবেষণাগ্রন্থের এমন দ্রুত বিক্রি হওয়া এর বিষয়বস্তুর গভীরতা, গ্রহণযোগ্যতা ও প্রামাণ্যতারই স্পষ্ট প্রমাণ।
আরবি ভাষায় রচিত এ গবেষণাগ্রন্থে হানাফি মাজহাবের ফিকহ ও ফাতাওয়া বিষয়ক শতাধিক গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থের পরিচয়, লেখক পরিচিতি, বিষয়বস্তুর বৈশিষ্ট্য ও ইলমি গুরুত্ব অত্যন্ত শৃঙ্খলাবদ্ধ ও তাহকিকপূর্ণভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বিশেষত ইফতা বিভাগে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী, গবেষক ও মুফতিদের জন্য গ্রন্থটি একটি মৌলিক রেফারেন্স হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দেশের আলেমসমাজের পাশাপাশি বিদেশি উলামা ও গবেষকদের কাছেও গ্রন্থটি প্রশংসিত হয়েছে। অনেক আলেম মন্তব্য করেছেন, হানাফি ফিকহ ও ফাতাওয়া বিষয়ক এত বিস্তৃত ও সুশৃঙ্খল পরিচিতিমূলক কাজ সাম্প্রতিক সময়ে খুব কমই দেখা গেছে।
লেখকের সম্মানিত উস্তাদ, বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব ও দেশের প্রখ্যাত আলেম মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক গ্রন্থটির প্রশংসা করে একে শিক্ষার্থীদের জন্য অত্যন্ত উপকারী আখ্যায়িত করেন এবং তাঁর স্নেহভাজন ছাত্রকে গ্রন্থ প্রকাশের অনুমতি প্রদান করেন।
এছাড়া পাকিস্তানের বানুরী টাউন করাচীর মুহতামিম ও বেফাকুল মাদারিস পাকিস্তানের সাবেক সভাপতি আল্লামা আব্দুর রাজ্জাক ইস্কান্দার রহ.-সহ দেশ-বিদেশের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আলেম গ্রন্থটির গুরুত্বপূর্ণ মূল্যায়ন প্রদান করেছেন। এসব মূল্যায়ন গ্রন্থটির শুরুতেই সংযুক্ত করা হয়েছে, যা এর গ্রহণযোগ্যতাকে আরও সুদৃঢ় করেছে।
জর্ডান থেকে প্রকাশের পরপরই উপমহাদেশের একাধিক প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গ্রন্থটি পুনর্মুদ্রণের আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলে জানা গেছে। একই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের উলামা ও তুলাবা (শিক্ষার্থী) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও ইলমি মহলে এ গবেষণাকর্মের প্রশংসা করে উচ্ছ¡াস প্রকাশ করছেন।
উল্লেখ, এবারের কায়রো আন্তর্জাতিক বইমেলায় শুধু বনানীর মুফতি আবদুল মালেকই নন; বরং বাইতুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের খতিব মুফতি মুহাম্মদ আবদুল মালেক-সহ বাংলাদেশের আরও কয়েকজন আলেম-লেখকের গ্রন্থ বরাবরের মতো পাঠকদের বিশেষ আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে বাংলাদেশের ইসলামী জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও প্রকাশনার সক্ষমতা নতুন করে প্রমাণিত হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, কায়রোর মতো আন্তর্জাতিক পরিসরে বাংলাদেশি আলেমদের এ সাফল্য শুধু ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অর্জন নয়; বরং এটি বাংলাদেশের ইসলামী শিক্ষা ও বুদ্ধিবৃত্তিক ঐতিহ্যের জন্য এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। এ ধরনের সাফল্য ভবিষ্যতে আরও গবেষণাধর্মী কাজের অনুপ্রেরণা জোগাবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ অর্জন নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ইসলামী জ্ঞানচর্চার ইতিহাসে একটি উল্লেখযোগ্য মাইলফলক হয়ে থাকবে।
লেখক : সাবেক শিক্ষার্থী, জামিআ মুহাম্মাদিয়া ইসলামিয়া বনানী, ঢাকা
মুহাদ্দিস, জামিআতুস সুফফাহ আল ইসলামিয়া, চৌরাস্তা, গাজীপুর।
মুফতি উবায়দুল হক খান/এমএম

