বরকত আল্লাহর পক্ষ হতে এক বড় নেয়ামত। জীবনের সব ক্ষেত্রে বরকত থাকলে আর কিছুর প্রয়োজন নেই। জীবন সফল। প্রশ্ন হলো- বরকত কী জিনিস? এর উদ্দেশ্যই বা কি! বরকত মানেই অনেকে মনে করে থাকি আধিক্য ও প্রচুরতা। সমৃদ্ধি। বেশি হওয়া। আগে বেতন ছিল ১০ হাজার, এখন ৫০ হাজার। এটাকেই বরকত হয়েছে বলে ধরে নিই। অথচ এটা বরকতের মূল মর্ম নয়। বরকতের আসল মর্ম উদ্দেশ্য হলো- সুখ, শান্তি , আরাম। আল্লাহতায়ালা যাকে যা কিছুই দিয়েছেন তা দ্বারাই সফলভাবে উদ্দেশ্য অর্জিত হওয়া। সহজভাবে বান্দার প্রয়োজনগুলো পূরণ হয়ে যাওয়ার নামই বরকত। দুনিয়াতে যত সম্পদ ও উপকরণ আছে কোনটাই সরাসরি শান্তি বয়ে আনে না। এর জন্য প্রয়োজন বরকত। কোরআন-হাদিসের বহু জায়গায় বরকতের কথা এসেছে। যা আমরা ধাপে ধাপে জানব ইনশাআল্লাহ। তার আগে এ ব্যাপারে কিছু মূল্যবান দৃষ্টান্ত জেনে নেই।
১. দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমিতে কারো কাছে কোটি টাকা আছে। কিন্তু জীবন ধারণের কিছু নেই। এই মানুষটা যদি টাকা চিবিয়ে খায় বাঁচতে পারবে? না। কখনই না। বোঝা গেল অর্থের আধিক্যই শুধু বরকত নয়।
২. সমুদ্রে সফররত এক ব্যক্তির কাছে অনেক রূপা-স্বর্ণ আছে। হঠাৎ নৌকা ডুবন্ত প্রায়। প্রাণ বাঁচানোর কোন অবলম্বন বা উপকরণ নেই। এই সম্পদ তার কোন কাজে আসবে? না । কখনই না। বোঝা গেল রূপা-স্বর্ণ, হীরা-জহরত যার প্রতি আমরা খুব লালায়িত, তার প্রচুরতাও প্রকৃত বরকত নয়।
৩. অর্থ দিয়ে এসি ক্রয় করা যায় শান্তি কিনা যায় না।
৪. দামি খাট পালং কিনা যায় শান্তির ঘুম কিনা যায় না।
৫. অপচয় করে ধুমধামের সঙ্গে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়া যায়, সুখময় দাম্পত্য জীবন পাওয়া যায় না।
৬. কোটিপতির টেনশনে ঘুম আসে না ট্যাবলেট খেয়েও কাজ হয় না অথচ দারোয়ান গেইট বন্ধ করতেই নাক ডেকে শান্তির ঘুম। সবই বরকতের খেলা, রহমতের হাতছানি।
আবার অনেকে মনে করে থাকি বরকত মানেই মাল ও খাদ্যে বরকত। না, বরকত ব্যাপক জিনিস, বিস্তৃত বস্তু, তা জীবনের সবকিছুতেই হতে পারে।
এক. হায়াতে বরকত
আল্লাহতায়ালা অনেকের জীবনে বরকত দান করেন, ফলে তারা অনেক স্মৃতিশক্তি ও মেধার অধিকারী হয়ে থাকেন। প্রখ্যাত আলেমদীন, বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব, আল্লামা আব্দুল হাই লৌখনভী (রহ.)। মাত্র ৩৯ বছর হায়াত পেয়ে ছিলেন। এই সামান্য সময়ে তিনি অসামান্য খেদমত করে গেছেন। জাতিকে দিয়ে গেছেন অমূল্য রতœ ভান্ডার। প্রায় আড়াইশোর বেশি কিতাব রচনা করেছেন। এটা জীবনের বরকত। ইলমের বরকত। আমরা ৩৩৯ বছরেও কী তা পারবো! একেই বলে হায়াতে বরকত।
দুই. স্মৃতিতে বরকত
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) সাহাবীদের মাঝে সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন। একদা হজরত আবু হুরায়রা (রা.) কে ততকালীন বাদশা মারওয়ান বিন হাকাম কর্তৃক দাওয়াত করা হয়। একপর্যায়ে কিছু হাদিস শুনানোর আবদার করা হয়। আগে থেকেই পর্দার আড়ালে সতর্কতামূলক দুইজন লেখককে খাতা কলম দিয়ে বসিয়ে রাখা হয়। তিনি প্রায় ১০০ র অধিক হাদিস শুনিয়ে দেন। সবগুলো দুই কাতেব হুবহু লিখে ফেলেন। এক বছর পর ওই স্থানে আবার দাওয়াত করা হয় হজরত আবু হুরায়রা (রা.) কে। গতবছর শুনানো হাদিসগুলো আবার শুনানোর আবেদন করা হয়। ওই দিকে পূর্বের দুই কাতেবকে পরীক্ষা করে মেলানোর আদেশ করা হয়। দেখা গেল তিনি নির্ভুলভাবে সবগুলো হাদিসই মুখস্থ শুনিয়ে দিলেন। এটা হল স্মৃতির বরকত। স্মরণ শক্তির বরকত।
তিন. ইবাদতে বরকত
চার ইমামের অন্যতম ইমাম শাফি (রহ.)। কোরআন-হাদিস থেকে মাসায়েল গবেষণা ও পাঠদানে ব্যস্ত থাকার পাশাপাশি ইবাদতেও প্রচুর নিমগ্ন থাকতেন। একদা মক্কা থেকে মদিনায় গেলেন উঠে সাওয়ার হয়ে। সময় লাগে মদিনায় পৌঁছাতে ১৬ দিন। এই ১৬ দিনে তিনি ১৬ বার কোরআন খতম করেন। সুবাহানাল্লাহ! এটাই ইবাদতের বরকত। আমরা সফরে তো দূরের কথা বাড়িতে থাকলেও কি প্রতিদিন এক খতম কোরআন পড়তে পারি! প্রতি মাসে কি আমরা এক খতম কোরআন পড়ি! আমাদের কজনই বা আছি বছরে এক খতম কোরআন পড়ি।
লেখক: মুফতি ও মুহাদ্দিস, জামিয়া ইবনে আব্বাস (রা.) সামান্তপুর জয়দেবপুর, গাজীপুর
উবাইদুল্লাহ তারানগরী/এমএম

