ঈমান রক্ষার লড়াই:
ফিতনার যুগে আমাদের করণীয়
মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ
প্রকাশ: ৩১ জানুয়ারি ২০২৬, ২২:৫৩
মানুষ হিসেবে আমাদের প্রথম ও প্রধান পরিচয় হলো, আমরা আল্লাহর বান্দা। আমাদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করা। এটিই তাওহীদ। এই সত্য শেখানোর জন্য আল্লাহ তাআলা যুগে যুগে নবী-রাসুল প্রেরণ করেছেন। হযরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে সর্বশেষ নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) পর্যন্ত সকল নবীর বাণী ছিল একটিই, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ।
একমাত্র ইসলাম প্রতিটি মানুষের স্বভাবজাত (ফিতরতি) ধর্ম। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “প্রত্যেক শিশু ইসলামি স্বভাবের ওপর জন্মগ্রহণ করে; পরে তার মা-বাবাই তাকে ইহুদি, খৃষ্টান অথবা অগ্নিপূজক বানিয়ে ফেলে।” (সহিহ বুখারি: ১৩৮৫)
আল্লাহ তাআলা পবিত্র কোরআনে ঘোষণা করেছেন: “সুতরাং তুমি নিজ চেহারাকে (সত্তাকে) একনিষ্ঠভাবে এই দ্বীনের অভিমুখী রাখ। আল্লাহর সেই ফিতরত অনুযায়ী চল, যে ফিতরতের উপর তিনি মানুষকে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহর সৃষ্টিতে কোন পরিবর্তন সাধন সম্ভব নয়। এটাই সম্পূর্ণ সরল দ্বীন। কিন্তু অধিকাংশ মানুষ জানে না।” (সূরা রূম: ৩০)
ঈমান সবচেয়ে বড় নিয়ামত
আল্লাহ তাআলা আমাদের দুনিয়ায় অসংখ্য নিয়ামত দান করেছেন, জীবন, স্বাস্থ্য, পরিবার, সম্পদ। কিন্তু এসবের মধ্যে সবচেয়ে বড় নিয়ামত হলো আমাদের ঈমান। ইসলামি ফিকহবিদগণ স্পষ্ট করে বলেছেন যে, ঈমান রক্ষার জন্য প্রয়োজন হলে জান, মাল কুরবানি দিতে হবে। (মুয়াফাকাত, ইমাম শাতেবি কৃত)
আল্লাহ তাআলা বলেন: “যাকে জাহান্নাম থেকে দূরে রাখা হলো এবং জান্নাতে প্রবেশ করানো হলো, সে-ই সফল। আর পার্থিব জীবন তো প্রতারণার উপকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।” (সূরা আলে ইমরান: ১৮৫)
এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, ধন-সম্পদের মোহে পড়ে সে আল্লাহর অনুগ্রহকে অস্বীকার করে বসে, ফলে সে এবং ঈমান হারিয়ে মহা ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়। পরিণতিতে আল্লাহ তাকে তার সম্পদসহ ভূমিতে ধসিয়ে দিলেন।
ঈমান নিয়ে নবীদের ফিকির
এই পৃথিবীতে আল্লাহর বাণী নবীগণ পৌঁছে দিয়েছেন, নিজেরা সেই বাণীর ওপর ঈমান এনেছেন এবং তার ওপর আমল করে অন্যদের তার দিকে আহ্বান করেছেন। মানুষকে ঈমানের দাওয়াত দিয়েছেন। যারা তাদের কথা মেনেছে তাদের জান্নাতের সুসংবাদ দিয়েছেন এবং যারা তাদের থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে ভয় দেখিয়েছেন। নবীগণ তাদের পরবর্তিদের ঈমানের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন।
হযরত ইবরাহিম (আ.) ও ইয়াকুব (আ.) তাঁদের সন্তানদের উপদেশ দিয়েছিলেন: “হে আমার সন্তানগণ! নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের জন্য এ ধর্মকে বেছে নিয়েছেন। সুতরাং, মুসলিম না হয়ে তোমরা মৃত্যু বরণ করো না।” (সুরা-বাকারা: ১৩২)
এমনকি মৃত্যুশয্যায় হযরত ইয়াকুব (আ.) তাঁর সন্তানদের কাছ থেকে অঙ্গীকার নিয়েছিলেন: “আমার পরে তোমরা কিসের ইবাদত করবে?” তারা বলল: “আমরা আপনার মাবুদ এবং আপনার পূর্বপুরুষদের মাবুদ, একমাত্র আল্লাহরই ইবাদত করব, এবং আমরা তাঁরই আনুগত্যশীল।” (সূরা বাকারা: ১৩৩)
হযরত ইউসুফ (আ.) দু‘আ করতেন: “আমাকে মুসলিম অবস্থায় মৃত্যু দিন এবং আমাকে সৎকর্মশীলদের সঙ্গে মিলিয়ে দিন।” (সূরা ইউসুফ: ১০১)
হাসান বসরি (রহ.) বলেন: “মুমিন ব্যক্তি ঈমান নিয়ে সবসময় চিন্তিত থাকে, আর মুনাফিক ব্যক্তি তা নিয়ে নির্ভার থাকে।” (ইরশাদুস সারি-১/১৩৬)
ঈমানের পরীক্ষার যুগ
রাসুলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, শেষ যুগে মুসলমানদের জন্য ঈমানের ওপর টিকে থাকা অত্যন্ত কঠিন হবে। হযরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত: “মানুষের উপর এমন এক সময় আসবে, যখন দ্বীনের উপর স্থির থাকা, হাতে আগুনের অঙ্গার রাখার মতো হবে।” (তিরমিযি: ২২৬০)
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বলেন: “মানুষ সকালে মুমিন থাকবে, আর সন্ধ্যায় কাফির হয়ে যাবে। আর সে তার দ্বীনকে দুনিয়ার স্বার্থের কাছে বিক্রি করে দেবে।” (সহিহ মুসলিম-১১৮)
হযরত জাবির (রা.) বলেন: “মানুষ দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করবে। আবার এমন সময় আসবে, যখন তারা দলবেঁধে ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।” (মুসনাদে আহমদ-১৪৬৯৬)
ধর্মত্যাগের বিভিন্ন রূপ
মানুষ সাধারণত মনে করে, ধর্মত্যাগ মানে শুধু মুসলমান থেকে অন্য ধর্মে চলে যাওয়া। কিন্তু বাস্তবতা হলো, কেউ নিয়মিত নামাজ-রোজা পালন করেও ধর্মত্যাগ করতে পারে যদি তার মৌলিক বিশ্বাসে ভুল থাকে।
মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী (রহ.) বলেছেন: “এই উপমহাদেশের মুসলমানদের সবচেয়ে ভয়ংকর বিপদ হলো বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্মত্যাগ। মানুষ বুঝতেই পারছে না যে, তারা ধীরে ধীরে ঈমানের নিয়ামত থেকে বঞ্চিত হয়ে পড়ছে।” (ফিকর ওয়া খবর)
বুদ্ধিবৃত্তিক ধর্মত্যাগের কিছু উদাহরণ: ইসলামের নারী অধিকার নিয়ে আপত্তি করা। ইসলামের উত্তরাধিকারের বিধান অস্বীকার করা। শরীয়তের শাস্তিগুলোকে বর্বর মনে করা। পর্দা ও একাধিক বিবাহের বিধান প্রত্যাখ্যান করা। নামাজ-রোজাকে নিরর্থক মনে করা। কোরআনেন বা হাদীসের বিধান নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রুপ করা। তালাকের অধিকার স্বামীদের, এই ব্যাপারে আপত্তি করা।
ঈমান ধ্বংস করার জন্য বিশ্বব্যাপী ষড়যন্ত্র
আল্লাহ তাআলা কোরআনেনে সতর্ক করেছেন: “তারা চায় যে, যেমন তারা নিজে অবিশ্বাসী, তেমনি তোমরাও অবিশ্বাসী হয়ে সমান হয়ে যাও।” (সুরা নিসা: ৮৯)
“তারা তোমাদের সাথে লড়াই করতে থাকবে, যতক্ষণ না তারা তোমাদেরকে তোমাদের ধর্ম থেকে ফিরিয়ে নিয়ে যায়।” (সুরা বাকারা: ২১৭)
বর্তমান বিশ্বে মুসলমানদের ঈমানকে ছিনিয়ে নেয়ার জন্য সুপরিকল্পিত প্রচেষ্টা চলছে। বিভিন্ন এনজিও, মিশনারি সংগঠন এবং চরমপন্থী গোষ্ঠীগুলো মুসলমানদের ইসলাম থেকে দূরে সরানোর কাজে নিয়োজিত। তারা কখনো সরাসরি, কখনো পরোক্ষভাবে ইসলামের বিরুদ্ধে বিষোদগার করছে।
ঈমান রক্ষার উপায়
এই কঠিন সময়ে আমাদের করণীয় হলো:
ইলম অর্জন করা: ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস ও বিধান সম্পর্কে সঠিক জ্ঞান অর্জন করতে হবে। অজ্ঞতাই মুসলিমদের সবচেয়ে বড় শত্রæ।
নামাজের সাথে সম্পর্ক মজবুত করা: পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ জামাতের সাথে আদায় করা। নামাজ ঈমান ও কুফরের মধ্যে পার্থক্যকারী।
সন্তানদের তত্ত্বাবধান: সন্তানদের ইসলামী শিক্ষা নিশ্চিত করা। তাদের সঙ্গী-সাথী ও পরিবেশ সম্পর্কে সতর্ক থাকা।
সৎসঙ্গ গ্রহণ: যারা দ্বীনদার ও আল্লাহভীরু, তাদের সাহচর্য গ্রহণ করা। খারাপ সঙ্গ থেকে দূরে থাকা।
কোরআনেন-হাদীসের সাথে সম্পর্ক গড়া: নিয়মিত কোরআনেন তিলাওয়াত করা এবং অর্থ বুঝে পড়া। হাদীসের জ্ঞান অর্জন করা।
সন্দেহ-সংশয় থেকে দূরে থাকা: ইসলামবিরোধী প্রচারণা এড়িয়ে চলা। কোনো বিষয়ে সংশয় সৃষ্টি হলে যোগ্য আলেমদের শরণাপন্ন হওয়া।
দোয়ার অভ্যাস গড়া: নিয়মিত ঈমান রক্ষার জন্য দুআ। বিজ্ঞ এই সম্পর্কীত মাসুর দু‘আগুলো শিখে নেয়া। দাওয়াতি কাজে অংশ নেওয়া: অন্যদের ইসলামের পথে আহ্বান করা। যারা পথভ্রষ্ট হয়েছে, তাদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।
ইসলামি পরিবেশ সৃষ্টি করা: পরিবারে ইসলামি পরিবেশ বজায় রাখা। ঘরে নিয়মিত তালিম করা।
মিডিয়া ব্যবহারে সতর্কতা: সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইসলামবিরোধী বিষয়বস্তু থেকে দূরে থাকা।
আমাদের কর্তব্য
আমাদের তথা, মুসলিম সমাজের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন। আরো বেশী বেশী দরিদ্র মুসলমানদের সহায়তার ব্যবস্থা করা (যাতে দারিদ্র্য ঈমান হারানোর কারণ না হয়)
যুগ-চাহিদা অনুযায়ী ইসলামি ভাবধারার শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। মসজিদকেন্দ্রিক দ্বীনি শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা। যুব সমাজকে ইসলামের সাথে সংযুক্ত রাখার উদ্যোগ নেওয়া।
পুনশ্চ: ঈমান আল্লাহর সবচেয়ে বড় দান। এই নিয়ামত রক্ষা করা আমাদের প্রধান দায়িত্ব। দুনিয়ার সকল সম্পদ ও সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ঈমানের তুলনায় মূল্যহীন। যদি ঈমান থাকে, তবে সবকিছু আছে। ঈমান না থাকলে সবকিছুই নিরর্থক।
আল্লাহ তাআলা বলেন: “আর তোমাদের মধ্যে যারা তাদের ধর্ম থেকে ফিরে যায় এবং কুফর অবস্থায় মরে, তাদের আমল ধ্বংস হয়ে যায় দুনিয়া ও আখিরাতে, এবং তারা হলো আগুনের কীট। যেখানে সে চিরকাল থাকবে।” (সুরা বাকারা: ২১৭)
আসুন, আমরা নবীদের মতো ঈমানের ব্যাপারে চিন্তিত হই। নিজেদের, নিজেদের পরিবার এবং পুরো মুসলিম উম্মাহর ঈমান রক্ষার জন্য সচেষ্ট হই। প্রতিদিন এই দোয়া করি: “হে আমাদের রব! আমাদের হৃদয়কে সত্য পথ দেখানোর পর বক্র করে দিও না এবং তোমার পক্ষ থেকে আমাদের রহমত দান করো। নিশ্চয়ই তুমি মহাদাতা।”
আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে ঈমানের সাথে জীবনযাপন করার এবং ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
লেখক: মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া কামরাঙ্গিচর, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

