নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর দীর্ঘদিন পর্যন্ত রাসুলুল্লাহ (সা.) মক্কায় দ্বীনের দাওয়াত প্রদান করেন। কিন্তু এতে গুটিকয়েক লোক ব্যতীত কেউ ইসলাম গ্রহণ করেনি। উপরন্তু নবীজি (সা.) এবং যাঁরা ইমান এনেছে, তাঁদের ওপর মক্কার মুশরিকদের নির্যাতনের মাত্রা বৃদ্ধি পেতে থাকে। এহেন পরিস্থিতিতে নবী কারিম (সা.) সাহাবিদের নিয়ে মদিনায় হিজরত করেন।
কোরায়শরা ইসলামকে চিরতরে দুনিয়া থেকে বিদায় করতে চেয়েছিল। নিজেদের মনোবাসনা পূরণ না হওয়ার কারণে হিজরতের পরেও তারা ইসলাম ও মুসলমানদের পেছনে লেগে থাকে। এর ফলেই দ্বিতীয় হিজরিতে বদর প্রান্তরে ঐতিহাসিক বদরযুদ্ধ সংঘটিত হয়। গুটিকয়েক মুসলমানদের হাতে এ যুদ্ধে মুশরিকরা চরমভাবে নাস্তানাবুদ হয়। তারা নিজেদের প্রায় সমস্ত নেতাকে হারিয়ে ফেলে। এরপর সংঘটিত হয় উহুদের যুদ্ধ। এতেও সুবিধা করতে না পেরে মুশরিকরা প্রতিশোধের চূড়ান্ত প্রস্তুতি নিতে থাকে।
নবী কারিম (সা.) মুশরিকদের অবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে মক্কার উপকণ্ঠে দশ জনের একটা অনুসন্ধানী দল প্রেরণ করেন। হজরত খুবাইব ইবনে আদি (রা.) সেই অনুসন্ধানী দলের অন্যতম সদস্য।
দলটি যখন মক্কার উপকণ্ঠে ‘রাজি’ নামক স্থানে পৌঁছায়। তখন কিছু লোক তাঁদের দেখে ফেলে এবং বনি লিহয়ান গোত্রের নিকট দলের অবস্থান বলে দেয়। বনি লিহয়ানের একশত দক্ষ তীরন্দাজ অনুসন্ধানী দলের ওপর আক্রমণ করে। স্বল্প পরিসরে হলেও সাহাবিদের এ দল আক্রমণ প্রতিরোধের চেষ্টা করেন। কিন্তু কিছুক্ষণের মধ্যেই তাঁদের ৭ জন শাহাদাত বরণ করেন। বাকি থাকেন মাত্র তিনজন। তাঁরা হলেন, খুবাইব ইবনে আদি (রা.), আব্দুল্লাহ ইবনে তারেক (রা.) এবং জায়েদ ইবনে দাসিনা (রা.)।
তাঁদেরকে বেঁধে মক্কার বাজারে বিক্রি করার জন্য রওনা করে মুশরিকরা। পথিমধ্যে আব্দুল্লাহ ইবনে তারেক (রা.) নিজের বাঁধন খুলে ফেলতে সক্ষম হন এবং কাফেরদের ওপর আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়েন। লড়াই করতে করতে এক পর্যায়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন।
হজরত জায়েদ ইবনে দাসিনা (রা.)-কে সফওয়ান ইবনে উমাইয়া পিতৃহত্যার প্রতিশোধ নিতে কিনে নেয়। আর খুবাইব ইবনে আদি (রা.)-কে কিনে নেয় হারিসের সন্তানরা। বন্দি অবস্থাতেও খুবাইব ইবনে আদি (রা.) একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদতে মগ্ন হন। তাঁর সেই ছোট্ট বন্দিজীবনে উল্লেখযোগ্য দুইটি ঘটনা ঘটে।
প্রথম ঘটনা: হুজাইর ইবনে আবু ওহাবের দাসী মাবিয়ার কাছে খুবাইব ইবনে আদি (রা.) বন্দি ছিলেন। মাবিয়া পরে ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। তিনি বলেন, ‘শপথ আল্লাহর! আমি খুবাইবের চেয়ে উত্তম কোনো বন্দি কখনো দেখিনি। শপথ আল্লাহর! একদিন আমি তাঁকে আঙুরের থোকা থেকে আঙুর খেতে দেখেছি। অথচ তখন তাঁকে লোহার শিকলে বেঁধে রাখা হয়েছে। তাছাড়া মক্কায় তখন এমন কোনো ফলফলাদিও ছিল না। নিশ্চয়ই এ ফল আল্লাহর পক্ষ থেকে ছিল। খুবাইবের রিজিক হিসেবে তিনি তা পাঠিয়েছিলেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৩০৪৫)
দ্বিতীয় ঘটনা: মাবিয়া (রা.) বলেন, খুবাইব (রা.) বন্দিজীবনে মৃত্যুর প্রস্তুতি নিতে শুরু করেন। তিনি ক্ষৌরকর্ম এবং দাড়ি-গোঁফ পরিষ্কার করার জন্য জন্য আমার কাছে একটা ক্ষুর চান। আমার ছেলেকে দিয়ে আমি তাঁকে ক্ষুর আনিয়ে দিলাম।
ক্ষুর দিয়ে ছেলেকে খুবাইবের ঘরে পাঠালাম। সে যখন খুবাইবের নিকট গেল, হঠাৎ করে আমার মনে হলো, একি সর্বনাশ করলাম! সে একজন বন্দি। তাঁকে হত্যা করা হবে। এখন যদি সে ছেলেটিকে হত্যা করে প্রতিশোধ নিয়ে নেয় তাহলে কী হবে? সে তো নিজের জীবনের বিনিময়ে একজনের জীবন নিয়ে আগাম প্রতিশোধ নিয়ে নেবে।
এসময় আমি আরো বিস্ময়কর ঘটনা দেখলাম যে, আমার ছেলে খুবাইবের উরুর উপর বসা এবং খুবাইবের হাতে তখন ক্ষুরও ছিল। আমি খুব ভয় পেয়ে গেলাম। খুবাইব আমার চেহারা দেখে আশংকার কারণ বুঝতে পেরে বললেন, ‘তুমি কি এ ভয় করছ যে, আমি এ শিশুটিকে হত্যা করে ফেলব? কখনো আমি তা করব না।’ মাবিয়া (রা.) বলেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি খুবাইবের মতো উত্তম বন্দি কখনো দেখিনি।’
কোরায়শ কাফেরদের হাতে বন্দি সাহাবি হজরত খুবাইব ইবনে আদিকে আজ শহিদ করা হবে। এ দৃশ্য দেখার জন্য কাফেররা সমবেত হয়েছে। হাত-পা বাঁধা শৃংখলিত খুবাইবকে উপস্থিত করা হলো সবার সামনে। কিন্তু কী আশ্চর্য! কিছুক্ষণের মধ্যেই যাঁকে হত্যা করা হবে তাঁর চেহারায় ভয়, উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা কিংবা ব্যাকুলতার চিহ্নমাত্র নেই।
খুবাইব (রা.) সবাইকে লক্ষ্য করে বললেন, ‘তোমরা কি শেষবারের মতো আমাকে দুই রাকাত নামাজ পড়তে দেবে?’
অনুমতি পেয়ে হজরত খুবাইব ইবনে আদি কেবলামুখী হয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। পরম ভক্তিভরে দুই রাকাত নামাজ আদায় করলেন।
নামাজ শেষে তাঁকে শূলে চড়ানো হলো। শুরু হলো চতুর্মাত্রিক উপর্যুপরি আঘাত। আঘাতে আঘাতে খুবাইব ধীরে ধীরে নেতিয়ে পড়ছিলেন। রক্তের স্রোতে ভেসে যাচ্ছিল তাঁর দেহ। এসময় ভিড়ের মাঝখান থেকে কেউ একজন তাঁকে ডেকে বলল, ‘খুবাইব! তোমার স্থানে যদি মুহাম্মদকে হত্যা করা হয়। আর তোমাকে মুক্তি দেওয়া হয়, তুমি কি তা পছন্দ করবে?’
কথাটা শোনামাত্র আহত বাঘের ন্যায় গর্জে উঠলেন হজরত খুবাইব ইবনে আদি (রা.)। তাদের লক্ষ্য করে বললেন, ‘আল্লাহর কসম! আমি আমার পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সুখে-শান্তিতে থাকব, আর এর বিনিময়ে আমার নবীজির পায়ে একটি কাঁটা বিদ্ধ হবে, এটাও আমি কখনো সহ্য করব না।’
নবীপ্রেমিক খুবাইব শহিদ হয়ে গেলেন। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়েও রেখে গেলেন নবীপ্রেমের উজ্জ্বল উপমা। (জাদুল মাআদ: ২/৩৮)
লেখক: মুহাদ্দিস, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ, ঢাকা।
বিকেপি/এমএম

