সুন্নাহ অনুযায়ী শবেবরাতের ইবাদত
ডা. মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৮
হিজরি ১৪৪৭ বর্ষপরিক্রমার অষ্টম চান্দ্র মাস পবিত্র শাবান। আজ ৩ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (মঙ্গলবার) দিবাগত রাতে পালিত হবে বরকতময় লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান, যা অধিকাংশ মুসলিম দেশেই ‘শবে বরাত’ নামে পরিচিত। ফারসি শব্দ ‘শব’ অর্থ রাত এবং ‘বরাত’ অর্থ মুক্তি- অর্থাৎ এটি মুক্তির রাত। আরবি পরিভাষায় একে বলা হয় লাইলাতুল বারাআত, এবং হাদিসে এসেছে- শাবান মাসের মধ্যরাত বিশেষ বরকতময়।
কোরআনের আলোকে রাতের বরকত
আল্লাহ তাআলা বলেন: হা-মীম। স্পষ্ট কিতাবের শপথ! নিশ্চয় আমি তা এক বরকতময় রাতে নাজিল করেছি, যাতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নির্ধারিত হয়।- (সূরা দুখান :৩)
মুফাসসিররা বলেন, এখানে বরকতময় রাত”কে শাবান মাসের মধ্যরাত্রি বা লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। এই রাত আল্লাহর রহমত, ক্ষমা ও বরকতের জন্য বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ।
শবে বরাত নিয়ে বিভ্রান্তি ও অতিরঞ্জন
যুগ যুগ ধরে মুসলিম সমাজে শবে বরাত পালন প্রচলিত। তবে কিছু ভুল বোঝাবুঝি লক্ষ্য করা যায়। একদল মুসলিম অতিরঞ্জিত হয়ে শরিয়তের বহির্ভূত আচরণে লিপ্ত হয়। অন্যদল রাতটি অস্বীকার করে মর্যাদা হ্রাসের চেষ্টা করে। ইসলামের পরিপূর্ণতা হলো মধ্যপন্থা। হাদিসের আলোকে শবে বরাতকে অতি-বিদআত বা উপেক্ষা উভয়ই গ্রহণযোগ্য নয়।
শবে বরাতের ফজিলত
শবে বরাতের ফজিলত সম্পর্কিত হাদিস সাহাবাদের বর্ণনায় প্রমাণিত।
ক্ষমার রাত: হজরত আবু মুসা আশআরি (রা.) বর্ণনা করেছেন:শাবান মাসের মধ্যরাতে আল্লাহ তাআলা সমস্ত মুমিনদের ক্ষমা করেন, মুশরিক ও হিংসুকদের ব্যতীত।- (ইবনে মাজাহ: ১৩৯০) হজরত আয়েশা (রা.) বলেন: শাবান মাসের এই রাতে আল্লাহ তাআলা কালব গোত্রের মেষপালের চেয়েও অধিক মানুষকে ক্ষমা করেন।- (ইবনে মাজাহ: ১৩৯১)
শাবান মাসে রোজার গুরুত্ব
নবী করিম (সা.) শাবান মাসে বেশি নফল রোজা রাখতেন। হজরত আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেছেন: আমি কখনো দেখিনি নবী (সা.) শাবান মাসের মতো এত বেশি রোজা অন্য কোনো মাসে রাখতেন।- (তিরমিজি : ৭৩৯)
আইয়ামে বিজের রোজা: প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে রোজা রাখা নবী (সা.)-এর সুন্নাহ। "যে ব্যক্তি আইয়ামে বিজে রোজা রাখে, আল্লাহ তাআলা তাকে পূর্ববর্তী গোনাহ থেকে মুক্ত করবেন।”- নাসাই : ২৩৪১)
শবে বরাতের পরদিন রোজা: হজরত আলী (রা.) থেকে বর্ণিত:১৫ শাবানের রাতে ইবাদত করো এবং পরদিন রোজা রাখো।- (ইবনে মাজাহ : ১৩৯২)
বর্জনীয় আচরণসমূহ
শবে বরাত পালনের সময় কিছু কাজ থেকে বিরত থাকা জরুরি।
* বিশেষ খাবারের আয়োজন করে সারা বছরের বরকতের আশা করা।
* ফটকা, আতশবাজি ও শব্দদূষণ করা।
* সন্ধ্যায় গোসল করলেই গোনাহ মাফের ধারণা করা।
* ঘর, কবর বা আঙিনায় মোমবাতি,
* আগরবাতি বা আলোকসজ্জা করা।
* ইবাদতের পরিবর্তে ঘোরাফেরা বা বেহুদা আনন্দে ব্যস্ত থাকা।
* অন্যের ইবাদত বা ঘুমের ব্যাঘাত ঘটানো।
* হালুয়া-রুটি বা খাবারে অতিরিক্ত সময় নষ্ট করা।এসব আচরণ শরিয়তের বহির্ভূত এবং পরিহারযোগ্য।
করণীয় নেক আমল
শবে বরাতে নিম্নোক্ত আমলগুলো বেশি ফলদায়ক।
* নফল নামাজ আদায় (সাহিহ মুসলিম: ৭২৮ )
* কোরআন তেলাওয়াত।
* দরুদ শরিফ পাঠ।
* ইস্তিগফার করা। (সাহিহ বুখারি :৬৩০১ )
* তাসবিহ, তাহলিল ও জিকির।
* নিজের, পিতা-মাতা ও সব মুমিনের জন্য দোয়া।
* সম্ভব হলে কবর জিয়ারত। (বিদআত থেকে মুক্ত থেকে)
নবী (সা.)-এর দোয়াসমূহ: উচ্চারণ- আল্লাহুম্মা বারিক লানা ফি শা‘বান ওয়া বাল্লিগনা রামাদান। অর্থ: হে আল্লাহ! শাবান মাসে আমাদের জন্য বরকত দান করুন এবং আমাদেরকে রমজান পর্যন্ত পৌঁছে দিন।
আরেকটি দোয়া:আল্লাহুম্মা বাল্লিগনা রামাদান ওয়া আ‘ইন্না ‘আলা সিয়ামিহি ওয়া ক্বিয়ামিহি।
পরিশেষে বলতে চাই, শবে বরাত বা লাইলাতুন নিসফে মিন শাবান কোনো বিতর্কের বিষয় নয়। এটি আত্মশুদ্ধি, ইবাদত ও ক্ষমা প্রার্থনার রাত। হাদিস ও কোরআনের আলোকে ভারসাম্যপূর্ণ ইবাদত করা সমীচীন। আমাদের উদ্দেশ্য হওয়া উচিত—অতিরঞ্জন বা অবহেলা না করে সুন্নাহ অনুযায়ী আমল করা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সঠিক পথে শিখিয়ে আমল করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
লেখক: কলাম লেখক ও ইসলাম বিষয়ক গবেষক
প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি
ইমেইল: drmazed96@gmail.com

