মুক্তির রজনী
লৌকিকতা ছেড়ে ফিরে আসি শাশ্বত ইবাদতে
হাফেজ মুফতী রাশেদুর রহমান
প্রকাশ: ০২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১৫
নিস্তব্ধ রাতের আঁধারে যখন প্রকৃতি মগ্ন থাকে গভীর ঘুমে, মুমিনের হৃদয়ে তখন বেজে ওঠে পরম প্রিয় রবের ক্ষমা ও করুণার আহ্বান। শাবান মাসের এই পূর্ণিমা তিথি যেন রমজানের এক প্রশান্তিময় পূর্বাভাস। এই মাসেরই চতুর্দশ দিবাগত রাতটি মুসলিম উম্মাহর কাছে 'শবে বরাত' বা 'লাইলাতুল বারাআত' নামে পরিচিত। ‘বারাআত’ শব্দের অর্থ মুক্তি। গুনাহ থেকে মুক্তির সুসংবাদ বয়ে আনে বলে মুমিন হৃদয়ে এই রাতের গুরুত্ব অপরিসীম। তবে এই রাতকে ঘিরে আমাদের সমাজে যেমন অতিরঞ্জন আছে, তেমনি আছে উদাসীনতাও। সহিহ হাদিসের আলোকে এই রাতের প্রকৃত আমল ও করণীয় জেনে নেওয়া যাক।
১. এই রাতের মর্যাদা কি প্রমাণিত?
অনেকেই মনে করেন শবে বরাতের কোনো ভিত্তি নেই। বিষয়টি সঠিক নয়। আল্লাহর রাসুল (সা.) বলেছেন, “মধ্য শাবানের রাতে আল্লাহ তাআলা তাঁর সৃষ্টির প্রতি রহমতের দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও অন্তরে বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সকলকে ক্ষমা করে দেন।” (সহিহ ইবনে হিব্বান: ৫৬৬৫) আলবানী ও শুআইব আরনাউতসহ প্রখ্যাত হাদীস বিশারদগণ হাদীসটিকে প্রামাণ্য হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
যাঁরা আল্লাহর ক্ষমা পেতে উন্মুখ, তাঁদের জন্য এটি একটি পরম সুযোগ। এই বিশাল প্রাপ্তি অবহেলায় বা ঘুমিয়ে কাটিয়ে দেওয়া মুমিনের কাজ হতে পারে না।
২. বিশেষ কোনো আমল কি আছে?
শরিয়তের দৃষ্টিতে এই রাতের জন্য সুনির্দিষ্ট বা অপরিহার্য কোনো আমল নেই। তবে যেহেতু এটি একটি ফযিলতপূর্ণ সময়, তাই ব্যক্তিগতভাবে যেকোনো নফল ইবাদত করা যেতে পারে। যেমন:
* নফল নামাজ ও দীর্ঘ মোনাজাত।
* কোরআন তিলাওয়াত ও জিকির-আজকার।
* তওবা-ইস্তেগফার ও দরুদ পাঠ।
* দান-সদকা ও সাধ্যমতো কাজা নামাজ আদায় করা।
সবচেয়ে বড় আমল হলো- নিজের অন্তরকে শিরক ও অন্যের প্রতি হিংসা-বিদ্বেষ থেকে পবিত্র করা। মনে রাখতে হবে, এসব ইবাদত ব্যক্তিগতভাবে করা উত্তম। এগুলোকে সুন্নাত বা অপরিহার্য মনে করা যাবে না এবং যারা করছে না তাদের সমালোচনাও করা সমীচীন নয়।
৩. রোজা ও শবে বরাত
শবে বরাতের সুনির্দিষ্ট রোজা নিয়ে যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তার সূত্র দুর্বল। তবে নবীজি (সা.) শাবান মাসে সবচেয়ে বেশি রোজা রাখতেন। এছাড়া প্রতি চন্দ্র মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখে ‘আইয়ামে বিয’-এর রোজা রাখা সুন্নাত। সেই ধারাবাহিকতায় আগামী ২, ৩ ও ৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ (সোম, মঙ্গল ও বুধবার) তিনটি রোজা রাখা যেতে পারে। এতে যেমন শবে বরাতের সময়টুকু ইবাদতে কাটে, তেমনি সুন্নাতও পালিত হয়।
৪. বর্জনীয় কিছু প্রচলিত ধারণা
আমাদের সমাজে প্রচলিত কিছু ভুল ধারণা ও কুসংস্কার থেকে বেঁচে থাকা জরুরি।
ক. ভাগ্য রজনী নয়: শবে বরাত ভাগ্য রজনী নয়; মূলত লাইলাতুল কদর বা শবে কদরই হলো ভাগ্য নির্ধারণের রাত।
খ. হালুয়া-রুটি ও আতশবাজি: হালুয়া-রুটি উৎসব বা আতশবাজি ফুটানো ইবাদতের অংশ নয়, বরং এগুলো অপচয় ও নিকৃষ্ট প্রথা।
গ. গোসল: এই রাতে গোসল করলে বিশেষ সওয়াব হবে- এমন কোনো বর্ণনা হাদিসে নেই।
ঘ. কবরস্থানে ভিড়: কবর জিয়ারত সওয়াবের কাজ, তবে এই রাতে দলবেঁধে কবরস্থানে যাওয়ার বিশেষ কোনো বিধান নেই। কেউ চাইলে ব্যক্তিগতভাবে নিঃশব্দে জিয়ারত করতে পারেন।
পরিশেষে, শবে বরাত হোক অন্তরের কালিমা মোচনের রাত। মসজিদে বা রাস্তায় সম্মিলিত ভিড় না বাড়িয়ে নিভৃতে আল্লাহর দরবারে চোখের পানি ফেলাই হোক আমাদের লক্ষ্য। কোনো বানোয়াট পদ্ধতি বা বিশেষ সূরা নির্দিষ্ট না করে স্বাভাবিকভাবে নফল ইবাদতের মাধ্যমে আমরা আল্লাহর নৈকট্য হাসিল করতে পারি। আল্লাহ আমাদের এই পবিত্র রাতে ক্ষমা ও বরকত নসিব করুন।
লেখক: সিনিয়র পেশ ইমাম, বুয়েট সেন্ট্রাল মসজিদ ঢাকা
বিকেপি/এমএম

