Logo

ধর্ম

যাকাত ও ইসলামি সামাজিক অর্থনীতি

Icon

ওয়েছ খান নূর সোহেল

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:৪১

যাকাত ও ইসলামি সামাজিক অর্থনীতি

‘যাকাত’ একটি আরবি শব্দ। এর আভিধানিক অর্থ : পবিত্রতা, প্রবৃদ্ধি ও প্রশংসা। পারিভাষিক অর্থে নির্দিষ্ট পরিমাণ সম্পদ কোনো ব্যক্তির মালিকানায় থাকলে নির্দিষ্ট সময় পর ঐ সম্পদের একটি অংশ শরীয়াহ কর্তৃক নির্ধারিত খাতে বিতরণ ও বণ্টন করাকে ‘যাকাত’ বলে। যাকাতের আভিধানিক ও পারিভাষিক অর্থের মাঝে সঙ্গতি বিদ্যমান। আল্লাহ্ তা‘আলা সূরাহ যারিয়্যাতের ১৯ নং আয়াতে বলেছেন, ‘তাদের (ধনীদের) সম্পদে প্রার্থী ও বঞ্চিতদের অধিকার রয়েছে’।

যাকাত আদায়ের মাধ্যমে ধনীরা নিজেদের সম্পদে বিদ্যমান থাকা অপরের ‘হক’ (অধিকার) হস্তান্তর করেন। ফলে একদিকে তাদের সম্পদ পবিত্র হয়, অপরদিকে তাদের মনও কৃপণতার কলুষতা হতে পবিত্রতা লাভ করে। যাকাত আদায়ের ফলে সম্পদ আবর্তিত হয়। তাই আপাতদৃষ্টিতে সম্পদ হ্রাস পায় বলে মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে তা বেড়ে যায়। তা ছাড়া যাকাতের কারণে সওয়াবও বর্ধিত হয়। এভাবে দেখা যায়, শব্দটির মূল আভিধানিক অর্থ তথা ‘পবিত্রতা’ ও ‘উন্নতি’ যাকাত আদায়ের মাধ্যমে অর্জিত হয়। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে একদিকে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করা সম্ভব; অপরদিকে দারিদ্র্যের অভিশাপ হতে সমাজকে মুক্ত করাও সম্ভব। 

ফরয আমলগুলোর মধ্যে সালাতের পরই যাকাতের স্থান। আল-কোরআনে ২৮টি স্থানে সালাতের সাথে যাকাতের উল্লেখ করা হয়েছে। যাকাত আদায়ের মাধ্যমে একজন মুসলিম একটি ফরয ইবাদাত আদায় করেন এবং এর মাধ্যমে অন্তর কলুষমুক্ত হয়। 

যাকাত গোনাহ মাফ করে

সম্পদের লোভ মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। তবে এটির নিয়ন্ত্রণেই মানুষের কল্যাণ। যাকাত মানুষের কাছে এ সুযোগ এনে দেয়। যাকাত ও সাদাকাহ প্রদান করলে আল্লাহ্ তা‘আলা মানুষের গুনাহ মাফ করে দেন। সূরাহ আল-বাক্বারাহ’র ২৭১ নং আয়াতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, ‘তোমরা যদি প্রকাশ্যে দান করো, তবে তা ভালো। কিন্তু যদি দান করো গোপনে এবং তা দাও অভাবী লোকদের, তবে তা তোমাদের নিজেদের জন্যই কল্যাণকর। আর তিনি (দানের কারণে) তোমাদের কিছু পাপ মোচন করে দেবেন। তোমরা যা করো, তিনি তার খবর রাখেন’।

ধনীদের সম্পদে গরিবের হক

সম্পদ নিরঙ্কুশভাবে মানুষের অর্জন নয়। আল্লাহ্ পৃথিবীময় সম্পদ ছড়িয়ে ছিটিয়ে দিয়েছেন। মানুষ চেষ্টা-প্রচেষ্টা বিনিয়োগ করে সম্পদ অর্জন করে। তাই বলে সম্পদকে কেবল নিজস্ব চেষ্টার ফল বলে ধরে নেয়া যায় না। বহু মানুষ প্রাণান্তকর চেষ্টা করেও সম্পদ উপার্জন করতে সক্ষম হয় না। আবার কেউ কেউ সহজেই বিরাট সম্পদের মালিক হয়। কারণ আল্লাহ্ যাকে ইচ্ছা রিযিক প্রশস্ত করেন, আবার যাকে ইচ্ছা রিযিক সংকীর্ণ করে দেন। সম্পদশালীকে আল্লাহ্ তা‘আলা যেমন সম্পদ দিয়েছেন তেমনি ওই সম্পদে গরিবের হক রেখে দিয়েছেন। যাকাত আদায় না করলে ধনীর সম্পদে আল্লাহ্ ও গরিবের হক থেকে যায়। অপরের হক বিদ্যমান থাকায় সম্পদ পবিত্র হয় না। আর তাই যাকাত প্রদানের মাধ্যমে ধনীরা তাদের সম্পদে বিদ্যমান অপরের হক আদায় করতে সমর্থ হন। এভাবে তাদের সম্পদ পবিত্র হয়। 

যাকাত আদায়ের পদ্ধতি

প্রশ্ন হলো এ যাকাত কি ব্যক্তি নিজে নিজে আদায় করে দিবে না রাষ্ট্রের কোনো দায়িত্ব আছে? সূরা আল হাজ্জের ৪১ নং আয়াতে আল্লাহ বলেছেন ‘তারা এমন যাদেরকে আমি যমীনে ক্ষমতা দান করলে তারা সালাত কায়েম করবে, যাকাত দেবে এবং সৎকাজের আদেশ দেবে ও অসৎকাজ থেকে নিষেধ করবে; আর সব কাজের পরিণাম আল্লাহরই অধিকারে’। আবার সূরা আত-তাওবার ১০৩ নং আয়াতে আল্লাহ ঘোষণা করেন ‘তাদের সম্পদ থেকে সাদাকাহ গ্রহণ করুন। এর মাধ্যমে তাদেরকে আপনি পবিত্র ও পরিশুদ্ধ করবেন।’ শেষোক্ত আয়াতে যেহেতু আল্লাহ রাব্বুল ‘আলামীন রাসুল (সা.) কে যাকাত সংগ্রহ করার জন্য নির্দেশ প্রদান করেছেন এবং তিনি যেহেতু রাষ্ট্র প্রধান ছিলেন, সেহেতু এর দ্বারা বোঝা যায় যে, যাকাত সংগ্রহ করাও রাষ্ট্র প্রধানের একটি দায়িত্ব ও কর্তব্য। মহানবী (সা.) মদিনায় একটি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর সেখানে যাকাত ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন। তিনি যাকাত আদায় ও তা বিতরণের জন্য কর্মচারি নিয়োগ করতেন। যাকাতের রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার ফলশ্রুতিতে সেখানে সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও তা কিছু সম্পদশালী লোকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থেকে সমাজের পিছিয়ে পড়া অভাবগ্রস্তদের মধ্যেও বণ্টিত ও আবর্তিত হতে থাকে।

খোলাফায়ে রাশেদিনের আমলে যাকাত

খোলাফায়ে রাশেদিনের সময়ে হযরত আবু বকর (রা.) রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত আদায়ের ব্যবস্থা জোরদার করেন। হযরত উমর (রা.)-এর খিলাফতকালে মুসলিম উম্মাহর অর্থনৈতিক অবস্থার এতটা উন্নতি হয়েছিল যে, যাকাতের সম্পদ বিতরণের জন্য প্রাপক পাওয়া যাচ্ছিল না। একইভাবে উমর ইবনে আবদুল আজিজের সময়ে মিসরের গভর্নর জানান যে, সেখানে যাকাতের সম্পদ বিতরণের জন্য উপযুক্ত প্রাপক নেই। এ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, যাকাত দারিদ্র্য বিমোচনে বিরাট অবদান রাখতে পারে এবং ইসলামের ইতিহাসে তার নজির রয়েছে। যাকাতের পাশাপাশি উশর, ওয়াকফ, ফিতর, সাদাকাহ, কর্জে হাসানা ইত্যাদি ব্যবস্থাও ইসলামি সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরীকরণে বিশেষ অবদান রাখে।

খোলাফায়ে রাশেদিনের পরে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ইসলামি নীতির ব্যত্যয় ঘটলেও উমাইয়া ও আব্বাসীয় শাসনামলেও যাকাত আদায় ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা রাষ্ট্রীয়ভাবে করা হতো। খিলাফত ব্যবস্থার পতন ও ঔপনিবেশিক শাসনের ফলশ্রুতিতে মুসলিম বিশ্বে রাষ্ট্রীয়ভাবে যাকাত ব্যবস্থাপনার অবসান ঘটে। ঔপনিবেশিক শাসনে পুঁজিবাদের আগ্রাসন মুসলিম সমাজকে একেবারে পঙ্গু করে দেয়। ঔপনিবেশিক শাসনের কবল থেকে মুক্তির পর সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের এরূপ সুন্দর ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আজ মুসলিম সমাজে এর অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ‘সামাজিক নিরাপত্তা বিধানের জন্য’ অন্যদের উপদেশ খুঁজে বেড়াচ্ছি। বিভিন্ন দাতা দেশ ও সংস্থাগুলো বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও দারিদ্র্যবিমোচন কৌশলপত্র প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে পরামর্শ ও চাপ দিচ্ছে। আজকে হাতে গোনা কয়েকটি দেশ বাদ দিলে অধিকাংশ মুসলিম দেশের সরকারের অর্থনৈতিক নীতিতে যাকাত আর্থিক ও রাজস্ব খাত হিসেবে স্বীকৃতি পায়নি। দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য বিদেশের কাছে অনুদান ও ঋণের জন্য ধরনা দেয়া হচ্ছে; অথচ যাকাতের মতো লুকায়িত বিশাল সম্পদের দিকে নজর দেয়া হচ্ছে না। 

দারিদ্র্য দূরীকরণে যাকাত

ইসলামের যাকাত ব্যবস্থায় দারিদ্র্য দূরীকরণের সর্বোত্তম ব্যবস্থা রয়েছে যা ইতিহাসে একটি সুফলদায়ক নীতি বলে প্রমাণিত হয়েছে।

ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন আসন্ন। ২৪’র জুলাই বিপ্লবের পর দেশের মানুষের মধ্যে একটি ইতিবাচক পরিবর্তনের আশা তৈরি হয়েছে। রাজনৈতিক নিপীড়ন, অর্থনৈতিক শোষণের যাঁতাকল থেকে মুক্তির জন্য মানুষের মনে তীব্র আকাক্সক্ষা তৈরি হয়েছে। ইতো পূর্বেও বহুবার রাজনৈতিক পরিবর্তন এসছিল, কিন্তু মানুষের ভাগ্যের উন্নতি সেভাবে হয়নি বরং শোষণ ও বৈষম্যের মাত্রা অনেক সময় বেড়েছে। অনেক সরকার এসেছে, অনেক সরকার বিদায় নিয়েছে। এদের মধ্যে কেউ বাংলাদেশকে উন্নয়নের রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন, কেউবা এশিয়ার উদীয়মান শক্তি হওয়ার বাসনা ব্যক্ত করেছেন। কিন্তু বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মৌলিক যে অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়নি। দেশের ব্যক্তি খাতের আপাতবিকাশ ও সাফল্যে শহর-নগরে কোথাও কোথাও গতি, প্রবৃদ্ধি আর সেবার মান বাড়লেও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমানের দৃশ্যমান উন্নতি লক্ষণীয় হয়নি। এখনো দেশের এক-চতুর্থাংশের বেশি মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছেন।

পিপিআরসি’র সাম্প্রতিক গবেষণায় উঠে এসেছে, দেশে এখন দারিদদ্র্যের হার প্রায় ২৮ শতাংশ। সরকারি হিসাবেই ২০২২ সালে এই হার ছিল ১৮ দশমিক ৭। দারিদ্র্য বৃদ্ধির এই চিত্র আমাদের উদ্বিগ্ন করে। দারিদ্র্যের পাশাপাশি অতিদারিদ্র্যের হারও বেড়েছে। সরকারি হিসাবে ২০২২ সালে অতিদারিদ্র্যের হার ছিল ৫ দশমিক ৬। তিন বছর পর এসে অতিদারিদ্র্যের হার বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৩৫-এ। বাংলাদেশে দারিদ্র্য হ্রাসের হার টেকসই করা যাচ্ছে না। প্রবৃদ্ধির সাফল্য যেমন সবার কাছে পৌঁছাচ্ছে না, তেমনি বিভিন্ন দুর্যোগে দারিদ্র্য আবার বেড়েও যায়। শুধু তা-ই নয়, অতি দরিদ্রের সংখ্যাও বেড়ে যায় বা নতুন করে লোকেরা দরিদ্র, এমনকি অতিদরিদ্রও হয়ে যাচ্ছে। এটির কারণ হিসেবে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা ভূরাজনৈতিক কারণ যেমন দায়ী তেমনি দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াইয়ে দীর্ঘমেয়াদি সাফল্য না এলে দারিদ্র্য হ্রাসের প্রক্রিয়া টেকসই হবে না।

বিগত সরকারের শেষ সময়ে অর্থনীতিতে যে বিশৃঙ্খল অবস্থা ও লুটপাট চলছিল, তা জনজীবনে মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলছে। জুলাই বিপ্লবের পর সামষ্টিক অর্থনীতিতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে এলেও সার্বিক পরিস্থিতি এখনো স্থিতিশীল নয়। দেশে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৮ শতাংশের বেশি। এখানে সাধারণ মানুষকে খাদ্যপণ্যের পেছনে আয়ের ৫৫ শতাংশ ব্যয় করতে হয়, ফলে বেঁচে থাকার অন্যান্য উপকরণের জোগান দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। খাদ্যপণ্যের মতো পরিবহন, বাড়িভাড়া ও চিকিৎসা ব্যয়ও বাড়ছে অস্বাভাবিক হারে; যদিও আয় বাড়েনি।

বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ১% মানুষ বর্তমান বিশ্বের মোট সম্পদের প্রায় অর্ধেক বা তার বেশি নিয়ন্ত্রণ করে। অক্সফাম এর বার্ষিক প্রতিবেদনগুলোতে প্রায়ই দেখা যায় যে, মাত্র কয়েকজন বিলিয়নেয়ারের হাতে থাকা সম্পদ বিশ্বের দরিদ্রতম অর্ধেক জনসংখ্যার (প্রায় ৪০০ কোটি মানুষ) মোট সম্পদের সমান। গত কয়েক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সিংহভাগই ধনীদের পকেটে গেছে। মহামারীর মতো সংকটের সময়েও দেখা গেছে যে সাধারণ মানুষ যখন কাজ হারিয়েছে, তখন শীর্ষ ধনীদের সম্পদ অভাবনীয় হারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশেও সম্পদ ও আয়ের বৈষম্য বেশ প্রকট এবং সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এটি আরও বেড়েছে।

২০২৬ সালের ‘ওয়ার্ল্ড ইনইকুয়ালিটি রিপোর্ট’ এবং বিভিন্ন আর্থিক সংস্থার তথ্য অনুযায়ী বাংলাদেশে শীর্ষ ১% ধনীর হাতে দেশের মোট সম্পদের প্রায় ২৪% পুঞ্জীভূত। দেশের সবচেয়ে ধনী ১০% মানুষের দখলে রয়েছে মোট সম্পদের ৫৮%। বিপরীতে, দেশের দরিদ্রতম ৫০% মানুষের হাতে রয়েছে মোট সম্পদের মাত্র ৪.৭%। জাতীয় আয়ের প্রায় ৪১% অর্জন করে উপরের ১০% উচ্চবিত্ত মানুষ, যেখানে নিচের ৫০% মানুষ পায় মাত্র ১৯%। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মুদ্রাস্ফীতি এবং স্থবির মজুরির কারণে স্বল্প আয়ের মানুষ অর্থনৈতিক চাপে রয়েছে, যার ফলে গিনি সূচক (বৈষম্য পরিমাপের একক) গত কয়েক বছরে বেড়েছে।

কর ও ভ্যাটের চাপ

দেশের কর ব্যবস্থা মূলত পরোক্ষ কর বা ভ্যাট নির্ভর, যা দরিদ্রদের ওপর বেশি চাপ সৃষ্টি করে। গ্রামীণ এলাকায় নিম্ মানের শিক্ষা এবং কর্মসংস্থানের অভাব নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য উপরে ওঠার সুযোগ কমিয়ে দিচ্ছে। সামগ্রিকভাবে, বাংলাদেশে গত এক দশকে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হলেও এর সুফল সাধারণ মানুষের তুলনায় উচ্চবিত্তদের কাছে বেশি পৌঁছেছে। 

অপরদিকে সরকার সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য যে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচী চালু রেখেছে তার পরিমাণ জিডিপি-ও মাত্র ২.৫% ভাগ। কিন্তু এটা অনেকটাই সত্য যে, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ ও দূর্নীতির কারণে প্রকৃত অভাবীরা ওই কর্মসূচির সুবিধা কমই পেয়ে থাকে। একইভাবে বিভিন্ন খাতে সরকারের যেসব ভতুর্কি দিয়ে থাকে তা থেকেও সুবিধা পায় ধনীরা। ঋণ খেলাপীরা তো সকলেই ধনী এবং ঋণ পরিশোধের পুনঃতফসলীকরণ সুবিধাও তারাই পায়। সে সকল কারণে বৈষম্য বৃদ্ধি পায় সেগুলোর প্রতিকারের জন্য কার্যকর কর্মসূচির অভাব থাকলেও সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির আওতায় দেশে দীর্ঘদিন থেকে বিভিন্ন প্রকল্প চালু আছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে- ভিজিডি, ভিজিএফ, কর্মসংস্থান প্রকল্প, ওএমএস, বয়স্ক ভাতা, বিধবা ভাতা, প্রতিবন্ধী ভাতা, ত্রান ও পুনবার্সন প্রকল্প, শিক্ষাথীদের জন্য বৃত্তি কর্মসূচি। বাংলাদেশে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচি মূলত দরিদ্র এবং সমাজের সুবিধাবঞ্চিত পরিবারগুলোর কল্যাণে কাজ করার কথা।

২০২৫-২৬ অর্থ বছরের বাজেট এবং সাম্প্রতিক সরকারি সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এই কর্মসূচিগুলোকে আরও আধুনিক ও জনবান্ধব করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। সাধারণ বয়স্কদের জন্য ভাতা বৃদ্ধি করে মাসিক ৭০০ টাকা করা হয়েছে এবং ৯০ বছরের ঊর্ধ্বে ব্যক্তিদের জন্য এই হার ১,০০০ টাকা। বিধবা ও স্বামী নিগৃহীতার মাসিক ভাতা ৭০০ টাকা করা হয়েছে। প্রতিবন্ধী ভাতা মাসিক ৯০০ টাকা করে প্রদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের জন্য উপবৃত্তির হার বাড়ানো হয়েছে। ২০২৫-২৬ অর্থ বছরে বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে মোট বরাদ্দ প্রায় ১.১৭ লাখ কোটি টাকা। সমস্যা হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাজেটের একটি বড় অংশ (প্রায় ৪৫%) সরকারি কর্মচারীদের পেনশন এবং কৃষি ভর্তুকিতে ব্যয় হয়, যা সরাসরি দরিদ্রদের সহায়তায় কম কাজে আসে। এছাড়া প্রকৃত দরিদ্রদের সঠিক তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা এবং শহরাঞ্চলে কাভারেজ বাড়ানো এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ।

২০১৫ সালের ডিসেম্বরে জাতীয় বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করে যখন সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতা একলাফে প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছিল, সম্প্রতি বেতনকাঠামো আবারো দ্বিগুণ করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি হয়ত আগামী নির্বাচিত সরকার বাস্তবায়ন করবে। কিন্তু এর বিপরীতে টাকার অঙ্কে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ অনেকটা কচ্ছপগতিতে বাড়ছে। সত্যিকার অর্থে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি নয়, এমন কিছু বিষয়কে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের তালিকায় দেখানো হচ্ছে। যেমন ধনী-গরিব সবাই সঞ্চয়পত্র কিনতে পারেন। সরকার দেখাতে যাচ্ছে, ব্যাংকে টাকা রাখলে যে হারে সুদ পাওয়া যায়, তার চেয়ে বেশি হারে যতটুকু সুদ সঞ্চয়পত্রে দেওয়া হয়, ততটুকু হচ্ছে সামাজিক নিরাপত্তা। আবার অবসরভোগী সরকারি চাকরিজীবীদের পেনশন এবং স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের বৃত্তিকেও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির তালিকায় রাখা হচ্ছে।

কৃষি খাতে ভর্তুকির পুরো অঙ্ককেই সরকার সামাজিক নিরাপত্তা বলে বিবেচনা করছে। উপকূল অঞ্চলে আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় তহবিল গঠন, চাকরিরত অবস্থায় মারা যাওয়া সরকারি কর্মচারীদের জন্য অনুদান ইত্যাদি খাতের বরাদ্দকেও সামাজিক নিরাপত্তায় বরাদ্দ হিসেবে চিহ্নিত করা হচ্ছে। নগদ সহায়তা, খাদ্যসহায়তা ও কর্মসৃজন, বৃত্তি, বিশেষ সহায়তা, বিশেষ জনগোষ্ঠীর জন্য সহায়তা, উন্নয়ন কর্মকাণ্ড ইত্যাদি বিষয়ে সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী খাতের আওতায় ১১৫টি বিষয় বা কর্মসূচি রয়েছে। বাস্তবায়নের দায়িত্বে রয়েছে ২৪টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ। খাদ্যনিরাপত্তা ও কর্মসৃজন কর্মসূচিতে থাকছে ১১টি বিষয়। এ ছাড়া বৃত্তি বাবদ ৬টি, নগদ ও খাদ্যসহায়তা সংক্রান্ত ১৭টি, ঋণসহায়তার ২টি, বিশেষ সম্প্রদায় ও জনগোষ্ঠীর ১৩টি, বিভিন্ন তহবিল ও কর্মসূচি ৯টি এবং ৩৪টি উন্নয়ন কর্মসূচি বাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে সামাজিক নিরাপত্তা খাতে। 

পর্যালোচনায় দেখা যাচ্ছে, মোট জিডিপি ২.০০%-২.৫% ব্যয় বরাদ্দ করে বলে যে দাবি করা হয়ে থাকে প্রকৃত পক্ষে তা সঠিক নয়। সাবসিডি বাদ দিলে প্রকৃত বরাদ্দ হার জিডিপি এর মাত্র ১.৩২%!  সরকারের এসব কর্মসূচি হতদরিদ্রের হার কমাতে কিছুটা সাহায্য করলেও প্রকৃত পক্ষে অর্থনৈতিক বৈষম্য হ্রাসকরণে এর অবদান সীমিত। সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের পরিমাণ এতটাই কম যে, তা দিয়ে ন্যূনতম চাহিদা পূরণ এমনকি খাবারের ব্যবস্থা করাও সম্ভব হয়না। যতটুকু হয় সেটাও সময়মতো পাওয়া যায়না। সরকারি কর্মচারী ও রাজনৈতিক দলের সংশ্লিষ্টরা বেশি সুবিধা পান। তদুপরি সামাজিক সুরক্ষায় যে বরাদ্দ দেওয়া হয়, তা-ও সব সময় উপযুক্ত ব্যক্তি পান না। স্বার্থান্বেষী মহল হাতিয়ে নেয়। দূর্নীতি হয়। গরিবের হক ধনীরা মেরে খায়। ২৪টি মন্ত্রনালয় কাজ বাস্তবায়নে জড়িত থাকার ফলে কোথাও সমন্বয়ের অভাব হয় আবার কোথাও বারংবার হয়। 

সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধির কথা বিবেচনা করতে গেলেই অন্য খাতের বরাদ্দ কমাতে হয়। কারণ দেশের রাজস্ব আয়ের পরিমান সন্তোষজনক নয়। এখানেই আমরা ভবিষ্যৎ সরকারে আসতে যাওয়া রাজনৈতিক দলকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুপারিশ করতে পারি। সেটি হচ্ছে ইসলামি সামাজিক অর্থয়নকে রাজস্বের একটি উৎস হিসেবে গ্রহণ করা।

যাকাত বাধ্যতামূলক করা

২০২২ সালের সমীক্ষা অনুযায়ী বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সমাজ থেকে প্রতি বছর কমপক্ষে ১.০০ লাখ কোটি টাকা যাকাত সংগ্রহ করা যেতে পারে। এই সংখ্যাটি সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচির জন্য সরকারি বরাদ্দের সমান বা তারও বেশি। সরকার বাধ্যতামূলকভাবে যাকাত সংগ্রহহের জন্য আইন প্রনয়ন করতে পারে। মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া যাকাত ও ইসলামি সামাজেক অর্থায়নে যে সফলতা লাভ করেছে তা থেকে শিক্ষা নেয়া যেতে পারে। এ খাতে যাকাত তহবিল কাজে লাগানো যেতে পারে। সামাজিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে সরকার নিজে এমনকি বেসরকারী ও ব্যক্তি উদ্যোগকে উৎসাহিত করতে পারে। যাকাত, সদাকা ও ওয়াকফ’র সমন্বিত অর্থায়ন হতে পারে। গত বছর মালয়েশিয়ার সারাওয়াকে ওয়ার্ল্ড যাকাত ফোরামের বার্ষিক কনফারেন্সে ওয়াকফ সর্ম্পকিত একটি উদারহণ পেশ করতে গিয়ে দেখানো হয়, নগদ ওয়াকফের তহবিল ব্যবহার করে সারাওয়াক সরকার হাইড্রোইলেকট্রিক পাওয়ার প্ল্যান্ট তৈরি করেছে। যা সাবাহ, ব্রুনাই ও ইন্দোনেশিয়া পর্যন্ত সার্ভিস দিচ্ছে এবং এর লভ্যাংশ জনকল্যাণে ব্যয় হচ্ছে। 

সমাজে নারীদের অর্থনৈতিক বৈষম্য দূরূকরণে উত্তারধিকার সম্পদ বন্টনে ন্যায্যতা নিশ্চিতকরণ এবং মোহরাণা আদায়ে নিশ্চিত করা যেতে পারে। বিদ্যমান আয়কর নীতি সংস্কার করে করদাতার সংখ্যা সম্প্রসারণ ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার পদক্ষেপ নিতে হবে। কর সংগ্রহে দূর্নীতি দূর করা গেলে রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উন্নতি ঘটবে। একই সঙ্গে যেসব করদাতা সমাজকল্যানমুলক কাজে যাকাত ও অনুদান প্রদান করতে আগ্রহী তাদরেকে জবাবদিহিতার সাথে কর অব্যহতি প্রদানের ব্যবস্থা করা প্রয়োজন।

অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করতে যাকাতের ভূমিকা

যাকাত হতে পারে বর্তমান বিশ্বের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় অর্থনৈতিক বৈষম্য দূর করা বা দরিদ্রদের কাছে সম্পদ হস্তান্তরের কার্যকর ও পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। দারিদ্র্য বিমোচন সংক্রান্ত উন্নয়ন বাজেটের বিরাট একটি উৎস। বাংলাদেশের অধিবাসীদের ৯০% ভাগ মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও এখানে যাকাত আদায় ও বিতরণ সঠিকভাবে হচ্ছে না। ব্যক্তি পর্যায়ে অনেকে বিচ্ছিন্ন-বিক্ষিপ্তভাবে যাকাত প্রদান করলেও দারিদ্র্য বিমোচনে যাকাতের ভূমিকা দৃশ্যমান হয়না। নীতি-নির্ধারকদের কাছেও অর্থব্যবস্থার অংশ হিসেবে যাকাতের কোনো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেনি। বাংলাদেশ সরকার যাকাত ব্যবস্থাপনার জন্য একটি যাকাত তহবিল গঠন করেছে এবং উক্ত যাকাত তহবিলে যে কেউ চাইলে স্বেচ্ছায় যাকাত দিতে পারে; কিন্তু আইন অনুযায়ী সেখানে যাকাত দেয়া বাধ্যতামূলক নয়। সমীক্ষা বলছে যাকাত পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা হলে সরকার বাংলাদেশ থেকে প্রতি বছর ১ লাখ কোটি টাকা যাকাত আদায় করতে পারে। আর এভাবে সংগৃহীত যাকাত তহবিল দারিদ্র্য বিমোচনে ব্যয় করা যেতে পারে। যাকাত আদায় ও বিতরণে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা না থাকায় এর সংগ্রহ ও বিতরণে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার অভাব দেখা যায়।

সবচেয়ে লক্ষণীয় যে, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই যাকাত দেয়া হয় স্বল্প পরিমাণে যা যাকাত গ্রহীতার জীবনমান উন্নয়নে বিশেষ কোনো অবদান রাখতে পারে না। বড়জোর তার সাময়িক কষ্টের কিছুটা লাঘব হয়। সরকার ২০২৩ সালে ১৯৮২ সালে যাকাত অর্ডিনেন্স কিছু সংশোধন ও পরিমার্জন করে একটি নতুন যাকাত আইন প্রণয়ন করেছে। কিন্তু আইনটি দেশে যাকাত প্রতিষ্ঠার জন্য যথেষ্ট নয়। এ আইনে অনেক কিছুই স্পষ্ট নেই। 

যাকাত ও ট্যাক্সের স্পষ্টতা প্রয়োজন

যাকাত ও ট্যাক্স বিশেষত ব্যবসায়িক যাকাত নিয়ে কোন স্পষ্টতা নই। বর্তমান ট্যাক্স পদ্ধতি ব্যবসায়িক যাকাত হিসেবে স্বীকৃত নয়। ফলে ব্যবসায়িক যাকাত বিকশিত হতে পারছেনা। এ বিষয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলগুলোরও দায়িত্ব আছে। দলগুলোর নেতৃত্ব রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রূপরেখা নিয়ে মাসের পর মাস দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলেও জনগণের অর্থনৈতিক সমস্যার বিষয়ে সীমাহীন উদাসীনতা দেখিয়ে এসছে। রয়েছে চিন্তার সক্ষমতার বিষয়টিও। দারিদ্র্য বিমোচনে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মসূচি ও নীতি-পরিকল্পনা কী, সেটা জানার অধিকার নিশ্চয়ই নাগরিকদের আছে।

আমরা চাই, রাজনৈতিক দলগুলো দারিদ্র বিমোচনের অন্যতম উৎস হিসেবে যাকাত ও ইসলামি সামাজিক অর্থায়নকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন। তাদের রাজনৈতিক ইশতেহারে এ বিষয়ে স্পষ্ট ঘোষণা দিবেন। 

যাকাত এবং হারাম উপার্জন সর্বদা বিপরীত মেরুতে অবস্থান করে। দেশে যদি যাকাত দাতার সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পায় তবে অবৈধ অর্থনৈতিক কর্মকান্ড ক্রমান্বয়ে কমে আসবে। মজুদদারী, অতিরিক্ত মুনাফা আদায়, জনগনের সম্পদের অপব্যবহার কমবে। অবৈধ সুযোগ নেয়ার মানসিকতা লোপ পাবে। দেশের সামগ্রীক অর্থনৈতিক পরিস্থিতির উত্তরণ ঘটবে। 

লেখক: প্রাবন্ধিক ও যাকাত ভিত্তিক উন্নয়নকর্মী

wknsohel86@gmail.com

বিকেপি/ এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর