Logo

ধর্ম

রিলসে আটকা জীবন: ঈমানের অবক্ষয়

Icon

মুফতি আহমাদুল্লাহ মাসউদ

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:০৫

রিলসে আটকা জীবন: ঈমানের অবক্ষয়

আল্লাহ তাআলা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তাঁর ইবাদত ও দায়িত্ব পালনের জন্য। তিনি ইরশাদ করেন: “আমি জিন ও মানুষকে কেবল এজন্যই সৃষ্টি করেছি যে তারা আমার ইবাদত করবে।” (সুরা যারিয়াত: ৫৬)। কিন্তু বর্তমান যুগে প্রযুক্তির নামে আমরা এমন এক জালে আবদ্ধ হয়ে পড়েছি, যা আমাদের জীবনের মূল্যবান সময়কে নিঃশব্দে গ্রাস করছে। ইউটুব শর্টস, ফেইসবুক রিলস, টিকটক, এই সব মাধ্যমগুলো আজ আমাদের জীবনে এমন নেশায় পরিণত হয়েছে, যা আমাদের দুনিয়া ও আখিরাত উভয়ের জন্য মারাত্মক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সময়: আল্লাহর বিশেষ আমানত

আল্লাহ তাআলা কোরআনে সময়ের শপথ করে বলেছেন: “শপথ যুগের (সময়ের), নিশ্চয়ই মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত।” (সুরা আসর: ১-২) এই সংক্ষিপ্ত সুরায় আল্লাহ তা‘আলা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, সময় মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। ইমাম শাফিঈ (রহ.) বলেছেন: “যদি মানুষ শুধু সূরা আসর নিয়ে চিন্তা করত, তাহলে তা তার জন্য যথেষ্ট হতো।” (তাফসিরে ইবনে কাসির, সুরা আসর-১) 

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কিয়ামতের দিন বান্দার পা নড়বে না যতক্ষণ না তাকে পাঁচটি বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হবে: তার জীবন কীভাবে কাটিয়েছে, তার যৌবন কোথায় ব্যয় করেছে...” (সুনানে তিরমিজি: ২৪১৬) এই হাদিসে স্পষ্ট যে, আমাদের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব দিতে হবে। আজ যে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমরা অর্থহীন রিলস দেখে কাটাচ্ছি, সেই সময়ের হিসাব আল্লাহর দরবারে দিতে হবে।

রিলস দেখার দুনিয়াবি ক্ষতি

রিলস দেখা কয়েক সেকেন্ডের বিনোদনের লোভে শুরু হলেও এটি ধীরে ধীরে সময়, মনোযোগ ও জীবনের ভারসাম্যকে গ্রাস করে নিচ্ছে। আমরা অনেকেই এটাকে নিরীহ বিনোদন মনে করি; অথচ বাস্তবে এটি এমন এক অভ্যাসে রূপ নিয়েছে, যা আমাদের দেহ, মন, পরিবার ও কর্মজীবনের ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। ইসলাম মানুষকে ভারসাম্যপূর্ণ জীবনব্যবস্থার দিকে আহ্বান করে, যেখানে সময়, স্বাস্থ্য ও দায়িত্বের সঠিক ব্যবহার ঈমানেরই অংশ। কিন্তু রিলস দেখার অতিরিক্ত আসক্তি সেই ভারসাম্যকে ভেঙে দিচ্ছে নিঃশব্দে। নিচে রিলস দেখার ফলে আমাদের জীবনে যে দুনিয়াবি ক্ষতিগুলো তৈরি হচ্ছে, তা সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো।

শারীরিক ক্ষতি: রিলস দেখায় আসক্তি চোখের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “তোমার শরীরের ওপর তোমার হক আছে।” (বুখারি-৫১৯৯) কিন্তু আমরা ঘণ্টার পর ঘণ্টা স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আমাদের চোখের উপর জুলুম করছি। ঘুমের ব্যাঘাত, মাথাব্যথা, মানসিক অস্থিরতা, এসব শারীরিক ক্ষতি আমরা নিজেদের উপর চাপিয়ে নিচ্ছি।

পারিবারিক সম্পর্কের বিচ্ছিন্নতা: আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা নিজেদের ও তোমাদের পরিবার-পরিজনকে আগুন থেকে রক্ষা কর।” (সুরা তাহরিম: ৬) কিন্তু আমরা একই ঘরে থেকেও পরিবারের সদস্যদের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছি। স্ত্রী-স্বামী, পিতা-পুত্র, মা-মেয়ে, সবার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হচ্ছে। সন্তানদের প্রতি দায়িত্ব পালনে অবহেলা হচ্ছে, যা কিয়ামতের দিন আমাদের জবাবদিহিতার কারণ হবে।

শিক্ষাগত ও পেশাগত ক্ষতি: শিক্ষার্থীরা পড়াশোনায় মনোযোগ হারাচ্ছে, চাকরিজীবীরা দায়িত্বে অবহেলা করছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “নিশ্চয়ই আল্লাহ পছন্দ করেন যে, যখন তোমাদের কেউ কোনো কাজ করে, তখন সে যেন তা সুচারুরূপে (নিখুঁতভাবে ও দৃঢ়তার সাথে) সম্পন্ন করে।” (মুজামুল আওসাত, ইমাম তাবারানি কৃত: ৮৯৭)। কিন্তু রিলসের আসক্তি আমাদের শিক্ষায় উন্নতি ও কর্মদক্ষতা নষ্ট করছে, ফলে দুনিয়াবি উন্নতির পথ রুদ্ধ হচ্ছে। 

মানসিক অস্থিরতা ও বিষণ্নতা: স্ক্রীনে অন্যের কৃত্রিম সুখী জীবন দেখে আমরা নিজেদের জীবন নিয়ে অসন্তুষ্ট হচ্ছি। আল্লাহ তাআলা বলেন: “আল্লাহর যিকিরেই অন্তর প্রশান্ত হয়।” (সুরা রাদ: ২৮) কিন্তু আল্লাহর যিকিরের পরিবর্তে আমরা স্ক্রিনে প্রশান্তি খুঁজছি, যা কখনো মিলবে না। বরং মানসিক অশান্তি, হতাশা ও তুলনামূলক হীনমন্যতা দিন দিন বেড়েই চলছে।

রিলস দেখার দ্বীনি ক্ষতি

দুনিয়াবি ক্ষতির চেয়েও ভয়াবহ হলো রিলস দেখার আখিরাতকেন্দ্রিক ক্ষতি, যার পরিণতি দুনিয়াতে চোখে পড়ে না। কিন্তু কিয়ামতের ময়দানে একে একে এগুলো উন্মোচিত হবে। প্রতিটি মুহূর্ত, প্রতিটি দৃষ্টি ও প্রতিটি অবহেলিত দায়িত্বের হিসাব আল্লাহর দরবারে পেশ করা হবে। যে সময় আল্লাহর স্মরণ, ইলম অর্জন, পরিবার প্রতিপালন ও নেক আমলের জন্য বরাদ্দ ছিল, তা যদি নিছক স্ক্রলিং ও অর্থহীন বিনোদনে ব্যয় হয়, তবে তা আখিরাতে চরম অনুশোচনার কারণ হবে। 

নামাযের প্রতি উদাসীনতা: রিলস দেখতে দেখতে নামাযের সময় চলে যায়। অনেকে নামাযই ছেড়ে দেয়। আবার অনেকে নামাজ কাজা করে ফেলে। অথচ আল্লাহ তাআলা কঠোর হুঁশিয়ারির সাথে উচ্চারণ করেছেন: “দুর্ভোগ সেই নামাজিদের জন্য, যারা তাদের নামাজে উদাসীন।” (সুরা মাউন: ৪-৫)। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কুফর ও ঈমানের মধ্যে পার্থক্য হলো নামায ত্যাগ করা।” (সহিহ মুসলিম: ৮২)

কোরআন থেকে দূরত্ব: মুমিনের জন্য কোরআন তিলাওয়াত ও অধ্যয়ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাব (কোরআন) থেকে একটি হরফ বা অক্ষর পাঠ করবে, তার জন্য একটি নেকি রয়েছে। আর প্রতিটি নেকিকে দশ গুণ বাড়িয়ে দেওয়া হয়।” (সুনানে তিরমিজি: ২৯১০) কিন্তু আমরা কোরআন তিলাওয়াতের সময় পাই না, অথচ রিলসের জন্য ঘণ্টার পর ঘণ্টা সময় আছে। এই অবহেলার পরিণাম কতটা ভয়াবহ হতে পারে, তা কি কল্পনা করা যায়!

অশ্লীলতা ও গুনাহের প্রবেশদ্বার: অনেক রিলসে থাকে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা ও গান-বাজনায় সম্পৃক্ত। আর আল-কোরআন ঘোষণা করেছে: “বলুন, আমার রব তো হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন (সব ধরণের) অশ্লীল কাজ।” (সুরা আরাফ: ৩৩) রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “চোখের যিনা হলো (হারামের দিকে) তাকানো, দুই কানের যিনা হলো (মন্দ কথা) শোনা, জিহ্বার যিনা হলো (অন্যায়) কথা বলা, হাতের যিনা হলো ধরা বা স্পর্শ করা, পায়ের যিনা হলো (গুনাহের দিকে) হেঁটে যাওয়া।” (সহিহ বুখারি: ৬২৩৪)।

হৃদয়ের কঠোরতা: ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন: “নিশ্চয়ই পাপাচার বা মন্দ কাজের ফলে- চেহারায় কালো দাগ পড়ে, কবরে ও হৃদয়ে অন্ধকার সৃষ্টি হয়, শরীরে দুর্বলতা তৈরি হয়, রিজিকে বা জীবিকায় সংকীর্ণতা আসে এবং মানুষের অন্তরে তার প্রতি ঘৃণা ও বিদ্বেষ তৈরি হয়।” (তাফসিরে ইবুল কায়্যিম, সুরা শুরা-৩০)। তাই ক্রমাগত অনর্থক কাজে লিপ্ত থাকলে হৃদয় কঠিন হয়ে যায়, আল্লাহর ভয় কমে যায়।

মৃত্যুর প্রস্তুতি থেকে গাফলত: আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের ধন-সম্পদ ও সন্তান-সন্ততি যেন তোমাদের আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না করে।” (সুরা মুনাফিকুন: ৯)। এই রিলস আমাদের মৃত্যুর কথা ভুলিয়ে দেয়, আখিরাতের চিন্তা থেকে দূরে রাখে। এদিকে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “স্বাদ নষ্টকারী (মৃত্যু)-কে অধিক হারে স্মরণ কর।” (তিরমিযী: ২৩০৭)

এই আসক্তি থেকে মুক্তির পথ

তাওবা ও দৃঢ় সংকল্প: সর্বপ্রথম আল্লাহর কাছে খালেস তাওবা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন: “হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহর কাছে খাঁটি তাওবা কর।” (সুরা তাহরিম: ৮)। সময় নষ্ট করার জন্য অনুতপ্ত হোন এবং দৃঢ় সংকল্প নিন যে আর এই পথে ফিরবেন না।

অ্যাপ আনইনস্টল বা সীমিতকরণ: যে অ্যাপগুলো সময় নষ্ট করাচ্ছে, সেগুলো মুছে ফেলুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে দেয় তা ছেড়ে দাও, যা তোমাকে সন্দেহে ফেলে না, তার প্রতি (ধাবিত হও)” (সুনানে তিরমিজি-২৫১৮)। যদি একবারে পুরোপুরি মুছতে না পারেন, তাহলে নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করুন এবং তা মেনে চলুন। ধীরে ধীরে মুছে ফেলুন। 

নিয়মিত পাঁচ ওয়াক্ত সালাত আদায় করা: সালাত হলো আল্লাহর সাথে সংযোগের মাধ্যম। সালাত সময়মতো পড়লে জীবনে শৃঙ্খলা আসে এবং অন্যায় থেকে বিরত থাকা সহজ হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন: “নিশ্চয়ই নামায অশ্লীল ও মন্দ কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সুরা আনকাবুত: ৪৫)

কোরআন তিলাওয়াতের নিয়মিত অভ্যাস গড়া: প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময় কোরআন তিলাওয়াতের জন্য বরাদ্দ রাখুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “কোরআন তিলাওয়াত কর। কেননা তা কিয়ামতের দিন সুপারিশকারী হিসেবে আসবে।” (মুসলিম: ৮০৪)

উপকারী ইলম চর্চা করা: অযথা সময় নষ্ট না করে ইসলামি জ্ঞান, দ্বীনি বই, হাদিস, তাফসির অধ্যয়ন করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাদেরকে এই ব্যাপারে সুন্দর একটি দুআ শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি দুআ করতেন: “হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে উপকারী ইলম প্রার্থনা করছি এবং এমন জ্ঞান থেকে আশ্রয় চাচ্ছি যা কোনো উপকারে আসে না।” (সহিহ ইবনে হিব্বান-৮২)

নেককারদের সাহচর্য গ্রহণ করা: যারা আল্লাহর পথে চলে, তাদের সান্বিধ্য অবলম্বন করুন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: “মানুষ তার বন্ধুর ধর্মের (আদর্শের) অনুসারী হয়। কাজেই তোমাদের প্রত্যেকেরই ভাবা উচিত সে কার সাথে বন্ধুত্ব করছে।” (সুনানে আবু দাউদ: ৪৮৩৩)

প্রিয় পাঠক! আল্লাহ তাআলা আমাদের যে সীমিত সময় দিয়েছেন, তা অসীম মূল্যবান। রিলস ও শর্ট ভিডিওর নেশা থেকে বের হয়ে আসুন। আল্লাহর সন্তুষ্টির পথে সময়কে কাজে লাগান। মনে রাখবেন, মৃত্যু হঠাৎ এসে যাবে, তখন অনুতাপের কোনো সুযোগ থাকবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন: “মৃত্যু যখন তাদের কারো কাছে এসে উপস্থিত হয়, তখন সে বলে: হে আমার রব! আমাকে পুনরায় পাঠিয়ে দিন। যাতে আমি সৎকর্ম করতে পারি যা আমি ছেড়ে এসেছি।” (সুরা মুমিনুন: ৯৯-১০০)

লেখক: মুদাররিস, জামিয়া নূরিয়া ইসলামিয়া, কামরাঙ্গিরচর, ঢাকা।

বিকেপি/এমএম 

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর