Logo

ধর্ম

মাতৃভাষা মাস

ইসলামের আলোকে মাতৃভাষার মর্যাদা

Icon

ডা.মুহাম্মাদ মাহতাব হোসাইন মাজেদ

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২৩:১০

ইসলামের আলোকে মাতৃভাষার মর্যাদা

ফেব্রুয়ারি মাস বিশেষভাবে আমাদের মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে উদ্দীপনা যোগায়। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে ফেব্রুয়ারি মাস মাতৃভাষা মাস হিসেবে পালন করা হয়। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য শহীদ হওয়া বীর সন্তানদের স্মরণে এই মাস আমাদের জাতীয় চেতনা, সংস্কৃতি ও শিক্ষার প্রতি দায়িত্ববোধ জাগ্রত করে। মাতৃভাষা শুধু একটি ভাষা নয়, এটি জাতির আত্মা, সংস্কৃতি এবং ইসলামের শিক্ষার প্রতিফলন।

মাতৃভাষা ও ইসলামের নির্দেশনা

ইসলামে ভাষা শেখা ও শিক্ষা দেওয়ার ক্ষেত্রে মাতৃভাষার গুরুত্ব অগ্রণী। কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, আমরা মানুষের জন্য তাদের ভাষা ও স্বাতন্ত্র্য দিয়ে তাদের আলাদা করেছি।- (সূরা হুজুরাত:১৩) এই আয়াত থেকে বোঝা যায়, আল্লাহ মানুষের মধ্যে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করেছেন। মাতৃভাষা সেই বৈচিত্র্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া এবং তা শেখা ইসলামী নৈতিক দায়িত্ব।

হাদিসেও এসেছে: তুমি যে জাতি তাদের ভাষা জানো না, তাদের ওপর শিক্ষা প্রচার করো না।- (সহীহ বুখারি: ২৭২৩)এটি প্রমাণ করে, শিক্ষা তখনই ফলপ্রসূ হয় যখন তা শিক্ষার্থীর বোঝার ভাষায় দেওয়া হয়। মাতৃভাষা শিশুদের কোরআন, ইসলামের নৈতিক শিক্ষা এবং সাধারণ জ্ঞান সহজে ধারণের ক্ষমতা প্রদান করে।

মাতৃভাষার শিক্ষা ও মনস্তাত্ত্বিক গুরুত্ব

শিশুদের মনস্তাত্ত্বিক বিকাশে মাতৃভাষার ভূমিকা অপরিসীম। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণ করলে শিশুরা সহজে ধারণ করে, চিন্তাশক্তি প্রসারিত হয় এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধি পায়। ইউনিসেফের গবেষণায় দেখা গেছে, শিশুরা যখন তাদের মাতৃভাষায় প্রাথমিক শিক্ষা পায়, তখন তারা শিক্ষার প্রতি বেশি আগ্রহী হয় এবং উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রস্তুত হয়।

ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও শিক্ষার মানসিক প্রক্রিয়াকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কোরআনে বলা হয়েছে: আর তোমাদের মধ্যে যারা জ্ঞান রাখে, তারা আল্লাহকে ভয় করবে।- (সূরা ফাতির:২৮) মাতৃভাষা শেখা শিক্ষার মূল ভিত্তি, যা শিশুর জ্ঞান, নৈতিকতা এবং সামাজিক উন্নয়নের জন্য অপরিহার্য।

মাতৃভাষা ও নৈতিক চরিত্র

মাতৃভাষা কেবল শিক্ষার মাধ্যম নয়; এটি মানুষের নৈতিক চরিত্র গঠনে সরাসরি প্রভাব ফেলে। হাদিসে এসেছে:সৎ ও ভাল মানুষ সেই, যে অন্যের সাথে তার ভাষায় সহজ ও সৎভাবে কথা বলে।”- (সহীহ মুসলিম: ২৭১)

এই হাদিস দেখায়, ভাষা ব্যবহার শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং নৈতিক ও সামাজিক মূল্যবোধের প্রতিফলন। মাতৃভাষার মাধ্যমে শিশু ও প্রাপ্তবয়স্করা ইসলামের নৈতিক শিক্ষা সহজে শিখতে পারে।

মাতৃভাষা ও জাতীয় চেতনা

বাংলাদেশের ইতিহাসে মাতৃভাষা আমাদের জাতীয় চেতনা ও মুক্তিযুদ্ধের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত। ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি ভাষার জন্য শহীদ হওয়া বীর সন্তানরা আমাদের মনে করিয়ে দেন মাতৃভাষার মর্যাদা কতটা গুরুত্বপূর্ণ। মাতৃভাষা শেখা ও রক্ষা করা কেবল শিক্ষার বিষয় নয়, এটি জাতির আত্মপরিচয়, সংস্কৃতি এবং ইতিহাসের প্রতীক।

কোরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, আর তোমাদের মধ্যে যারা জ্ঞান রাখে, তারা আল্লাহকে ভয় করবে।- (সূরা ফাতির:২৮) এই আয়াত নির্দেশ দেয় যে জ্ঞান অর্জন এবং শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর নৈতিক পথে চলতে সক্ষম হয়। মাতৃভাষায় শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে শিশুরা সহজে জ্ঞান অর্জন করতে পারে এবং ইসলামের শিক্ষার সঙ্গে যুক্ত হতে পারে।

মাতৃভাষা ও সামাজিক উন্নয়ন

মাতৃভাষা সামাজিক ও নৈতিক উন্নয়নেরও চাবিকাঠি। একজন মানুষ তার মাতৃভাষা জানলে সে সহজে জ্ঞান অর্জন করে, সামাজিক এবং ধর্মীয় দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হয়। মাতৃভাষা শেখা সামাজিক সংহতি এবং মানুষের মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক দৃঢ় করে।

হাদিসে এসেছে: যে ব্যক্তি অন্যের সাথে ন্যায় ও সহজভাবে কথা বলে, সে আল্লাহর নৈকট্য লাভ করে।- (সহীহ বুখারি : ৬৭২১)

মাতৃভাষার ব্যবহার মানুষের নৈতিক আচরণ ও সামাজিক মূল্যবোধকে দৃঢ় করে।

মাতৃভাষা মাসের গুরুত্ব

ফেব্রুয়ারি মাসে মাতৃভাষার প্রতি শ্রদ্ধা জানানো আমাদের জাতীয় ও ধর্মীয় দায়িত্ব। মাতৃভাষা শেখা, ব্যবহার করা এবং রক্ষা করা মানে কেবল শিক্ষার প্রতি মনোযোগ নয়, বরং ইসলামের নৈতিক শিক্ষা, সামাজিক মূল্যবোধ এবং জাতীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষণ করা। মাতৃভাষা মাস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব।

উপসংহার

মাতৃভাষা একটি জাতির আত্মা, সংস্কৃতি এবং নৈতিক চেতনার প্রতীক। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকেও মাতৃভাষার শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। কোরআন ও হাদিসের আলোকে আমরা বুঝতে পারি, ভাষা শেখা এবং ব্যবহার করা শুধুমাত্র জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়; এটি নৈতিকতা, সামাজিক সংহতি এবং মানবিক মূল্যবোধের মূল চালিকা শক্তি।

আমাদের উচিত মাতৃভাষার মর্যাদা রক্ষা করা, শেখা এবং তা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে প্রেরণ করা। মাতৃভাষা শেখা এবং রক্ষা করা মানে ইসলামের শিক্ষার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া, জাতীয় ঐতিহ্য এবং মানবিক মূল্যবোধ রক্ষা করা। আমরা যদি আমাদের মাতৃভাষার মর্যাদা বজায় রাখি, তবে আগামী প্রজন্মও ইসলামের নৈতিক শিক্ষা এবং জাতীয় চেতনার সঙ্গে যুক্ত একটি সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলতে পারবে।

মাতৃভাষা শেখা, ব্যবহার করা এবং রক্ষা করা আমাদের ধর্মীয় ও জাতীয় দায়িত্ব।

লেখক: ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধকার ও গবেষক 

প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান, জাতীয় রোগী কল্যাণ সোসাইটি 

ইমেইল: drmazed96@gmail.com

বিকেপি/এমএম

প্রাসঙ্গিক সংবাদ পড়তে নিচের ট্যাগে ক্লিক করুন

ইসলাম ধর্ম

Logo
সম্পাদকমণ্ডলীর সভাপতি মোস্তফা কামাল মহীউদ্দীন ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক সৈয়দ মেজবাহ উদ্দিন প্রধান, ডিজিটাল সংস্করণ হাসনাত কাদীর