যুগে যুগে বিশ্বনবীর মদিনা সনদের প্রাসঙ্গিকতা
সুলতান মাহমুদ সরকার
প্রকাশ: ০৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ২২:১৭
মানবসভ্যতার ইতিহাসে নবী ও রাসুলরা ছিলেন সকল যুগের ও সকল কালের জন্য পথপ্রদর্শক। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন এমনই এক অনন্য ব্যক্তিত্ব যিনি একাধারে নেতা, রাষ্ট্রনায়ক, সমাজসংস্কারক, বিচারক এবং মানবিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে পৃথিবীতে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দক্ষতা এতটাই অসাধারণ ছিল যে মাত্র দশ বছরের মধ্যে তিনি একটি বিভক্ত, যুদ্ধবিধ্বস্ত এবং উপজাতীয় কলহে লিপ্ত আরব ভূখণ্ডকে একটি সুসংগঠিত, শক্তিশালী এবং ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। বিশ্বনবীর নেতৃত্ব কেবল আধ্যাত্মিকতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং বাস্তববাদী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবকল্যাণকেন্দ্রিক। আর এই রাষ্ট্রনায়কসুলভ প্রজ্ঞার সর্বোৎকৃষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশ ঘটেছিল মদিনার সনদের মাধ্যমে- যা ইতিহাসের প্রথম লিখিত সামাজিক চুক্তি ও সংবিধান হিসেবে আজও স্বীকৃত। এই সনদ কেবল একটি ঐতিহাসিক দলিল নয়, বরং এটি সংঘাতপূর্ণ বর্তমান বিশ্বে শান্তি, সহাবস্থান এবং ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার এক অমূল্য দিকনির্দেশনা।
হিজরতের পর ইয়াসরিব নগরী যখন ‘মদীনাতুন নবী’ বা মদীনা হিসেবে নতুন পরিচয় লাভ করে, তখন সেটি ছিল একটি বহুধাবিভক্ত সমাজ। সেখানে ছিল মুসলমান, ইহুদি, মুশরিক ও বিভিন্ন গোত্রভিত্তিক জনগোষ্ঠী, যাদের মধ্যে পারস্পরিক অবিশ্বাস, রক্তক্ষয়ী দ্ব›দ্ব ও ক্ষমতার লড়াই ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। এমন একটি সমাজকে শান্তি, শৃঙ্খলা ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রে রূপান্তর করা সহজ কোনো কাজ ছিল না। কিন্তু বিশ্বনবী (সা.) সেই কঠিন বাস্তবতাকে মোকাবিলা করেছেন প্রজ্ঞা, সহনশীলতা ও ন্যায়ের মাধ্যমে। তাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বের ফল হিসেবেই প্রণীত হয় মদীনার সনদ যা কেবল একটি চুক্তি নয়, বরং একটি পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদর্শনের দলিল।
মদীনার সনদ মূলত একটি সামাজিক ও রাজনৈতিক চুক্তি, যেখানে মদীনার সব জনগোষ্ঠীকে একটি সম্মিলিত রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আওতায় আনা হয়। এখানে ধর্ম, গোত্র কিংবা বংশের ভিত্তিতে কোনো বৈষম্য করা হয়নি। বরং সবাইকে একটি ‘উম্মাহ’ বা রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই উম্মাহ ধারণাটি ছিল যুগান্তকারী। কারণ, এর আগে রাষ্ট্র গঠনের ভিত্তি ছিল বংশ, রক্ত অথবা শক্তি; সেখানে মদীনার সনদ নাগরিকত্ব ও পারস্পরিক দায়িত্ববোধকে রাষ্ট্রের ভিত্তি হিসেবে স্থাপন করে। এভাবেই বিশ্বনবী (সা.) প্রথমবারের মতো একটি বহুধর্মীয়, বহুজাতিক ও বহুগোষ্ঠীর সমাজকে আইনের শাসনের আওতায় আনেন।
এই সনদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল ধর্মীয় স্বাধীনতা। মদীনার ইহুদি ও অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালনের পূর্ণ অধিকার দেওয়া হয়েছিল। রাষ্ট্র কোনোভাবেই তাদের বিশ্বাসে হস্তক্ষেপ করেনি। একই সঙ্গে সবার জন্য আইন ছিল সমান। কেউ অপরাধ করলে তাকে তার গোত্র বা ধর্মের কারণে রেহাই দেওয়া হতো না। ন্যায়বিচার ছিল সবার জন্য এক ও অভিন্ন। আজকের আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় ধর্মীয় স্বাধীনতা ও আইনের শাসনের যে ধারণা আমরা দেখি, তার মৌলিক ভিত্তি মদীনার সনদেই সুস্পষ্টভাবে উপস্থিত।
মদীনার সনদ কেবল অধিকার নয়, দায়িত্বের কথাও স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা, শান্তি ও শৃঙ্খলা রক্ষার দায়িত্ব ছিল সবার সম্মিলিত। বহিঃশত্রæর আক্রমণের ক্ষেত্রে সবাইকে একসঙ্গে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে-এটি ছিল একটি যৌথ নিরাপত্তা নীতির ঘোষণা। একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ বিশৃঙ্খলা, অপরাধ ও ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথাও বলা হয়েছিল। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় স্বার্থকে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠীগত স্বার্থের ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া হয়।
বিশ্বনবী (সা.) যে শুধু একজন রাসুলই ছিলেন না, বরং একজন দক্ষ রাষ্ট্রনায়ক ছিলেন- মদীনার সনদ তার জ্বলন্ত প্রমাণ। তিনি জানতেন, কেবল নৈতিক আহ্বান দিয়ে রাষ্ট্র টেকে না; প্রয়োজন হয় নীতিমালা, আইন ও প্রশাসনিক কাঠামোর। আবার আইন যদি নৈতিকতা ও মানবিকতার ভিত্তিতে না হয়, তবে তা নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে। মদীনার সনদ এই দুইয়ের অপূর্ব সমন্বয় ঘটিয়েছে- নৈতিকতা ও আইন, অধিকার ও দায়িত্ব, স্বাধীনতা ও শৃঙ্খলা।
আজকের বিশ্ব যখন রাজনৈতিক মেরুকরণ, ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা, জাতিগত বিদ্বেষ ও রাষ্ট্রীয় নিপীড়নে জর্জরিত, তখন মদীনার সনদের প্রাসঙ্গিকতা নতুন করে সামনে আসে। আধুনিক রাষ্ট্রগুলোতে সংখ্যালঘু নির্যাতন, মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপ এবং ক্ষমতার অপব্যবহার নিত্যদিনের সংবাদ। অথচ চৌদ্দশ বছর আগে প্রণীত মদীনার সনদ এসব সমস্যার সমাধানে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। সেখানে ক্ষমতা ছিল দায়িত্বের সঙ্গে যুক্ত, আর নেতৃত্ব ছিল জবাবদিহিমূলক।
বিশ্বনবী (সা.) রাষ্ট্র পরিচালনায় যে নীতি অনুসরণ করেছেন, তার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল ন্যায় ও ইনসাফ। তিনি নিজে যেমন আইনের ঊর্ধ্বে ছিলেন না, তেমনি তাঁর নিকট আত্মীয়ও আইনের বাইরে কোনো সুবিধা পেত না। তাঁর সেই বিখ্যাত ঘোষণা- যদি ফাতিমা বিনতে মুহাম্মদ চুরি করত, তবে তার হাতও কাটা হতো, যা আইনের শাসনের এক অতুলনীয় উদাহরণ। এই নীতি মদীনার সনদের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছে, যেখানে ব্যক্তিগত পরিচয় নয়, অপরাধই বিচার্যের বিষয়।
রাষ্ট্র পরিচালনায় পরামর্শ ও অংশগ্রহণের বিষয়টিও মদীনার সনদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। বিশ্বনবী (সা.) রাষ্ট্র পরিচালনায় এককভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতেন না। তিনি সাহাবিদের সঙ্গে পরামর্শ করতেন, বিভিন্ন গোত্র ও সম্প্রদায়ের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। এর মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক শাসনব্যবস্থা গড়ে ওঠে, যা আধুনিক গণতান্ত্রিক ধারণার সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্র্ণ।
মদীনার সনদের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো সামাজিক ন্যায়বিচার ও দুর্বলদের সুরক্ষা। এতিম, দরিদ্র, নিপীড়িত ও অসহায় মানুষের অধিকার রক্ষাকে রাষ্ট্রের দায়িত্ব হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। রাষ্ট্র কেবল শক্তিশালীদের জন্য নয় বরং দুর্বলদের আশ্রয়স্থল- এই ধারণা আজকের কল্যাণরাষ্ট্রের মূল দর্শনের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।
আজকের মুসলিম বিশ্বসহ সমগ্র মানবসভ্যতা যদি রাষ্ট্র পরিচালনায় বিশ্বনবী (সা.)- এর দেখানো পথ থেকে শিক্ষা নেয়, তবে অনেক সংকটই কেটে যাবে। ধর্মকে যদি বিভাজনের হাতিয়ার না বানিয়ে নৈতিকতার উৎস হিসেবে গ্রহণ করা হয়, যদি সংবিধান ও আইনে মানবিকতা ও ন্যায়বোধকে প্রাধান্য দেওয়া হয়, যদি ক্ষমতা চর্চা হয় জবাবদিহির সঙ্গে- তবে রাষ্ট্র সত্যিকার অর্থেই মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারে। মদীনার সনদ আমাদের শেখায়, ভিন্নতা সমস্যা নয়; সমস্যা হলো অন্যায় ও অবিচার। আর এই অন্যায়ের প্রতিকার ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থায়।
যুগে যুগে সভ্যতা বদলেছে, প্রযুক্তি এগিয়েছে, রাষ্ট্রের কাঠামো রূপান্তরিত হয়েছে; কিন্তু মানুষের মৌলিক চাহিদা-নিরাপত্তা, ন্যায়, মর্যাদা ও স্বাধীনতা একই রয়ে গেছে। এই চাহিদাগুলোর সমন্বিত উত্তর মদীনার সনদে ছিল বলেই তা আজও প্রাসঙ্গিক। এটি কোনো অতীতচারী দলিল নয়; বরং একটি জীবন্ত দর্শন, যা আজও রাষ্ট্রনায়ক, চিন্তাবিদ ও নীতিনির্ধারকদের জন্য অনুকরণীয়।
সুতরাং মদীনার সনদ কেবল ইসলামী ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়; এটি মানবসভ্যতার এক অনন্য মাইলফলক। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) তাঁর রাষ্ট্রনায়কসুলভ প্রজ্ঞা দিয়ে প্রমাণ করেছেন, ধর্ম ও রাষ্ট্র কখনোই পরস্পরের বিরোধী নয়- বরং ন্যায়, মানবিকতা ও শান্তির নিমিত্তে তারা একে অপরের অন্যতম পরিপূরক। যুগে যুগে, কালে কালে, সংকটে ও সম্ভাবনায় মদীনার সনদ তাই আজও আমাদের পথ দেখায়- ন্যায়ের পথে, সহাবস্থানের পথে, মানবতার পথে।
লেখক: কলামিস্ট, এমফিল গবেষক, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও শিক্ষক গাজীপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজ।
ই-মেইল: sultanmh17@gmail.com
বিকেপি/এমএম

